চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ১৬ আষাঢ় ১৪২৯, ২৯ জিলকদ ১৪৪৩  |   ২৯ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   কচুয়ায় অগ্নিকাণ্ডে বসতঘর পুড়ে ছাই
  •   বাংলাদেশে ঈদুল আজহা ১০ জুলাই
  •   ডাকাত সন্দেহে কোস্টগার্ডের হামলায় নিখোঁজ ১ : আহত ২
  •   হাজীগঞ্জে নবজাতকের লাশ উদ্ধার
  •   অধ্যাপক    কামরুজ্জামান সাহেবের স্মরণ সভা  ও মিলাদ

প্রকাশ : ২২ মে ২০২২, ০০:০০

তার বিবাহ দিনে
অনলাইন ডেস্ক

যখন ঘুম ভাঙ্গলো, তখন ভোর চারটা বাজে মাত্র। মোবাইলের লক-স্কিনে এমন আশ্চর্য সময় দেখার জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। এমনিতেই গতকাল রাতে ঘুমিয়েছিলাম প্রায় আড়াইটার দিকে। চোখের অবস্থা তখন যথেষ্ট খারাপ, ফোলা ফোলা ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। মাত্র একরাতের অশ্র-সিক্ততা চোখের নিচে কালো দাগ জমে গেছে। টেবিলের সামনে দাঁড়াতেই বুঝতে পারলাম। চেহারার বিষণœ ছাপ আয়নার মুখে স্পষ্ট দেখা যায়। সবমিলিয়ে যে অবস্থায় আছি, আর যে পরিস্থিতিতে বিরাজ করছি তাতে করে ঘরের কেউ যদি চেহারার দিকে তাকায়, তাহলে খুব সহজেই আমার অসুস্থ মনের ব্যথা ধরে ফেলতে পারবে। তবে, যা কিছু ভাবলাম তার কিছুই হয়নি কেবল মাত্র রাত ছিলো। শূন্যতার ছোঁয়ায় পরিপূর্ণ মন, আজ বিপুল বিরহের তীরে দাঁড়িয়ে। সুতরাং ঘরের মানুষেরা আমার এমন অবস্থা দেখলে বকাণ্ডঝকা কিংবা প্রশ্নবিদ্ধ করার চেয়ে, যে আমার জন্যে কেঁদে বুক ভাসাবেন, এটা বুঝতে পারছিলাম।

আয়নাতে কেবল কয়েক সেকেন্ডের জন্যেই তাকিয়ে ছিলাম। আর তাকানোর পর নিজের বিভৎস চেহারা দেখে তৎক্ষণাৎ আয়না থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম। নিজেকে নিয়ে নিজেরই যথেষ্ট ভয় হতে লাগলো। বুঝলাম আমার দেহখানা মগজের চেয়ে মনের কথাগুলো, মনের ইচ্ছাগুলো অতিরিক্ত প্রাধান্য দিচ্ছে। যেটা আদৌ শুভ-কর নয়।

রাতে যখন ঘুমোতে গিয়েছিলাম তখনও চোখে একটুও ঘুম ছিলো না। চোখ ছিলো একেবারে খোলা। একবারের জন্যেও পলকও পড়ছিলো না। মনে কেবল একটা কথায়ই ঘুরপাক খাচ্ছিলো। তাকে হারিয়ে ফেলার কথা। এটা তখন, স্পষ্টই বুঝতে পারছিলাম। জেনেছিলাম, খুব দ্রুতই সরে যাচ্ছি অনেক দূর। বুঝলাম, সরলরেখার মতো আমাদের পথ সর্বোচ্চ বিপরিতগামী।

রাতের শুরুটা অবশ্য বেশ ভালো ছিলো। কিন্তু রাতের শেষটা যে এতটা পীড়ন দিবে তা কখনো ভাবতে পারিনি। আমি স্বভাবতই ফেসবুকে একটু বেশি সক্রিয় থাকি। সুযোগ পেলেই যখন তখন ঢুকে পড়ি ফেসবুকে। তারপর কখন যে দশ-পনের-পঁচিশ মিনিট করে দুই-তিন-চার ঘণ্টা পার হয়ে যায় তার কোনো কুলই পাই না।

গতকাল রাতেও ঠিক এমনই হয়েছিল। রাত তখন এগারোটা বাজে। হঠাৎ প্রিয় মানুষটার মেসেজ। মানুষ যেহেতু প্রিয় তার মেসেজগুলোও যে প্রিয়-ই হবে সেটা আর বলতে হয় কিসে। আমি বেশ আগ্রহ নিয়েই মেসেজগুলো পড়লাম। উত্তর দিলাম। স্বাভাবিক মেসজই। সুন্দরভাবে সবগুলো মেসেজের উত্তর দিয়ে তার ফিরতি মেসেজের অপেক্ষায় রইলো। কিন্তু হঠাৎই মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়ার মতো এক বার্তা।

-‘ফাহিম! আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে’।

বর্তাটা পড়ার পর থ-হয়ে গেলাম। জমে গিয়েছিলাম শুভ্র বরফের মতো। এতটাই জমে গিয়েছিলাম যে, মন চাইলেও হুট করে নিজেকে নিজে গলিয়ে নিতে পারবে না। হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিক ভাবে উঠাণ্ডনামা করছে। এমন মনে হচ্ছে যেনো, কেউ একজন বুকের ভিতরে ঢুকে বাহিরের দেয়াল লক্ষ্য করে হাতুরি দিয়ে সমানতালে আঘাত মেরে যাচ্ছে। ধকধক করা এমনই প্রচণ্ড শক্তিতে কেঁপে উঠছিল হৃৎস্পন্দন।

চোখে-মুখে ঘন হতে লাগলো বর্ষার মেঘ। ঘন হয়ে জুড়তে লাগলো বিষণœতার ধোঁয়া। কপালে জমতে লাগল ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। মনের অস্বাভাবিক উথাল-পাতাল শুরু হয়ে গেছে। খুব দ্রুতই নিজের অস্বাভাবিক অবস্থার কথা বুঝতে পারলাম। সবই বুঝলাম কিন্তু মানুষটা তার বিয়ের কথা যে, এত সহজ আর স্বাভাবিকভাবে জানান দিবে তা কখনো ভাবতে পারিনি। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না নিজেকে নিজে। এত বড় বিষ্ময় খুব সহজে হজম করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছিলো। কিছুটা সময় ধরে দম নিলাম। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় প্রায় পনেরো বিশ মিনিট পার করে দিলাম।

না স্বাভাবিক লাগছে না। তাকে উত্তর দেয়ার বিষয়ও মাথায় গুঁজা আছে। আর দেরি করলে চলবে না। এখনই উত্তর দিতে হবে নয়তো মন খারাপ করতে পারে। খুব ছোট্ট একটা শব্দে পাঠিয়ে মৃত ব্যক্তির হৃৎস্পন্দনের মতো থেমে গেলাম। বললাম, তোর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে! ‘ভালো তো’!

-ছেলে কি করে?

-ব্যবসা।

আর কিছু বলার মতো শব্দ খুঁজে পেলাম না। ধরা পড়া চোরের মতো চুপ মেরে গেলাম ক্ষণিকের জন্যে। একটু পর সে-ই আবার মেসেজ দিলো। বললো তুই বিয়েতে আসিস। তোর দাওয়াত।

-হুম অবশ্যই।

মেসেজ পাঠানো শেষে ফোনটা বন্ধ করে পাশে রেখে দিলাম। আগামীকাল ক্লাসের অনেকগুলো পড়া দাগিয়ে আছি। পড়াগুলোর জন্যে কিছুটা সময় বের করা উচিত। কিন্তু না, এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পড়ায় আর মন বসাতে পারিনি। মনে মনে পোষা বহুদিনের ভালোবাসা। আজ তার এত সুন্দর আর বিস্ময়কর প্রস্থান আমাকে সত্যিই অবাক করে দিচ্ছে। ভেঙ্গে-চুরে চুর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছে ভেতরের শুভ্র মলিন শহরটা।

আমার এই অস্বাভাবিক অবস্থা গা-ছেড়ে বেড়িয়ে ক্ষণিক পরের অন্ধকারে হারাচ্ছিল। আমি যে ঠাণ্ডার কাছে জমে যাওয়া শুভ্র বরফ সেটা আর এই রাতে কেউ বুঝতে পারেনি। গত আট বছর ধরে তার প্রতি আমার মায়া, ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতি সবকিছু যেনো এক মুহূর্তে গুলিয়ে গেলো। মিথ্যে মনে হতে লাগলো নিজের স্বাভাবিক অবস্থান। মিথ্যে মনে হতে লাগলো নিজেকে। অথচ! এতকিছু পরও আমার কেনো যানি মনে হচ্ছিল আমি এক ঘোর দুঃস্বপ্নে মধ্যে আটকে আছি। নিজেকে নিজে বিশ্বাস করতে পারছি না। বিশ্বাস করতে পারছি না কিঞ্চিৎ আগে জানতে পারা প্রিয় মানুষটার আশ্চর্যজনক বিয়ের কথা। বিয়ের দাওয়াতও পেয়ে গেলাম সেটাও বিশ্বাস হচ্ছিল না। মোটকথা কোনো কিছুকেই স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছিল না। কিছুই সাবলীলভাবে গ্রহণ করতে পারছিলাম না। হৃৎস্পন্দনের ক্রমশ বাড়ছে, ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে রাত। চারিদিকে ঘোর অন্ধকারে ডেকে ওঠা পোকাদের হইচই। ঘন হচ্ছে নিশ্বাস। কিন্তু তবুও আমার কেনো জানি বিশ্বাস, আমি ঘুমের মধ্যে আছি। গভীর ঘুমে তলিয়ে আছি অপ্রত্যাশিত এক দুঃস্বপ্ন নিয়ে। আর আমার দুঃস্বপ্নটা বোধহয় স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি সময়ই আটকে গেছে সময়ের জালে, তাই একটু খারাপ লাগছে। খণ্ড খণ্ড ভয়ে কাঁবু হওয়া স্বত্বেও একটু সাহস করে নিজেই নিজের হাতে চিমটি কাটলাম। উফফ... ব্যথা লাগছে। নাহ! এটা কোনো দুঃস্বপ্ন নয়।

সম্পূর্ণ বাস্তব। অতিরিক্ত হতাশাগ্রস্ত হওয়ায় এখন খারাপ সময়টাকে দুঃস্বপ্ন বলে চালিয়ে দেয়ার চালাকি করতে চেয়েছিলাম। ভুলে থাকতে চাচ্ছিলাম সব পীড়িত সংবাদ। কিন্তু সম্ভব হলো না। মায়ার একটা আলাদা ক্ষমতা আছে, তাণ্ডও খুব বড়। খুব সহজে মানুষের মন কাঁবু করে নেয়। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। আমাকেও কাঁবু করে ফেলেছে সেই সম্বোধনহীন মায়া।

রাত তখন দুটোর কাছাকাছি। অন্যান্য সময় বারোটার মধ্যে ঘুমিয়ে গেলেও আজ কিন্তু চোখে ঘুম নেই। কানের কাছ বেয়ে গড়াতে লাগলো জল। মনে পড়তে লাগলে অতীতের স্মৃতিগুলো। মনে পড়তে লাগলে অকারণে তার রেগে যাওয়া। হুটহাট বায়না ধরা। মনে পড়ে, তার দেঁতো হাসির মাঝে লুকিয়ে থাকা মায়ার সম্ভার। এতটাই স্নিগ্ধ সেই সম্ভার যে, আমি চাইলেও তা এড়িয়ে চলতে পারতাম না। খুব আকৃষ্ট করতো আমায়। কিন্তু আজ, আজ আমি সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। নিশ্চুপ হয়ে আছি শহরের নির্জনতম গলির মতো। আমার মুখ আর শরীর স্তব্ধ হলেও মন নিজে নিজে অনেক কথা বলছে। আমার স্পষ্ট মনে পড়তে লাগলো, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ও তার কবিতার সাথে প্রিয় মানুষটার সাদৃশ্য। ‘সে আজ যে কোনো নারী, হয়তো বা অতি শীগ্রই তার বুক থেকে আতরের গন্ধের পরিবর্তে মাংসের গন্ধ বের হবে’। আর সে গন্ধ সহ্য করবে এমন প্রেমিক বোধ-হয় এই শহরে একটাও নেই।

ভাবতাম মানুষ আলাদা আলাদা দুটো বিষয়ে জড়িত অবস্থায় প্রেমে পড়ে। এক, ভুল সময়ে। দুই, ভুল মানুষে। খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখলাম। আমি ওই দুটো অবস্থার দুটোতেই আটকে আছি। না সেদিক দিয়ে বেরতে পারছি, আর না এদিক দিয়ে। একাগ্র অনুভূতির শেষ প্রান্ত খুবই অদ্ভুত ধরনের হয়। দেখুন না। একটু লক্ষ করলেই বোঝা যায় সে তার ভাগ্যকে কি সুন্দর জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করে নিচ্ছে। আর আমি চোখের জলে ভাসিয়ে বেড়াচ্ছি নিজের চোখ মুখ। এ ব্যথা কোনো ব্যথা নয়, বেশ বুঝতে পারছি। তবু মন তো আর যুক্তি বুঝে না, তার তো আবার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। সুতরাং হাজার বাধা-বিপত্তির থাকা সত্ত্বেও মন চায়, কেউ একজন পাশে থাকুক, ছুটে আসুক সব জমা প্রেম দিয়ে চুকিয়ে দিক খণ্ডিত ঋণে। অথচ কি বোকাই না আমি, অদ্ভুত ভাবনায় কত কিছু ভেবে ফেললাম, তার এই বিবাহ দিনে।

* পাঠক ফোরাম বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা : pathok.ck@gmail.com

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়