চাঁদপুর, মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ১৭ মাঘ ১৪২৯, ৮ রজব ১৪৪৪  |   ২৯ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   আগামী নির্বাচনে অনেক চমক অপেক্ষা করছে
  •   ১৭ দিন পর করোনায় একজনের মৃত্যু, শনাক্ত ১০
  •   জাপানি দুই শিশু মায়ের জিম্মায় থাকবে
  •   হাজীগঞ্জের আমির হোসেনের প্রতারণার শিকার হয়ে সৌদি আরবে বহু প্রবাসী যুবক নিঃস্ব
  •   কোস্টগার্ডের অভিযানে ৪৪০ কেজি জাটকা মাছ জব্দ

প্রকাশ : ১০ জুন ২০২২, ০০:০০

ইন্টারনেটের কবলে
অনলাইন ডেস্ক

মাধ্যমিকে পড়া ছাত্র রূপম। ক্লাসের টপার ছাত্র। সবসময়ই সে প্রথম হয়। এবারেও ঠিক তা-ই ঘটার কথা। কিন্তু ঘটলো ব্যতিক্রম। রূপম হিরো থেকে জিরোতে। টেনেটুনে পাস করলো। এবার সে নবম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণিতে উঠলো। পরীক্ষায় ফলাফল খারাপের হতাশায় সে খুবই বিষণœ। রূপমের ফলাফল খারাপের পেছনেও লুকিয়ে আছে ছোট্ট একটি গল্প। অবশ্য তা রূপমের জন্যে কৌতূহলের ছিলো। বয়ঃসন্ধিকাল পার করছে সে। সে যখন একদিন ক্লাসে পাঠ নিয়ে ব্যস্ত তখনই তার কানে কিছু কথা তীরের মতো বিঁধতে লাগলো। তার বন্ধুরা বলাবলি করতে থাকে, আজকে এই স্ট্যাটাস দিয়েছি, কালকে প্রোফাইল আপলোড করবো, অমুককে এড পাঠাইছি, তমুককে এড করেছি আরো কত কী? তারা বেশ মজা করছিলো।

রূপম তখন ইন্টারনেট জগতে একদম অপরিচিত। একদিন তার বন্ধুরা সকলে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে বলছে, ‘কিরে রূপম আর কত গোঁজা থাকবি একটু স্মার্ট হ। সবকিছু এখন ডিজিটাল। নিজেকে একটু আপডেট কর। আরে, সময় এখন করবি কখন?’

রূপমকে এমনভাবে তারা জব্দ করলো যে রূপম সেদিন এ নিয়েই ভাবতে লাগলো। এমনকি ঐদিন সে পড়াতে মন বসাতে পারছিলো না। তাকেও তার বন্ধুদের মতো হতে হবে। একদিন সে তার বাবার কাছে একটি স্মার্টফোন চেয়ে বসলো। যে কোনো মূল্যে হোক মোবাইল চাই। বাবাকে রূপম বুঝালো অনলাইনে ক্লাস হয়। পড়ালেখার সকল কিছু মোবাইলে পাওয়া যায়। বড় ভাইয়া মোবাইল ব্যবহার করে তার তো পড়াশোনার কোনো ক্ষতি হয় না। এরকম আরো অনেক উদাহরণ রূপম দিয়েই চললো। যাক্ বাবা সরলমনা মানুষ তাই ছেলেকে বিশ্বাস করলো। পরের দিন রূপমকে তার বাবা একটা স্মার্টফোন কিনে দিলো। আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে। সুখ-সাগরে ভাসতে লাগলো রূপম। নতুন জিনিসের প্রতি আকর্ষণ একটু বেশি থাকাই স্বাভাবিক। এদিকে রূপমের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা ঘনিয়ে আসছে। পড়ালেখার প্রতি তার মন একদমই নেই। তার এক বন্ধু তাকে ফেসবুক একাউন্ট খুলে দিলো। নাস্তার টাকা জমিয়ে এমবি কিনতে হয়। ফেসবুকিং করতে করতে রাতেও ঠিকমতো ঘুমায় না। যে ঘুম তার অপূর্ণ থাকে তা পরের দিন ক্লাসের বেঞ্চিতে মাথা হেলান দিয়ে মিটিয়ে নেয়। যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহার করে রূপম নিজে উপকৃত হবে সেখানে ইনটারনেট রূপমকে ব্যবহার করছে। আগামীকাল রূপমের পরীক্ষা। রূপম তো এখনো ভার্চুয়াল থেকেই বেরুতে পারছে না। পরীক্ষার প্রস্তুতিই বা নেবে কী। রূপমের এক দুই বিষয় পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তার খাতা যখন কোনো শিক্ষকের হাতে পড়লো তখনই দেখা গেলো রূপমের গত কয়েক মাসের ইন্টারনেট চালানোর ফিডব্যাক। ক্লাসেও অপ্রিয় হতে থাকলো রূপম। হলে কি হবে রূপমের জন্যে আলাদা স্পেস এখন ফেসবুকে। রূপম ফেসবুকে সেলেব্রিটি। সে এখন কয়েকটি গ্রুপের এডমিন। রেজাল্ট খারাপ করায় শিক্ষক এবং বাবা মায়ের বকুনি খেয়ে রূপম ভীষণ হতাশায়। তাকে বুঝানোর মতো কেউ নেই। এতে সে আরো খিটখিটে স্বভাবের হয়ে উঠলো। ফেসবুকে আবেগঘন পোস্ট দিয়ে হালকা হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্ত তা তো অন্য এক জগৎ। অ্যাকটিভ থাকলে বন্ধু আছে নয়তো কেউই নেই। হঠাৎ একদিন একটা অচেনা আইডি থেকে একটা মেয়ে রূপমকে নক দেয়। যেহেতু রূপম বয়ঃসন্ধিকালের মাঝখানে সেহেতু আইডির নাম আর প্রোফাইল দেখেই রূপম টাসকি খেয়ে যায়। আমরা যাকে ক্রাশ বলি আরকি। রূপমের এখন দুই জগৎ। ইন্টারনেটে প্রবেশ করলেই হারিয়ে যায় মজা আর মাস্তিতে। আর বাস্তবে রূপম ভীষণ কষ্ট আর হতাশায় নিপতিত। মন খারাপ করেই একদিন রূপম দোকানের কাছে গেলো। সেখানে দেখতে পেলো তার কিছু বন্ধু দোকানের একদম ভিতর থেকে তাকে ইশারা করছে। দোকানের ভিতরে এক্সট্রা একটা রুম থাকে তা রূপমের জানা ছিলো না। ভিতরে যাওয়ার পর রূপমকে তার বন্ধুরা জিজ্ঞেস করলো, ‘আরে মন খারাপ করে আছিস যে, এই নে ধর টেনশন দূর হবে’। এ বলে রূপমকে ধরিয়ে দিলো সিগারেট। প্রথমে রূপম খেতে পারছিলো না। সিগারেট খাওয়ার পর সে বুঝতে পারলো সে হালকা হচ্ছে। টেনশন দূর হচ্ছে। তাই সে বন্ধুদের আড়াল করেই প্রতিদিন সিগারেট খেতো। রীতিমতো ফেসবুকিং করছে। অচেনা ওই মেয়েটির সাথেও সে সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। ইন্টারনেটে প্রবেশ করলেই পর্দায় ভেসে উঠে অশ্লীল ছবি আর ভিডিও। অতিরিক্ত আসক্তির কারণে রূপমের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো, শরীর দুর্বল হতে থাকলো। কাজের স্পৃহা হারিয়ে ফেললো।

রূপম তো জানে না পর্ণো সাইট ব্লক করে ইউটিউব বা ভিডমেট এগুলোকে নিজের মতো সাজাতে হয়। সপ্তাখানেক সিগারেট টানার পর আর ভালো লাগে না। এবার চাই আরো স্ট্রং কিছু যা সিগারেট এর চেয়েও দ্রুত কাজ করবে। তাই সে ঘুমের বড়ি খেতো এক পর্যায়ে সে ভয়ানক রকম মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। রূপমের বাবা-মা এখন আর ছেলের পড়ালেখা নিয়ে ভাবিত নয়। সমাজে তাদের মাথা হেট। তাতে কী?

তারা এখন ছেলের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত। সুখের এক টুকরো পরিবারে নেমে এলো বিষাদ আর অশান্তির ছায়া। নানা পদক্ষেপ নিয়েও ব্যর্থ তার বাবা মা। কীভাবে ছেলেকে আসক্তি থেকে ফিরিয়ে আনবে? ডাক্তার দেখালে ডাক্তার ঔষধ দেয়। কিন্তু ছেলের আচরণ স্বাভাবিক না। সর্বশেষ রূপমের বাবা পরামর্শের জন্য মসজিদের ইমামের কাছে যায়। ইমাম সাহেব পরামর্শ দেন রূপমকে যত ধর্মের দিকে দিক্ষিত করা যাবে ততই তার মনে পরিবর্তন আসবে। রূপমের বাবা বললো এখন উপায়! ছেলে তো এখন আমার কথা শুনবে না। রূপমের বাবার মনে পড়লো আহ ছেলেকে তো কখনো নামাজের জন্য বলতাম না। এতো খেয়াল নিতাম না। তাহলে মনে হয় এ সমস্যার মধ্যে পড়তে হতো না। ইমাম সাহেব তাকে পরামর্শ দিলো রূপমকে আলাদা একটা পরিবেশে রাখতে হবে। সবসময় কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। ইসলামিক মনের ভালো মানুষের সাথে তাকে রাখতে হবে। তাকে সবসময় নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। তার মনে ধর্মীয় অনুভূতি জাগাতে হবে। এসব কথা শুনে রূপমের বাবা বললো এরকম পরিবেশ তে ঘরে বা বাড়িতে করা সম্ভব না। বরং ভাই আপনি রূপমকে আপনার কাছে রেখে দিন। যতকিছু প্রয়োজন হবে আমি দিবো। ইমাম সাহেবের কথায় রূপমের বাবা সিদ্ধান্ত নিলো তাকে তিন মাসের জন্য তাবলীগী ভাইদের সাথে পাঠাবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রূপমকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

এতে সুবিধা হলো রূপম তার কোনো খারাপ বন্ধুদের সাথে মিশতে পারবে না। যেহেতু তাবলীগ এর ভাইয়ারা মসজিদে ঘুমায়। তাই রূপম ক্ষতিকর কোনো আসক্তির দিকে যাওয়ার সুযোগ পাবে না। কখনো ইসলামি আলোচনা যেমন হাদিস এবং ইসলামী গল্প পড়াও হবে। কখনো দ্বীনের দাওয়াত। এমনকি রান্নাও নিজেরা করতে হয়। সেখানে সবসময়ই ভালো কথার আলোচনা হয়। মসজিদে গেলে তো এমনেই মন শীতল হয়। দুনিয়ার জান্নাত হলো মসজিদ। অনেকজন একসাথে থাকে বিধায় একাকী কোনো অনৈতিক কাজের ইচ্ছা হলেও করতে পারবে না।

সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা পরিবেশে রূপম তেমন কোনো সুযোগও পাবে না। তিন মাসের একটা দ্বীনি কোর্সে রূপম নামাজ শিক্ষা, কুরআন শিক্ষা, দোয়া-কালাম সবই শিখবে। এদিকে রূপমের এসএসসি পরীক্ষা শেষ। ঐদিকে রূপমের খেয়াল নেই। প্রথম প্রথম রূপমের ভীষণ খারাপ লাগতো। সম্পূর্ন নতুন পরিবেশ কিছুই ছিলো না রূপম। কয়েকদিন যাওয়ার পর আস্তে আস্তে যেন সব স্বাভাবিক হতে থাকলো। রূপমের ঘোর কাটতে শুরু করলো। ভারী আকাশের কালো মেঘ ফাঁকি দিয়ে যেন এক ফালি রৌদ্র উঁকি দিলো। রূপমের মন ঠিক সেরকমই হলো।

আসক্তি কাটিয়ে রূপম পুরো বাস্তবজীবনে ফিরে এলো। এক বছর লস দিয়ে রূপম পরের বছর এসএসসি দিলো। হিরো থেকে জিরো আবার হিরো রূপম গোল্ডেন এ প্লাস পেলো। পত্রিকায় তার নাম ছাপা হলো ‘রূপমের ঘুরে দাঁড়ানো’ ইনডেক্স দিয়ে। তার গল্প ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার হতে লাগলো। এখন কি রূপম ইন্টারনেট ব্যবহার করে না? করে, তবে তার প্রয়োজনে। সে এখন আর অনলাইনে ঘা ভাসিয়ে দেয় না। ইন্টারনেট তো আলেমসমাজের লোকেরাও ব্যবহার করে তারা পথভ্রষ্ট হয় না কেনো?

যাই হোক রূপম ফেসবুকে আগের চেয়েও অধিক জনপ্রিয়। তার জনপ্রিয়তা দেওয়ালের চুনকাম নয় যে, কদিন ফুরিয়ে গেলে খসে পড়বে। রূপমের ইন্টারনেট আসক্তি, পর্ণো আসক্তি, অবৈধ সম্পর্ক সবকিছুর পেছনেই পরিবার ও সমাজ দায়ী। কারণ এ বয়সে রূপম তার মতো করেই চলতে চেষ্টা করবে। তার পরিবার এবং সমাজের লোকেরা যদি একটু সতর্ক হতো, তাকে যদি ইন্টারনেট এর সুফল কুফল সম্পর্কে বুঝাতো, সঙ্গ দেয়ার জন্যে ভালো বন্ধু পেতো। সবসময় তার খেয়াল রাখতো যে সে কি করে, তার সম্পর্কে জ্ঞান রাখতো তাহলে এমনটি ঘটতো না। কারণ নরম মাটিকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই আকৃতি দেয়া যায়। কিন্তু তা যদি শক্ত হয়ে যায় বা শুকিয়ে যায় তা সম্ভব হয় না। এরকম হাজারো রূপম বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যে কোনো আসক্তি থেকে এরকম আরো অনেক রূপমকে বাঁচাতে হলে তাদের মনে ধর্মীয় অনুভূতির জাগ্রত করতে হবে। কড়া নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। তাহলে যে কোনো আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করবো ভালো কথা কিন্তু প্রযুক্তি যেনো আমাদের ব্যবহার না করে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়