চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ১৬ আষাঢ় ১৪২৯, ২৯ জিলকদ ১৪৪৩  |   ২৯ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   কচুয়ায় অগ্নিকাণ্ডে বসতঘর পুড়ে ছাই
  •   বাংলাদেশে ঈদুল আজহা ১০ জুলাই
  •   ডাকাত সন্দেহে কোস্টগার্ডের হামলায় নিখোঁজ ১ : আহত ২
  •   হাজীগঞ্জে নবজাতকের লাশ উদ্ধার
  •   অধ্যাপক    কামরুজ্জামান সাহেবের স্মরণ সভা  ও মিলাদ

প্রকাশ : ১৯ মে ২০২২, ০০:০০

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার মান
অনলাইন ডেস্ক

বই মানুষের জীবনের চিরন্তনী সঙ্গী। বই জ্ঞানের ভাণ্ডার, বই জ্ঞানের উৎস। বই জ্ঞানার্জনের উপলব্ধি জন্মায়। সীতানাথ বসাক রচিত ‘আদর্শ লিপি’ বইখানা প্রাকপ্রাথমিক শিক্ষায় যে নৈতিক শিক্ষায় উন্মাদনা জাগাতো তাতেই শিশু-কিশোর সবাই একটা নৈতিক শিক্ষার আওতায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চলে আসতো। তাতে মৌলিক শিক্ষার দৃঢ় ভিত্তি রচিত হতো এবং পরবর্তী শিক্ষাক্রম চলমান থাকতো।

আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে। এতে কিন্তু শিক্ষার গুণগত মানের আদৌ কোনো পরিবর্তন হয় নি।

শিক্ষার মৌলিক স্তর হলো প্রাথমিক স্তর। যে স্তর থেকে শিক্ষার ভিত্তি গড়ে উঠে। দেশের প্রাথমিক স্তরেই ব্যাপক অনিয়ম বিদ্যমান। সরকারি প্রাথমিক স্তরের পাশাপাশি অনেক বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তাছাড়া রয়েছে কিন্ডারগার্টেন, ও লেভেল, এ লেভেল ইত্যাদি, যেখানে শিশুদের বই বহন করতে হয় অভিভাবকগণ। সরকারি ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার মানের অনেক তফাৎ। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা নীতির এ অসামাঞ্জস্যতার পরিণতিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক অথৈ পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষাতেও প্রাথমিকের অনুরূপ ৩টি প্রাথমিক স্তর চালু হয়েছে। সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকেই এ দেশে দুই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু ছিল। একটি স্কুল শিক্ষা অপরটি মাদ্রাসা শিক্ষা। এখানে পার্থক্যটা ব্যাপক। পরস্পরের মনমানসিকতা বিপরীত। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর ভাবনা যে, তারা আখেরাতের কাজ করে যাচ্ছে, আর স্কুল শিক্ষার্থীদের ভাবনা তারা দুনিয়াদারি গুছাচ্ছে। এ দুটি ধারণা পরস্পরকে মুক্ত চিন্তা থেকে দূরে রাখছে এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটাচ্ছে। একদা পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগীয় প্রধান মরহুম মোঃ আঃ হাইকে অনুরোধ করেছিলেন, ‘আপনারা রবীন্দ্র সঙ্গীত লেখেন না কেন?’ প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, আমার লেখাটা হবে ‘হাই সঙ্গীত’। এমন জটিল সময়ও বাংলার ভাগ্যাকাশে এসেছিলো।

তারুণ্য সুলভ অপরাধে অপরাধীর সংখ্যা দিন দিন সমাজে এতোটাই বেড়ে গিয়েছে যে, প্রতিকারের কথা চিন্তা করা ছাড়া বিকল্প নেই। নৈতিকতার বাস্তব শিক্ষা বিশেষ করে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলামকে জরুরি ভিত্তিতে পরিবর্তন করা অতীব জরুরি। চল্লিশ থেকে সত্তর দশকের পূর্ব পর্যন্ত যে Matriculation পদ্ধতি প্রচলিত ছিল তাতে English, Bengali, Mathematics, History, Geography, Arabic or Sanskrit এই আটশত নম্বর আর অতিরিক্ত বিষয় ছিল Public Administration or Additional Mathematics ইত্যাদি। এর আগের Six to Eight পর্যায়ে শিক্ষা কারিকুলাম অত্যন্ত সংগতিপূর্ণ ছিলো। শিক্ষার্থীরা কিছুটা হলেও জ্ঞানার্জনে আগ্রহী হতো এবং শিখতো। বর্তমানের শিক্ষা কারিকুলাম ঝঝঈ পর্যন্ত চারটি কার্যকরী স্তরে বিভক্ত করা উচিত। যেমন প্রাক প্রাথমিকে বর্ণ পরিচয় এবং স্বরবর্ণের সাথে ব্যঞ্জনবর্ণের মিলনে যে শব্দ উচ্চারিত হয়, আবার ২১টি Consonant -এর সাথে ৫টি ঠড়বিষ-এর মিলনে যে উচ্চারণ বৈধ তাহা ২য় শ্রেণী পর্যন্ত পরিপূর্ণ সিলেবাস হওয়া উচিত।

তারপর ৩য় শ্রেণী-৫ম শ্রেণী পর্যন্ত একটা ধাপ। এ ধাপের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে ৯ম-১০ম শ্রেণী পর্যন্ত শেষ ধাপটি। সব বিষয়ের প্রতি সৃজনশীলতা একটু নিয়ন্ত্রিত রেখে শুধুমাত্র ইংরেজি ও বাংলা ভাষার ওপর সৃজনশীলতার চাপ বাড়ালে আন্তর্জাতিকভাবে ILTS বাংলাদেশে সহজেই করে নিতে পারবে।

শিক্ষার ভিত যত মজবুত হবে তৎপরবর্তী পেশাগত শিক্ষার ভিতও ততোধিক মজবুত হবে। পাকিস্তান আমলের সেই হামিদুর রহমানের শিক্ষা কমিশন প্রয়োগে আমরা যতটুকু পিছিয়ে পড়েছি, ততোধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি ড. কুদরত-ই খোদার শিক্ষা কমিশনকে বাস্তবতায় রূপায়িত না করে। উল্লেখিত Matriculation পদ্ধতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সৃজনশীলতা চলে আসবে। সরকারের বর্তমান সম্মানিত কারিকুলাম প্রণেতাগণকে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে শিক্ষা কারিকুলাম যুগোপযোগী এবং বস্তুনিষ্ঠভাবে গড়ে তোলার জন্য সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে অনুরোধ জানাচ্ছি।

এই বাংলায় আনাচে-কানাচে যত ব্যবসা ভিত্তিক শিশু শিক্ষালয় তথা Kindergarten প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সে গুলোর সঠিক কার্যকারিতা যাচাই-বাছাই যথাযথ কর্তৃপক্ষ করছে কিনা পাঠকের বিবেচ্য। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা কিন্তু উপক্ষো করার ফলস্বরূপ একটা জাতির মেরুদণ্ড অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশে গড়ে প্রতিটি ইউনিয়নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১২টি, বে-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রায় ১৫টি, প্রাথমিক মাদ্রাসার সংখ্যা ১৫টি এবং বিভিন্ন ধরনের মাদ্রাসার সংখ্যা আছে আরো প্রায় ২০টি। এই হলো ১টি ইউনিয়নের পরিসংখ্যান মাত্র। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কী ধরনের শিক্ষিত বেরিয়ে আসছে তা বিবেকবান তরুণ সম্প্রদায়ের সহজেই অনুমেয়। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার উক্তি দিয়ে শেষ করছি : দেশ গঠনে প্রধানত চারটি উপাদান লাগে-

১। যোগ্য শিক্ষক যাঁরা সুনাগরিক গড়বেন।

২। শিক্ষিত সৎ এবং নেতৃত্ব দিতে সক্ষম রাজনীতিবিদ।

৩। নিবেদিতপ্রাণ সংস্কৃতি কর্মী যারা বিদেশী সংস্কৃতির নগ্ন আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারবেন।

৪। দেশপ্রেমিক সুশীল সমাজ, যারা নির্মোহ, পক্ষপাতহীন রাষ্ট্রের বিবেক।

আদর্শ ব্যক্তিত্ব থেকে গড়ে উঠবে আদর্শ প্রতিষ্ঠান, আদর্শ প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসবে আদর্শ রাজনীতিবিদ, আদর্শ রাজনীতিবিদ একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক।

বিমল কান্তি দাশ : কবি ও লেখক; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক, বলাখাল যোগেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় ও কারিগরি কলেজ, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়