চাঁদপুর, মঙ্গলবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১০ ফাল্গুন ১৪২৭, ১০ রজব ১৪৪২
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • বীমায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর
ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু
অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ হাসান খান
২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয় জীবনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ এই আন্দোলনের ভেতর দিয়েই আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম অনেকদূর এগিয়ে যায়। বলা যায়, স্বাধীনতার বীজ লুক্কায়িত ছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্যে। আর ভাষা আন্দোলনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভূমিকা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণর্। সে সময় তিনি ছিলেন ছাত্রনেতা। এখন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে জেনে নেই ভাষা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকার কথা।



১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। আমরা ছিলাম পূর্ব পাকিস্তানের অংশ। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা কী হবে তা নিয়ে ১৯৪৭ সাল থেকে বিতর্ক শুরু হয়। পাকিস্তানের মোট জন সংখ্যার ৫৬ ভাগ মানুষ বাংলায় কথা বললেও পাকিস্তানের শাসকগণ উর্দুকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করতে উদ্যোগী ছিল। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বলেন, "আমি খুব স্পষ্ট করেই আপনাদের বলছি যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, এবং অন্য কোন ভাষা নয়। কেউ যদি আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে তাহলে সে আসলে পাকিস্তানের শত্রু।" পরবর্তীতে কার্জন হলে দেওয়া আরেক বক্তৃতায় মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ পুনরায় বলেন, "পাকিস্তানের প্রদেশগুলো নিজেদের সরকারি কাজে যে কোন ভাষা ব্যবহার করতে পারে। তবে রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে একটিই এবং তা হবে উর্দু।" সাথে সাথেই সেখানে উপস্থিত ছাত্ররা এই বক্তৃতার বিরোধিতা করে। এ ঘটনার আগে-পরের ঘটনাগুলি আমাদের সবারই কম- বেশি জানার কথা।



১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তানের কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন ছাত্রনেতা শেখ মুজিব এই সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবনা পাঠ করেন। যার মধ্যে রাষ্ট্র ভাষার প্রস্তাব ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন বলেছেন, "পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জন সাধারনের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক। এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।" [সূত্র : ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা, গাজীউল হক]। এই কথা থেকে বুঝা যায়, বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলনের সূচনাকাল থেকে যুক্ত ছিলেন এবং নিজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।



১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরের ০১ তারিখে গঠিত তমুদ্দিন মজলিশ ভাষা আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা রাখে। ছাত্র নেতা শেখ মুজিব তমুদ্দিন মজলিশের কাজে জড়িত ছিলেন। এই বছরের ডিসেম্বর মাসে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হলে বঙ্গবন্ধু এই পরিষদের সাথে যুক্ত থেকে নানা কাজ করেছেন। বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করতে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন। মিছিল-মিটিং করেছেন।



১৯৪৮ সালের জানুয়ারির ০৪ তারিখে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা কর্মীবৃন্দ ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখেন। এই বিষয়ে শিক্ষাবিদ হারুন অর রশিদ লিখেছেন, "ছাত্রলীগের উদ্যোগেই ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ 'বাংলা ভাষা দাবি দিবস' পালন করা হয়। এ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুসহ অনেক নেতা কর্মী গ্রেপ্তার হন; অনেকে গুরুতরভাবে আহত হন। ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব শুরুর আগে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলেও এ পর্বেও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের ভূমিকা ছিল খুবই বলিষ্ঠ। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে তাঁদের ছিল কার্যকর প্রতিনিধিত্ব।"



১৯৪৯ সালে ছাত্রলীগের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলে এতে সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'তে বঙ্গবন্ধু সেদিনের বক্তৃতার কথা লিখেছেন। প্রথম কাউন্সিলে তিনি বলেছেন, "পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ যে নেতৃত্ব দিয়েছে, পূর্ব বাংলার লোক কোনোদিন তা ভুলতে পারবে না। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য যে ত্যাগ স্বীকার আপনারা করেছেন এদেশের মানুষ চিরজীবন তা ভুলতে পারবে না।" বঙ্গবন্ধুর এই বক্তৃতা থেকে ভাষা আন্দোলনে ছাত্রলীগের ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট জানা যায়। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারির ২৬ তারিখ ধর্মঘট আহ্বান করা হলে ধর্মঘট সফল করতে শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্ব দেন ও ভূমিকা রাখেন। ২ মার্চ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। গবেষক এম আর মাহবুব লিখেছেন, 'এই সংগ্রাম পরিষদ গঠনে শেখ মুজিব বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন এবং তাঁর ভূমিকা ছিল যেমন বলিষ্ঠ তেমনি সুদূরপ্রসারী।' ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করার দাবিতে ডাকা ধর্মঘটের নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু এবং এই দিন পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। বঙ্গবন্ধু এদিনের কথায় বলেছেন, "১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ গঠনের মাধ্যমে আমাদের আন্দোলন শুরু হয়। সেদিনই সকাল ৯ ঘটিকার সময় আমি গ্রেপ্তার হই। আমার সহকর্মীদেরও গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে আন্দোলন চলতে থাকে।" [দৈনিক আজাদ, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১] আটকের কয়েকদিনের মাথায় বঙ্গবন্ধুসহ অন্য ভাষা সংগ্রামীদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সরকার।



ভাষা আন্দোলনে যুক্ত থাকায় বঙ্গবন্ধুকে ১৯৪৯ সালে দুইবার গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তারের পর বঙ্গবন্ধু মুক্তি পান ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে অনেকে বলে, ভাষা আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু জেলে ছিলেন, তিনি কীভাবে আন্দোলন করেছেন? যারা এই প্রশ্ন করে তারা ভুলে যায় ভাষা আন্দোলন মানে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির এক দিন নয়। ভাষার দাবি ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু হয়েছে। এবার জেলে থাকাকালীন ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা যাক। বঙ্গবন্ধু জেলে থেকেও ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করতে পরামর্শ দিতেন। ভাষাসৈনিক গাজীউল হক বলেছেন, "জেলে থেকেই তিনি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিতেন।" ভাষাসৈনিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন, "শেখ মুজিব ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ ফরিদপুর জেলে যাওয়ার আগে ও পরে ছাত্রলীগের একাধিক নেতার কাছে চিরকুট পাঠিয়েছেন।" বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালে জেলে কিন্তু ভাষা সংগ্রামে তার অবদান অস্বীকার করা যাবে না।



১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির পর ভাষা আন্দোলন জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রথমে রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পক্ষে ছিলেন এবং তিনি লিখিত বিবৃতি প্রদান করেন। শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করে তাঁর মত পরিবর্তন করান। পরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলাকে সমর্থন করে লিখিত বিবৃতি প্রদান করেন যা সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালের ২৯ জুন তারিখে। ১৯৫৩ সালে সভা, মিছিল, শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যমে একুশের প্রথমবার্ষিকী পালিত হয়। বঙ্গবন্ধু এ সবের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।



স্বাধীনতার সংগ্রাম এসেছে ভাষা আন্দোলনের হাত ধরে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ, পেয়েছি একটি পতাকা, জাতীয় সংগীত, বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা হয়েছে আমাদের। দেশ স্বাধীনের পর বাংলা ভাষা বিকাশে বঙ্গবন্ধু উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি আমাদের বাংলায় লেখা সংবিধান উপহার দিয়েছেন। জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়ে তিনি ইতিহাস তৈরি করেছেন ১৯৭৪ সালে। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ সর্বত্র বাংলাভাষা প্রচলনের নির্দেশ জারি করেন বঙ্গবন্ধু। বাংলা প্রচলনের জন্য এটি প্রথম সরকারি নির্দেশনা। বঙ্গবন্ধু আজীবন বাংলা ভাষার বিকাশ ও মর্যাদা রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন। ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদান জাতির কাছে আজ স্পষ্ট। একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল ভাষাসৈনিকদের প্রতি জানাই অবিরাম শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। "যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান/ দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা রক্তগঙ্গা বহমান/ তবু নাই ভয় হবে হবে জয় জয় মুজিবর রহমান।"



জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। ভাষা দিবস অমর হোক।



লেখক : অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ হাসান খান, সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা; প্রকাশিত গ্রন্থ : "বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনা" এবং "মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনা"।



 



 



 



 


এই পাতার আরো খবর -
    হেরার আলো
    বাণী চিরন্তন
    আল-হাদিস

    ৯৬-সূরা 'আলাক


    ১৯ আয়াত, ১ রুকু, মক্কী


    পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


    ১৫। সাবধান, সে যদি বিরত না হয় তবে আমি তাহাকে অবশ্যই হেঁচড়াইয়া লইয়া যাইব, মস্তকের সম্মুখভাগের কেশগুচ্ছ ধরিয়া-


    ১৬। মিথ্যাচারী, পাপিষ্ঠের কেশগুচ্ছ।


    ১৭। অতএব সে তাহার পার্শ্বচরদিগকে আহ্বান করুক।


     


     


    মূর্খতা এমন এক পাপ, সারাজীবনে যার প্রায়শ্চিত্ত হয় না।


    -আল-ফখরি।


     


     


     


    কাউকে অভিশাপ দেওয়া সত্যপরায়ণ ব্যক্তির উচিত নয়।


     


    ফটো গ্যালারি
    করোনা পরিস্থিতি
    বাংলাদেশ বিশ্ব
    আক্রান্ত ৫,৩৮,০৬২ ১০,৬৪,২৭,১০৩
    সুস্থ ৪,৮৩,৩৭২ ৭,৮০,৮৪,৯০৯
    মৃত্যু ৮,২০৫ ২৩,২২,০৫৩
    দেশ ২১৩
    সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
    আজকের পাঠকসংখ্যা
    ৯৫২৯১
    পুরোন সংখ্যা