শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২২, ১৩ মাঘ ১৪২৮  |   ১৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   শিক্ষক রফিকুল ইসলামের দাফন সম্পন্ন
  •   কচুয়ায় সর্জন পদ্ধতিতে সবজি চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা
  •   বাগাদী চৌরাস্তায় আইল্যান্ড না থাকায় ঘটছে দুর্ঘটনা
  •   জমি অধিগ্রহণে আমার পরিবারের কোনো আর্থিক সম্পর্ক নেই : শিক্ষামন্ত্রী

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০

মিয়ানওয়ালী জেল থেকে স্বদেশ
রতন কুমার মজুমদার

পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনচরিত নিয়েই ইতিহাস রচিত হয়। কিন্তু সহ¯্র বছরের বাঙালির ইতিহাস রচনার জন্যেই যেনো জন্মেছিলেন বঙ্গবন্ধু মুজিব। বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ ভূখ-ের মানুষের হৃদয়ের স¤্রাট। বাঙালির অবিসংবাদিত এ নেতা বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির ইতিহাসে একজন কিংবদন্তি।

মুজিবের রাজনীতি কোনো প্রাসাদ ষড়যন্ত্র হতে সৃষ্টি হয়নি, ক্ষমতার প্রলোভন তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর রাজনীতির পত্তন ঘটেছে শোষিত-বঞ্চিত বাংলার দুঃখী মানুষের পর্ণকুটিরে। জনগণের ইচ্ছা এবং সমর্থন ছিলো মুজিব রাজনীতির মূলমন্ত্র, জনগণকে জাগিয়ে তোলা ছিলো তাঁর মূল উদ্দেশ্য। তাই মুজিব-রাজনীতির অপর নাম ভালোবাসা। নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অমৃতধারায় সঞ্জীবিত এ রাজনীতি।

বাংলার মাটি, বাংলার আলো-বাতাস, জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের অমৃতরসে পুষ্ট ছিলো তাঁর রাজনীতি। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির হৃদয়ের অকৃত্রিম ভালোবাসা মুজিব নেতৃত্বের অজেয় দুর্গ। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত ছিলো তাঁর জীবন। বাঙালির মুক্তির জন্যে তিনি সুদীর্ঘ এক যুগ কাটিয়েছেন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। মুজিবের তেজোদ্দীপ্ত মনোভাবের কাছে স্বৈরাচার গোষ্ঠী বারবার প্রতিহত হয়েছে। অবর্ণনীয় নিগ্রহের পরও তিনি বাঙালি জাতিকে আত্মপ্রতিষ্ঠার ব্রত থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর জীবনের স্বর্ণযুগ অতিবাহিত হয়েছে নির্জন বন্দিশালায়। নির্যাতন, নিষ্পেষণ যতো বেড়েছে ততোই বলিষ্ঠ হয়েছেন সংগ্রামের মহিমায়। নিজেকে অগ্নিপুরুষ ‘মুজিব’ হিসেবে শাসকদের কাছে প্রমাণ করেছেন। গোটা বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছেন। মানুষের মুক্তির ইতিহাসে এমন ত্যাগের দৃষ্টান্ত খুবই বিরল।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অনেক রক্তের বিনিময়ে বাঙালি মুক্ত হয়েছে। এ ত্যাগ ও নেতৃত্ব গোটা জাতির অমূল্য সম্পদ। তাই বঙ্গবন্ধু-বাঙালি ও বাংলাদেশ যেনো বিনি সুতোর মালা। যে নেতার জন্ম না হলে বাঙালি তাঁর স্বাধিকার পেতো না, যে নেতার জন্ম না হলে বাঙালি পেতো না বাংলাদেশ নামের ভূখ-, যে নেতার জন্ম না হলে বাঙালির স্বাধীন বাংলাদেশের লালিত স্বপ্ন যুগ যুগ ধরে অপূর্ণই থেকে যেতো। তাই তিনি বঙ্গবন্ধু, বাঙালি জাতির জনক, বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশের স্থপতি। সমগ্র বিশ্বে আমাদের একটিই পরিচয় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। হিমালয়ের চূড়া থেকে নামিয়ে এনে বঙ্গবন্ধু যেনো বাংলার ইতিহাস রচনা করেছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রথম প্রশ্ন দাঁড়ালো পাকিস্তানের কারাগার থেকে বাংলাদেশের জাতির জনকের মুক্তি। দেশের জনগণ একদিকে যেমন অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছে অন্যদিকে নিমজ্জিত হচ্ছে ভয়ানক শঙ্কায়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখবে তো! এদিকে শ্রীমতি গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে, বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করবার কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

২৬ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন, জীবিত আছেন কি-না কেউ বলতে পারছিলেন না। বিদেশী কোনো সংবাদ সংস্থার কাছেও বঙ্গবন্ধুর কোনো খবর ছিলো না। ২৮ তারিখ আকাশবাণী থেকে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান নিশ্চিত হবার জন্যে কৌশলগতভাবে প্রচারিত হয় বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। ভারতের কৌশলের কাছে পরাজিত হয়ে পাকিস্তান জবাব দেয় শেখ মুজিব জীবিত আছে। তখনই শ্রীমতি গান্ধীর তৎপরতা শুরু বঙ্গন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে।

২৬ মার্চের পর প্রথম বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের প্রধান কারাগার লায়ালপুর জেলে রাখা হয়েছিলো। সেখানে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সামরিক আদালতে তার বিচার শুরু হয়। বিচারের রায় ছিলো পূর্বনির্ধারিত। ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেয়ার জন্যে সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। বিচারটা ছিলো প্রহসনের। তবুও অকুতোভয় ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আদালতে নিশ্চুপ বসে থাকতেন। বিচারের সপ্তম দিন আদালত জিজ্ঞেস করলেন মুজিব নিজের পক্ষে কোনো অবস্থান নিতে চান কি-না। উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। আমাকে অথবা আমার জনগণকে বিচার করার কোনো অধিকার এদের নেই। বঙ্গবন্ধুর বিচার প্রসঙ্গে একসময় পশ্চিম পাকিস্তানের নানা পেশাজীবীরা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে থাকেন। পশ্চিম পাকিস্তানের লেখক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী, আইনজীবী, সাংবাদিক, ছাত্রনেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের একটি গোষ্ঠী শেখ মুজিবুর রহমানের আশুমুক্তি ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে ইয়াহিয়া খানের বরাবরে আবেদন করেছিলেন। এর পর দীর্ঘ সময় পার হলো।

অবশেষে পাকিস্তান সামরিক জান্তার পরাজয় নিশ্চিত জেনে প্রহসনের বিচারের রায় দেয়া হলো ৩ ডিসেম্বর। দোষী সাব্যস্ত করে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসির দ- দেয়া হয়। এরপর তাঁকে লায়ালপুর কারাগার থেকে নিয়ে যাওয়া হয় পাঞ্জাবের মিয়ানওয়ালি জেলে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তাঁর কারাকক্ষের পাশে কবর খোঁড়া হয়েছিলো। জেলের ডেপুটি সুপার ফজলদাদ একদিন ব্যারাকে এসে আটজন বন্দিকে বাছাই করলেন। এদের দিয়ে আট ফুট লম্বা, চার ফুট প্রশস্ত ও চার ফুট গভীর গর্ত খোঁড়া হলো। উপস্থিত সবাই বুঝতে পারলেন, সেই রাতেই শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেয়া হবে। ৯টার মধ্যে কবর খোঁড়া সম্পন্ন হলো। কিন্তু সেই রাতে কিছু ঘটলো না। শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেয়ার জন্যে নির্ধারিত সেই রাতে জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করে শেখ মুজিবকে ফাঁসি না দেয়ার জন্যে পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, যদি মুজিবকে ফাঁসি দেয়া হয়, তবে বাঙালির ক্রোধের লক্ষ্য হবে পূর্বাঞ্চলে মোতায়েন করা পাকবাহিনীর সর্বোচ্চ অফিসার থেকে সর্বনি¤œ সৈনিক পর্যন্ত সবাই। ভুট্টোর উপদেশ অনুসারে ইয়াহিয়া খান মুজিবের ফাঁসি স্থগিত রাখেন। এর কয়েকদিন পর একইভাবে গর্ত খোঁড়ার হুকুম আসে। এবারও শেখ মুজিবের ফাঁসি দেয়া হলো না। এমনি প্রক্রিয়া তিনবার ঘটেছিলো এবং তিনবারই তাঁর ফাঁসি পিছিয়ে দেয়া হয়।

এদিকে পাকিস্তানের রাজনীতি জটিল রূপ নেয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পরাজয় ঘটলো। বাংলাদেশ নামে নতুন রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করলো। এজন্যে ইয়াহিয়া খানকে দোষী সাব্যস্ত করে পাকিস্তানে প্রচ- বিক্ষোভ শুরু হয়। তখন ইয়াহিয়া খানের পদত্যাগ দাবিতে সোচ্চার গোটা পাকিস্তান। এটি অনেকটাই স্পষ্ট যে, জুলফিককার আলী ভুট্টোর কু-পরামর্শের একটি বড় প্রভাব ছিলো বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যায়। অর্থাৎ দমননীতির মাধ্যমে বাঙালির অধিকার আন্দোলনের দাবিকে অবদমিত করা। অথচ এই ভুট্টোই তখন ইয়াহিয়ার পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার। এই অবস্থায় ইয়াহিয়া খানের টেকা সম্ভব ছিলো না। বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের তিন দিন পর একাত্তরের ১৯ ডিসেম্বর তিনি ভুট্টোর হাতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দিয়ে অন্তরালে চলে গেলেন।

ইয়াহিয়া খান পদত্যাগ করে ভুট্টোর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরও বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেয়ার আশা ত্যাগ করেননি। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নিজ ভাষ্য থেকে একটি তথ্য পাওয়া যায়, ‘ভুট্টো আমাকে জানিয়েছিলেন, ইয়াহিয়া খান যখন তাকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চেয়েছিলেন তখন বলেছিলেন যে, মুজিবকে শুরুতে না মেরে তিনি মহাভুল করেছেন। তিনি আরও বলেছিলেন, এখন আপনাকে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে অনুগ্রহ করে পেছনের তারিখ দিয়ে নির্দেশ জারি করে মুজিবকে মেরে ফেলার সুযোগ আমাকে দিন। কিন্তু ভুট্টো এতে সম্মত হননি’ (মোনায়েম সরকার ও আশফাক-উল-আলম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ঢাকা, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ : আগামী প্রকাশনী, ২০১৪, পৃ. ৩১৯-৩২০)।

সময়ের বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের চাপ অনুভব করলেন ভুট্টো। বুঝতে পারলেন বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়াই এখন জরুরি। পরবর্তী পদক্ষেপ খুব দ্রুত ঘটতে লাগলো। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির প্রশ্নে পাকিস্তানের জনমত যাচাইয়ের জন্যে ভুট্টো ৩ জানুয়ারি করাচিতে এক জনসভার আয়োজন করেছিলেন। এদিন সন্ধ্যায় পাকিস্তান টেলিভিশনের নিউজ বুলেটিনে জানানো হয়, করাচির জনসভায় শেখ মুজিবের মুক্তির পক্ষে জনগণ রায় দিয়েছে।

বঙ্গবন্ধু যখন মিয়ানওয়ালী কারাগারের ক্ষুদ্র কনডেম সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন; তিনি জানতেন না-তার স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়েছে; বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তিনি শুধু জানতেন, মৃত্যু দুয়ারে করাঘাত করছে। সেদিন ২৬ ডিসেম্বর। গভীর রাত। প্রচ- শীত। একটি মাত্র কম্বলে শীতে বঙ্গবন্ধু ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলেন। হঠাৎ কানে এলো একটা চলন্ত গাড়ির আওয়াজ।

জানালা দিয়ে তাকাতেই লক্ষ করলেন-একটা ট্রাক আসছে ধীরে ধীরে। ট্রাকটা সেলের সঙ্গে লাগোয়া গার্ড হাউসের সামনে এসে দাঁড়ালো। বাইরে ছুটোছুটি, হাঁকডাক ও ফিসফিসানির শব্দ। হঠাৎ ঝন ঝন করে লৌহকপাট খুলে গেলো। চারজন সৈন্য ভেতরে ঢুকে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে দাঁড়ালো।

সামনে এসে দাঁড়ালেন বেঁটে-খাটো শ্মশ্রুম-িত জেল গভর্নর হাবিব আলী। মাথায় মিলিটারি ক্যাপ, গায়ে রেইনকোট জড়ানো। হাবিব আলী পরিচিত কর্কশ স্বরে বললেন, আপনি আমাকে বিশ্বাস করুন; আমি আপনাকে একটা নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে এসেছি...

চলতে চলতে বঙ্গবন্ধু ভাবলেন-ওরা তাহলে এখনই আমাকে এই অন্ধকারের মধ্যে গুলি করে মেরে ফেলবে! কিন্তু এতোসবের কী প্রয়োজন ছিলো! সেলের সামনের গর্তের পাশে নিয়েও তো গোপনে মেরে ফেলতে পারতো। এত দূরে নিয়ে এলো কেনো? কিছুক্ষণ পর বঙ্গবন্ধু দেখলেন-পাহাড়ের গা ঘেঁষেই সুন্দর নি¤œভূমি; সেখানে সুরম্য বাংলোর সামনে সাজানো বাগান। ইসলামাবাদের কাছে সোয়ান নদীর তীরে সিহালা শহরে সিহালা গেস্ট হাউজে বঙ্গবন্ধুকে রাখা হয়েছিলো। পাকিস্তানের হরিপুর কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিলো বঙ্গবন্ধুর সহচর ড. কামালকে। এদিন তাকেও নিয়ে আসা হয় সিহালা গেস্ট হাউজে। ৮ জানুয়ারি ১৯৭২-এ আর্মি কমান্ডোদের প্রহরায় মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন। এই স্থানান্তরিত হওয়ার মধ্যে বঙ্গবন্ধু আঁচ করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পর বাগানের পিচঢালা পথ ধরে তার দিকে একজন চেনা মানুষ এগিয়ে আসছেন। তিনি জুলফিকার আলী ভুট্টো।

একটি কৌশল অবলম্বন করেছিলেন ভুট্টো। বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কী হবে সে প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ভুট্টোর একটি মিটিং হয়। এই দুই নেতার কথোপকথন তুলে ধরেছেন রবার্ট পেইন (জড়নবৎঃ চধুহ, গধংংধপৎব : ঞযব ঞৎধমবফু ধঃ ইধহমষধ উবংয ধহফ ঃযব চযবহড়সবহড়হ ড়ভ গধংং ঝষঁমযঃবৎ ঞযৎড়ঁমযড়ঁঃ ঐরংঃড়ৎু, ঘবি ণড়ৎশ, ১৯৭২)। ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বললেন “প্রথমেই আমাদের এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে যে, আমাদের দুটি পৃথক জাতি হওয়া চলবে না। যেভাবেই হোক আমাদের সম্পর্ক অটুট রাখতে হবে। অবশ্য তা আগের মতো নয়, তবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান বলে চেনা যায় এমন একটি দেশ হিসেবে। আর যা হোক না কেনো, আমাদের ধর্ম ও উদ্দেশ্য অভিন্ন। দেখুন শেখ সাহেব, সবকিছুর পরও আমরা এখনো এক জাতি। সেই সত্যের মুখোমুখি এখন আমরা। আমাকে বিশ্বাস করুন, আমরা এই বন্ধন ছিন্ন করতে পারি না। এ কথা আমাদের উভয়ের ভাবা উচিত। অবশ্য পশ্চিম পাকিস্তানে বসে এ কথা আমাদের আলোচনা করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। আমরা একটি নিরপেক্ষ দেশে আলোচনার জন্যে মিলিত হতে পারি”।

‘উদাহরণস্বরূপ ইরানের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে শাহিনশাহ আশা করেন, আমরা ইচ্ছা করলে তেহরানে আলোচনায় বসতে পারি। তিনি অনুগ্রহ করে তার একটি প্রাসাদ আমাদের ব্যবহারের জন্য দিতে রাজি হয়েছেন। ইরান যদি আপনার পছন্দ না হয়, তাহলে আমরা সুইজারল্যান্ডে মিলিত হতে পারি শুধু আমরা দুজন।’ মুজিব ব্যঙ্গোক্তি করে বললেন, ‘এখন আমরা যেমন মিলিত হয়েছি।’ ভুট্টো বললেন, ‘ঠিক তাই, কোনো রকম বাধা ছাড়াই আমরা এ কাজটি করতে পারি। আমরা দুজন নীতি সম্পর্কে একটি যৌথ বিবৃতি তৈরি করতে পারি। আমরা বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতে পারি। আমি একটি খসড়া তৈরি করেছি। আপনার তা পছন্দ হবে। আপনাকে আমি এটি দেখাতে চাই।’

মুজিব বললেন, ‘না’। ভুট্টোর উত্তর, ‘কেন নয়?’ উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘কারণ, আমি এখন পর্যন্ত আপনার বন্দি। এমনকি আমার স্ত্রীকে আমি টেলিফোন করারও অধিকারী নই। আমি জানি না, তিনি এখনো জীবিত আছেন কি না। আমার ছেলেমেয়েরাও কি জীবিত আছে? আমার বৃদ্ধ পিতামাতাও কি জীবিত আছেন? আমার মন্ত্রীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে কীভাবে আমার সামনে আপনি যে কাগজের টুকরা রেখেছেন তাতে আমি দস্তখত করতে পারি? আপনার ইচ্ছা পূরণের জন্য আপনি আমাকে জোর করে রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। আপনি আমাকে গুলি করতে পারেন, কিন্তু ঢাকায় গিয়ে আমার মন্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়া পর্যন্ত আমি কোনো কাগজে দস্তখত দেব না। আমাকে এখানে আটক রাখা হলে আমি আপনার বন্দি এবং আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আপনি আমার দস্তখত গ্রহণের চেষ্টা করছেন। ফলে এখান থেকে আমাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না মুক্তি দেওয়া হয়, আমি নীরব থাকব।’ শেষবারের মতো অনুরোধ করে ভুট্টো বলেন, ‘একটি অখ- ও অবিভাজ্য পাকিস্তান গঠনের ব্যাপারে আপনি কি আমাকে সাহায্য করবেন, না করবেন না?’ শেখ মুজিব নীরব থাকেন।

৮ জানুয়ারি, ১৯৭২। রাওয়ালপি-ি বিমানবন্দর। সময় রাত এগারোটা। এয়ারপোর্ট তখন ব্ল্যাক আউট। থমথমে ভাব। পিআইএ’র একটি বিশেষ বিমান রানওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে। পাইলট, স্টুয়ার্ড, এয়ারহোস্টেস যার যার জায়গায় অন্ধকারে বসে আছে। গোপনীয়তা রক্ষার তাগিদ আসছে ঘন ঘন।

সৈন্যরা যার যার সীমানায় টহল দিচ্ছে। রাত ২টায় রানওয়েতে অপেক্ষমান একমাত্র বিমানযাত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ রাতেই তাকে নিয়ে বিশেষ এই বিমানটি উড়ে যাবে। আর সেইসঙ্গে পরিসমাপ্তি ঘটবে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ জীবনব্যাপী নিঃসঙ্গ, একাকী, দুঃসহ কারাজীবনের।

৯ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী পাকিস্তানের বিমানটি কুয়াশাসিক্ত শীতার্ত ভোরে হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে পৌঁছান ইয়ান সাদারল্যান্ড। তিনি ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান। তিনি ক্লারিজ হোটেলে বঙ্গবন্ধুর থাকার ব্যবস্থা করার কথা জানান। যেখানে সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধানদের থাকার ব্যবস্থা করা হতো। বঙ্গবন্ধু তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, যদি সম্ভব হয় রাসেল স্কয়ারের একটি সাধারণ হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে। যেখানে তিনি আগের সফরে ছিলেন।

জবাবে সাদারল্যান্ড বলেছিলেন, “স্যার, আমার হাতে শুধু এই একটি উপায় রয়েছে, ক্লারিজ হোটেলই রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু, আপনার সঙ্গে কেউ দেখা করতে চাইলে আমরা তার ব্যবস্থা করতে চেষ্টা করবো। তবে, তা হবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই। বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সরকারি লিমোজিন ব্যবহার করতে অস্বীকার করেন এবং তার পরিবর্তে রেজাউলি করিমের রোলরয়েস গাড়িতে চড়েন। রেজাউল করিম তীব্র শীতের সকালে গাড়ি চালাচ্ছেন। তখন একই সঙ্গে তিনি উচ্ছ্বসিত এবং শঙ্কিত ছিলেন। কারণ ১৯৭১ সালের মার্চের পর বঙ্গবন্ধুকে দেখা প্রথম বাঙালি ছিলেন রেজাউল করীম, যিনি দেশের খবর জানতেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু তার কাছে যুদ্ধ এবং বাংলাদেশ কীভাবে স্বাধীন হয়েছে তা জানতে চাইলেন। তবে গাড়িটি যেনো দুর্ঘটনার মুখোমুখি না হয় এবং নতুন কোনো দুঃখজনক ঘটনা না ঘটে তা নিয়ে ভীত ছিলেন রেজাউল করীম। হোটেলে পৌঁছে বঙ্গবন্ধু বিবিসি বাংলা বিভাগের তৎকালীন সাংবাদিক সিরাজুর রহমানের কাছে জানতে পারেন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। জানতে পারেন গণহত্যার কথা। খুন, ধর্ষণ, আগুনের বিভীষিকাময় ছবি; রক্তে রক্তে নদী বয়ে যাওয়ার কাহিনী। এসব শুনে দু হাতে মুখ ঢেকে বঙ্গবন্ধু শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন। কান্নাজড়িত গলায় বারবার কেবল একটা কথাই বলছিলেন, আহ! আমার দুঃখিনী বাংলা মা।

ক্লারিজ হোটেলে পৌঁছে বঙ্গবন্ধু তার পরিবার, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে কথা বললেন। তারা তখন ঢাকায় ছিলেন। সৈয়দ নজরুল ও তাজউদ্দিন আহমেদ জানান, ঢাকা থেকে লন্ডনে বিমানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে, লন্ডনে পৌঁছাতে কমপক্ষে দুদিন সময় লাগবে। তারা আরও জানান, ঢাকা ফেরার পথে দিল্লি ও কলকাতায় সাময়িক যাত্রাবিরতির জন্যে অনুরোধ জানিয়েছে ভারতের মানুষ।

হোটেলে হাজার হাজার মানুষ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ করেন। যা নিয়ে সমস্যার মধ্যে পড়তে হয় হোটেল কর্তৃপক্ষকে। তারপরে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় পাঁচজনের একটি দল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে পারবে। পরে হোটেলে একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু।

তিনি বলেছিলেন, “আজ আমি মুক্তভাবে দেশবাসীর সঙ্গে স্বাধীনতার আনন্দ ভাগ করে নিতে পারছি। এক মহাকাব্যিক সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা এই স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এই লড়াইয়ের চূড়ান্ত অর্জন হলো একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ গঠন করা। আমি যখন কারাগারে বন্দী অবস্থায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম, তখন জনগণ আমাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছে।”

তিনি আরও বলেছিলেন, “স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশের মানুষ যে পরিমাণ মূল্য দিয়েছে এবং কষ্ট ভোগ করেছে, অন্য কোনো জাতিকে তা করতে হয়নি। আমি আমার দেশের মানুষের কাছে ফেরার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারছি না।” সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু। পশ্চিম পাকিস্তানে আটক এবং যে কোনো সময় মৃত্যুদ- কার্যকরের বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন এক সাংবাদিক। জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। মনে রাখতে হবে, যে মানুষ মরতে প্রস্তুত, তাকে কেউ মেরে ফেলতে পারে না।”

আরেক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, আপনি কি কখনো ভেবেছিলেন বাংলাদেশে স্বাধীন হবে? জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমি প্রায় ৩৫ বছর ধরে রাজনীতি করছি। যেদিন আমাকে কারাগারে নেওয়া হয় আমি বুঝতে পারছিলাম না বেঁচে থাকব নাকি মরে যাব। তবে, আমি জানতাম বাংলাদেশেরে মানুষ স্বাধীন হবে, তাদের কেউ দমাতে পারবে না।”

সন্ধ্যায় ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে বৈঠক করেন বঙ্গবন্ধু। বৈঠকে ব্রিটিশদের বাংলাদেশকে সার্বভৌম দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্ন তুলেছিলেন বঙ্গবন্ধু। গাড়ির দরজা খুলে দেন এডওয়ার্ড হিথ।

হিথ যখন বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেন, আমরা আপনার জন্যে আর কী করতে পারি? জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আপনি আমাদের জন্য একটি কাজ করুন, যত দ্রুত সম্ভব আমাদের বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিমান দিয়ে সাহায্য করুন।”

বৈঠক শেষে হোটেলে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু। এরপর ঢাকা পৌঁছাতে কত সময় লাগবে তার হিসাব করেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিলো দিনের আলো থাকতেই ঢাকা পৌঁছানো। দেখা যায়, যদি তারা বিকেল তিনটার মধ্যে ঢাকা পৌঁছতে চান তাহলে ভারতে শুধুমাত্র একটি যাত্রাবিরতি নিতে হবে। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কেবল দিল্লিতেই বিরতি নেবেন তারা।

বঙ্গবন্ধুকে ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর সামরিক বিমানে দিল্লি হয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি নেয়া হয়। ৯ জানুয়ারি ভোরে দ্রুততার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে বিমানবন্দরে নেয়া হয়। সকাল ৬টার দিকে ব্রিটিশ বিমানটিকে জ্বালানির জন্যে নিকোলিয়া নেয়া হয়। আর বিমানটির চূড়ান্ত গন্তব্য ছিলো নয়াদিল্লি হয়ে ঢাকা পৌঁছানো। তবে সতর্কতা ছিলো সর্বোচ্চ।

দিল্লির পালাম বিমানবন্দর থেকে মঞ্চে উঠলেন। মঞ্চ থেকে প্রথামাফিক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর ভাষণ শেষ করলেন৷ জনতা ফেটে পড়লো৷ মাইকের সামনে তখন দীর্ঘদেহী মুজিবুর রহমান। তিনি এবার ইংরাজিতে বক্তব্য শুরু করলেন, ‘প্রাইম মিনিস্টার শ্রীমতি গান্ধী, লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান প্রেজেন্ট’

এরপরেই জনতার প্রবল দাবি-‘বাংলা-বাংলা’। একটু থেমে গেলেন বঙ্গবন্ধু। পাশ থেকে ইন্দিরা মুচকি হেসে জানিয়ে দিলেন ‘বেঙ্গলি-বেঙ্গলি’। হাসি খেলে গেলো শেখ মুজিবের মুখে। নিজের দেশ-বাংলাদেশের তরফে স্বাধীনতার শুভেচ্ছা দিয়েই আপামর ভারতবাসীকে বাংলায় সম্বোধন করলেন বঙ্গবন্ধু...।

লাখ লাখ মানুষের সমাবেশে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ভারতবাসীর উদ্দেশ্যে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধু বক্তৃতায় বলেন, ‘আমার জন্য এটা পরম সন্তোষের মুহূর্ত। বাংলাদেশে যাওয়ার পথে আমি আপনাদের মহতী দেশের ঐতিহাসিক রাজধানীতে যাত্রাবিরতির সিদ্ধান্ত নিয়েছি এ কারণে যে, আমাদের জনগণের সবচেয়ে বড় বন্ধু ভারতের জনগণ এবং আপনাদের মহীয়সী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী যিনি কেবল মানুষের নন, মানবতারও নেতা। আমাদের মধ্যে মিল আদর্শের মিল মানবতার মিল।

তিনি দিল্লীতে শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধীর কাছে স্বাধীনতা সংগ্রামে অকুণ্ঠ সমর্থন ও ১ কোটির বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়ার জন্যে বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান এবং এও জানতে চান, কবে নাগাদ ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে আনা হবে। জবাবে ইন্ধিরা গান্ধী বলেন, স্বাধীন দেশে আপনার জন্মদিন পালনের পূর্বে অর্থাৎ ১৭/০৩/১৯৭২ তারিখে সব ভারতীয় সৈন্য চলে আসবে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ-ও একটি বিরল দৃষ্টান্ত।

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর কমেট বিমানটি ঢাকার আকাশসীমায় দেখা দিতেই জনসমুদ্র উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। বেলা ১টা ৪১ মিনিটে জাতির অবিসংবাদিত নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর স্বপ্নের মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। সেদিন বাংলাদেশে ছিলো এক মহোৎসবের আমেজ। গোটা বাঙালি জাতি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিলো কখন তাদের প্রিয় নেতা, স্বাধীন বাংলার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীন দেশের মাটিতে পা রাখবেন। পুরো দেশের মানুষই যেনো জড়ো হয়েছিলো ঢাকা বিমানবন্দর এলাকায়। বিমানবন্দর থেকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স পর্যন্ত রাস্তা ছিলো লোকে লোকারণ্য।

অবশেষে বন্দিত্বের নাগপাশ ছিন্ন করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বিজয়ের বেশে নামলেন বিমান থেকে। পা রাখলেন লাখো শহীদের রক্ত¯œাত স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে। গোটা জাতি হর্ষধ্বনি দিয়ে তেজোদ্দীপ্ত ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে তাদের অবিসংবাদিত প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানায়। জয় বাংলা, তোমার নেতা আমার নেতা; শেখ মুজিব, শেখ মুজিব স্লোগানে সেদিন মুখরিত হয়েছিলো বাংলার আকাশ-বাতাস।

পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে বিজয়ীর বেশে এলেন ইতিহাসের মহানায়ক, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত আসতে সময় লেগেছে ২ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট। চতুর্দিকে করতালি আর জয়বাংলা স্লোগানে মুখরিত কানায় কানায় পরিপূর্ণ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সেদিন কোনো সীমানা ছিলো না, ছিলো না তিল ধারণের ঠাঁই। প্রকৃতপক্ষে ১০ জানুয়ারিতেই বিজয়ের পূর্ণতা পেয়েছিলো বাঙালি।

বিকেল ৫টায় তিনি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে ভাষণ দেন। দীর্ঘ ৯ মাস পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের এ-দেশীয় দোসরদের গণহত্যার সংবাদ শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বাংলার এই অবিসংবাদিত নেতা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমার সারাজীবনের স্বপ্ন আজ পূরণ হয়েছে। আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। একজন বাঙালি বেঁচে থাকতেও এ স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেব না’। রাজনীতির ধ্রুপদী কবি বলেন, যে মাটিকে আমি এতো ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এতো ভালোবাসি, যে জাতিকে আমি এতো ভালোবাসি; আমি জানতাম না, সে বাংলায় আমি যেতে পারব কি-না। ১১ জানুয়ারি ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক গার্ডিয়ান এক সম্পাদকীয়তে লেখে যে, “তাঁহার এই মুক্তি বাংলাদেশকে বাঁচার সুযোগ দিয়াছে”।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো জনতার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা দেন, ‘রক্ত দিয়ে হলেও আমি বাঙালি জাতির এই ভালোবাসার ঋণ শোধ করে যাব।’ কথা রেখেছেন জাতির পিতা। হিং¯্র পাকহানাদাররাও যার গায়ে আঁচড় দেয়ার সাহস দেখাতে পারেনি, স্বাধীন দেশে বাঙালি নামক এক শ্রেণির বিশ্বাসঘাতকের হাতে তাঁকে জীবন দিতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিজের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর কথা রেখে গেছেন।

আমাদের জাতীয় জীবনে মহিমাপূর্ণ এ দিবসটি ‘অন্ধকার থেকে আলোয়, বন্দিদশা থেকে স্বাধীনতায়, নিরাশা থেকে আশায়’ উত্তরণের বিজয়ের পরিপূর্ণ দীপ্তিতে ভাস্বর। আমরা মনে করি, ইতিহাসের এই অধ্যায়গুলো বারবার আমাদের প্রজন্মের সামনে আসা উচিত। বাঙালির মুক্তি আর বাংলার মর্যাদা রক্ষায় বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কতটা আত্মত্যাগ করেছিলেন, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও কতটা দৃঢ়চিত্ত ছিলেন, তার ছবি এ প্রজন্মের মনে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা যেমন বাড়াবে তেমনি দেশের প্রতি ভালোবাসার অনুভূতিও আরও প্রবল করবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়