চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯, ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪  |   ২৮ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   ড্রেজার ধ্বংস করাসহ মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
  •   শাহরাস্তিতে আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন
  •   ফরিদগঞ্জে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে ছাত্রলীগের আয়োজনে বর্ণাঢ্য র‌্যালী
  •   হাজীগঞ্জ পৌরসভা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত
  •   ভুয়া দুদক কর্মকর্তা সেজে চাঁদা দাবি

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০

হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর ভূমিষ্ঠে বরকতময় অলৌকিক ঘটনাবলী
অনলাইন ডেস্ক

মহান আল্লাহ তা'আলা যুগে যুগে বহু নবী এবং রাসূলগনকে পৃথিবীতে মানব জাতির হেদায়েতের জন্য প্রেরণ করেন। তম্মধ্যে আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ নবী এবং রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেন।

নিম্নে আমাদের নবীর আগমন বার্তা সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো- পূর্ববতী আসমানী কিতাবে আমাদের নবীর নাম উল্লেখ রয়েছে, পবিত্র কুরআনুল কারীমে মহান আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন -

পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে অবশ্যই এর উল্লেখ আছে।(২৬ সূরা শুয়ারা - ১৯৬)

শেষ নবীর আগমন বার্তা ও তাঁর সুন্দর চারিত্রিক গুণাবলির বর্ণনা পূর্বের ধর্মগ্রন্থসমূহে রয়েছে। অনুরূপ কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সুসংবাদও পূর্বের কিতাবসমূহে দেওয়া হয়েছিল। এর অন্য একটি অর্থ হল, সমস্ত শরীয়তের অভিন্ন বিধি-বিধানের দিক দিয়ে এই কুরআন মাজীদ পূর্বের কিতাবসমূহেও মওজুদ রয়েছে।

আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি, তারা তাঁকে (মুহাম্মাদকে) তেমনই চেনে, যেমন তাদের পুত্রগণকে চেনে; কিন্তু তাদের একদল জেনেশুনে সত্য গোপন করে থাকে। (২ সূরা বাকারা -১৪৬)

সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে সমাগত। সুতরাং তুমি সংশয়ীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।(২ সূরা বাকারা -১৪৭)

নবীর উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে যে বিধানই অবতীর্ণ হয়, তা অবশ্যই সত্য। সে ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয়ের কোন অবকাশ নেই।

আর যখন আল্লাহ নবীদের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিলেন যে, আমি তোমাদেরকে কিতাব ও প্রজ্ঞা দান করছি, অতঃপর তোমাদের কাছে যা আছে তার সমর্থকরূপে যখন একজন রসূল আসবে, তখন নিশ্চয় তোমরা তাকে বিশ্বাস ও সাহায্য করবে।তিনি বললেন, ‘তোমরা কি স্বীকার করলে এবং আমার অঙ্গীকার গ্রহণ করলে?’ তারা বলল, ‘আমরা স্বীকার করলাম।’ তিনি বললেন, ‘তবে তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী রইলাম।’(৩ সূরা আলে ইমরান -৮১)

আর স্মরণ করুন, যখন মারইয়াম-পুত্র ঈসা বলেছিলেন, হে বনী ইসরাঈল! নিশ্চয় আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসূল এবং আমার পূর্ব থেকে তোমাদের কাছে যে তাওরাত রয়েছে আমি তার সত্যায়নকারী এবং আমার পরে আহমাদ নামে যে রাসূল আসবেন আমি তার সুসংবাদদাতা। পরে তিনি যখন সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ তাদের কাছে আসলেন তখন তারা বলতে লাগল, এটা তো স্পষ্ট জাদু। ( ৬১ সূরা আস সাফ-৬)

ঈসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক সুসংবাদ প্রদত্ত সেই রাসূলের নাম বলা হয়েছে আহমদ। আমাদের প্রিয় শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম মুহাম্মদ, আহমদ এবং আরও কয়েকটি নাম ছিল। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার কয়েকটি নাম রয়েছে, আমি মুহাম্মাদ, আমি ‘আহমদ, আমি মাহী’ বা নিশ্চিহ্নকারী; যার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ কুফারী নিশ্চিহ্ন করে দিবেন। আর আমি ‘হাশির’ বা একত্রিতকারী; আমার কদমের কাছে সমস্ত মানুষ জমা হবে। আর আমি ‘আকিব’ বা পরিসমাপ্তিকারী ৷ [বুখারী: ৩৫৩২, ৪৮৯৬, মুসলিম: ২৩৫৪, তিরমিযী: ২৮৪০, মুসনাদে আহমাদ: ৪/৮০, ইবনে হিব্বান: ৬৩১৩] তবে রাসূলের নাম এ কয়টিতে সীমাবদ্ধ নয়। অন্য হাদীসে আরও এসেছে, আবু মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই আমাদেরকে তার নাম উল্লেখ করেছেন, তন্মধ্যে কিছু আমরা মুখস্ত করতে সক্ষম হয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, আমি ‘মুহাম্মাদ’ ‘আহমাদ, হাশির, মুকাফফি (সর্বশেষে আগমনকারী), নাবিইউত তাওবাহ (তাওবাহর নবী), নাবীইউল মালহামাহ, (সংগ্রামের নবী)। [মুসলিম: ২৩৫৫, মুসনাদে আহমাদ: ৪/৩৯৫, ৪০৪, ৪০৭]

ঈসা আলাইহিস সালাম এর সুসংবাদ প্রদানের কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসেও এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ তাকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরকে আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন। জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আমি আমার পিতা (পিতৃপুরুষ) ইবরাহীম এর দোআ, ঈসা এর সুসংবাদ এবং আমার মা যখন আমাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন তখন তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, তার থেকে একটি আলো বের হয়ে সিরিয়ার বুসরা নগরীর প্রাসাদসমূহ আলোকিত হয়ে গেছে।” [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৬০০, অনুরূপ বর্ণনা আরও দেখুন : মুসনাদে আহমাদ: ৫/২৬২] এমনকি এ সুসংবাদের কথা হাবশার বাদশাহ নাজাসীও স্বীকার করেছিলেন। [দেখুন: মুসনাদে আহমাদ: ১/৪৬১-৪৬২]

বল, হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রসূল, (সেই আল্লাহর) যিনি আকাশসমূহ আর পৃথিবীর রাজত্বের মালিক, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তিনিই জীবিত করেন আর মৃত্যু আনেন। কাজেই তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তাঁর প্রেরিত সেই উম্মী বার্তাবাহকের প্রতি যে নিজে আল্লাহর প্রতি ও তাঁর যাবতীয় বাণীর প্রতি বিশ্বাস করে, তোমরা তাঁর অনুসরণ কর যাতে তোমরা সঠিক পথ পেতে পার।(৭ সূরা আরাফ- ১৫৮)

আমি তো তোমার পূর্বে অনেক রসূল প্রেরণ করেছিলাম; তাদের কারো কারো কথা তোমার নিকট বিবৃত করেছি এবং কারো কারো কথা তোমার নিকট বিবৃত করিনি। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন নিদর্শন উপস্থিত করা কোন রসূলের কাজ নয়। আল্লাহর আদেশ এলে ন্যায়সঙ্গতভাবে ফায়সালা হয়ে যাবে। আর তখন মিথ্যাশ্রয়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (৪০ সূরা আল গাফির-৭৮)

মহান আল্লাহতায়ালা নবীজি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লামকে জগৎবাসীদের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর ভূমিষ্ঠে জগৎবাসীর প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অসংখ্য-অগণিত রহমত, কল্যাণ, বরকত নাযিল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লামের ভূমিষ্ঠের রাতের বরকতময় আলোচনা করা হলো-

বায়হাকী এবং আবু নাঈম বর্ণনা করেছেন, হাসসান ইবনে ছাবেত (রাঃ) বলেন, আমি তখন সাত - আট বছরের বুঝমান বালক ছিলাম। ঐ সময় একদা এক ইয়াহুদী একটি টিলার উপর উঠে মদীনার ইয়াহুদী সম্প্রদায়কে আওয়াজ দিয়ে ডাকল। তাতে তারা ছুটে এসে তার কাছে জিজ্ঞেস করল, কি ব্যাপার? ইয়াহুদী বলল, আজ রাতে আহমদ ভূমিষ্ঠ হয়েছেন। তাঁর লক্ষণযুক্ত তারকা আসমানে উদিত হয়েছে। বায়হাকী, তিবরানী, আবু নাঈম এবং ইবনে আসাকির হযরত উসমান ইবনে আবুল আছ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। আমার মাতা আমাকে বলেছেন, আমেনার গৃহে নবী করীম (সাঃ)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমেনার গৃহে চারদিক নূরের আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। আসমানের নক্ষত্ররাজি এভাবে নীচের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল, মনে হচ্ছিল যেন তারকাগুলো আমার উপরই পতিত হবে। তাছাড়া নবী করীম (সাঃ) -এর জন্মগ্রহণকালে আমেনার দেহ থেকে একটি নূর বের হয়ে সারা ঘর আলোকময় হয়ে গিয়েছিল।

আহমদ বাযযার, তিবরানী, হাকেম, বায়হাকী এবং আবু নাঈম ইরবায় ইবনে সারিয়া (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, আমি আল্লাহর বান্দা। আমি সে সময় থেকেই শেষ নবী, যখন হযরত আদম ( আ) -এর সত্তা মৃত্তিকার মধ্যে নিহিত ছিল। আমার জন্য হযরত ইব্রাহীম (আঃ) দোয়া করেছেন। হযরত ঈসা ( আ) আমার আগমনের সুসংবাদ দিয়াছেন এবং আমার মাতা স্বপ্ন দেখেছেন। নবীদের মাতাগণ এরূপ স্বপ্ন দেখে থাকেন। নবী করীম (সাঃ)-এর মাতা তাঁর পুত্রের জন্মের সময় এমন একটি নূর দেখতে পান যার উজ্জ্বল আলোকে সুদূর সিরিয়ার রাজমহল পর্যন্ত তার চোখে ভেসে উঠে। হাকেম এবং বায়হাকী খালেদ ইবনে মে'দান থেকে বর্ণনা করেছেন, একদা সাহবাগণ আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! আপনি আপনার নিজের সম্পর্কে আমাদেরকে কিছু কথা শুনান। তখন তিনি বললেন, আমি হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর দোয়ার ফলশ্রুতি এবং হযরত ঈসা (আঃ) -এর সুসংবাদের বাস্তবায়ন। আমার মাতা আমি তার গর্ভে থাকাকালীন অবস্থায় স্বপ্ন দেখেছেন — যেন তার দেহ থেকে একটি নূরের উদয় হয়েছে। যার আলোকে সিরিয়ার বুছরা এলাকা আলোকোজ্জ্বল হয়ে গিয়েছে। খালেদ বলেন, নবী করীম (সাঃ) -এর মাতা আমেনা তার গর্ভাবস্থায় যে নূর দেখেছিলেন, তা ছিল স্বপ্ন। পক্ষান্তরে নবী করীম (সাঃ)-এর জন্মের সময় যে নূর দেখেছিলেন, তা ছিল তাঁর জাগ্রত অবস্থার বাস্তব ঘটনা। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, হযরত আমেনা বলেন, গর্ভসঞ্চার হওয়ার পর কেউ তাকে বলল, হে আমেনা ! তোমার গর্ভে মনুষ্যকুলের সরদার স্থান লাভ করেছেন। তার নিদর্শন হল, যখন তিনি জন্মগ্রহণ করবেন তখন একটি নূরের উদয় হবে। যার আলোকে সিরিয়ার বুছরা নগরীর রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত চোখের সামনে ভেসে উঠবে। তোমার এ সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে মুহাম্মদ তার নাম রেখো।

ইবনে সা’দ এবং ইবনে আসাকির হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, হযরত আমেনা বলেন, নবী করীম (সাঃ)-কে গর্ভে ধারণ করার পর থেকে তার ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত আমার কোনরূপ ক্লেশ পেতে হয়নি। তার ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথে একটি নূরের উদয় হল। যাতে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী সমস্ত এলাকা আলোকোজ্জ্বল হয়ে গেল। জন্মের সময় তিনি তার হাত দিয়ে মাটিতে ভর দিলেন এবং একমুষ্টি মাটি নিয়ে হাত বন্ধ করে আসমানের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন।

ইবনে সা'দ ছাওরর ইবনে ইয়াযিদ থেকে, তিনি আল আজফা থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, আমার জন্মগ্রহণকালে আমার মাতা তার দেহ থেকে একটি নূর উদিত হতে দেখলেন যার জ্যোতির ছটা সিরিয়ার রাজধানী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল।

আবু নাজীম আতা ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণনা করেছেন, হযরত উম্মে সালামাহ (রাঃ), হযরত আমেনার এ কথা বর্ণনা করেছেন; যে রাতে নবী করীম (সাঃ) ভূমিষ্ঠ হলেন, আমি একটি নূর উদিত হতে দেখলাম। যার আলোকে সিরিয়ার রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত এভাবে আলোকোদ্ভাাসিত হয়ে উঠল, তা আমিও দেখতে পেলাম ইবনে সা’দ আমর ইবনে আছেম থেকে, তিনি হুমাম ইবনে ইয়াহইয়া থেকে, তিনি ইসহাক ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে নবী করীম (সাঃ) -এর মাতা আমেনার এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, নবী করীম (সাঃ) ভূমিষ্ঠ হলে আমার দেহ থেকে একটি নূর বের হল। যাতে সিরিয়ার রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত আলোকোজ্জ্বল হয়ে গেল। তিনি সম্পূর্ণ পাক-পবিত্র অবস্থায় ভূমিষ্ট হলেন। কোনরূপ অপরিচ্ছন্নতা বা অপবিত্রতা ছিল না। ভূমিষ্ঠ হয়েই তিনি মাটিতে তার হাত রাখলেন। ইবনে সা’দ মুআয় আমারী থেকে, তিনি ইবনে আওন থেকে, তিনি ইবনে কিবতিয়া থেকে বর্ণনা করেছেন, হযরত আমেনা নবী করীম (সাঃ) -এর জন্মের ব্যাপারে বলেছেন, আমি আমার দেহ থেকে একটি আলোকপি- উদিত হতে দেখলাম। যাতে সমগ্র জগত আলোময় হয়ে উঠল। ইবনে সা'দ হাসসান ইবনে আতিয়্যাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সাঃ) জন্মগ্রহণ করেই নিজ হাতের তালু এবং হাটু দিয়ে মাটিতে ভর দিলেন। ঐ সময় তিনি আসমানের দিকে তাকিয়েছিলেন।

ইবনে সা'দ মুসা ইবনে ওবায়দাহ থেকে এবং তিনি তার ভাই থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সাঃ) জন্মগ্রহণ করে হাত দিয়ে মাটিতে ভর দিলেন। মস্তক আসমানের দিকে উত্তোলন করলেন এবং হাতে একমুষ্টি মাটি তুলে নিলেন। বনু লাহাবের এক ব্যক্তি এ কথা শুনে এরূপ মন্তব্য করল, এটা সত্য হলে এ শিশু এককালে সারা জগতকে তার করায়ত্ত করে ফেলবে। আবু নাঈম, আব্দুর রহমান ইবনে আওফ থেকে, তিনি তার মাতা আশশিফা বিনতে আমর ইবনে আওফের এ ধরনের একটি বর্ণনার উল্লেখ করেছেন, নবী করীম (সাঃ) -এর জন্ম আমার হাতের উপর হয়েছে। তার মুখমণ্ডল তখনই উজ্জ্বল এবং দীপ্তিময় ছিল। ঐ সময় আমি কাউকে বলতে শুনলাম, তোমার প্রতি আল্লাহর রহমত। তোমার প্রতি তোমার প্রতিপালকের রহমত। এরপর আমার সামনে পূর্ব ও পশ্চিম দিক-দিগন্তু আলোকোজ্জ্বল হয়ে গেল এবং রোমের রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। অতঃপর আমি নবজাতককে কাপড়ে ঢেকে শয়ন করিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার উপর যেন একটি অন্ধকার এবং ভীতির পর্দা পড়ে গেল। আমি কেঁদে উঠলাম। এ সময় আমি কাউকে বলতে শুনলাম, তুমি একে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ? বলা হল, পশ্চিম দিকে। তারপরই আমার এ অবস্থা দূর হয়ে গেল ; কিন্তু একটু পরেই আবার ঐ অবস্থা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। আমি আবার ভীতিগ্রস্ত হয়ে পড়লাম এবং কাঁপতে লাগলাম। আর সে অবস্থায় আমি কাউকে বলতে শুনলাম, একে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ? বলা হল পূর্বদিকে। শিফা বিনতে আমর ইবনে আওফ বলেন, নবী করীম (সাঃ) -এর নবুয়ত লাভ পর্যন্ত আমার মনের মধ্যে এ কথাগুলো শুধু তোলপাড় করছিল। অতঃপর যখন তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হলেন, তখন আমি সর্বপ্রথম দীক্ষিত হলাম। আবু নাঈম আমর ইবনে কুতাইবাহ থেকে, তিনি তার পিতাকে বলতে শুনেছেন, হযরত আমেনার সন্তান প্রসবকাল উপস্থিত হলে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন ফেরেশতাদেরকে আদেশ করলেন, তোমরা সমস্ত আসমান এবং বেহেশতসমূহের দরজাগুলো খুলে দাও, অতঃপর তোমরা আমার সামনে উপস্থিত হও। তখন ফেরেশতাগণ তাদের একে অপরকে সুখবর বলতে বলতে আল্লাহর দরবারে হাজির হল। দুনিয়ার পাহাড়-পর্বতগুলো তাদের শির উচু করল। সাগরসমূহের জলরাশি স্ফীত হয়ে উঠল। পানিতে ও পর্বতে যারা বসবাস করে তারাও একে অপরকে সুসংবাদ জানাতে লাগল। শয়তানকে সত্তরটি শিকল দিয়ে আবদ্ধ করা হল এবং তাকে কাস্পিয়ান সাগর বক্ষে উপুড় করে ঝুলিয়ে রাখা হল। দুনিয়ার পাপীষ্ঠ ও অবাধ্য প্রাণীসমূহকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হল। সূর্যকে সেদিন এক অপূর্ব ও অসাধারণ আলো প্রদান করা হল এবং তার দরজার সামনে শূন্য জগতে সত্তর হাজার হুরকে দাড় করিয়ে দেয়া হল, যারা নবী করীম (সাঃ)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগল। নবী করীম (সাঃ)-এর সম্মান ও মর্যাদার কারণে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর জন্মের বছর দুনিয়ার সকল নারীর জন্য পুত্র সন্তান নির্ধারণ করে দিলেন এবং দুনিয়ার কোন একটি বৃক্ষকেও সেই বছর ফলবিহীন করে রাখলেন না। আর এটাও নির্ধারণ করে রাখলেন, ঐ বছর দুনিয়ার কোন স্থানেই কোনরূপ অশান্তি এবং ফেতনা-ফাসাদের অস্তিত্ব থাকবে না। এর পর যখন এ সর্বপ্রতিক্ষীত জন্ম ঘটনা সংঘটিত হল, তখন সমগ্র জগত নূরের জ্যোতিতে জ্যোতির্ময় হয়ে গেল। ফেরেশতাগণ পরস্পরকে ধন্যবাদ জানাতে লাগল। প্রতিটি আসমানে মহামূল্যবান চুনি - পান্নার স্তম্ভ নির্মাণ করা হল। যার ফলে আসমানসমূহ আলোময় রূপ ধারণ করল। নবী করীম (সাঃ) যখন মে'রাজ সফর করেছিলেন তখন আসমানে ঐ স্তম্ভসমূহ দেখলে তাকে বলা হয়েছিল, এগুলো আপনার জন্মের সুসংবাদ শুনে নির্মাণ করা যে রাতে নবী করীম (সাঃ) জন্মগ্রহণ করলেন, সে রাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হাওজে কাওছারের কূলে সত্তর হাজার মেশক আম্বর বৃক্ষ রােপণ করে সেগুলোকে সেরা সুঘ্রাণযুক্ত বৃক্ষে পরিণত করলেন। ঐ রাতে সকল আসমানের অধিবাসীরা আল্লাহর দরবারে তাদের নিরাপত্তার জন্য দোয়া করলেন দুনিয়ার মূর্তি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। লাত এবং ওযযার অবস্থানস্থল থেকে স্বর্ণভান্ডার বের হয়ে পড়ল। সর্বত্র এরূপ আওয়াজ উঠল, কুরাইশদের মধ্য থেকে আল আমীনের অভ্যুদয় ঘটেছে। ছিদ্দীক তাশরীফ এনেছেন, অথচ কুরাইশরা কিছুই জানল না যে কি ঘটনা ঘটেছে। খানায়ে কা'বা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত এরূপ আওয়াজ বাতাসে ভেসে বেড়াল, পূর্ণিমার চাঁদ বিকশিত হয়েছে। এখন থেকে আমার প্রিয় যিয়ারাতকারীদের আমার কাছে আনাগুনা শুরু হবে। এখন আমি বর্বরতার আবর্জনা মুক্ত হতে পারব। হে ওযযা তোর ধ্বংস সমাগত। খানায়ে কা'বা যে অপবিত্রতাজনিত কারণে কখনো কখনো কেঁপে উঠত, তার সে কম্পন থেমে গেল। এটা ছিল নবী করীম (সাঃ)-এর ধরায় আগমনের প্রথম নিদর্শন যা কুরাইশরাও লক্ষ্য করেছিল। আবু নাঈম বর্ণনা করেছেন, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমেনার গর্ভ ধারণের নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হল, সে রাতে কুরাইশদের পালিত জীবজন্তুগুলো বলল, খানায়ে কাবার প্রতিপালকের কসম ! সে সত্তা গর্ভে তাশরীফ নিয়েছেন, তিনিই জগতের শান্তি এবং জগদ্বাসীদের জন্য আলো। ঐ রাতে আরবের বিভিন্ন আধ্যাত্মবাদিনী যে সকল মহিলার সঙ্গীনীরূপে জ্বিনেরা তাদের সাথে থাকত, তারা সকলেই গা ঢাকা দিল। জ্যোতির্বিদ্যা বিলুপ্ত হয়ে গেল। দুনিয়ার পরাক্রান্ত রাজা বাদশাহদের আসনসমূহ টলটলায়মান হল। রাজা - বাদশাহরা নির্বাক হয়ে গেল। পূর্বাঞ্চলের জীব - জন্তুরা পশ্চিমাঞ্চলের জীব-জন্তুদেরকে মহামানবের সংবাদ জানিয়ে দিল। একইভাবে সমুদ্রের প্রাণীরা একে অপরকে খোশ-খবর শুনাতে লাগল। হযরত আমেনার গর্ভের প্রতিটি মাস অতিবাহিত হওয়ার পর যমিনে ও আসমানে ঘোষণা করা হত, খোশ আমদেদ! এখন আবুল কাসেম (সাঃ) সার্বিক কল্যাণ এবং বরকতসহ দুনিয়ায় শুভাগমন করেছেন। নবী করীম (সাঃ) তার মাতার উদরে পূর্ণ নয় মাস অবস্থান করলেন; কিন্তু তিনি তার উদরে কোনরূপ ব্যথা-বেদনা অথবা অস্বস্তি, অস্থিরতা অনুভব করলেন না। এমন কি গর্ভবতী নারীদের মধ্যে যে সকল স্বাভাবিক অবস্থা ও নিদর্শনাদি দেখা যায় হযরত আমেনার মধ্যে তাও দেখা গেল না। নবী করীম (সাঃ)-এর মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায়ই পিতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করলেন। তাতে ফেরেশতাগণ বলে উঠল, হে আমাদের পালনকর্তা ! আপনার নবী যে এতিম হয়ে পড়লেন? তখন পালনকর্তা জবাব দিলেন, তাতে কি? স্বয়ং আমিই তার অভিভাবক এবং সাহায্যকারী। তোমরা তার জন্ম থেকে বরকত অর্জন কর। তার জন্ম সকলের জন্যই বরকতময় এবং কল্যাণকর। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার জন্মের সময় আসমান এবং বেহেশতের দরজাসমূহ খুলে দিলেন। হযরত আমেনা তার সম্পর্কে এরূপ বলতেন, আমার গর্ভধারণের ছয় মাস অতিবাহিত হওয়ার পর আমার কাছে জনৈক আগন্তুক এসে নিদ্রার মধ্যে আমার পদযুগলে টোকা দিয়ে বলল, হে আমেনা! তুমি সমগ্র জগতের মনোনীত ব্যক্তিকে গর্ভে ধারণ করেছে। সে ভূমিষ্ঠ হলে তার নাম মুহাম্মদ রেখো। হযরত আমেনা তার নেফাস সম্পর্কে বলেছেন, অন্যান্য নারীদের যা হয়ে থাকে আমার ক্ষেত্রেও তা দেখা গিয়েছে ; কিন্তু কোন লোকই তা জানতে পারেনি। এক সময় আমি একটি ভীতিকর গড়গড় আওয়াজ শুনতে পেয়ে খুবই ভীত হয়ে পড়লাম। তারপর হঠাৎ দেখলাম, যেন একটি সাদা পাখীর ডানা আমাকে স্পর্শ করেছে। তাতে আমার সে ভীতি দূর হয়ে গেল। পরক্ষণেই দেখলাম, একটি দুগ্ধপূর্ণ পেয়ালা আমার পার্শ্বে রাখা হয়েছে। আমি তখন দারুণ তৃষ্ণার্ত ছিলাম বলে ঐ দুগ্ধ তুলে পান করলাম। অতঃপর আমার দেহ থেকে একটি নূর উদিত হল। তাতে আমি কয়েকজন মহিলাকে দেখতে পেলাম। তারা প্রত্যেকেই খর্জুর বৃক্ষ সদৃশ দীর্ঘদেহী ছিলেন। তাদেরকে আবদে মানাফ পরিবারের কন্যা বলে মনে হল। তারা আমাকে গভীর দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন। আমি নির্বাকভাবে তা অনুভব করছিলাম। ঠিক এমন সময় একটি জরিদার রেশমী বস্ত্র আসমান ও যমিনের মধ্যস্থলে ছড়িয়ে পড়ল। তাদের কেউ কেউ বলল, একে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে নিয়ে যাও। এর পর আমি দেখতে পেলাম, কতিপয় ব্যক্তি শূন্যে রৌপ্যের লোটা হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। এর পর একঝাক পাখী এসে আমাকে যেন আবৃত করে ফেলল। পাখীগুলোর ঠোট পান্না নির্মিত এবং পাখা চুনির তৈরী ছিল। অতঃপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমার সামনে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল খুলে দিলেন। তখন আমি শূন্যে তিনটি ঝাণ্ডা উড়তে দেখলাম। একটি পূর্বে, একটি পশ্চিমে এবং একটি খানায়ে কা'বার ছাদে। এর পর আমার প্রসব বেদনা আরম্ভ হল এবং নবী করীম (সাঃ) ভূমিষ্ঠ হলেন। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই আমি তাকে সিজদায় পতিত দেখতে পেলাম। তিনি তখন যেন অনুনয়-বিনয় রত অবস্থায় তার অঙ্গুলী উপরে তুলে রেখেছিলেন। এরপর আসমানে একটি সাদা মেঘ এসে সমগ্র আকাশ ঢেকে ফেলল। তারপর আবার তা অদৃশ্য হয়ে গেল। এ সময় কেউ বলে উঠল, মুহাম্মদকে পূর্বাঞ্চলে ও পশ্চিমাঞ্চলে নিয়ে যাও এবং তাকে সমুদ্রেও বিচরণ করাও, যেন মানুষ তার নাম, আকৃতি এবং গুণাবলি সম্পর্কে জেনে নিতে পারে এবং তারা এটাও জানতে পারে, তার এক নাম মাহী। তার আগমনে শিরক ও কুফরী নিৰ্মল হয়ে যাবে এর পরক্ষণেই আমি তাকে একটি শ্বেতবর্ণের পশমী কাপড়ে জড়ানো অবস্থায় দেখলাম এবং তার দেহের নীচে ছিল সবুজ রেশম। তার হাতের মুঠায় ছিল মূল্যবান ধাতু নির্মিত তিনটি চাবি। এ সময় অদৃশ্য আওয়াজ এল, মুহাম্মদ নবুয়তের চাবি গ্রহণ করেছেন। এর পরই একটি মেঘখণ্ডের আবির্ভাব ঘটল। আর তার মধ্য থেকে অশ্বের আওয়াজ এবং পাখীর পাখা নাড়ানোর শব্দ শুনা যেতে লাগল। শেষ পর্যন্ত মেঘ অদৃশ্য হয়ে গেল এবং উক্তরূপ আওয়াজও থেমে গেল। এর পর কেউ যেন বলে উঠল, মুহাম্মদকে পূর্ব এবং পশ্চিমে নিয়ে যাও। পয়গম্বরদের জন্মভূমিসমূহে ঘুরিয়ে আন। জ্বিন, মানব, পশু-পাখী এবং হিংস্র প্রাণীদের কাছে নিয়ে যাও। তাকে হযরত আদম (আঃ)-এর পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, নূহ (আঃ)-এর বিনয়, ইব্রাহীম (আঃ) -এর বন্ধুত্ব, ইসমাইল (আঃ)-এর বাক্য, ইয়াকুব (আঃ)-এর চেহারা, ইউসুফ (আঃ) -এর সৌন্দর্য, দাউদ (আঃ) -এর কণ্ঠস্বর, আইয়ুব (আঃ)-এর ধৈর্য, ইয়াহইয়া (আঃ)-এর ত্যাগ এবং ঈসা (আঃ)-এর মমতা প্রদান কর। তাকে সকল পয়গাম্বরের চরিত্রের সমাবেশকারী বানিয়ে দাও। এর পর এই অবস্থাও দূর হয়ে গেল। এর পর আমি আমার সন্তানের হাতে একটি সবুজ রেশমী কাপড় জড়ানো দেখলাম, কে যেন এই সময় বলে উঠল, মুহাম্মদ সারাজগত হস্তগত করেছে। সৃষ্টিজগতের সকল বস্তু তার মুঠায় এসে গেছে। এর পর তিনটি লোকের আগমন ঘটল। তাদের একজনের হাতে রৌপ্যের লোটা, দ্বিতীয়জনের হাতে সবুজ পান্নার ছােট বাসন এবং তৃতীয়জনের হাতে সাদাবর্ণের রেশম। তা খুলে সে একটি অপূর্ব সুন্দর আংটি বের করল। তারপর উক্ত লোটার পানি দিয়ে আংটিটি সাতবার ধৌত করে ওটা দিয়ে নবী করীম (সাঃ) -এর দু'কাঁধের মধ্যস্থলে মােহর করে দিল। আবু নাঈম এক দুর্বল সনদে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমাদের সর্বকনিষ্ঠ ভাই আব্দুল্লাহ জন্মগ্রহণ করলে দেখলাম, তার মুখমণ্ডলে একটি জ্যোতি সূর্যের ন্যায় ঝলমল করত। আমাদের পিতা বললেন, আমার এই সন্তানের অবস্থা অদ্ভূত আমি স্বপ্নে দেখলাম, তার নাকের ছিদ্র থেকে একটি সাদা বর্ণের পাখী বের হয়ে উড়ে গেল। আমি এই ঘটনা বনি মাখযুমের এক আধ্যাত্মবাদিনীর কাছে গিয়ে ব্যক্ত করলে সে বলল, তোমার এই স্বপ্ন সত্য হলে তোমার ঔরস থেকে এক পুত্র জন্মগ্রহণ করবে। পূর্ব ও পশ্চিমের লোকগণ তার অনুসরণ করবে। এর পর আমেনা যখন সন্তান প্রসব করল, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি কোনকিছু দেখেছ ? সে বলল, আমার প্রসব বেদনা আরম্ভ হলে আমি একরূপ গড়গড় শব্দ এবং কিছু মানুষের কথা বলার আওয়াজ শুনতে পেলাম। তারপর আমি একটি ইয়াকুতের তৈরি স্তম্ভের সাথে রেশমী কাপড়ের ঝা-া দেখতে পেলাম। তাছাড়া আমি শিশুর মাথা থেকে একটি নূর উদিত হতে দেখলাম। যা সুউচ্চ আসমান পর্যন্ত বিচ্ছুরিত হল। যার আলোকে আমি সিরিয়ার রাজপ্রাসাদকে যেন প্রজ্বলিত অবস্থায় দেখতে পেলাম। এর পর আমি কাছেই এক ঝাক পাখীকে পাখা বিস্তার করে আমার শিশুকে সিজদাহ করতে দেখলাম। আমি সাঈরা আসাদীদ জিনকে বলতে শুনলাম, তোমার এ পুত্রের জন্মের উছিলায় মূতি-প্রতিমা ও জ্যোতির্বিদ্যার বিলুপ্তি ঘটেছে। এর পর আমি একজন দীর্ঘকায় সুন্দর যুবককে দেখলাম। সে আমার শিশুকে আমার কোল থেকে নিয়ে গেল এবং তার মুখে নিজ মুখের লালা লাগিয়ে দিল। তার নিকট একটি স্বর্ণের থালা ছিল। সে আমার শিশুর বক্ষ বিদীর্ণ করে হৃদপি- বের করে আনল। তারপর হৃদপি-টি চিরে তার মধ্য হতে একটি ক্ষুদ্রাণুক্ষুদ্র কালবিন্দু বের করে দূরে নিক্ষপ করুল। ঐ থালায় সাদা বর্ণের সুগন্ধি ছিল। তা হৃদপি-ে লাগিয়ে দেয়া হল। এর পর একটি সাদা রেশমী থলে থেকে একটি আংটি বের করে তার দ্বারা নবী করীম (সাঃ)-এর দু’স্কন্ধের মধ্যস্থলে মােহর অংকিত করা হল। তারপর সে তাকে কাপড় দ্বারা ঢেকে দিল।

হাফেজ আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে মায়েজ নবী করীম (সাঃ)-এর জন্ম ঘটনা সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, হযরত আমেনা নবী করীম (সাঃ)-এর জন্মদিনের আশ্চর্যজনক ঘটনাসমূহ বলতে গিয়ে বলেন যে, আমি সেদিনকার ঘটনাসমূহে বিস্ময়াভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ আমার নিকট তিনব্যক্তি আগমন করল। তাদের চেহারার সৌন্দর্য দেখে মনে হচ্ছিল যে, তাদের মুখমণ্ডল থেকে সূর্য ঠিকরে বের হচ্ছে। তাদের একজনের হাতে একটি লোটা ছিল, যার মধ্য হতে অপূর্ব সুঘ্রাণ বের হচ্ছিল। দ্বিতীয়জনের হাতে ছিল পান্নার তৈরী একটি চতুষ্কোণ থালা। ওটার প্রত্যেক কোণে একটি সাদা মােতি জড়ানো ছিল। কে যেন বলল, এটা সমগ্র জগত ও তার পূর্ব পশ্চিম এবং জল ও স্থল। হে আল্লাহর বন্ধু! আপনি যেদিক দিয়ে ইচ্ছা এটা ধরুন। তার এরূপ কথা শুনে আমি দেখার জন্য থালাটির দিকে তাকালাম, দেখি তিনি ওটা কোনদিক দিয়ে ধারণ করেন। দেখলাম তিনি ওটার মাঝখান দিয়ে ধরলেন। হঠাৎ আওয়াজ এল, কসম কা'বার ! মুহাম্মদ কা'বা ধারণ করেছেন। আল্লাহ্ পাক তার জন্য কা'বাকে কিবলা এবং বাসস্থান নির্ধারণ করেছেন। তারপর আমি তৃতীয়জনের হাতে উত্তমরূপে ভাজ করা একটি সাদা রেশমী বস্তু দেখলাম। সে ওটা খুলে ওটার ভিতর থেকে একটি মনোরম আংটি বের করল। তারপর তার নিকট হতে থালাধারী ব্যক্তি আংটিটি নিয়ে সাতবার উল্লিখিত লোটার পানি দিয়ে ধৌত করল। অতঃপর সেই আংটি দিয়ে নবী করীম (সাঃ)-এর দু ' স্কন্ধের মধ্যস্থলে মােহর এটে দিল। তারপর তা রেশমী বস্ত্রে ঢুকিয়ে রেখে তাতে মেশকের সুতা বেঁধে দিল। অতঃপর তা কিছু সময় নিজ মাথায় রেখে দিল। (ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন) এ ব্যক্তি ছিল বেহেশতের তত্ত্বাবধায়ক ফিরেশতা রেজওয়ান। সে তখন নবী করীম (সাঃ) -এর কানের নিকট মুখ নিয়ে যেন চুপে চুপে কি বলল, যা আমি বুঝতে পারলাম না। তারপর সে স্পষ্টভাবে বলল, হে মুহাম্মদ ! আপনাকে সুসংবাদ। প্রত্যেক নবীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আমি আপনাকে দান করেছি। আপনি তাদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী এবং ধীর। আপনার হাতে সাফল্যের চাবি দেয়া হয়েছে। আপনাকে সর্বাধিক ব্যক্তিত্ব দান করা হয়েছে। হে আল্লাহর খলীফা ! যে কেউই আপনার নাম শুনবে, আপনাকে না দেখেই তার অন্তর কেঁপে উঠবে। ইবনে ওয়াহেদ তানভীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এই হাদীছটি অপরিজ্ঞাত। ইবনে সা'দ হাকেম, বায়হাকী এবং আবু নাঈম হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, জনৈক ইয়াহুদী মক্কায় অবস্থান করে ব্যবসা - বাণিজ্য করত। নবী করীম (সাঃ) -এর জন্মের রাতে সে কুরাইশদের মজলিসে গিয়ে বলল, হে কুরাইশগণ ! আজ রাতে তোমাদের মধ্যে কোন শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েছে কি ? তারা বলল, তাতো বলতে পারি না। সে বলল, জেনে রাখ এই রাতে শেষ যমানার নবী ভূমিষ্ঠ হয়েছেন। তাঁর স্কন্ধের মাঝখানে চিহ্ন অঙ্কিত আছে, যাতে কিছু চুল রয়েছে। এই শিশু দু'দিন দুধ পানে বিরত থাকবে। কোন জিন তার মুখে অঙ্গুলি রেখেছে। একথা শুনে কুরাইশরা সবিস্ময়ে মজলিস ত্যাগ করল। অতঃপর প্রত্যেকে নিজ নিজ গৃহে পৌছে পরিবারের অন্যান্য লোকদেরকেও একথা বলল। তারা বলল, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুতালিবের আজ একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। তার নাম রাখা হয়েছে মুহাম্মদ। এই সংবাদ শুনে উক্ত মজলিসে উপস্থিত থাকা কুরাইশ একথা উক্ত ইয়াহুদীর কাছে বলল। ইয়াহুদী বলল, তোমরা আমাকে নিয়ে চল, আমি শিশুটিকে দেখব। তখন কুরাইশরা উক্ত ইয়াহুদীকে নিয়ে হযরত আমেনার নিকট উপস্থিত হল এবং তার শিশুটিকে দেখতে চাইল। হযরত আমেনা তার শিশুকে দেখালেন। ইয়াহুদী শিশুর পিঠ বস্ত্রমুক্ত করে একটি তিলের মত চিহ্ন দেখে বেহুঁশ হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর তার হুঁশ ফিরে এলে কুরাইশরা তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি হঠাৎ ঐরূপ বেহুঁশ হয়ে পড়লে কেন ? সে বলল, আমাদের বনী ইস্রাইলদের মধ্য হতে নবুয়তের অবসান ঘটেছে। অবশ্য তোমাদের এতে খুশী হওয়ার কথা। আল্লাহর কসম, এই শিশু সকলের উপর এমন বিজয় লাভ করবে যে, তার পরিচয় মাশরেক-মাগরেব তথা সমগ্র জগতে ছড়িয়ে পড়বে।

বায়হাকী এবং ইবনে আসাকির আবুল হাকাম তানুখী থেকে বর্ণনা করেছেন, কুরাইশদের কোন সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে তাকে একটি হাঁড়ি দিয়ে ঢেকে রাখার জন্য মহিলাদের নিকট সমর্পণ করা হত। তারা তাকে রাতে হাঁড়ির নবী করীম (সাঃ) ভূমিষ্ঠ হলে আরবের ঐ প্রচলন অনুযায়ী আব্দুল মুতালিবও তাকে মহিলাদের নিকট সােপর্দ করলেন। তারা তাকে ঐভাবে রাখার পর প্রত্যুষে গিয়ে দেখল যে, হাঁড়িটি ফেটে গিয়েছে এবং শিশু মুহাম্মদ দু চক্ষু মেলে আসমানের দিকে তাকিয়ে আছেন। তখন মহিলারা আব্দুল মুতালিবের নিকট গিয়ে বলল, আমরা এমন ব্যাপার আর কখনো দেখিনি। শিশুর উপরে যে হাঁড়ি রেখেছিলাম তা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছে এবং তিনি আসমানের দিকে তাকিয়ে আছেন। একথা শুনে আব্দুল মুতালিব বললেন, তোমরা তার প্রতি তীক্ষ দৃষ্টি রেখ। অবশ্য আমি এ ঘটনাকে সুলক্ষণই মনে করি। শিশুর জন্মের সপ্তম দিনে আবদুল মুত্তালিব কতগুলো পশু যবেহ করে কুরাইশদেরকে আহারের দাওয়াত করলেন। তারা এসে আহারান্তে জিজ্ঞেস করলেন যে, হে আব্দুল মুতালিব। আপনার নাতীর নাম কি রাখলেন ? তিনি বললেন, নাম রেখেছি মুহাম্মদ। তারা বলল, পারিবারিক প্রচলিত নাম রাখলেন না কেন ? তিনি বললেন, আমার বাসনা যে, ' আসমানে আল্লাহ এবং দুনিয়ায় মানবকুল তার প্রশংসা করুক। ( সে সকলের প্রশংসাভাজন হোক)

আবু নাঈম এবং ইবনে আসাকির মুসাইয়্যিব ইবনে শরীফ থেকে, তিনি মুহাম্মদ ইবনে শরীফ থেকে, তিনি আমর ইবনে শরীফ থেকে, তিনি নিজ পিতা থেকে, তিনি নিজ দাদা থেকে রেওয়ায়েত করেছেন, মাররুয যাহরানে ঈসা নামক এক সিরীয় রাহেব বাস করত। সে বিজ্ঞ আলিম ছিল। বেশিরভাগ সময়ে সে গির্জার মধ্যেই কাটিয়ে দিত। কখনো কখনো মক্কায় এলে লোকগণ তার সাথে সাক্ষাত করতে যেত ! তখন সে বলত যে, তোমাদের মধ্যে এক শিশু ভূমিষ্ঠ হবে, তার সামনে গােটা আরব দেশ শির নত করবে এবং অনারবরাও তার বশ্যতা স্বীকার করবে। এখনই তার আগমনের সময়। যে তার যমানা পাবে এবং তার অনুসরণ করবে সে সফলতা লাভ করবে। আর যে তার অবাধ্যতা প্রদর্শন করবে, ব্যর্থকাম হবে। আল্লাহর কসম, আমি সুখ - সাচ্ছন্দ্য ও শাস্তির দেশ ত্যাগ করে এই অভাবানটন ও দুর্যোগপূর্ণ দেশে শুধু তারই তালাসে এসেছি।

উক্ত রাহেব মক্কার প্রতিটি নবজাতক সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে এবং জিজ্ঞেসবাদ করে বলত যে, সে এখনো আসেনি। নবী করীম (সাঃ)-এর জন্মের দিন সকালে আব্দুল মুতালিব ঐ রাহেবের গৃহ দরজায় গিয়ে তাকে ডাক দিলেন। সে জিজ্ঞেস করল, কে ডাকছে ? আব্দুল মুত্তালিব বললেন, আমি। রাহেব বাইরে এসে বলল, মনে হচ্ছে, তুমিই সেই জাতকের পিতা, আজ যে শিশু জন্মগ্রহণ করেছে। যার সম্পর্কে আমি তোমাকে বলেছিলাম যে, সে সােমবারে জন্মগ্রহণ করবে। নবুয়ত লাভ করবে এবং সােমবারেই ইন্তেকাল করবে তার জন্মলক্ষণযুক্ত তারকা সন্ধ্যায় আসমানে উদিত হয়েছে। তবে তুমি এই সম্পর্কে কাউকে কিছু বলবে না। কেননা এত বেশি হিংসা কেউ কারাে প্রতি করেনি, এর সাথে করা হবে। এবং এত বেশি শত্রুতাও কেউ কারো সাথে করেনি, এর সাথে করা হবে।

আব্দুল মুতালিব জিজ্ঞেস করলেন, সে কি পরিমাণ বয়স প্রাপ্ত হবে ? রাহেব বলল, তার বয়স সত্তর বছরের কোঠায় পৌঁছবে না ; বরং এর নীচে কোন বেজোড় সংখ্যায় পৌছবে। সম্ভবতঃ একষট্টি বা তেষট্টি বছর হতে পারে। তার উম্মতের বয়সও সাধারণতঃ এরূপ হবে।

আবু নাঈম হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, বর্বর যুগে রাতের বেলায় কোন শিশু ভূমিষ্ঠ হলে তাকে একটি হাড়ির নীচে রেখে দেয়া হত এবং ভাের পর্যন্ত কেউ তাকে দেখত না। নবী করীম (সাঃ) -এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাকেও ঐরূপ হাড়ির নীচে রেখে দেয়া হল। ভাের বেলা দেখা গেল যে হাড়িটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছে এবং শিশু দু'চক্ষু মেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এ দৃশ্য দেখে সকলেই অবাক হয়ে গেল। এর পর তাকে দুধপান করার জন্য বনু বকরের এক মহিলার নিকট সমর্পণ করা হল। সে তাকে দুধপান করাতে শুরু করলে তার পরিবারে নানাবিধ বরকত এবং কল্যাণ আসতে লাগল। তার কয়েকটি বকরী ছিল। আল্লাহ প্রদত্ত বরকতে তার বকরীর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেল।

আবু নাঈম, দাউদ ইবনে আবী হিন্দ থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সাঃ) জন্মগ্রহণ করলে তার নবুয়তের নূরের আলোকে টিলাসমূহ উজ্জ্বল হল। জন্মগ্রহণ করেই তিনি মাটির উপর হাত রেখে ভর দিলেন এবং চক্ষুদ্বয় মেলে আকাশের দিকে তাকালেন। তাকে যে হাড়ির নীচে রাখা হল, তা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল।

ইবনে সা'দ হযরত ইকরিমাহ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সাঃ) জন্মগ্রহণ করলে তাঁর মাতা তার উপর হাড়ি রেখে দিলেন, যা ভেঙ্গে দু ' টুকরা হয়ে গেল। তাঁর মাতা বলেন যে, হাড়ি রাখার পর যখন আমি তাকে দেখতে গেলাম, তখন দেখলাম যে, সে চক্ষু মেলে উর্ধ্বে আসমানের দিকে তাকিয়ে আছে।

ইবনে আবী হাতেম হযরত ইকরিমাহ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সাঃ) -এর জন্মের সময় সমগ্র জগত নূরের আলোকে উজ্জ্বল হয়ে গেল। ইবলীস বলল যে, আজ পৃথিবীতে এমন এক শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েছে, যে আমাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বরবাদ করে দিবে। তখন তার এক সহচর তাকে বলল যে, তুমি এখনই গিয়া তার জ্ঞান - বুদ্ধি নষ্ট করে দিবার চেষ্টা কর। সুতরাং ইবলীস নবী করীম (সাঃ) -এর নিকট রওয়ানা করল। যখন সে তার নিকট পৌঁছল, ফিরেশতা জিব্রাইল (আঃ) ইবলীসকে সজোরে পদাঘাত করলেন, যাতে সে আদনে গিয়ে পতিত হল।

জোবায়ের ইবনে বাক্কার এবং ইবনে আসাকির মা'রুফ ইবনে খরবুস থেকে বর্ণনা করেছেন, ইবলীস সপ্ত আকাশ ঘুরে বেড়াত ; কিন্তু যখন হযরত ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করলেন, তখন তার তিন আকাশের প্রবেশাধিকার রহিত করা হল। তারপর যখন নবী করীম (সাঃ) জন্মগ্রহণ করলেন, তখন তার জন্য সাত আসমানের প্রত্যেকটির দরজাই বদ্ধ করে দেয়া হল। নবী করীম (সাঃ) সােমবার দিন অতি ভােরে জন্মগ্রহণ করলেন।

বায়হাকী, আবু নাঈম, খারায়েতী এবং ইবনে আসাকির আবু ইয়ালা ইবনে ইমরান বাজালী থেকে, তিনি মাখযুম ইবনে ছানী থেকে এবং তিনি স্বীয় পিতা হতে (যার বয়স হয়েছিল দেড়শত বছর) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সাঃ) -এর জন্মের রাতে পারস্য রাজ প্রাসাদে কম্পন শুরু হল। যার ফলে ওর চৌদ্দটি গম্বুজ সব কয়টিই ভূমিসাৎ হল। হাজার হাজার বছর ব্যাপী যে অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে রাখা হয়েছিল, হঠাৎ তা নির্বাপিত হয়ে গেল। তথাকার শ্বেত বর্ণের হ্রদ শুকিয়ে গেল। তখন আতংকিত পারস্য রাজ মনে মনে ভাবলেন যে, এই ঘটনা ছুপিয়ে রাখা ঠিক হবে না; বরং একথা নিয়ে উজীরদের সাথে পরামর্শ করা প্রয়োজন ; সুতরাং তিনি তার পারিষদবর্গকে দরবারে ডেকে এ ব্যাপার সম্পর্কে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে বসলেন। ঠিক এই মুহূর্তে সংবাদ এল যে, অগ্নিকুণ্ড নির্বাপিত হয়ে গিয়েছে। এতে রাজা অত্যধিক সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। তখন দরবারের প্রধান পুরােহিত বলল, ঈশ্বর আমাদের সম্রাটকে নিরাপদ রাখুন। আমিও আজ রাতে এরূপ স্বপ্ন দেখেছি যে, কতকগুলো উট আরবী ঘোড়া গুলোকে টেনে আনছে এবং দজলানদ অতিক্রম করে সারাদেশে ঐগুলো ছড়িয়ে পড়েছে। তখন রাজা পুরােহিতকে জিজ্ঞেস করলেন, বল, এখন আমাদের কি করা উচিত এবং এসব ঘটনা কিসের আলামত ? সে বলল, মনে হচ্ছে আরবের দিক হতে কোন বিরাট ঘটনা ঘটবে।

অতঃপর পরস্যরাজ নো'মান ইবনে মুনযিরকে লিখে জানালেন যে, তুমি কোন বিজ্ঞ ব্যক্তিকে আমার নিকট প্রেরণ কর। আমি তাকে কিছু প্রশ্ন করব। নো'মান আব্দুল মসীহ ইবনে আমর ইবনে হাসসান গাসসানীকে দরবারে পাঠিয়ে দিল। রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি বলতে পার, আমি তোমাকে কি জিজ্ঞেস করতে চাই ? সে বলল, জাহাপনা! আপনি জিজ্ঞেস করুন। যদি আমার সঠিক জবাব জানা থাকে আমি তা বলব। আর জানা না থাকলে যে জানে আপনাকে তার ঠিকানা বলে দিব। তখন পারস্যরাজ তার নিকট সব ঘটনা খুলে বললেন। আবুল মসীহ তা শুনে বলল, হে জাঁহাপনা! আমার মামা সাতীহ এই সম্পর্কে বিশেষ ওয়াকিফহাল। তিনি সিরিয়া সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছেন। রাজা বললেন, তুমি তাকে আমার নিকট নিয়ে আস। আমি তার কাছেই জিজ্ঞেস করব। তখন আব্দুল মসীহ রওয়ানা হয়ে সাতীহের নিকট পৌঁছল। সে তখন প্রায় মুমূর্মু অবস্থায় পৌঁছেছিল। তার নিকট পৌঁছে আব্দুল মসীহ সালাম করলে সে মাথা তুলে বলল, আব্দুল মসীহ দ্রুতগামী বাহনে চড়ে সেই সাতীহর নিকট উপনীত হয়েছে, যার মৃত্যু সমাগত। তোমাকে পারস্যের রাজা প্রেরণ করেছে। কেননা তার রাজপ্রাসাদ কেঁপে উঠেছে। পারস্যের অগ্নিকুণ্ড হঠাৎ নিভে গিয়েছে। প্রধান পুরােহিত স্বপ্ন দেখেছে যে, কতিপয় উট আরবী ঘোড়াগুলোকে টেনে নিচ্ছে এবং দজলা পাড় হয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। হে আব্দুল মসীহ। যখন তিলাওয়াত অধিক হতে থাকে লাঠিবাহক আত্মপ্রকাশ করে, সামাদাহ উপত্যকায় পানি উথলে উঠে।

শ্বেত হ্রদ শুকিয়ে যায় এবং পারস্যের অগ্নিকুণ্ড ঠাণ্ডা হয়ে যায় তখন সাতীহের জন্য সিরিয়া নয় জেনে রাখ, পারস্যের রাজপ্রাসাদের গম্বুজের সমসংখ্যক রাজা হবে এবং যা হবার তা অবশ্যই হবে।

একথা বলার সাথে সাথে সতীহ মৃত্যুবরণ করল আব্দুল মসীহ, পারস্যে প্রত্যাবর্তন করে রাজার নিকট সমস্ত ঘটনা ব্যক্ত করল। শুনে রাজা বললেন, যতদিনে আমাদের চৌদ্দজন রাজা হবে ততদিনে কত কি ঘটবে তা কে বলতে পারে ? কিন্তু চৌদ্দজনের মধ্যে দশজন রাজা মাত্র চার বছরের মধ্যেই অতিক্রান্ত হয়ে গেল। অবশিষ্ট চারজন হযরত ওছমান (রাঃ)-এর খেলাফত পর্যন্ত বহাল থাকে। ইবনে আসাকির বলেন, এই হাদীছটি গরিব হাদীছের শ্রেণীভুক্ত। একথা শুধু মাখযুম তার পিতার নিকট হতে রেওয়ায়েত করেছেন। ইবনে আসাকির তার ইতিহাস গ্রন্থে সাতীহের আলোচনায় একথাই উল্লেখ করেছেন। আব্দুল মসীহের আলোচনায় উল্লিখিত সনদে রেওয়ায়েত উল্লেখ করার পর তিনি বলেছেন, একথা মারুফ ইবনে খরবুজ, বিশর ইবনে তাইম মক্কী হতেও বর্ণনা করেছেন। আমি বলি, এই সনদে আবজান ও কিতাবুছ ছাহাবায় বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাজার আল ইছাহাবা গ্রন্থে একথাকে মুরসাল বলে উল্লেখ করেছেন।

খারায়েতী এবং ইবনে আসাকির ওরওয়াহ থেকে বর্ণনা করেছেন, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল, যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল, ওবায়দুল্লাহ ইবনে জাহশ, ওছমান ইবনে হুয়াইরিছু প্রমুখ কুরাইশ নেতা এক রাতে তাদের এক প্রতিমার নিকট উপস্থিত হয়ে দেখল যে, প্রতিটি উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। তারা তা দেখে প্রতিমাটিকে দাঁড় করিয়ে দিল ; কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই এটা আবার পড়ে গেল। তখন ওছমান ইবনে হুয়াইরিছ বলল যে, লক্ষণে মনে হচ্ছে যে, নিশ্চয়ই কোনকিছু ঘটেছে। এই ঘটনা ঘটেছিল নবী করীম (সাঃ) -এর জন্মের রাতে। ঐ সময় ওছমান এই পংক্তিটি আবৃত্তি করেছিল ; “ হে মূর্তি ! তোমার নিকট দূর - দূরান্ত হতে আগত আরব নেতারা এসে উপস্থিত হয়েছে। আর তুমি কিনা উপুড় হয়ে ভূতলে পড়ে আছ। ব্যাপার কি বল ! তুমি কি আমাদের সাথে কৌতুক করছ ? আমাদের দ্বারা কোন অন্যায় আচরণ হয়ে থাকলে আমরা তা স্বীকার করি, তুমি এভাবে মাথা নীচু করে থেকো না। যদি থাক, তবে নিশ্চয়ই তুমি প্রতিমাদের সরদার নও। ” একথা বলে তারা প্রতিমাটিকে পুনরায় দাঁড় করিয়ে দিল। তখন ওটার মধ্য হতে অদৃশ্য আওয়াজ এল, জেনে রাখ, এই প্রতিমা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে সেই শিশুটির কারণে, যার নূরের আলোকে সমগ্র জগত সমুজ্জ্বল হয়েছে যার আগমনে শুধু এই প্রতিমাই নয় ; বরং সব প্রতিমাই ভূমিসাৎ হয়েছে। রাজা - বাদশাহদের অন্তর তার ভয়ে কেঁপে উঠেছে পারস্যের দীর্ঘস্থায়ী অগ্নিকুণ্ড নির্বাপিত হয়েছে। যার ফলে পারস্য রাজ সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। অধ্যাত্মবাদিদের নিকট হতে তাদের জ্বিন সহচরেরা পালিয়ে গিয়েছে। এখন আর কেউ তাদেরকে সত্য - মিথ্যা কোন খবরই জানাবে না। হে বনু কুসাই ! তোমরা গােমরাহী বর্জন কর এবং প্রকৃত সত্যের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ কর।

খারায়েতী হিশাম ইবনে ওর ওয়াহ থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি তার দাদী আসমা বিনতে আবুবকর (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল এবং ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল বলেন, আমরা মক্কা থেকে ইয়ামানের বাদশাহ আবরাহার প্রত্যাবর্তনের পর আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর নিকট গমন করলাম। তিনি বললেন, হে কুরাইশগণ ! সত্য বল, তোমাদের মধ্যে কি এমন কোন শিশু জন্মগ্রহণ করেছে যার পিতা তাকে কুরবানী করার মানত করেছিল ? তারপর কোরার মাধ্যমে উট কুরবানী করে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। আমরা বললাম, হ্যাঁ এরূপ শিশু জন্মগ্রহণ করেছিল। নাজ্জাশী জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা জান কি সে পরে কি করেছে ? আমরা বললাম, এর পর সে আমিনা না¤œী এক মহিলাকে বিবাহ করেছে এবং তাকে গর্ভবতী অবস্থায় রেখে মৃত্যুবরণ করেছে। বাদশাহ আবার জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা জান কি, সেই মহিলার গর্ভের শিশু জন্মগ্রহণ করেছে কি - না ?

বাদশাহর এ প্রশ্নের জবাবে ওয়ারাকা বললেন, এক রাতে আমি আমাদের এক প্রতিমার কাছে উপস্থিত ছিলাম। উক্ত প্রতিমার মধ্য হতে আমি এরূপ আওয়াজ শুনেছি যে, নবী জন্মগ্রহণ করেছেন। রাজা - বাদশাহরা লাঞ্ছিত এবং অপদস্থ হয়েছে। গোমরাহীর অবসান ঘটেছে এবং শিরক ও কুফরী বিলুপ্ত হয়েছে। এর পরই ঐ প্রতিমাটি উপুড় হয়ে পড়ে গেল।

যায়েদ বলল, হে বাদশাহ ! আমার নিকটও এই ধরনের সংবাদ রয়েছে। আমি সেই পবিত্র রাতে স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি আবু কুবাইশ পাহাড়ে পৌঁছে গিয়েছি। ঐ সময় এক ব্যক্তি আসমান হতে অবতরণ করল। তার সবুজ বর্ণের দু'টি পাখা ছিল। সে কিছু সময় আবু কুবাইশ পাহাড়ে অবস্থান করে মক্কায় এসে বলল, শয়তান অপদস্থ হয়েছে। মূর্তিপূজা শেষ হয়ে গিয়েছে। আমীন জন্মগ্রহণ করেছেন। একথা বলে সে একটি কাপড়ের ভাঁজ খুলে তা পূর্ব ও পশ্চিমে ছড়িয়ে দিল। আমি দেখলাম যে, কাপড়টি সমগ্র আসমানের নীচে একটি তাবুর আকৃতি ধারণ করল। এর পর একটি নূরের উদয় হল। যার তীক্ষ্ণ কিরণে আমার দু ’ চক্ষু ঝলসে গেল। এসব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে আমি ভীত - সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লাম। এর পর আর একটি নূরের উদয় ঘটলে মক্কার ভূখণ্ড উদ্ভাসিত হয়ে গেল। তখন বলা হল যে, বিশ্ব জগত পবিত্র হয়ে গিয়েছে। অতঃপর খানায়ে কা'বায় স্থাপিত প্রতিমাগুলো ভূমিসাৎ হয়ে গেল।

বাদশাহ নাজ্জাশী বললেন, এবার তোমরা আমার কথা শোেন। আমি সেই রাতেই আমার শয্যায় নিদ্রাভিভূত ছিলাম। তখন স্বপ্নে দেখলাম যে, সহসা মৃত্তিকা ভেদ করে একটি ঘাড়সহ মাথা বের হয়ে এল এবং সে বলল, হস্তীবাহিনী ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আবাবীল পাখী তাদেরকে কংকর ছুড়ে বিধ্বস্ত করে ফেলেছে। পাপী অপরাধীদের আস্তানা বিরাণ হয়েছে। মক্কী নবী ভূমিষ্ঠ হয়েছেন। এখন হতে যে তাঁর অনুসরণ করবে, সে কামিয়াবী হাছিল করবে। আর যে তার অবাধ্যতা প্রদর্শন করবে, এই পর্যন্ত বলে সেই মস্তকটি অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি তখন চীৎকার করতে চাইলাম ; কিন্তু আমার মুখ থেকে আওয়াজ বের হল না। আমি তথা হতে পালাতে চাইলাম ; কিন্তু দাঁড়াতেই পারলাম না। এর পর আমার গৃহের লোকজন আমার নিকট উপস্থিত হল। আমি বললাম, হাবশী লোকদেরকে আমার নিকট হতে সরিয়ে দাও। তারা আমার আদেশ পালন করল।

(উস্ওয়ায়ে রাসূল (স:) ও খাছায়েছুল কুবরা)

লেখক : মুফতী মুহা.আবু বকর বিন ফারুক, ইমাম ও খতিব, বিষ্ণুপুর মনোহরখাদী মদিনা বাজার বাইতুল আমিন জামে মসজিদ, চাঁদপুর সদর,চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়