চাঁদপুর, শুক্রবার, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯, ১১ রজব ১৪৪৪  |   ১৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   কচুয়ায় রিয়া হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন
  •   কোস্টগার্ডের অভিযানে চাঁদপুর কোর্ট স্টেশনে ১৩শ’ কেজি জাটকা জব্দ
  •   ডাঃ সাজেদা পলিন নড়াইলের সিভিল সার্জন
  •   মতলবের আনন্দবাজারে অগ্নিকাণ্ডে পাঁচটি দোকান পুড়ে ২৫ লক্ষ টাকার ক্ষয়-ক্ষতি
  •   ভাষার মাসের প্রথমদিনে বাংলায় রায় দিলেন হাইকোর্ট

প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০

অনুসন্ধান কার্যক্রম কী এবং কেন?
অনলাইন ডেস্ক

সারাবিশ্ব জুড়ে এবং বাংলাদেশেও অভিবাসন একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শত-সহস্র বাংলাদেশী অভিবাসী নিজ দেশ ছেড়ে পরিবারের সচ্ছলতা আনয়ন, নিজের প্রতিষ্ঠা ও অর্থ উপার্জনের জন্য কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পাড়ি জমায়। বিপদসংকুল বন্ধুর যাত্রাপথের প্রতিকূলতা ও প্রতারণার পরে অনেকেই তাদের পরিবারের বা প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পারিবারিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কটি বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্ক। যা আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি এবং সমগ্র বিশ্ব জুড়ে থাকা ১৯২টি জাতীয় রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সমন্বয়ে গঠিত। এরূপ পরিস্থিতিতে রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ব্যক্তিবর্গ বা পরিবারসমূহের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারে এবং পারিবারিক পুনর্মিলনে সহায়তা করতে পারে।

বর্তমান এই আধুনিক বিশ্বে মানব সৃষ্ট দুর্যোগ যেমন ঃ যুদ্ধ-বিগ্রহ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আভ্যন্তরীণ গোলযোগ, অবৈধ অভিবাসন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষ নিজ পরিবার হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। স্ত্রী পাচ্ছে না তার স্বামীর সংবাদ, স্বামী পাচ্ছে না স্ত্রীর সংবাদ, বাবা পাচ্ছে না ছেলের সংবাদ আর ছেলে পাচ্ছে না মা-বাবার সন্ধান। এমনি পরিস্থিতিতে প্রিয়জনের সংবাদের জন্য তাদের যে উদ্বিগ্নতা এবং মানসিক যন্ত্রণা তা লাঘবের ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নেটওয়ার্কটি বিশ্বব্যাপী সশস্ত্র সংঘাত, সহিংস পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগ বা পরিবার হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানুষের সাথে পারিবারিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের সেবা প্রদান করে আসছে। অভিবাসনের কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিও পারিবারিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন বিভাগে Mi Restoring Family Links (RFL) মাধ্যমে দীর্ঘদিন যাবৎ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করে অসহায় মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত রয়েছে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি পারিবারিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দিয়ে থাকে এবং সকল ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখে। অনুসন্ধানজনিত সেবা গ্রহণের জন্য নিকটস্থ বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জেলা বা সিটি ইউনিটের অফিসে/কর্মকর্তাদের সাথে দ্রুত যোগাযোগ করুন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার যুদ্ধে নিখোঁজ সামরিক-বেসামরিক যুদ্ধবন্দী আটকেপড়া ব্যক্তিবর্গকে পরিবারের সাথে পুনর্মিলন করে দিয়ে প্রভূত প্রশংসা অর্জন করে। এছাড়াও বিগত বছর গুলোতে দেশের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া দুর্যোগ, নিখোঁজ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার বর্গের অনুসন্ধান ও প্রত্যাবাসনে সোসাইটির অনুন্ধান বিভাগ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছে। প্রায় এক শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির এ বিশেষ বিভাগটি বিভিন্ন দেশে সংঘটিত সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মানসিক যন্ত্রণা উপশম করে আসছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির এই বিশেষ বিভাগ যার নাম ‘সেন্ট্রাল ট্রেসিং এজেন্সী’। সেন্ট্রাল ট্রেসিং এজেন্সীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ফ্রান্স ও জার্মানীর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার তিনদিন পর অর্থাৎ ১৮ই জুলাই ১৮৭০ সালে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি ১৮৬৯ সালে বার্লিনে অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল এইড সোসাইটিস ফর দি নার্সিং অব ওয়ার উনডেডস এর আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক যুদ্ধরত দুই পক্ষের আহত ও অসুস্থ সৈন্যদের সাহায্য ও সংবাদ সংগ্রাহের জন্য সর্বপ্রথম ব্যাসেলে (সুইজারল্যান্ডে) একটি এজেন্সী স্থাপন করে।

সে সময় আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির প্রেসিডেন্ট গুস্টার মইনার অনুধাবন করেন যে, আহত সৈন্য এবং সাধারণ লোক যারা শত্রুর হাতে ধরা পড়েছে তাদের পরিবারের সাথে তাদের সরাসরি যোগাযোগের কোন ব্যবস্থা না থাকায় তাদের বহুদিন পর্যন্ত সংবাদ বিহীন অবস্থায় থাকতে হয়। ফলে তাদের শারিরীক কষ্টের পাশাপাশি তাদের মানসিক যন্ত্রণা উপশমের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি বিবাদমান উভয় পক্ষের ত্রাণ কমিটি (রিলিফ কমিটি) কে যুদ্ধবন্দীদের পরিবারের সাথে পত্র বিনিময় করার প্রস্তাব দেয়। উক্ত প্রস্তাব গৃহীত হলে ৩১ শে জুলাই ১৮৭০ সালে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির সহযোগিতায় যুদ্ধবন্দীরা তাদের পরিবারের সাথে পত্র বিনিময় শুরু করে।

অনুসন্ধান কার্যক্রমের উদ্দেশ্যে : অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিবারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং পরিবারের দুটি অধিকারকে সুরক্ষা করে। এ দুটি অধিকারের মধ্যে রয়েছে ঃ ১) পরিবারের সদস্যদের একে অন্যের সাথে পত্র বিনিময়ের অধিকার। এ অধিকারের কথা বর্ণিত আছে ৪র্থ জেনেভা কনভেনশনের ২৫নং আর্টিকেলে এবং ২) পরিবারের সদস্যরা কে, কোথায় আছে, কেমন আছে তা জানার অধিকার। এ অধিকারের কথা বর্ণিত আছে জেনেভা কনভেনশনের অ্যাডিশনাল প্রটোকল ১-এর ৩২নং আর্টিকেলে। পরিবারের এ দুটি অধিকার সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক আইন রেড ক্রস/রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিকে অধিকার দিয়েছে অনুসন্ধান কাজ পরিচালনার জন্য। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আপন জনের সংবাদের জন্য মানুষের যে মানসিক যন্ত্রণা বা উৎকন্ঠা তা লাঘব করা।

অনুসন্ধান কার্যক্রমের মূল ভূমিকা : অনুসন্ধান কার্যক্রম মূলত পারিবারিক সংবাদ আদান প্রদান, নিখোঁজ লোকের সন্ধান ও পরিবার পুনর্মিলন বা একত্রীকরণে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমন : পারিবারিক সংবাদ আদান প্রদান-যুদ্ধ-বিগ্রহ, রাজনৈতিক গোলযোগ, সামরিক অভ্যুত্থান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদির ফলে কোথাও স্বাভাবিক ডাক যোগাযোগ সাময়িক ভাবে বন্ধ হলে সেখানে পরিবারের সদস্যরা রেড ক্রস/রেড ক্রিসেন্ট মেসেজ ফর্মে পারিবারিক সংবাদ আদান-প্রদান করতে পারে। রেড ক্রিসেন্ট মেসেজ ফর্ম হচ্ছে রেড ক্রিসেন্ট চিহ্ন সম্বলিত প্রমাণ মাপের সহজ সরলভাবে দু পাতা বিশিষ্ট ছাপানো ফর্ম। এটি দুপাতা বিশিষ্ট হওয়ায় প্রাপক তার অংশ রেখে খালি পাতায় সহজেই প্রেরকের নিকট উত্তর পাঠাতে পারেন।

সুস্বাস্থ্য কার্ড : অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায় যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন : ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প হঠাৎ করেই সংঘটিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে তছনছ করে দেয় মানুষের স্বাভাবিক জীবন। দুর্যোগ কবলিত স্থানের সাথে যোগাযোগ থাকে না দেশের অন্য প্রান্তরের। সেখানে বসবাসরত আত্মীয়স্বজনের সংবাদের জন্য মানুষ ব্যাকুল হয়ে উঠে। এমন পরিস্থিতিতে দুযোর্গ কবলিত স্থানের লোকেরা যাতে দ্রুত তাদের আত্মীয়-স্বজনের নিকট সুস্বাস্থ্য সংবাদ পাঠাতে পারে সে ব্যবস্থাও রয়েছে রেড ক্রিসেন্টের অনুসন্ধান বিভাগে।

Anxious for News ফর্ম : কোন ব্যক্তি কিছুদিন যাবৎ নিরুদ্দেশ থাকলে তার জন্য অনুসন্ধানের অনুরোধ না পাঠিয়ে Anxious for News ফর্ম পাঠানো প্রয়োজন। এর জন্য পৃথক কোনো ফর্ম নেই। রেড ক্রিসেন্ট মেসেজ ফর্মে কোনো ব্যক্তিগত চিঠি না লিখে কেবল ছোট একটি কথা Anxious for News লিখে দিলেই হবে। এটি অনুসন্ধান অনুরোধের মতই গুরুত্ব বহন করে।

নিখোঁজ লোকের সন্ধান : যুদ্ধ বিগ্রহ, রাজনৈতিক গোলযোগ, সামরিক অভ্যুত্থান, ঘুর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প, নারীপাচার, শিশু পাচার, অবৈধভাবে বিদেশ ভ্রমণ কিংবা কাজ করার বৈধ অনুমতির জন্য কেউ বিদেশে আটক থাকার ফলে পরিবার থেকে যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তার সন্ধানের জন্যও সোসাইটির অনুসন্ধান বিভাগ প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকে। এর জন্য প্রয়োজন হয় নিখোঁজ ব্যক্তির পূর্ণ বিবরণ যেমন : নাম, পিতা এবং মাতার নাম, বয়স, জন্মস্থান, মাতৃভাষা, জাতীয়তা, পেশা, সর্বশেষ জানা ঠিকানা, সর্বশেষ সংবাদের তারিখ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ বা ঘটনা অনুসন্ধানকারীর বিস্তারিত বিবরণ ইত্যাদি।

পরিবার পুনর্মিলন বা একত্রীকরণ : নিখোঁজ বা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার পরবর্তী পদক্ষেপ হচ্ছে পরিবার একত্রীকরণ। পরিবারের সাথে একত্রে বসবাস করা মানুষের পারিবারিক অধিকার। নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়ার পর সে যদি তার পরিবারের সাথে একত্রে বসবাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করে তবে তাকে পরিবারের সাথে একত্রীকরণ করার ব্যাপারেও এই বিভাগ সহযোগিতা করে থাকে। যে সকল ব্যক্তিবর্গ পরিবার পুনর্মিলনের জন্য আবেদন করে তাদের সঠিক পরিচয় আগে জেনে পরিবার তাকে গ্রহণ করতে চায় কিনা তাও নিশ্চিত হওয়া দরকার।

আন্তর্জাতিক ট্রেসিং নেটওয়ার্ক : অনুসন্ধান কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য রয়েছে বিশ্বব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক ট্রেসিং নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি জাতীয় রেড ক্রস/রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির সেন্ট্রাল ট্রেসিং এজেন্সী নিয়ে এই ট্রেসিং নেটওয়ার্ক গঠিত।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির অনুসন্ধান বিভাগ জন্মলগ্ন হতেই অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সাথে কাজ করে আসছে। আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অব রেড ক্রস এন্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (IFRC) ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (ICRC) এ ব্যাপারে আরো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (BDRCS) পৃথিবীর সমস্ত জাতীয় সোসাইটি, IFRC, ICRC ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে অনুসন্ধান কার্যক্রমে সরাসরি সম্পৃক্ত। এ মহতী কার্যক্রমে সহযোগিতা করে আপনিও হতে পারেন একজন গর্বিত অংশীদার।

লেখক পরিচিতি : মোঃ নূর ইসলাম খান অসি, পরিচালক-ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি), বিডিআরসিএস। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার । মোবাইল ফোন : ০১৭১১-৫৮৫৮৭৫

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়