চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  |   ৩৩ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জের শিশু আরাফ হত্যায় তিন আসামীর মৃত্যুদণ্ড
  •   কল্যাণপুর ইউপির জেলে চাল আত্মসাৎ, দুই গুদাম সিলগালা
  •   মা আর স্ত্রীকে বুঝিয়ে দেয়া হলো দুই ভাইয়ের লাশ
  •   বাকিলা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভিম ধ্বসে ৩ ছাত্রী গুরুতর আহত
  •   আশিকাটিতে খাটের নিচে গৃহবধূর লাশ ॥ স্বামী পলাতক

প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০

মামা
অনলাইন ডেস্ক

সাদিব গিয়েছিলো ছোটখালামণিদের বাসায় বেড়াতে, সেখানে যাওয়ার কারণে সে পড়ালেখায় অনেক পিছিয়ে পড়েছে। খালু সৌদি আরব থেকে এসেছে বলেই দেখতে যাওয়া, তা না হলে পড়ালেখা ছেড়ে বেড়ানো ছেলে সাদিব নয়। তবে দুইদিন কোচিংয়ে আসা হয়নি বলে ও খুব লজ্জা পাচ্ছে। না জানি কী হয়। কী পড়া হয়ে গেছে।

আজ তাই ক্লাসে ঢুকতেই সে শুনতে পেলো কয়েকজন বন্ধুর কণ্ঠে ওর নাম, ওরা যেন বলছে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ সাদিব, সাদিবের।’ ব্যাগ রেখে ওদের কাছে যেতেই অরণ্য এসে ওকে জড়িয়ে ধরলো, কী রে সাদিব, এই দুইদিন আসিস না কেন? অরণ্য যেন মুখটা একটু কেমন করেই বললো।

সাদিব বললো, তার আগে বল তোরা আমাকে নিয়ে কী বলছিলি?

সঙ্গে সঙ্গে রিয়াদ বললো, আর বলিস না। আমাদের রিপন স্যারের নাকি মোবাইল চুরি হয়েছে। আশরাফ বলছিলো তোর ইমতু মামা নাকি এসব চুরির বিষয়ে গোয়েন্দাগিরি করে, তাকে একবার বলে দেখলে হতো-যদি চোর খুঁজে পাওয়া যায়।

ওর কথা শেষ না হতেই শাফিন বললো, সামান্য একটা মোবাইল চুরির জন্য ওর মামা গোয়েন্দাগিরি করবে তো! এ কথা বলেই ও হেসে দিলো। তার সঙ্গে অন্য সবাই।

সাদিব একটু সিরিয়াস হয়ে বললো, আরে না, মামা এমন তেমন কোনো গোয়েন্দা না। তবে এসব বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে পছন্দ করেন। তা চুরিটা কখন হয়েছে বলতে পারিস?

আশরাফ বললো, আমরা তো হাফিজ স্যারের কাছে পড়তে যাই। ঐ একই মেসে রিপন স্যারও থাকে। আমাদের ব্যাচ যখন পড়ছিলো তখনই নাকি রিপন স্যার তার রুমে মোবাইলটা রেখে টয়লেটে যান। কাজ শেষ করে তিনি মেসের পাশের বাসায় পড়াতে যান। ওখান থেকে এসেই দেখেন মোবাইল নেই। তবে ঘরের অন্য সবকিছু অক্ষত অবস্থায় আছে।

অরণ্য হেসে বললো, আশরাফ তুই এমনভাবে বলছিস যেন টিভিতে সংবাদ বলছিস।

এ কথা শুনে সবাই একচোট হেসে দিলো। এ সময় ক্লাসে স্যার চলে এলেন। সবাই স্যারকে সালাম দেয়ার পর স্যার বসতে বললে যার যার জায়গায় বসে পড়লো।

সাদিব বাসায় গিয়ে ইমতু মামার কাছে সব কথা খুলে বললো। শুনে মামা বললেন, সামান্য একটা মোবাইল চুরি তো! খুব দ্রুতই চোরকে ধরে ফেলবো ইনশাআল্লাহ।

সাদিব বললো, হ্যাঁ, আল্লাহতায়ালা যদি চান তাহলেই আমরা ধরতে পারবো।

তখন ইমতু মামা বললেন, তাহলে চল আগামীকাল সকালেই তোদের হাফিজ স্যারদের মেসে যাওয়া যাক।

সাদিব যেই কোচিংয়ে পড়ে সেই কোচিংয়ের সবাই পড়ালেখা করে। কেউ অনার্স পড়ে কেউ বা ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার। তবে এটি ওদের শহরের নাম করা কোচিং সেন্টারের একটি। ইমতু মামা পরদিন সকালে সাদিবের সাথে চলে গেল মেসের উদ্দেশ্যে। ওখানে যেয়ে রিপন স্যারের কাছে সবকিছু আবার শুনলো এবং তারপর জিজ্ঞাসা করলো, মোবাইলটা কোন্ জায়গায় কোন্ রুমে ছিলো?

রিপন স্যার বললেন, পড়ার টেবিল দেখিয়ে, ওটার উপরেই ছিলো। আরো আফসোস করে বললেন, আমার কত শখের ৯ হাজার টাকার ক্যামেরা মোবাইল সেটটা!

ইমতু মামা জিজ্ঞেস করলো, মোবাইলটা যখন চুরি হয় তখন কয়টা বাজে বলুন তো?

হাফিজ স্যার বললেন, আনুমানিক সকালে ৮টা হবে। কেননা আটটার সময় সাদিবদের ব্যাচ শুরু হয়। আর রিপন ভাইও তো তখনই একজনকে পড়াতে যায়। ৯টার সময়ই এসে দেখে মোবাইল নেই।

মেসে কি তখন আর কেউ ছিলো?

আমাদের মেসটা তো ছোটই। আমরা এখানে পাঁচজন থাকি-আমি, শিপুল, রিপন, আরিস ও তানভীর। তবে তানভীর গ্রামে গেছে। শিপুল ৮টার সময় পড়তে যায়। আরিসেরও পড়া থাকে। তবে ওর নাকি শরীর বেশি ভালো লাগছিলো না, তাই ও পড়তে যায়নি।

এ সময় সাদিব বললো, আচ্ছা, স্যার, আরিস ভাইও কি এই রুমেই ছিলো?

হাফিজ স্যার বললেন, নাহ, আরিস ও তানভীর এক রুমে থাকে। আরিস ওর রুমেই ছিলো, শুয়ে শুয়ে পড়ছিলো।

ইমতু মামা বললেন, তার মানে মেসে হাফিজ ভাই ও আরিস ভাই-ই ছিলেন।

এর ভেতর আবার রিপন ভাই বললেন, মেসের বুয়াও ছিলেন। আমি পড়াতে যাবার আগে দেখে গোলাম উনি রান্না করতে এসেছেন।

ইমতু মামা জিজ্ঞেস করলেন, হাফিজ স্যার পড়ান কোথায়?

হাফিজ স্যার ডান পাশে বড় একটি ঝুল বারান্দা দেখিয়ে দিলেন, ওখানে একটি হোয়াট বোর্ডও আছে, অর্থাৎ ওখানেই পড়ানো হয়। এবার ইমতু মামা প্রশ্ন করলেন, বুয়া আবার কখন আসবে?

এই তো বিকেল সাড়ে পাঁচটায় এসে রাতের রান্না করে দিয়ে যাবেন।

সাদিব জিজ্ঞেস করলো, আরিস ভাই এখন কোথায়?

রিপন স্যার বললেন, কলেজে গেছেন।

ইমতু মামা বললেন, সন্ধ্যা ৬টায় কি বুয়া ও আরিস ভাই দুজনকেই পাওয়া যাবে?

রিপন স্যার ‘হ্যাঁ’-সূচক মাথা নাড়লেন।

তাহলে আজকে সন্ধ্যা ৬টায় আমি আর সাদিব আবার আসছি। বলে বেরিয়ে এলো মেস থেকে।

বাসায় গিয়ে সাদিব বললো, মামা আমার মনে হয় আরিস নামক ভাই-ই চুরিটা করেছে। তা না হলে সেদিন কেন পড়তে গেল না? আর তাছাড়া এমন তো নয় যে সে বিছানা থেকে উঠতে পারছে না বা জ্বর হয়েছে। এটা কিন্তু একটা প্লাস পয়েন্ট।

ইমতু মামা একটু রাগ করেই বললো, চুপ করতো। এমনও তো হতে পারে যে ওর মাথা ঘুরছিলো। আর তাছাড়া তো বুয়াও কাজটা করতে পারে।

সাদিব এবার একটু চুপসে গেল। রাগও করলো। বললো, মামা তুমি খুঁজে খুঁজে সব পজিটিভ দিক আনছ। এমন করলে কখনোই চোর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বিকেল ৬টায় সাদিব ও ইমতু মামা মেসে গেল। ওখানে গিয়ে দেখল আরিস আছে। ইমতু মামার সঙ্গে হাফিজ স্যার তার পরিচয় করিয়ে দিলেন। আরো বললেন, ইমতু মামা মোবাইল চুরির বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছেন। এ কথা শুনে তিনি একটু ভয় পেয়ে গেলেন। চোখ-মুখ কেমন জানি শুকিয়ে গেল। ইমতু মামা জিজ্ঞেস করলো, কাল আপনি পড়তে যাননি কেন?

আরিস নিজের মধ্যে গুটিয়ে গিয়ে বললো, আসলে আমার শরীরটা ভালো লাগছিলো না।

ইমতু মামা আবার জিজ্ঞেস করলো, আপনার এমন কী হয়েছিলো?

আরিস বললো, দেখুন, আমি চোর না। আমি চুরি করিনি। মিথ্যাভাবে আমাকে দোষারোপ করবেন না। ইমতু মামা বললো, আমি যেটা জিজ্ঞেস করেছি সেটার উত্তর দিন।

আরিস বললো, আমার লাল বা রঙ চা খাওয়ার অভ্যাস নেই তো, ভোরে হাঁটতে বের হয়ে খেয়েছিলাম। তাই একটু বমি আসছিলো।

এ সময় সাদিব হাফিজ স্যারকে জিজ্ঞেস করলো, স্যার, বুয়া আসেনি?

হাফিজ স্যার বললেন, অন্যদিন তো আগেই চলে আসে, আজকে এত লেট হচ্ছে কেন বুঝতে পারছিনে।

ইমতু মামা আবার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলো, রিপন ভাইয়ের সঙ্গে আপনার কতদিনের বন্ধুত্ব? কবে থেকে পরিচয়?

আরিস ছোট করে উত্তর দিলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডমিশন দেয়ার সময় থেকে।

এমন সময় কাজের বুয়া এসে হাজির। ডেকে আনা হলো তাকে। ইমতু মামা প্রথমেই জিজ্ঞেস করলো, আপনি কাল রিপন ভাইয়ের ঘরে ঢুকেছিলেন?

বুয়া সোজাসাপ্টা উত্তর দিলো, না, আমি এসেই রান্না করতে বসেছি।

আপনি কি হাফিজ ভাইকে পড়ানো ছেড়ে উঠে ঘরে প্রবেশ করতে দেখেছিলেন?

এবার হাফিজ স্যার লজ্জিত ভঙ্গিতে বললেন, দেখুন আমি কি চুরি করতে পারি?

ইমতু মামা বললেন, সরি। গোয়েন্দাগিরিতে সন্দেহের বাইরে কেউ নেই। তাছাড়া আপনিও তো মেসে ছিলেন। আপনাকে দোষ দিচ্ছি তা কিন্তু নয়।

তখন বুয়া বললো, আমি হাফিজ স্যারকে ঘরে ঢুকতে দেখিনি, তই এক পোলা ঢুকছিলো। পোলাডা মনে অয় হাফিজ স্যারের কাছেই পড়ে।

এবার সাদিব সিরিয়াস হয়ে বললো, ছেলেটি দেখতে কেমন?

বুয়া বর্ণনা দিয়ে চলল, উজ্জ্বল শ্যামলা, উঁচুডা তোমার লাহান। বেশ ইশমাট, দেখে চোর তা মনে অয় না।

তাহলে কি অরণ্য! সাদিব অবাক হয়ে বললো।

হাফিজ স্যারও বললেন, এমন বর্ণনা শুনে তো মনে হচ্ছে অরণ্যই!

ইমতু মামা বললো, কিন্তু আচ্ছা হাফিজ স্যার, অরণ্য ঘরে ঢুকেছিলো আপনি কেন বলতে পারলেন না? হাফিজ স্যার একটু কেমন করে বললেন, দেখুন, ঐ সময় আমার একটি ফোন আসে। ওরা চেঁচামেচি করছিলো বলে আমি আরিসের রুমে আসি এবং কথা শেষে আবার পড়াতে যাই। আর আমি যেয়ে দেখেছিলোাম ওরা যার যার জায়গায়ই বসে আছে। আর তাছাড়া মাঝে মাঝে অনেক ছাত্রই পানি খেতে আসে, তাই কোনো ছাত্র ভেতরে এলে তেমন কোনো সন্দেহ মনে হয় না।

ইমতু মামা সাদিবকে বললো, সাদিব চল উঠি, বোঝা হয়ে গেছে কে চুরি করেছে।

এ সময় রিপন স্যার বললেন, অরণ্য তো মেধাবী ছাত্র। ও কি এ কাজ করতে পারে?

সাদিবেরও অরণ্যের কথা শুনে মন খারাপ হয়ে গেল।

ইমতু মামা পথের মধ্যে সাদিবকে বোঝালো মেধাবী বলেই যে সে চুরি করতে পারে না, এমন তো কোনো কথা নেই। তুই ওর সঙ্গে বিভিন্ন কথা বলে বুঝতে চেষ্টা করবি ওর ভাবভঙ্গি। তারপরে যা করার আল্লাহর রহমতে আমিই করব।

সাদিব ইমতু মামার কথা অনুযায়ী পরদিন কোচিংয়ে গেলো। এগিয়ে এলো ওর বন্ধুরা। সঙ্গে অরণ্যও। সবাই উৎসুক মোবাইল চুরির ব্যাপারে জানার জন্য। সাদিব ওসব এড়িয়ে গেল। বুদ্ধি করে অরণ্যের পাশে বসল। অরণ্য চুরির বিষয়ে কোনোকিছুই বলছে না। স্যার এখনও আসেননি। সাদিব শুরু করলো, জানিস অরণ্য, ইমতু মামা বলেছে, আমাদের বন্ধুদের মধ্যেই নাকি কেউ মোবাইলটা চুরি করেছে। জানিস, এই কথাটা শুনে আমার খুব মন খারাপ, কখনোই ভাবিনি আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউ চুরি করবে! চুরি করা খুবই অন্যায় কাজ। আর এই খারাপ কাজ আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউ করেছে। ছি! এ যেন অবিশ্বাস্য! কী রে, কথা বলছিস না কেন? শিক্ষক আমাদের গুরু। তার কোনো জিনিস চুরি করা কি উচিত?

ঠিক এমন সময় অরণ্যের সামনে ব্যাগের উপরে রাখা খাতার উপরে এক ফোঁটা পানি পড়লো। সাদিব জিজ্ঞেস করলো, কী রে অরণ্য, তুই কাঁদছিস?

অরণ্য ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো, আমি চুরি করতে চাইনি। আমার মা অসুস্থ। তোরা তো জানিসই আমার বাবা নেই। সংসার মামা-চাচার কাছে চেয়ে ও মা কাঁথা-টাথা সেলাই করে আল্লাহর রহমতে চলত। কিন্তু মা এখন অসুস্থ। সামনে পরীক্ষা, স্কুলের বেতনও দিতে হবে। কী করে এত টাকা জোগাড়ৃ

এমন সময় ক্লাসে স্যার চলে এলেন। সাদিব অরণ্যের ঘাড়ে হাত রেখে আস্তে করে বললো, আজই কোচিং শেষে আমাদের বাসায় যাবি। ইমতু মামা ও স্যারদেরকে সব কথা জানাতে হবে। ভয় পাসনে, আমি তোর কিছু হতে দেব না। আমি না তোর বন্ধু! সাদিবেরও চোখজোড়া ভিজে উঠল।

সাদিবের কথা মত অরণ্য ওদের বাসায় গেল। সাদিব সব কথা খুলে বললো। ইমতু মামা বললো, সাদিব হাফিজ ভাই ও রিপন ভাইকেও খবরটা দেয়া দরকার।

সাদিব ফোন করে রিপন ও হাফিজ স্যারকে বাসায় আসতে বললো। বাসায় এলে ইমতু মামা সব ঘটনা খুলে বললো। ইমতু মামার পরিচিত একটি পাঠাগার আছে। ঐ পাঠাগারের পরিচালকের সাথে কথা বলে অরণ্যের সাহায্য করার বিষয়টা নিশ্চিত করা হলো। অরণ্যও রিপন স্যারের কাছে ক্ষমা চাইল, মহান রবের নিকটও ক্ষমা চাইল এবং প্রতিজ্ঞা করলো যত কষ্টই হোক আর কখনো চুরি করবে না।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়