চাঁদপুর, মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯, ১৫ রজব ১৪৪৪  |   ২১ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   তুরস্ক ও সিরিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রাণহানি ১ হাজার ৬'শ ছাড়িয়েছে, জরুরী অবস্থা জারি
  •   জুনের মধ্যে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ
  •   ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে হজের নিবন্ধন শুরু
  •   জুয়ার নিরাপদ আস্তানায় হানা নেই কেন?
  •   নিখোঁজের ৪ দিন পর ফরিদগঞ্জে মাদক ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার ॥ আটক ২

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০০

বিশ্ব ইজতেমার ইতিবৃত্ত
অনলাইন ডেস্ক

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও শুরু হচ্ছে বাংলাদেশে বিশ্ব ইজতেমা। রাজধানী ঢাকার ২২ কিলোমিটার উত্তরে তুরাগ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে তাবলিগ জামায়াতের বিশ্বখ্যাত এ ইজতেমা। তবে বাংলাদেশে তাবলিগ আন্দোলন শুরু হয় ১৯৪৪ সালে। কয়েক যুগ ধরে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বিশ্ব ইজতেমা। বিগত কয়েক বছর দু’পর্বে ছয় দিনব্যাপী ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এটি বিশ্বের তাবলিগ অনুসারীদের একটি বৃহত্তম সমাবেশ। তাবলিগ আরবি শব্দ, বালাগ শব্দমূল থেকে আগত। যার শাব্দিক অর্থ পৌঁছানো, প্রচার করা, প্রসার করা, বয়ান করা, চেষ্টা করা, দান করা ইত্যাদি। পরিভাষায় একজনের অর্জিত জ্ঞান বা শিক্ষা নিজ ইচ্ছা ও চেষ্টার মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌঁছানোকে তাবলিগ বলে। তাবলিগ আদর্শ যিনি পৌঁছেন, তাকে মুবাল্লিগ বলে।

ইতোপূর্বে ঢাকার কাকরাইল মসজিদ ও সংলগ্ন রমনা উদ্যানের একাংশে অনুষ্ঠিত হতো এ সমাবেশ। ইজতেমার ইতিহাস তালাশ করলে মোটামুটি জানা যায়, বাংলাদেশে ইজতেমা অনুষ্ঠানের প্রায় ৩/৪ যুগ পূর্বে ভারতের সাহারানপুর এলাকায় এ মহতী কাজের গোড়াপত্তন ঘটে।

বর্তমান ধারায় এ তাবলিগি কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করেন মাওলানা ইলিয়াস (র)। ১৯২০ সালে তিনি প্রচলিত তাবলিগ আন্দোলন শুরু করেন। তিনি এ কর্মপ্রয়াসকে তখন বলতেন ‘ইসালে নফস’ বা আত্মশুদ্ধির প্রাথমিক পাঠ। প্রথমত তিনি টেস্ট কেস হিসেবে ভারতের সাহারানপুর ও মেওয়াত এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। তিনি ৬টি বিশেষ গুণ অর্জনের মেহনত করেন জনসাধারণ্যে। সেই ছটি বিশেষগুণ হলো- কালেমা, নামাজ, এলেম ও জিকির, ইকরামুল মুসলিমিন (মুসলমানদের সেবা) সহিহ নিয়ত ও তাবলিগ। অন্য একটি গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, ইলিয়াস (র) প্রথম বর্তমান ধারার এ তাবলিগকে নাম দেন ‘তাহরিকুস সালাত’ বা নামাজের আন্দোলন বলে।

কথিত আছে, ইলিয়াস (র) প্রথম যখন মানুষের কাছে ধর্মীয় প্রচার শুরু করেন, তখন তেমন কোনো সাড়া মিলেনি। তাই তিনি অভিনব এক কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি আশপাশের দিনমজুর, শ্রমিক-কৃষকদের ডেকে এনে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রেখে দু’বেলা খাবার দিতেন এবং তাদেরকে নামাজ শিক্ষা দিতেন, নামাজের সুরা শিখাতেন, ধর্মীয় বিধি-নিষেধ বর্ণনা করতেন। অবশেষে বিদায় বেলা তাদের প্রত্যেককে মজুরি তথা পারিশ্রমিক দিয়ে দিতেন। এ পদ্ধতি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হলো। অল্প সময়ের ব্যবধানেই তার নামাজের আন্দোলনের সদস্য সংখ্যা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হয়ে পড়ল। জনগণ নিজেরাই নিজ অর্থ ব্যয় করে ইলিয়াস (র)-এর পদাঙ্ক অনুকরণ করে দাওয়াতি কার্যক্রম চালাতে থাকেন।

যখন বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের প্রচেষ্টা শুরু হয়, তখন এর নাম ছিল শুধুই ইজতেমা। যা’ অনুষ্ঠিত হতো ঢাকার কাকরাইল মসজিদে। ১৯৬৪ সালে কাকরাইলে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের ইজতেমা শুরু হয়। ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে, তারপর ১৯৬৫ সালে টঙ্গীর পাগারে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তখন থেকে ধীরে ধীরে এগুতে এগুতেই আজকের টঙ্গীতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমা। যে ইজতেমায় অংশগ্রহণ করে বিশ্বের প্রায় একশ’টি রাষ্ট্রের তাবলিগ প্রতিনিধিরা।

শিল্পনগরী টঙ্গীতে ইজতেমাকে স্থানান্তরিত করা হয় ১৯৬৬ সালে। আর সে বছর থেকেই তাবলিগ জামাতের এ মহাসম্মেলন বিশ্ব ইজতেমা নামে খ্যাতি অর্জন করে। বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের মুসলমানদের সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য আর ঐক্যের এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র বিশ্ব ইজতেমা। এর ফলে তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা পরিচিতি লাভ করে বিশ্ব মুসলিমের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিলনকেন্দ্র হিসেবে।

বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় তিন দিনব্যাপী। কিন্তু টঙ্গীতে এর আমেজ থাকে প্রায় মাসব্যাপী। আর এ ইজতেমার প্রস্তুতি তো তিন-চার মাস আগ থেকেই শুরু হয়ে যায়। সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত তাবলিগ আন্দোলনকে বিশ্বের সবচে’ বড় ইসলামি আন্দোলন বলা হয়ে থাকে। পৃথিবীর ছয়টি মহাদেশের কোটি কোটি মুসলমান এ আন্দোলনের সময় বিনিয়োগ করে থাকেন।

তাবলিগ জামাতের কোনো সংবিধান নেই। অলিখিত সংবিধানও নেই। লিখিত আইন, বিধি বিধান ও উপবিধি কিছুই নেই। তারপরও এ আন্দোলন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সুশৃঙ্খল আন্দোলন। তাবলিগ জামাতের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি আছে। এটিকে বলা হয় মজলিসে শূরা। এ কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না। ২১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াও বহু ব্যক্তি এ কমিটির মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করে থাকেন। তাবলীগে যারা অপেক্ষাকৃত বেশি অবদান রেখেছেন, তারাই এ কমিটির আলোচনায় কথাবার্তা বলেন। তবে কে কত বেশি অবদান রেখেছেন, তা’ নির্ধারণেরও মাপকাঠি নেই। তাবলিগ আন্দোলনে ক্ষমতা বা পদমর্যাদার কোনো প্রতিযোগিতা নেই, প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। নেতৃত্বের কোন্দল নেই। যিনি একবার কেন্দ্রীয় শূরায় আমির নির্বাচিত হন, তিনি আমৃত্যু সে পদ অলঙ্কৃত করেন। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য কোনো আন্দোলন নেই, ষড়যন্ত্র নেই। তাবলিগ অনুসারীরা তাদের আমিরকে সম্বোধন করেন ‘হজরতজি’ বলে। ঢাকা মহানগরীতে অবস্থিত কাকরাইল মসজিদ বাংলাদেশ তাবলিগ জমাতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বা হেড কোয়ার্টার।

বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে টঙ্গীতে প্রায় চার কিলোমিটার লম্বা যে প্যান্ডেল তৈরি করা হয়, তার জন্যে কোনো চাঁদা অনুদান কারো কাছ থেকে চাওয়া হয় না। স্বেচ্ছাসেবীরা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এ সম্মিলনের ব্যয়ভার বহন করে থাকেন। তাবলিগে অংশগ্রহণকারী প্রকৌশলীগণ প্যান্ডেলের একটি নকশা তৈরি করে দেন। বিভিন্ন কল-কারখানা, মিল-ফ্যাক্টরি থেকে আসা লোকজন রড, সিআই সিট, সামিয়ানার চট ইত্যাদি নিয়ে আসেন। কে কী জিনিস নিয়ে আসে, তা’ যার হিসেব তারাই রাখেন। ইজতেমা শেষ হওয়ার পর তারা স্ব স্ব জিনিসপত্র খুলিয়ে দেন।

তাবলিগ আন্দোলন ও বিশ্ব ইজতেমার কোনো প্রেস রিলিজ, প্রকাশনা, প্রচার শাখা নেই। বিশ্ব ইজতেমা কোন্ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে, তা’ উল্লেখ করে কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি ইস্যু করা হয় না। কোনো লিফলেট-পোস্টার ছাপানো হয় না। তবুও লাখ লাখ মানুষ নির্দিষ্ট সময়ের আগে বিশ্ব ইজতেমায় সমবেত হন। ইজতেমা ময়দানে লাখো জনতার উদ্দেশ্যে কে বক্তব্য রাখছেন, তার নাম ঘোষণা দেয়া হয় না। এ ক্ষেত্রে তাবলিগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ‘কে বলছেন সে দিকে তাকিও না, কী বলেছে সেদিকে লক্ষ্য করো’ হাদিসকেই ফলো করে থাকেন।

মাওলানা ইলিয়াস (র)-এর জীবদ্দশাতেই বার্ষিক ইজতেমা অনুষ্ঠানের কাজ শুরু হয়। উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও উপমহাদেশের বাইরে নানা দেশে তাবলিগের কাজ বিস্তৃত করার উদ্যোগ মাওলানা ইলিয়াস (র) নিজেই গ্রহণ করেন। তার নির্দেশে উপমহাদেশের বড় বড় শহরে তাবলিগের জামাত সফর শুরু করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাবলিগ জামাতের কাজ সম্প্রসারিত হলেও ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এ আন্দোলন সবচে’ বেশি শক্তিশালী। বাংলাদেশে তাবলিগ জামাত সৃষ্টি করেছে নিবেদিতপ্রাণ বিপুলসংখ্যক প্রচারক মুবাল্লিগ। যার ফলে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক ইসলামি সম্মেলন- বিশ্ব ইজতেমা। যা’ আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও সুদূরপ্রসারি প্রভাব সৃষ্টি করে চলছে।

বিশ্ব ইজতেমা মানুষের মধ্যে ব্যাপক ধর্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আবেগ তৈরি করে। আধ্যাত্মিক প্রেরণার উন্মেষ ঘটায়। বিশেষ করে বর্তমানে দু’পর্বে অনুষ্ঠিত ছয় দিনব্যাপী ইজতেমার শেষ দিনের মোনাজাতে অংশ নেয়ার জন্যে যেভাবে মানুষ পাগলের মতো ছুটে যায়, তা’ সত্যিই যে একটি প্রচণ্ড ইসলামি আবেগ ও চেতনার বহিঃপ্রকাশ তা’ অস্বীকার করার জো নেই। এতে কেউ শরিক হতে না পারলে নিজেকে বঞ্চিত মনে করে। বিশ্ব ইজতেমার শেষ দিন কার্যত টঙ্গীকেন্দ্রিক জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। এর প্রভাব এতটুকু গড়ায় যে, দেশের প্রেসিডেন্ট, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতাসহ বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ কমপক্ষে একবার সেখানে বিশেষত মুনাজাতের দিন হাজিরা দিতে যান।

বিশ্ব ইজতেমার ব্যাপারে মিডিয়াগুলোও নিস্পৃহ থাকতে পারে না। দেশের গণমাধ্যমগুলো যে পন্থিই হোক না কেন, তাদের পক্ষে ইজতেমাকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ইজতেমার খবরাখবর বিশেষ করে আখেরি মুনাজাত অনুষ্ঠানটি দেশের প্রধান খবর হিসেবে সবাইকে গুরুত্ব সহকারে প্রচার করতে হয়। শুধু বাংলাদেশেই নয়, টঙ্গীর তুরাগ যেন মিশে আছে যমুনা, সিন্ধু, নীল, দজলা, ফোরাত, মিসিসিপি আর আমাজানের সাথে। টঙ্গীর ইসলামি জাগরণের স্রোতধারা একাত্ম করে নেয় বিশ্ব মুসলিমকে। লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে একাত্ম করে নেয় নিরন্তর দাওয়াতি প্রচেষ্টার তাবলিগি মাধ্যমে। মোটকথা, বিশ্ব ইজতেমা আমাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনে প্রভাব সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের ধর্মীয় ইমেজের ক্ষেত্রে বিশ্ব ইজতেমা ও তাবলিগ আন্দোলন ব্যাপক ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে চলছে। বিশ্বব্যাপী ইসলামী চর্চা ও জাগরণ সৃষ্টিতে বাংলাদেশের বিশ্ব ইজতেমা অভাবনীয় ভূমিকা পালন করছে।

লেখক : মুহাদ্দিস, গবেষক ও প্রাবন্ধিক; খতিব, হাজি শরিয়ত উল্লাহ (র) জামে মসজিদ, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়