চাঁদপুর, মঙ্গলবার ১১ মে ২০২১, ২৮ বৈশাখ ১৪২৮, ২৮ রমজান ১৪৪২
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
স্কুলের নানা রঙের দিনগুলো
গণেশ চন্দ্র দাস
১১ মে, ২০২১ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


আমার জন্ম মতলব দক্ষিণের ৬নং উপাধী দক্ষিণ ইউনিয়নের পিংরা গ্রামে। ১৯৬৬ সালের ১৫ জানুয়ারি। আমার বাবা রত্নেশ্বর চন্দ্র দাস, মা লাবণ্য রাণী দাস। আমি শৈশব-কৈশোরে পিংরা গ্রামে বেড়ে উঠি। আমাদের গ্রামটি ছিলো গাছগাছালিতে ভরা সবুজ গ্রাম। শিক্ষা-দীক্ষা, আচার-ব্যবহারে এ গ্রামটি সুশৃঙ্খলিত ছিলো।



 



আমার পড়াশোনার হাতেখড়ি বাবা-মায়ের হাতে। পরে প্রাথমিকের শিক্ষক সুভাষ চন্দ্র রায় আমাকে হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। তিনি আমার গৃহশিক্ষক ছিলেন। আমাদের বাড়ির পাশেই পিংরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলে হেঁটে যেতে পাঁচমিনিট সময় লাগে। ওই সময় গ্রামের অনেকেই স্কুলে যেতো। আমরা ছোটরাও তাদের সঙ্গে স্কুলে যেতাম। তখন কিছুদিন স্কুলে গেলে শিক্ষকরা প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দিতেন। আমিও এভাবে স্কুলের খাতায় নাম তুললাম।



 



আমাদের স্কুলের সমানে একটি বড় রেইনট্রি ছিলো। গরমকালে গাছতলায় ঠা-া লাগতো। তখন এখনকার মতো এতো ক্লাসরুম ছিলো না। দুই শিফটে ক্লাস হতো। ১০টা-১২টা হলো ক্লাস ওয়ান-টু, ৩য় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস হতো ১২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত। আমরা অনেক সময় গাছের নিচে বসে পড়তাম। মাঝে মাঝে শিক্ষকরা সবাইকে গোল করে দাঁড় করাতেন। তারপর একজনকে মাঝখানে ডেকে এনে নামতা পড়তে বলতেন। তার সঙ্গে সবাই চিৎকার করে নামতা পড়তো। আমাদের আদর্শলিপি বই ছিলো। শিক্ষকরা বর্ণ পরিচয়, বানান শেখাতো, অংক করাতো।



 



আমাদের শিক্ষক ছিলেন পাঁচজন। প্রধান শিক্ষক আলী আকবর স্যার, সহকারী শিক্ষক মুকবুল স্যার, আনোয়ার স্যার, আবদুর রশিদ স্যার ও মান্নান স্যার। এর মধ্যে আলী আকবর স্যার ও রশিদ স্যারকে আমরা ভয় পেতাম। রশিদ স্যার ভালোভাবে বুঝিয়ে অঙ্ক করাতেন। তিনি আমার অত্যন্ত প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। মুকবুল স্যারকে সবাই বলতো হুজুর স্যার। তিনি আদর করতেন, শাসনও করতেন। তাঁরা যেভাবে পড়াতেন সেটাই ছিলো প্রকৃত শিক্ষা। তাঁরা আদর্শ মানুষ তৈরি করতে চাইতেন। তাঁদের মধ্যে কপটতা ছিলো না। শিক্ষকতা তাঁদের কাছে পেশা নয়, সেবা ছিলো। স্যাররা কোনো প্রাইভেট পড়াতেন না। প্রয়োজনে অতিরিক্ত ক্লাস নিতেন। অবৈতনিক পড়াতেন। তাঁদের আন্তরিকতা এমনই ছিলো। আমরা যদি দু-তিনদিন স্কুলে না যেতাম, স্যাররা বাড়িতে খোঁজ নিতেন। জানতে চাইতেন কেনো স্কুলে আসি না।



 



তখন স্কুলে যাওয়ার জন্যে ছাত্র-ছাত্রীদের নির্দিষ্ট কোনো পোশাক ছিলো না। আমরা হাফ প্যান্ট পরে যেতাম। বয়সে বড়রা লুঙ্গি পরে যেতো। তখন প্রায় সবাই খালি পায়ে স্কুলে যেতো। আমরা প্রাইমারিতে চক-সস্নেটে লিখতাম। তখন এক প্রকার কলমও ছিলো। পরবর্তীতে কাগজ-কলমে লিখতাম। পেন্সিলে লিখতাম। পেন্সিল কাটার জন্যে 'কাটার' ছিলো না। আমরা বেস্নড দিয়ে পেন্সিল কেটে নিতাম। ওইসময় কলম ছিলো ফাউন্টেন পেন। এ কলমে কালি ভরা যেতো।



 



ওইসময় স্কুলে টিকা দেয়া হতো। টিকা দেয়া ছিলো আমাদের কাছে আতঙ্কের বিষয়। তৎকালে টিকা দেয়ার ব্যবস্থা এতো আধুনিক ছিলো না। টিকা দিলে হাতে ক্ষত তৈরি হতো, জ্বর ও যন্ত্রণা হতো। আমাদের ক্লাসের বেড়া এক স্থানে ভাঙা ছিলো। টিকা দেয়ার দিন আমরা সেই ভাঙা বেড়া দিয়ে বাড়িতে পালিয়ে যেতাম। কিন্তু শেষ রক্ষা হতো না। টিকা দেয়ার বিষয়টি ছিলো বাধ্যতামূলক। আমাদের বাড়ি থেকে ধরে এনে টিকা দেয়া হতো। স্কুলে দেয়া টিকার দাগ এখনো আছে। আবার স্কুলে মাঝে-মধ্যে গুঁড়ো দুধ দেয়া হতো। সেটি আমাদের খুব পছন্দের ছিলো। যারা আগে থেকে খবর পেতো, তারা ছোট ভাইবোনদের নিয়ে স্কুলে চলে আসতো। আমরা হাতে নিয়ে মজা করে গুঁড়ো দুধ খেতাম।



 



আমার সহপাঠী ছিলো কামাল হোসেন, নান্নু প্রধানিয়া, শফিক প্রধানিয়া, হরিপদ শীল, শিবুলাল সরকার, ফেরদৌস তপাদার, জাহাঙ্গীর তপাদার, শাহআলম তপাদার। তারা ছিলো পড়ার সঙ্গী, খেলার সঙ্গী। আমরা হাডুডু, গোল্লাছুট, ফুটবল, দাড়িয়াবান্ধা খেলতাম। আমরা ঘুড়ি উড়াতাম। স্কুল ছুটি হলেই ঘুড়ি উড়াতে যেতাম। আমাদের বাড়ির পাশে নাগের বাড়ি ছিলো। সেখানে একটা ম-ফল গাছ ছিলো। সেই গাছে আমরা প্রায়ই ঝুলতাম। এটা ছিলো এক ধরনের খেলা। আরেকটি মজার ঘটনা মনে পড়ছে। আমার বন্ধু গনেশ (আমার নামেই নাম) খুব দুষ্টু ছিলো। একবার সে শিবুর গোঁফ কেটে দিয়েছিলো। লজ্জায় শিবু সারাদিন কারো সামনে আসেনি, দরোজা বন্ধ করে ঘরে ছিলো। এমন অনেক ঘটনা আছে বন্ধুদের সঙ্গে।



 



প্রাথমিকে আমাদের ক্লাসে অল্প কজন মেয়ে ছিলো। তখন নারী শিক্ষার এতো প্রসার ছিলো না। অল্প বয়সেই পরিবারের লোকেরা মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিতো। তখনকার লোকেরা মনে করতো, মেয়েরা এতো স্কুল যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কেউ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়লেই তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়া হতো। বলা হতো : মেয়েরা সংসার করবে, এতো পড়ার কী দরকার। বরং রান্না-বান্না, সংসারের কাজকর্ম শেখার দরকার আছে। অবশ্য যারা উচ্চবিত্ত ও আধুনিক ছিলেন তারা মেয়েদের পড়াতেন।



 



তখন সন্ধ্যা হলেই পড়তে বসতাম। ঘরে ঘরে আজকের মতো বিদ্যুৎ ছিলো না। হারিকেন বা কুপির আলোয় সবাইকে পড়তে হতো। জোরে জোরে পড়তাম আমরা। তখন কোনো কিছু ভুল পড়লে বাবা-মা তা ধরতে পারতেন এবং শুধরে দিতেন। তখন রাত ১০টা ছিলো গভীর রাত। আমরা বড় জোর ৯টা পর্যন্ত পড়তাম। আবার সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসতাম। পড়ার মাঝেই মা নাস্তা দিতেন।



 



আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি। মুক্তিযুদ্ধের কিছু কথা স্পষ্ট মনে আছে। একটা ঘটনার কথা বলতে চাই। তখন বর্ষকাল ছিলো। হঠাৎ খবর পেলাম পিংরা বাজারে মিলিটারি এসেছে। খবর শুনে আমরা আতঙ্কিত। কারণ, হিন্দুদের উপর মিলিটারিদের ক্ষোভ ছিলো বেশি। তারা হিন্দুবাড়ি পেলে তছনছ করে দিতো। হিন্দু ধরা পড়লে মৃত্যু নিশ্চিত। মিলিটারি আসার খবর পেয়ে আমরা ভয়ে নৌকা নিয়ে বিলে আশ্রয় নিতে চেয়েছিলাম। সে সময় নৌকা থেকে আমি পড়ে যাই। যদিও সাঁতার জানতাম। পরে জানতে পারলাম, মিলিটারি আসেনি। এটি স্রেফ গুজব ছিলো। তখন অবশ্য এমন আতঙ্কের মধ্যেই জীবন কাটাতে হতো।



 



আমার স্কুলজীবনের কথা প্রায়ই মনে পড়ে। কত আনন্দ, দুষ্টামি করতাম। ছাত্র হিসেবে খারাপ ছিলাম না। তাই স্যাররা আদর করতেন। যখন ক্লাস থাকতো না তখন স্কুলেই খেলাধুলা শুরু করতাম। মান্নান স্যার এখনো জীবিত আছেন। তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি এখনো আমাকে স্নেহ করেন। প্রায়ই বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। বিশেষত, শিবু, নান্নু, কামালের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ ও দেখা-সাক্ষাৎ হয়। তাদের সঙ্গে দেখা হলেই স্কুলজীবনের কথা সামনে চলে আসে। কে কেমন ছিলাম, কী করতাম তার আলোচনা হয়।



 



স্কুলজীবনের কথা আমি প্রায়ই ভাবি। কি সুন্দর ছিলো আমাদের নানা রঙের দিনগুলো! সে দিনগুলো খুব মনে পড়ে। (অনুলিখিত)



 



গণেশ চন্দ্র দাস : প্রধান শিক্ষক,



পুরাণবাজার এম এইচ উচ্চ বিদ্যালয়।



 



 


হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

 


২-সূরা বাকারা


২৮৬ আয়াত, ৪০ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৪৫। তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর এবং ইহা বিনীতগণ ব্যতীত আর সকলের নিকট নিশ্চিতভাবে কঠিন।


 


 


 


 


 


চারিত্রিক সরলতা গূঢ় চিন্তাধারায় স্বাভাবিক বিকাশ। _হেজলিট।


 


 


 


নিশ্চয় খোদা তার বিশ্বাসী বান্দাকে তওবা দ্বারা পরীক্ষা করতে ভালোবাসেন।


 


 


ফটো গ্যালারি
করোনা পরিস্থিতি
বাংলাদেশ বিশ্ব
আক্রান্ত ৭,৫১,৬৫৯ ১৬,৮০,১৩,৪১৫
সুস্থ ৭,৩২,৮১০ ১৪,৯৩,৫৬,৭৪৮
মৃত্যু ১২,৪৪১ ৩৪,৮৮,২৩৭
দেশ ২০০ ২১৩
সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
আজকের পাঠকসংখ্যা
৭৭৬৪৯৭
পুরোন সংখ্যা