চাঁদপুর, রবিবার, ৩ জুলাই ২০২২, ১৯ আষাঢ় ১৪২৯, ৩ জিলহজ ১৪৪৩  |   ৩৩ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগাদীতে দেয়াল ধ্বসে নিহত ১
  •   উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া শিক্ষা খাতে বৈশ্বিক পরিবর্তন সম্ভব নয় : শিক্ষামন্ত্রী
  •   মতলবে ৭০ দিন পর কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন
  •   মতলবে শিক্ষক লাঞ্ছিত, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
  •   লঞ্চে জমজমাট জুয়া ॥ সর্বস্বান্ত যাত্রীরা

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২২, ০০:০০

লিটন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর
অনলাইন ডেস্ক

আমাদের বাসা শহরের ব্যস্ত সড়কের ধার ঘেঁষে। বাসায় ঢুকতেই অলকানন্দা ফুলের হলুদ হাসি আর মধুমঞ্জরি লতার লুটোপুটি নতুন যে কাউকেই মুগ্ধ করে তোলে। ব্যস্ত রাস্তার ধার ঘেঁষে হলেও যানবাহনের বিকট ভেঁপুর আওয়াজ আমাদের কানে তেমন আসে না। তবে এই সড়কের দুইপাশে বেশ কয়েকটি প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে। যখন-তখন এই রাস্তায় তাই অ্যাম্বুলেন্সের কড়া হর্ণ শোনা যায়। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণেই মনে হয় কারও জীবনদীপ এই বুঝি এলো নিভে।

আমাদের বাসার গেইটের বিপরীতে রাস্তার ঠিক ওপাশে আছে একটা বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। দোকানটাতে কত কী যে পাওয়া যায়! দোকানের নাম লিটন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। দোকানের মালিক লিটন আঙ্কেল। তিনি আগে কুয়েতে ছিলেন। অনেকদিন সেখানে থেকে পয়সা জমিয়ে তারপর দেশে এসে এই দোকান দিয়েছেন। বাবা বা মায়ের সাথে তার দোকানে গেলেই তিনি চকলেট দেন খেতে। মাঝে মাঝে কোক এবং ফান্টা খেতে দেন। তার দোকানের যে অংশে খেলনা সে অংশটাই আমার খুব পছন্দের। এ অংশে ব্যাটবল, র‌্যাকেট যেমন আছে তেমনি ব্যাটারির কিছু খেলনাও আছে। খেলনাগুলো যে কথা বলতে পারে তা আমি জানতাম না। কথা বলতে পারা একটা বেড়াল আছে টম। তার মুখে কিছু বাঘের মাসির আদলে গোঁফ আছে। দু পায়ে ভর দিয়ে খেলনা বেড়ালটি দাঁড়ানো। দেখে মনে হয় এই বুঝি রাজ্য জয় করে আসলো। খেলনাটি নিজে নিজে কথা বলে না। কেউ কথা বললে কিছুক্ষণ পর সে তার কথাকে রিপিট করে। সুইচ বন্ধ না করলে কিংবা নতুন কোনো কথা না বললে বেড়ালটি একটানা আগের কথা বলতেই থাকে। প্রথমে নরম স্বরে বলে, এরপর একটু রাগের স্বরে বলতে থাকে। শুনলে মনে হয় সত্যি সত্যি বেড়ালটি মানুষের মতো কথা বলছে। একই রকমের আরও কয়েকটি খেলনা আছে দোকানে। যেমন কথা বলা টিয়ে, কথা বলা হাতি ইত্যাদি। কথা বলা হাতিটা ভয়ঙ্কর। গর্জাতে গর্জাতে চলে এবং কান দুটো দিয়ে রাগলে আগুন বের হয়। আমি যতোবারই লিটন আঙ্কেলের দোকানে যাই ততোবারই ঐ খেলনাগুলোর দিকে লোলুপ দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকি।

একদিন আমার স্কুলের এক বন্ধুর জন্মদিনের উপহার হিসেবে এ রকম একটা কথা বলা পাখি বাবা লিটন আঙ্কেলের দোকান থেকে কিনে আনলেন। দোকানের কর্মচারী রাজু আঙ্কেল তাতে ব্যাটারি ঢুকিয়ে চেক করে দিলেন। তিনি ঢুকানোর সময় দুষ্টুমি করে বললেন, চোর আসছে চোর আসছে। অমনি পাখিটিও বলতে শুরু করলো, চোর আসছে চোর আসছে। তার কথা শুনে দোকানের সবাই হেসে উঠলো। বাবা খুব সুন্দর করে পাখিটাকে র‌্যাপিং করে আলাদা ব্যাটারি দিয়ে জন্মদিনে উপহার দিলেন। র‌্যাপিংয়ের ওপর আমার নাম লিখে দিলেন উপহার দাতা হিসেবে। জন্মদিনের দাওয়াতে গিয়ে আমি নিজের হাতে আমার বন্ধুকে উপহারটি তুলে দিলাম। রাতের বেলা যখন সবাই যে যার ঘরে চলে গেলো তখন আমার বন্ধুটা সব উপহার খুলে খুলে চেক করলো। কিছু কিছু উপহার ছিলো ফ্যামিলির ব্যবহারের জন্যে। যেমন : বিছানার চাদর, পানি খাওয়ার গ্লাসের সেট, শো-পিস ইত্যাদি। কিছু কিছু উপহার ছিলো ছবির বই। আর কিছু উপহার ছিলো খেলনা। কেউ কেউ আবার প্রাইজবন্ডও দিয়েছেন। আমার বন্ধু সায়মন খেলনাগুলো নিজের কাছে রেখে বাকিগুলো আন্টির কাছে দিয়ে দিলো। প্রত্যেকটা খেলনা সে যাচাই করে দেখলো। এর মধ্যে আমার দেওয়া খেলনাটি তার খুব পছন্দ হলো।

আমার বন্ধুর জন্মদিন ছিলো আষাঢ় মাসে। সেদিনও রাতে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। ফলে রাতভর একটা হিমেল আবহাওয়া বিরাজ করছিল। সন্ধ্যা হতে একটানা ক্লান্তির কারণে বাড়ির সবাই নিবিড় ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। যেন তাদের কেউ ঘুমের যাদু করেছে। শেষ রাতের দিকে তাদের বাড়ির কলাপসিবল গেট খুলে একজন আবছা ছায়ামূর্তিকে দেখা গেল দ্বিতীয় তলার দিকে উঠতে। লোকটি কী এক অদ্ভুত কৌশলে সায়মনদের বাসার গেট খুলে ভিতরে ঢুকে গেল। তারপর আস্তে আস্তে নিঃশব্দে সায়মনের ঘরের দিকে চলে এলো। সায়মনের ঘরে সায়মন একা থাকে। তার ঘরে একটা পড়ার টেবিল আছে, একটা আলনা আছে, একটা ছোট আলমারী আছে। পড়ার টেবিলের ওপর গত রাতের উপহারগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সায়মনের ঘরে একটা হাল্কা ডিমলাইট জ্বলছিল। আবছা ছায়ামূর্তিটি সায়মনের পড়ার টেবিলের দিকে নজর দিলো। তার চোখের পাওয়ার মনে হয় অনেক বেশি। সে আধো আলো, আধো আঁধারে ভালো দেখতে পায়। টেবিলে রাখা যন্ত্রের পাখিটা তার চোখে পড়লো। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হলো সে এই কথাবলা পাখিটার জন্যেই এসেছে।

আবছা ছায়ামূর্তিটি তৎক্ষণাৎ পাখিটার গায়ে হাত না দিয়ে হুট করে রান্না ঘরে চলে গেলো। তারপর গতরাতের বেঁচে যাওয়া খাবার ফ্রিজ থেকে বের করে সে গপাগপ সাবাড় করে ফেললো। পেটভরার পর তার ঢেঁকুর উঠলো। কোনোমতে ঢেঁকুর সামলে তারপর আবার সে ঢুকলো সায়মনের রুমে। জীবনে এতো খেলনা সে দেখেনি। যতো খেলনা সায়মনের টেবিলে আছে! খেলনাগুলো নাড়তে নাড়তে তার হাত লেগে গেলো কথা বলা পাখিটার গায়ে। সুইচে চাপ লাগতেই পাখিটা চালু হয়ে যায়। এতে ছায়ামূর্তিটা হতভম্ব হয়ে গেলো। আওয়াজ শুনে সবাই জেগে গেলো। সবাই সায়মনের রুমে এসে লাইট জ্বালিয়ে দেখে, সত্যিকারের এক চোর এসেছে তাদের ঘরে। চোরটার মুখ বাঁধা একটা কাপড়ে। তবে চোরটাকে দেখে তাদের চেনা চেনা মনে হলো না। এ চোর মানুষের মত নয়, যেন অন্যরকম। ধরা পড়ার পর তার মুখে কোনো কথা নেই। সে আদতে কথা বলতেই পারে না। শুধু দুর্বোধ্য ভাষায় কুঁইকুঁই করে। সায়মনের বড়ভাই পড়ে ক্লাস এইটে। সে আবার কার্টুনের ভক্ত। টিভিতে শুধু কার্টুন ছবিই সে দেখে। সে চিনতে পেরেছে এই ছায়ামূর্তিকে। সে চিৎকার করে বলে উঠল, আরে! এ যে দেখি এলিয়েন! তার কথা শুনে সবাই যে যার মুখ দেখতে শুরু করে দিলো।

এলিয়েনটা তাদের বাড়িতে কেন এলো তা সবার মনে একটা কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। এলিয়েনটা এলোই বা কোত্থেকে তাণ্ডও সবার মনে প্রশ্ন। এলিয়েনের কথা আর কাউকে না জানিয়ে তাকে একটা শেকল দিয়ে বাঁধা হলো। তারপর তাকে সায়মনের রুমে আটকে রেখে দরজায় তালা দিয়ে সবাই আবার ঘুমাতে গেল। সায়মন তার বড় ভাইয়ের সাথে ঘুমিয়ে পড়লো বাকি রাত। সকাল হতে না হতেই তারা দুইভাই সায়মনের রুমের দরজা খুলে দেখে, এলিয়েনটাও নেই, কথাবলা যন্ত্রের পাখিটাও নেই। সবাইকেই ডেকে আনা হলো ঐ রুমে। কেউ বলতে পারলো না ঘটনা কী ঘটেছে। ঘরের বুয়া বললো সায়মনের মাকে, আফা, ঘরের সোনাদানাগুলান ঠিক আছে কি না দেখেন। সায়মনের মা-আন্টি সবগুলো যাচাই করে বললেন, ঠিক আছে। কোনকিছুই খোয়া যায়নি। সবই যথাস্থানে আছে। কেবল সেই এলিয়েন আর কথাবলা পাখিটা নেই। শেকলটা পড়ে আছে সায়মনের ঘরে। দরজার ভেতরের দিকে যে তালা আটকানো ছিলো তাণ্ডও অক্ষত আছে। কেবল যাদুর মতো এলিয়েন আর পাখিটা উধাও। সবার মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়ে সকালটা ধীরে ধীরে দুপুর হয়ে এলো। আমি স্কুলে গিয়ে সায়মনের কাছ থেকে এ ঘটনাটা জানলাম। তারপর বাসায় এসে মাকে আর বাবাকে বললাম। বাবাতো হেসেই উড়িয়ে দেয়। দূর বোকা! এলিয়েন বলে কি কিছু আছে নাকি? সব হলো কার্টুন ছবিঅলাদের বানানো। কল্পিত। এগুলো বাস্তবে নেই। আমি আর মা বাবার মতিগতি দেখে আর কথা বাড়ালাম না। কিন্তু মনে একটা খচখচ থেকেই গেলো।

মনে করেছিলাম ঘটনাটা এখানেই শেষ। কিন্তু শেষ তো হওয়ার নয়! বিকেলে লিটন আঙ্কেলের দোকান থেকে রাজু আঙ্কেল আমাদের বাসায় এলো। এসেই বাবাকে বললো, স্যার, গতদিনের নেওয়া খেলনা পাখিটা যে ফেরৎ পাঠালেন, তার দামটা দিতে এলাম। আমরা তো কথা শুনে থ হয়ে গেলাম। বাবা বললো, আমরা তো খেলনা পাখিটা ফেরৎ পাঠাইনি! রাজু আঙ্কেল বললো, কিন্তু একটা লোক আপনার কথা বলেই আজ সকালে পাখিটা দোকানে ফেরৎ দিয়ে এসেছে। তখন দোকানে মালিক ছিলো না তাই তাকে টাকা ফেরৎ দিতে পারিনি। সে বলেছিলো, স্যারকে ফেরৎ দিলেই হবে। মা, আমি, ভাই এবং বাবা- সবাই মিলে রাজু আঙ্কেলের মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। মনেই, রাজু, পাখিটা কি এখন আপনাদের দোকানে আছে? জ্বী আছে। বিশ্বাস না হয় তো চলেন আমার সাথে দোকানে। আমরা দলবেঁধে সবাই লিটন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে গেলাম। ব্যাটারি ঢুকিয়ে তারপর পাখিটা চালু করা হলো। চালু করা মাত্রই পাখিটা বলতে শুরু করলো, চোর আসছে, চোর আসছে। পাখির কথা শুনে আমরা বুঝলাম, এটাই সেই পাখিটা। বাবা সায়মনের বাবাকে ফোন দিলেন। ফোন পেয়ে তারাও সদলবলে লিটন আঙ্কেলের দোকানে এসে দেখলেন, সেই পাখিটাই র‌্যাকে শোভা পাচ্ছে। এরকম একটাই পাখি ছিলো গতকাল লিটন আঙ্কেলের দোকানে। কিন্তু পাখিটা কে ফেরৎ আনলো তার কোন সুরাহা হলো না। বাবা লিটন আঙ্কেলকে বললেন, লিটন, তোমার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখ। লিটন আঙ্কেল সকালে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খুলে দেখেন, ঐ সময়ে কেবল আলো ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। কোন ভিডিও ফুটেজ ঐ পাঁচ মিনিটে রেকর্ড হয়নি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়