চাঁদপুর, শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৪ মহররম ১৪৪৪  |   ৩১ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   ফরিদগঞ্জে কিশোর বলাৎকারের শিকার
  •   বাবুরহাট মতলব পেন্নাই সড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১
  •   আগামীতে হরতালের চেয়েও বৃহৎ কর্মসূচি আসবে : মানিক
  •   চাঁদপুরে পুলিশের অভিযানে ৫ কেজি গাঁজাসহ আটক ১
  •   চাঁদপুর পদ্মা নদীতে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ৫ নৌ ডাকাত গ্রেফতার

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২২, ০০:০০

চেনা মুখ অচেনা পথে
অনলাইন ডেস্ক

চাঁদপুর শহরের অতি পরিচিত শাজাহান চোকদার ভাই মারা গেছেন। তাঁর সাথে আমাদের অনেকের অনেক স্মৃতি রয়েছে। ১৯৭৯ সালে চাঁদপুর কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হবার পর তাঁর সাথে আমার ভিপির রুমে প্রথম দেখা হয়। তিনি তখন পর্যন্ত ভিপি ছিলেন। আমাকে একটি কলেজ বার্ষিকী দিলেন। হাতে পাওয়ার সাথে সাথে পাঠে মনযোগী হয়ে গেলাম। আমার পড়ার আগ্রহ তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বুঝতে পারলাম যখন তিনি সিঙ্গারার আদেশ দিলেন।

কলেজে তখন ছাত্র সংসদ নির্বাচনের তোড়জোড় চলছে। ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ভিপি পদে জাসদের শাজাহান চোকদার আর আওয়ামী লীগের খালিছুর রহমান জাকিরের নাম আলোচিত হচ্ছে। তাঁরা দুজনই তখন তিরিশের কাছাকাছি বয়সে চলে এসেছেন। তাঁদের বয়স ও বিয়ে নিয়ে বিরোধী পক্ষের হাসি-ঠাট্টার শেষ নেই। শেষ পর্যন্ত জাসদ থেকে মনোনয়ন পেলেন ‘এমদাদণ্ডজাকির পরিষদ’ আর আওয়ামী লীগের ‘খালিছ-মঞ্জু’ পরিষদ। নির্বাচনে খালিছুর রহমান জাকিরের জনপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়। জয়ের সম্ভাবনা বেড়ে গেলে নির্বাচনের ব্যালেট বাক্স ছিনতাই হয়ে যায়। নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করা হয়। এই নির্বাচনে আমি এমদাদণ্ডজাকির পরিষদ থেকে সদস্য পদে প্রার্থী ছিলাম। জীবনের প্রথম নির্বাচন ভুল হওয়ার কারণে ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল।

আবার শাজাহান ভাইয়ের সাথে দেখা হলো ওয়ান মিনিটে। তিনি আমার জন্যে একটা কোন আইসক্রিমের অর্ডার দিলেন। খুশি মনে খেতে খেতে শুনলাম ছাত্র সংসদ নির্বাচনে হেরে যাওয়া কিংবা ব্যালট পেপার রক্ষা করতে না পারার কারণ। তার কথা আমার মাথায় একটুও ঢুকে নাই। আমি মজে ছিলাম আইসক্রিমের মধ্যে। আমার সাথে কালীবাড়ি মোড়ে প্রায়ই দেখা হতো। খোঁজখবর নিতেন। মতাদর্শগত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৮০ সালে জাসদ ভেঙ্গে বাসদ হলো। তিনি জাসদের সাথে থাকলেন আর আমি থাকলাম বাসদের সাথে।

এই বিভক্তিকে কেন্দ্র করে তাঁর সাথে আমার প্রায়ই তর্কবিতর্ক হতো। তর্কের মধ্যে তিনি আমাকে চা খেতে নিয়ে যেতেন। গুয়াখোলা রোডে বাসদের ভ্যানগার্ড বিক্রি করতে গেলে কিংবা গণচাঁদা তুলতে গেলে তাঁর বাসায় যেতাম। তিনি আমাদের অনেক যত্ন করে বসতে দিতেন, চা বিস্কুট খেতে দিতেন। না থাকলে তাঁর স্ত্রী সেতু আপা আমাদের আপ্যায়ন করতেন।

আমি ছিলাম তাদের দুজনেরই খুব প্রিয়। রাজনীতির মোহভঙ্গ হলে আমি চাঁদপুর ছেড়ে চলে যাই। দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে আমি চাঁদপুরের সাথে যুক্ত থাকি। আমার লেখা কলাম শাজাহান ভাইয়ের নজরে পড়লে তিনি আমাকে ফোন করে অনেক প্রশংসা করতেন। নতুন নতুন লেখা দিতে উৎসাহিত করতেন। একবার আমার একটা লেখা ‘জাসদণ্ডবাসদ পাকলে আওয়ামী লীগ হয়’ প্রকাশিত হলে তিনি অনেক রেগে গিয়ে আমাকে ফোন করেন। বেশ খানিকটা বকে ফোন রেখে দিলেন। কিছুদিন পর সাহস নিয়ে ফোন করলাম। ফোন রিসিভ করে আমাকে বললেন, তোমাকে সেদিন রাগের মাথায় অনেক কিছু বলেছি। কিছু মনে করোনা ছোট ভাই। চাঁদপুর আসলে ফোন করো।

চাঁদপুর এসে ফোন করলাম। তিনি আমাকে ওয়ান মিনিটে অপেক্ষা করতে বললেন। দেখা হলো, অনেক কথাও হলো। হাসতে হাসতে বললেন, তুমি অনেক মানুষ সম্পর্কে লেখ, আমাদের কথা তো লেখ না। ভুল হোক শুদ্ধ হোক মানুষের জন্য রাজনীতি করেছিলাম। যতখানি সম্ভব কাজ করেছি। সামাজিক কাজের একটা স্বীকৃতি লাগে । তুমি আমার সম্পর্কে লেখবে আমি যখন মরবো। সমাজটাকে বদলাতে চেয়েছিলাম সেজন্য জাসদ করেছি। যখন বুঝতে পারলাম জাসদ দিয়ে সমাজ বদলাবে না তখন আবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। জানি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে না থাকলে সমাজ বদলানোর সংগ্রাম সফল হবে না।

আমি চুপ করে তাঁর কথা শুনি। মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছি নানান রোগের চিকিৎসা নিতে গিয়ে সংকটে পড়েছেন। শারীরিক সংকট নিয়ে বেশি অভিযোগ করলেন। একবার আক্ষেপের সুরে বললেন, বিদেশে গিয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে ভালো হতো।

আমি ভরসা দিয়ে বললাম, শতায়ু হবেন। আমার কথায় এক ঝিলিক হাসি দিয়ে বললেন, শতায়ু হলে তোমার লাভ কি? সময় ফুরিয়ে আসছে তা বুঝতে পারছি।

প্রসঙ্গ পাল্টাতে মেয়ে-জামাই নিয়ে কথা শুরু করলাম। গত কয়েক মাস ধরেই শাজাহান ভাইয়ের অসুস্থতার সংবাদ পাচ্ছি। এত তাড়াতাড়ি মরে যাবেন তা ভাবিনি। আমাদের অতি পরিচিত চেনা জানা শাজাহান ভাই অজানার পথে পাড়ি দিলেন। আমাদের প্রার্থনা-ভালো থাকুন। আপনার কথা চাঁদপুরবাসী ভুলে যাবে না। আপনাকে অনেক ভালোবাসি প্রিয় ভাই!

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়