চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  |   ৩৩ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জের শিশু আরাফ হত্যায় তিন আসামীর মৃত্যুদণ্ড
  •   কল্যাণপুর ইউপির জেলে চাল আত্মসাৎ, দুই গুদাম সিলগালা
  •   মা আর স্ত্রীকে বুঝিয়ে দেয়া হলো দুই ভাইয়ের লাশ
  •   বাকিলা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভিম ধ্বসে ৩ ছাত্রী গুরুতর আহত
  •   আশিকাটিতে খাটের নিচে গৃহবধূর লাশ ॥ স্বামী পলাতক

প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০

বাংলাদেশের ক্রিকেট : সাম্প্রতিক পর্যালোচনা
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

উপযুক্ত পরিচর্যাহীনতার কারণে আশির দশকে রমরমা ফুটবল লীগ আর আবাহনী-মোহামেডানের স্নায়ুক্ষয়ী দ্বৈরথ সত্ত্বেও সত্যিকারের ফুটবল হারিয়ে যায় মাঠ থেকে, বাঙালির পা থেকে। এক সময়ের কয়েক হালি গোলে গো-হারা হেরে যাওয়া মালদ্বীপও আজ চোখ রাঙায় বাংলাদেশকে মাঠের নৈপুণ্যে। ক্ষয়িষ্ণু ফুটবলের দুর্দিনে মাঠ ও গ্যালারি দখল করে সাহেবী খেলা ক্রিকেট বাংলাদেশকে দেখিয়েছিল স্বপ্নের বর্ণালী। অথচ আজ সেই ক্রিকেট আমাদের জন্যে হয়ে উঠেছে আত্মগ্লানির এক বড় উপাদান। বাংলাদেশের যে ক্রিকেটের উজ্জ্বল এক জ্যোতিষ্ক রকিবুলের হাতে পাকিস্তানী খেলোয়াড়েরা হয়েছিল নাস্তানাবুদ কেবলমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানকে কটাক্ষ করার জন্যে, সেই ক্রিকেটই আজ স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীতে দেশপ্রেমের বিপরীতে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানী পতাকা নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উল্লাস করে। দেশের সম্মান যাদের কাছে ক্রীড়ার উন্মাদনার কাছে হেরে যায় তাদের আর যাই হোক মানুষ হিসেবে বিকৃত মানসিকতাই বলা যায়।

ক্রিকেট বাংলাদেশকে অনেক কিছু দিলেও কেড়ে নিয়েছে অনেক। ঊনিশশো ছিয়ানব্বই সালে এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশ যখন ওয়ানডে স্ট্যাটাস পায়, তখন সারাদেশ মেতে উঠেছিল উৎসবে। মনে হয়েছিলো একাত্তরে বিজয়ের পর আরো একটা তেমন বিজয়ের আনন্দে ভাসছে বাংলাদেশ। তারপর তুখোড় সংগঠক সাবের হোসেন চৌধুরীর হাতে বিসিবির দায়িত্ব পড়ে আমাদের ক্রিকেট এগিয়ে যায় দ্রুত গতিতে। দুহাজার সালে আমরা সাবের হোসেন চৌধুরীর তৎপরতায় তৎকালীন আইসিসি সভাপতি ও জাঁদরেল সাংগঠনিক ব্যক্তি জগমোহন ডালমিয়ার ইতিবাচক ভূমিকায় পেয়ে যাই টেস্ট স্ট্যাটাস। ভারতীয় ক্যাপ্টেন বাঙালি সৌরভ আর আমাদের দুর্জয়ের দ্বৈরথে আমরা প্রবেশ করি টেস্ট ক্রিকেটের বনেদী রাজ্যে। তারপর বয়ে যায় পদ্মা-মেঘনায় শত কিউসেক জল। আমাদের ক্রিকেট একটা আশা জাগানিয়া মানে পৌঁছালেও ধীরে ধীরে আমাদের পেয়ে বসে অতি আত্মবিশ্বাসের ঘুণে। আমরা যতই বিকশিত হচ্ছি ততই আমাদের খেলোয়াড়দের পেয়ে বসছে গ্ল্যামারের জটিলতায় আর খ্যাতির মোহে। ফলে খেলার মাঠে পারফর্ম্যান্সের চেয়ে ব্যক্তিগত স্ক্যান্ডাল ও বিশৃঙ্খলা মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেটা করে তারা দেশের মুখ উজ্জ্বল করবেন, তা না করে দেশকে মাঠে গোহারা হারানোর ব্যবস্থা করে রেখেছেন। হাল আমলে নিউজিল্যান্ড আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মাঠের নৈপুণ্য আমাদের বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর বছরকে ম্লান করে তুলেছে। মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হারলে কোন ব্যাপার ছিল না। সম্পূর্ণ মাঠ বহির্ভূত আচরণের কারণেই আমরা আজ ক্রিকেটের গ্লানি বয়ে বেড়াচ্ছি। সাকিবের আত্ম-অহমিকা কিংবা মুশফিকের আয়নাবাজি আমাদের খেলাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি তামিম-মাহমুদউল্লাহ এপিসোড কিংবা নাসির-কা- আমাদের ক্রিকেটকে তলানিতে এনে ঠেকিয়েছে। এমনিতেই আশরাফুলের মত প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে কেড়ে নিয়েছে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রলোভন, তার ওপর পরকীয়া-কা-ে ছিটকে পড়েছে নাসির। মুশফিকুর রহিম নিজেকে বিতর্কিত করে তুলে স্বাভাবিক নৈপুণ্য হারিয়ে দলকে ফেলেছেন বিপদে। বাংলাদেশ দল এখন হয়ে গেছে অনেকটাই খেলার মাঠে ধর্ম প্রচারকের মতো। পাকিস্তান দল যেমন নিজেদের খেলা ছেড়ে মাঠে ধর্ম আচরণ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তেমনি বাংলাদেশ দলেও তার ছায়া তৈরি হয়েছে। ফলে নিজেরা যে কাজের জন্যে মোটা অংকের বেতন পায় সে কাজে তৈরি হয়েছে গাফিলতি। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সাম্প্রদায়িক মন্তব্য জুড়ে দিয়ে বাংলাদেশ দলের স্বাভাবিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। ফলে খেলা নয়, পার্শ্ব চরিত্রের বিষয়গুলোই এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোচের অস্বচ্ছ ভূমিকা, সৌম্য সরকারের উপর্যুপরি ব্যর্থতার কোনো সমাধান না খুঁজে কেবলমাত্র বিসিবির সভাপতিকে কটাক্ষ করে কাদা ছোড়াছুড়ি হচ্ছে বিস্তর।

এর সমান্তরালে আমরা নারী ক্রিকেট দলকে দেখি বাঘিনীর মতো সত্যিকারের দেশকে বিশ্ব পরিম-লে নিজেদের পারফর্ম্যান্স দিয়ে তুলে ধরতে। আজ থেকে বার বছর আগে যে বাঘিনীরা থাইল্যান্ডে মাঠে নেমেছিলো উইলো হাতে, তারাই আজ আমাদের জন্যে নিয়ে এসেছে অপার গৌরব। এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ান বাঘিনীরা ২০১১ সালে অর্জন করে ওয়ানডে স্ট্যাটাস আর ২০২১ সালে তথা সুবর্ণজয়ন্তীকালে পেয়ে যায় গৌরবময় টেস্ট স্ট্যাটাস। বাঘিনীদের এ অর্জন বাঘদের মিউ মিউকে ছাপিয়ে গিয়ে আমাদের অনন্য গৌরবের অধিকারী করেছে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে হলে তৃণমূল হতে ক্রিকেটার তৈরির সূতিকাগারগুলোকে পুনরায় চালু করতে হবে। নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটকে যেমন চালু করতে হবে তৃণমূলজুড়ে, তেমনি দামাল সামার ক্রিকেটের মতো ক্রিকেটার তৈরির কারখানাগুলো চালু করতে হবে। বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলো বছরব্যাপী চালু রাখতে হবে। কেবল তাই নয়, ক্রিকেটারদের নৈতিকতা, শারীরিক সবলতা ও দেশপ্রেমকে জাগ্রত রাখতে হবে। তাদের মনস্তাত্ত্বিক জগৎকে শাণিত করতে হবে। ক্রিকেটে অর্থের ছড়াছড়ি কমিয়ে ক্রিকেটারদের সেনাবাহিনীর মতো আলাদা রাখতে হবে। তাহলেই শৃঙ্খলার পাশাপাশি খেলায় মনোযোগ শতভাগ নিরেট হবে। আমরা তারকা চাই না, খেলোয়াড় চাই, দেশপ্রেমিক খেলোয়াড়। আমরা আমাদের দেশের মানকে আন্তর্জাতিক পরিম-লে ক্রিকেটের গৌরবের মাধ্যমে বৃদ্ধি করতে চাই। সকল বিতর্ক ছাড়িয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জয় হোক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়