চাঁদপুর, শুক্রবার, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯, ১১ রজব ১৪৪৪  |   ১৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   কচুয়ায় রিয়া হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন
  •   কোস্টগার্ডের অভিযানে চাঁদপুর কোর্ট স্টেশনে ১৩শ’ কেজি জাটকা জব্দ
  •   ডাঃ সাজেদা পলিন নড়াইলের সিভিল সার্জন
  •   মতলবের আনন্দবাজারে অগ্নিকাণ্ডে পাঁচটি দোকান পুড়ে ২৫ লক্ষ টাকার ক্ষয়-ক্ষতি
  •   ভাষার মাসের প্রথমদিনে বাংলায় রায় দিলেন হাইকোর্ট

প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০

দেয়ালঘড়ি
অনলাইন ডেস্ক

ঘণ্টা পর পর ঘড়ির কাঁটা সমান দূরত্ব অতিক্রম করে। অথচ মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যবধানে কারো জীবন থেকে জীবনের দূরত্ব বহু গুণে বেড়ে যায় বা কমে আসে। খোলা চুলে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কথাগুলো ভাবে হৃদিতা। ব্যালকনি হয়ে শোবার ঘর পেরিয়ে ঠিক দেয়াল বরাবর ঝুলে আছে পুরনো ঘড়িটা। ঘরের অন্যান্য আসবাবের তুলনায় ঘড়িটি বেশ পুরনো ধাঁচের, বেমানান, সেকেলে। তবু শিরিন জামান এত দিনেও ঘড়িটাকে বদলাতে দেননি। মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হৃদিতাও কখনো অবস্থান নেয়নি। থাক না ঘড়িটা! পুরনো কত কিছুই তো আমরা বয়ে বেড়াই। আমাদের জলজ্যান্ত শরীরটাই তো পুরনো! চাইলেই কি তা বদলাতে পারি? হৃদিতা হঠাৎ দার্শনিকদের মতো গুরুগম্ভীর কথার স্রোতের ভেসে যায়। মায়ের পুরনো ডায়েরির ধূসরপাতা থেকে সে জেনেছে... এই ঘড়িটা তার জন্মসাক্ষী। ডায়েরিতে রহস্যের বীজ বোনা হলেও বটবৃক্ষের সন্ধান মেলেনি। ঘড়ির সঙ্গে তার জন্মের সম্পর্কটা কী-এই ভাবনা তাকে বহু রাত দু’চোখের পাতা এক করতে দেয়নি। সেদিন জন্মদিনের গভীর রাতে মায়ের মুখে সে যখন ঘটনাটি শুনল, এক অজানা স্বস্তির নিঃশ্বাস আপনা থেকেই ফুসফুস থেকে বেরিয়ে রাতের পৃথিবীকে ‘দু’দন্ড শান্তি’ দিয়েছিল। রহস্যটা রহস্য হয়েই থাকতে পারত, কিন্তু থাকেনি। কিছু রহস্য জীবনের প্রয়োজনে মুখোশ খুলে সামনে এসে হাজির হয়। কেউ তাকে হাস্যোজ্জ্বল মুখে সহজ ভঙ্গিতে বরণ করে নেয়। আবার কেউ বা তাকে মেনে নেওয়ার সাহস রাখে না। হৃদিতা কি তার জীবনের রহস্যকে খুব সহজে মেনে নিয়েছিল? নাকি মেনে নিতে পারেনি? মেনে নেওয়া না নেওয়ার রহস্যটাও গল্পের এক পর্যায়ে উন্মোচিত হবে।

শিরিন জামান, হৃদিতার মা। পিতার মধ্যবিত্ত সংসারে স্বাচ্ছন্দ্যেই বেড়ে উঠেছেন। যদিও সৎমার ঘরে জীবনের সোনালি কিছু সময় ভুলের অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল। পড়াশোনা শেষ করে একটি সরকারি স্কুলে চাকরি নিলেন তিনি। চাকরিটা তাকে নতুনভাবে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল সেদিন। পিতার ঘাড়ে বসে অন্ন ধ্বংস করাটা বড্ড বেশি বেমানান হয়ে পড়েছিল। তাই হাঁফ ছেড়ে তিনি যেন বেঁচে উঠলেন। সৎমার মুখের অলীক সত্যগুলো তার কাছে, রোজ সন্ধ্যার বিনোদন মনে হতো। কন্যার মুখে ভালো থাকার মিথ্যা স্বীকারোক্তি, পিতার শেষ বয়সের শান্তির সঞ্চয় হয়ে উঠেছিল। মেঘমুক্ত আর মেঘযুক্ত একটি সমন্বিত আকাশ পরিবারে শিরিন জামান তখন দোদুল্যমান। কখনো সামান্য বাতাসেই শুকনো পাতার মতো ঝরে যেতেন। কখনো বা প্রচন্ড ঝড়েও মাটি কামড়ে মেরুদন্ড সোজা করে রাখতেন।

পিতার সংসার, তার কাছে মিটমিট করে জ্বলে থাকা প্রদীপের মতো মনে হতো। যার সলতেটা তার হৃদয় আর তেল যেন ছাড় দিয়ে চলার মানসিকতা। চলমান স্রোতের হঠাৎ বিপরীতমুখী স্রোতের আগমন ঘটল। পিতার বাল্যকালের বন্ধুর পুত্রের সঙ্গে শিরিন জামানের বিয়ে ঠিক হলো। বৃদ্ধ পিতার মুখের দিকে চেয়ে রাজি হয়ে গেলেন শিরিন। তাছাড়া নামমাত্র পরিবার থেকে মুক্ত হওয়ার সুপ্ত বাসনাও তার ভেতর নিত্য ঘুরপাক খেত। তখন চলছিল মার্চ মাস। মে মাসের মাঝামাঝি বিয়ের দিন ধার্য হলো। শিরিন বিয়ের জন্য নিজের অগোছালো মনটাকে প্রস্তুত করলেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি পিতার অকস্মাৎ মৃত্যুতে শিরিন বেশ ভেঙ্গে পড়লেন। সৎমার গলগ্রহে বেঁচে থাকাটা এবার যেন পূর্ণতা পেল।

শিরিন জামানের একমাত্র বন্ধু ছিলেন রুখসানা। তারা একসঙ্গে কলেজে পড়তেন। রুখসানার বাড়ি শিরিনের বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে। তবু সুযোগ পেলেই বন্ধুর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে আসতেন শিরিন। পিতার মৃত্যুর পর যাতায়াতটা আরো বেড়ে গিয়েছিল। সেদিন ছিল রুখসানার জন্মদিন। রঙিন বেলুনে সাজানো হয়েছিল পুরো বাড়ি। রান্না হয়েছিল মজাদার সব খাবার। আনা হয়েছিল বড় একটি কেক। জন্মদিনের সমস্ত কার্যক্রম শেষ করে বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল শিরিনের। রুখসানা বেশ কয়েকবার শিরিনকে বাড়ি ফিরতে নিষেধ করলেন। তবু শিরিন বন্ধুর কথা শুনলেন না, নিজের ঘর ছাড়া কোথাও তিনি রাত কাটান না বলে। রিকশা নিয়ে এক গলির মুখে ঢুকতেই মুখে রুমাল চেপে ধরলো দুই যুবক। আকাশে তখন প্রচন্ড মেঘ। একটু পর পর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। বিভীষিকাময় পরিবেশের জন্ম হলো হঠাৎ। শিরিনের যখন জ্ঞান ফিরল তখন মধ্যরাত। পাশের ঘর থেকে অশ্লীল কথা আর বিভিন্ন নেশা জাতীয় দ্রব্যের উৎকট গন্ধ ভেসে এলো। সবাই মিলে কোনো একজনকে বারবার গুরু বলে সম্বোধন করছিল। সেদিন রাতে সেই গুরুরই পশুত্বের বলি হয়েছিলেন শিরিন জামান। বিদ্যুৎ ছিল না সে রাতে। মোমবাতির আলোর ছিটেফোঁটা দরজার ফাঁক দিয়ে শিরিনের পায়ে এসে পড়ল। শিরিনের শরীর তীব্র বেগে কাঁপতে শুরু করল। মাত্র কয়েকটা দিন পর তার বিয়ের লগ্ন। আচমকা জীবনের মোড়টা কেমন বদলে গেল। পুরো ঘরে সে একা। খোলা জানালার ভেতর দিয়ে বজ্রপাতের আলো ঘরের দেয়ালে গিয়ে পড়ল বেশ কয়েকবার। সে দেয়ালে ঝুলে ছিল টিকটিক টিকটিক করে বয়ে চলা একটি দেয়ালঘড়ি। ঘড়িটির অবয়ব শিরিনের মনে গেঁথে গেল। এরপর নীরবে চুকে গেল সম্ভ্রমহানির পাঠ। জানোয়ারটার মুখ অন্ধকারে দেখতে পাননি শিরিন। শুধু চিহ্ন হিসেবে রয়ে গিয়েছিল কিছু নখের দাগ আর বিষাক্ত কামড়। সে রাতেই বাড়ির সামনে গাড়িতে করে নামিয়ে দেওয়া হলো শিরিনকে। সৎমা সে রাতে তাকে একটা কথাই বলেছিলেন, ‘যত তাড়াতাড়ি পার এই রাতটার কথা ভুলে যাও, দু’দিন পরই তোমার বিয়ে।’ এই প্রথমবারের মতো শিরিনের মনে হলো- সৎমা তার খুব বেশি খারাপ চাননি।

শিরিন বিয়ের পিঁড়িতে বসলেন। বরের নিকটাত্মীয় কেউ ছিল না বলে শিরিনদের বাড়িতেই পাকাপোক্তভাবে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। কাজেই ফুলশয্যার আয়োজন হলো শিরিনের ঘরে। শিরিনের মন থেকে বিভীষিকাময় সে রাতের স্মৃতি সামান্যতমও মুছে যায়নি। তবু তিনি স্বামীর বুকের গভীরে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। কেটে গেল ফুলশয্যার রাত। বেশ ভালোই কাটছিল দিনগুলো। প্রত্যাশাহীন এক নারীর এর চেয়ে বেশি কিছু পাওয়ারও ছিল না। শিরিনের প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত আসন্ন। এক রাতে কী মনে করে স্বামীর ব্যবহৃত পুরনো ট্রাঙ্ক খুললেন শিরিন। তার দৃষ্টি ট্রাঙ্কের এক কোনায় আটকে গেল হঠাৎ। সেখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল, সেই কলঙ্কিত রাতের বজ্রপাতের আলোতে উঁকি দেওয়া দেয়ালঘড়িটা। শিরিন বুঝে গেলেন, তার গর্ভে ধর্ষক নামক পশুটা যে বীজ বুনে দিয়েছিল সে রাতে, সে বীজের মালিক আর কেউ নয়, তার স্বামী। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই দেয়ালঘড়িটা বুকে চেপে চলে এসেছিলেন শিরিন। সন্তান জন্ম দেওয়া, মানুষ করা এক হাতে সামলেছেন তিনি। তবু ধর্ষকের অশুভ ছায়া থেকে সন্তানকে রক্ষা করতে পেরেছেন, এই তার অমূল্য বিজয়। ধর্ষক কখনো পিতা কিংবা স্বামী হতে পারে না!

ঘড়ির সঙ্গে জন্মের রহস্যটা হৃদিতাকে যতটা না কষ্ট দিয়েছে তারচেয়ে বেশি আনন্দ অশ্রু ঝরিয়েছে এমন জননীর গর্ভে জন্ম হওয়াতে। হৃদিতা গর্ব অনুভব করে তার মায়ের জন্য। যে মা কেবল পিতৃ পরিচয়ের জন্য ধর্ষকের ছায়াতলে সন্তানকে বেড়ে উঠতে দেননি। হৃদিতা দেয়ালঘড়িটা নামিয়ে আবারো পুরনো ট্রাঙ্কে ঢুকিয়ে রাখল। মা শিরিন জামান যখন জিজ্ঞাসা করবেন দেয়ালঘড়িটা কোথায়, হৃদিতা তখন মুচকি হেসে বলবে, মা, দেয়ালঘড়িটি ঝুলিয়ে রাখার প্রয়োজন আজ ফুরিয়ে গেছে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়