চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  |   ৩৩ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জের শিশু আরাফ হত্যায় তিন আসামীর মৃত্যুদণ্ড
  •   কল্যাণপুর ইউপির জেলে চাল আত্মসাৎ, দুই গুদাম সিলগালা
  •   মা আর স্ত্রীকে বুঝিয়ে দেয়া হলো দুই ভাইয়ের লাশ
  •   বাকিলা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভিম ধ্বসে ৩ ছাত্রী গুরুতর আহত
  •   আশিকাটিতে খাটের নিচে গৃহবধূর লাশ ॥ স্বামী পলাতক

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০

সেই পায়রারা আর ওড়ে না
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

একদল পায়রার সভা হচ্ছে। তাদের যিনি দলনেতা তার নাম হেড পিজিয়ন। তিনি অন্যদের চেয়ে বেশ বিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান। পায়রার দলটাতে মোট বারটা পায়রা আছে। চারটা সাদা, চারটা জালালি কবুতর আর চারটা সাদা-কালো ছোপ ছোপ। মাঝে মাঝে তারা বাক্ বাকুম বাক্ বাকুম করে নিজেদের মতামত দিচ্ছে। তাদের আজকের সভার বিষয় এক মানব শিশুর স্মরণসভা পালন করা। মানবশিশুটা তাদের দেখভাল করতো। তাদের লালন-পালন করতো সেই শিশু মনিব। শিশু মনিবের বাড়িটা ছিলো দোতলা। তাতে বারান্দা ছিলো প্রশস্ত। সেই বারান্দাতেই শিশু মনিব পায়রাদের জন্যে ঘরবেঁধে দিয়েছে খোপ খোপ করে। পায়রাগুলো সেই খোপের ভেতর সেনাদলের ব্যারাকের মতো থাকতো। খুব ভোরেই তারা উঠে যেত ঘুম হতে। তারা জাগার পরে জেগে উঠতো তাদের মনিব। ভোরে মনিবের হাতে দানা খেতো কুট কুট করে। সে এক স্বর্গীয় দৃশ্য। যেনো এক দেবশিশু পুণ্যবান পায়রাদের আহার করাচ্ছে। শিশু মনিবের হাতে দানা খেতে তারা খুব পছন্দ করতো। তাকে কাছে পেলে বাক্ বাকুম বাক্ বাকুম করে কতো কথা বলতো! শিশু মনিব তাদের সে কথা বুঝতে পারতো। প্রতিদিন ভোরে শিশু মনিবকে দেখলেই পায়রারা জিজ্ঞেস করতো, আজ কী স্বপ্ন দেখলে বন্ধু? শিশু মনিব তাদের মন ভালো থাকলে স্বপ্নের কথা বলতো। আর না হলে আদর করে দানা খেতে তাড়া দিতো।

একদিন ভোরে ঘুম থেকে জেগে শিশু মনিব হন্তদন্ত হয়ে এসে গেলো পায়রাদের খোপের সামনে। তখনও পায়রারা সবাই ঘুম থেকে জাগেনি। শিশু মনিবের এ অবস্থা দেখে সবাই তো খুব অবাক। কী হলো! কী হলো! সবকটা পায়রাকে অক্ষত দেখে শিশু মনিব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো অবশেষে। পরে জানা গেলো, ঘটনা হলো, তিনি স্বপ্নে দেখেছেন, একটা প্রকা- বড় হানাদার বেড়াল তার শখের পায়রাগুলোর খোপে হানা দিয়ে থাবার আঘাতে সবাইকে ঘুমন্ত অবস্থায় রক্তাক্ত করে দিয়েছে। পায়রারা এ কথা শোনার পর সবাই শিউরে উঠলো। সেদিন শিশু মনিব দীর্ঘক্ষণ পায়রাদের পরিচর্যা করলো। এতোক্ষণ পায়রাদের পরিচর্যা করার কারণে তার স্কুলে যাওয়ার সময় বয়ে যাচ্ছিলো। বারবার তাকে তার বড়বুবু ডাকা শুরু করলো। কিন্তু সেদিন বড়বুবুর ডাকেও সে ফিরে যাচ্ছে না দেখে বড়বুবু নিজেই চলে এলেন পায়রাদের খোপের কাছে। তাকে পেয়ে পায়রারও যপন উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। এই বুবুটা শিশু মনিবকে খুব বেশি ভালোবাসেন। বুবুকে কাছে পেয়ে শিশু মনিব স্বপ্নের কথা বললো। সব শুনে বুবুরও চিন্তা বেড়ে গেলো। তিনি তখনই সিকিউরিটিকে বলে দিলেন, যাতে বাইরের কোনো বেড়ালকে কম্পাউন্ডে ঢুকতে না দেয়। বুবুর কথায় সেদিন ভরসা পেয়ে শিশু মনিব স্কুলে গিয়েছিল শেষমেষ।

এ ঘটনার বছরখানেক পরে একদিন পায়রারাও একটা ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখলো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পায়রারা সেদিন সবাই একই স্বপ্ন দেখেছিলো। যদিও পায়রাদের স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার কোনো ক্ষমতা নেই, তবু তারা দেখলো, তাদের শিশু মনিবকে একদল সৈন্য খাটের তলা থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে নিয়ে যাচ্ছে গুলি করার জন্যে। এই স্বপ্ন দেখে রাতের আঁধারেই তারা কিচির-মিচির করে উঠলো। সেই কিচির-মিচির শুনে কামাল ভাই, জামাল ভাইসহ ছুটে আসলো। কিন্তু পায়রারা তো আর তাদের কাছে খুলে বলতে পারেনি স্বপ্নের কথা। তাই কেউ জানতেও পারলো বা, তাদের পরিবারে কী এক ভয়ানক বিপদ ঘনিয়ে আসছে। তোমাদের তো বলাই হয়নি। কামাল ভাই-জামাল ভাই হচ্ছে শিশু মনিবের বড় ভাই-মেজ ভাই। তারা দুজনেই বীর যোদ্ধা। পায়রারা মুখে কিছু বলতে না পারলেও মনে মনে শান্তি পেয়েছিলো এই ভেবে যে, কামাল ভাই-জামাল ভাই থাকতে তাদের শিশু মনিবের কিচ্ছু হবে না। কিন্তু স্বপ্ন দেখার এক মাসের মাথাতেই তারা যে দুঃস্বপ্ন দেখেছিলো তা সত্য হয়ে গেলো। সেই দানবের মতো সৈনিকেরা এসে শিশু মনিবের ছোট বুকটাতে গুলির বৃষ্টি ঝরালো। আহা! কী যে রক্তের ¯্রােত সে রাতে বয়ে গেলো! এই দৃশ্য দেখে পায়রাদের কেউ কেউ মূর্চ্ছা গেলো। কেউ কেউ অভিসম্পাত করলো সেইসব দানবীয় সৈন্যদের। তারা যেনো বংশ পরম্পরায় ঘৃণার আগুনে জ্বলতে থাকে।

শিশু মনিবের মর্মান্তিক মৃত্যুর এক বছর পার হলো। কিন্তু কেউ আজও সেই শিশু মনিবের হত্যার বিচার চাইলো না। পায়রারা সেই শিশু মনিব খুন হওয়ার পরও গত এক বছর ধরে তাদের বত্রিশ নম্বর বাড়ির খোপে বাস করে আসছে। এখন আর কেউ আদর করে দানা দেয় না খেতে। তারা সকাল হলে যে যার দিকে বের হয়ে যায়। দলবেঁধে যায় না। সন্ধ্যায় খোপে ফিরে আসে। সন্ধ্যার পর থেকে তারা শিশু মনিবের কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ে। আজ সেই পায়রারাই শিশু মনিবের এক বছর পার হওয়ার স্মরণসভা করছে। এক একজন এক এক রকমের বক্তৃতা দিচ্ছে। কেউ কেউ বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। সবাই একবাক্যে স্মরণ সভায় মানুষের বিপক্ষে ঘৃণা প্রস্তাব পাশ করলো। তারা এক মিনিট মানুষের জন্যে ঘৃণা প্রকাশ করে থু থু করে আওয়াজ করতে থাকলো। গণঘৃণা প্রকাশ করা শেষে হেড পিজিয়ন বক্তব্য দিতে উঠলো। তাদের শিশু মনিব খুন হওয়ার দিনটিকে পালন করার জন্যে পায়রারা একে কালো দিবস নামে অভিহিত করলো। অবশেষে হেড পিজিয়ন তার শেষ বক্তব্য উচ্চারণ করলো : আমার শোকার্ত পায়রা ভাইয়েরা, আজ এই কালো দিনে আমরা এক নতুন শপথে দীক্ষা নিলাম। আজ থেকে কোনো খুনি মানুষ যদি আমাদের আটকে তাদের কোনো অনুষ্ঠানে শান্তির শ্বেত কপোত হিসেবে উড়িয়ে দেয় তবে আমরা উড়বো না। আমরা প্রয়োজনে জীবন দিবো, তবু সেইসব খুনিদের হাতে শান্তির বারতা হয়ে ফুটবো না। আমরা আমাদের শিশু মনিবের আত্মার শান্তি কামনা করি। হেড পিজিয়ন তার বক্তব্য শেষ করে। সবাই তুমুল বাক্ বাকুমের মাধ্যমে সে প্রস্তাব অনুমোদন করে। সেই থেকে কোনো খুনি মানুষের হাতে আর শ্বেত কপোতেরা ওড়ে না, ওড়েই না।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়