চাঁদপুর, রোববার ৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১০ রবিউস সানি ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুর শহরে গৃহপরিচারিকার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৯-সূরা হাশ্র


২৪ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


২। তিনিই কিতাবীদের মধ্যে যাহারা কাফির তাহাদিগকে প্রথম সমবেতভাবে তাহাদের আবাসভূমি হইতে বিতাড়িত করিয়াছিলেন। তোমরা কল্পনাও কর নাই যে, উহারা নির্বাসিত হইবে এবং উহারা মনে করিয়াছিল উহাদের দুর্গগুলি উহাদিগকে রক্ষা করিবে আল্লাহ হইতে; কিন্তু আল্লাহর শাস্তি এমন এক দিক হইতে আসিল যাহা ছিল উহাদের ধারণাতীত এবং উহাদের অন্তরে তাহা ত্রাসের সঞ্চার করিল। উহারা ধ্বংস করিয়া ফেলিল নিজেদের বাড়ি-ঘর নিজেদের হাতে এবং মুমিনদের হাতেও; অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।


 


 


ভালোবাসা মানুষকে শিল্পী করতে পারে কিন্তু প্রাচুর্য বাধার সৃষ্টি করে।


-ওয়াশিংটন অলস্টন।


 


 


কৃপণতা একটি ধ্বংসকারী স্বভাব, ইহা মানুষকে দুনিয়া এবং আখেরাতের উভয় লোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।


 


 


ফটো গ্যালারি
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নতুন জায়গায় বাবরী মসজিদ
এ.এস.এম. শফিকুর রহমান
০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় বাবরী মসজিদ ও রাম মন্দির বিরোধ নিয়ে আলোচিত মামলার রায় গত ৯ নভেম্বর ঘোষণা করেছে ভারতের মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট। রায়ে বাবরী মসজিদের জায়গায় একটি ট্রাস্টের মাধ্যমে রাম মন্দির প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য হিন্দুদের দেওয়া এবং নিকটতম অন্য কোনো জায়গায় বাবরী মসজিদ প্রতিষ্ঠার জন্য ৫ একর ভূমি প্রদানের জন্য বলা হয়েছে। ভারতের মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত ৫ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করে। সর্বোচ্চ আদালতের রায় মেনে নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রথমতঃ ভারতের আর্কিলজিকেল ডিপার্টমেন্ট খনন কাজ চালিয়ে বাবরী মসজিদের নিচে যে প্রাচীনতম কাঠামোর নিদর্শন পেয়েছে তা যে রামমন্দির স্থাপনার অংশ তা প্রমাণ করা যায়নি। দ্বিতীয়তঃ বাবরী মসজিদ ভাঙ্গা বেআইনী হয়েছে। মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের রায় মানার বাধ্যবাধকতা থাকলেও মহামান্য আদালতের এই ২টি পর্যবেক্ষণের প্রেক্ষিতে মুসলিম ল' বোর্ড থেকে রায় পুনঃ বিবেচনার জন্য রিভিউ পিটিশন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।



ভারতের ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দিন মোহাম্মদ বাবর ছিলেন উচ্চ সংস্কৃতি সম্পন্ন বংশের ধারক ও বাহক। পিতার সূত্রে তৈমুর এবং মাতার সূত্রে চেংগিশ খাঁর বংশে জন্ম নিয়েছেন বাবর। ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষ আক্রমণ করে ৪ বার পরাজিত হন বাবর। ১৫২৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারত অধিকার করেন। বাবর ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু রাজা রানা সংগ্রাম সিংহকে সিক্রিতে পরাজিত করে তার প্রধান সেনাপতি মীর বাকী তাশকন্দিকে অযোধ্যার গভর্নর নিযুক্ত করেন। মীর বাকী সম্রাটের স্মৃতি রক্ষার্থে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে অযোধ্যার ফয়েজাবাদে এক খ- পতিত জমিতে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এটিই হচ্ছে ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ।



রামের জন্মভূমির তথ্য আবিষ্কার করে অন্ততঃ ২০ বার বাবরী মসজিদে হামলা করা হয় ভাঙ্গার জন্য। ১৯৪৯ সালে বাবরী মসজিদে রামের মূর্তি স্থাপন করা হয়। এ নিয়ে উত্তেজনা দেখা দিলে সরকার মসজিদ চত্বরকে বিরোধপূর্ণ এলাকা বলে ঘোষণা করে। এতে মসজিদে মুসলমানদের নামাজ পড়ার সুযোগ না থাকলেও হিন্দুদের পূজার কার্যক্রম চলতে থাকে। ১৯৮৩ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ মসজিদ এলাকায় মন্দির নির্মাণের অভিযান শুরু করে এবং মসজিদের তালা খুলে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানায়। ১৯৮৬ সালে ফৈজাবাদের মাননীয় জেলা জজ তার এক রায়ে মসজিদের তালা খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন, যাতে হিন্দুরা বিনা বাধায় সেখানে পূজা করতে পারে। এবারে মুসলমানরা বিক্ষুব্ধ হয় এবং গঠন করা হয় বাবরী মসজিদ একশন কমিটি। সুন্নী ওয়াক্ফ বোর্ডের পক্ষে মোহাম্মদ হামিদ আনসারী, মোহাম্মদ ফারুখ, সাহাবুদ্দিন, মাওলানা নিসার, মোহাম্মদ সাহাব ও হাসিম এলাহাবাদ হাইকোর্টে ফৈজাবাদ জেলা জজের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল রুজু করেন। অবশ্য এই আপীল রুজুকারী সকলেই এখন মৃত। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বাবরী মসজিদের মূলভূমি 'রাম জন্মভূমি' উল্লেখ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের সুন্নী ওয়াক্ফ বোর্ডকে এক তৃতীয়াংশ এবং নির্মোহী আখড়া ও রামলালা গোষ্ঠী নামে ২টি সংগঠনকে বাকি দুই তৃতীয়াংশ দেওয়ার রায় প্রদান করে। বিচারপতি ডি.ভি. শর্মা, বিচারপতি এস.ইউ. খান ও বিচারপতি সুধীর আগরওয়ালের সমন্বয়ে গঠিত উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাইকোর্টের লক্ষ্নৌ বেঞ্চ এই রায় প্রদান করে।



১৯৮৯ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, ভারতীয় জনতা পার্টি মসজিদ স্থলে রাম মন্দির স্থাপনের ঘোষণা দেয়। ২ নভেম্বর হিন্দু পরিষদ পতাকা উড়িয়ে বাবরী মসজিদ দখল করে। ১৯৯০ সালে লালকৃষ্ণ আদভানী বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে রাম মন্দির স্থাপনের ঘোষণা দেয় এবং অযোধ্যা অভিমুখে রথযাত্রার আয়োজন করে। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ হাজার হাজার হিন্দু জড়ো হয়ে ভেঙ্গে ফেলে। রামের জন্মভূমি ভেঙ্গে বাবরী মসজিদ করা হয়েছে এটি প্রমাণের জন্য। মসজিদটিতে ৩০টি চিত্র অংকন করা হয় এবং একটি চিত্রে ছিল রামের প্রতিমূর্তি। মসজিদে অংকিত চিত্রের মধ্যে লিখিত নির্দেশনায় বলা ছিলো যে, বাবরের সৈন্যদল অযোধ্যার রাম মন্দির দখলকালে ৭৫ হাজার হিন্দুকে হত্যা করেছিল এবং তাদের রক্ত মসজিদ নির্মাণের মঙ্গলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এ ব্যাপারে নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক কমিউনাল হিস্টরি এন্ড রামস অযোধ্যা নামক গ্রন্থে বলেছেন যে, বাবর রাম মন্দির ধ্বংস করে সে স্থানে মসজিদ নির্মাণ করেছেন এ ধারণা যতখানি মিথ্যা ততখানি তাদের দুরভিসন্ধিমূলক প্রচার। বাবরী মসজিদের ধ্বংসস্তূপে ৫৫টি গর্ত খোঁড়া হলেও সেখানে কোনো রামমন্দির পাওয়া যায়নি। এমনকি বাবরী মসজিদের ১৪টি প্রস্তর স্তম্ভ প্রমাণ করে এখানে মন্দির ছিল না। বাবরী মসজিদ ধ্বংসের মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী ফলের রুই কাতলারা সেদিন যে সাম্প্রদায়িকতার পরিচয় দিয়েছিল, বিশ্বের ইতিহাসে তার তুলনা মেলা ভার। তাই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে জর্জরিত ভারতীয় সমাজকে মুক্ত করার জন্য লিবারহান কমিশনের মাধ্যমে তাদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া সময়ের অনিবার্য দাবি বলে ড. শর্মা তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।



উল্লেখ্য, ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২ সালে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার পর ১৬ ডিসেম্বর অর্থাৎ ঘটনার ১০ দিন পর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মনমোহন সিং লিবারহানের নেতৃত্বে লিবারহান কমিশন গঠন করা হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ৩০ জুন ২০০৯ সালে তাদের ৯০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়। ২৪ নভেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি. চিদাম্বরম ভারতীয় পার্লামেন্টে রিপোর্টটি পড়ে শোনালে তুমুল হইচই হয়। এমনকি হাতাহাতির ঘটনা পর্যন্ত ঘটে। লিবারহান কমিশনের এই তদন্ত প্রতিবেদনে ৬৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে আছেন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী, তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা এল.কে. আদভানী, বিজেপির সাবেক সভাপতি মুরলি মনোহরযোশি, উত্তর প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংযাদব, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা অশোক সিংঘাল ও প্রবীণ ভোগরিয়া আরএসএস তথা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের প্রধান কে.এম. সুদর্শন ও গোবিন্দাচার্য সংঘ পরিবারের সাবেক নেত্রী উমা ভারতী, শিব সেনার বালচাক, বিনয় কার্নিয়ার গিরিবাজ কিশোর প্রমুখ। এ প্রতিবেদনের পর বাজপেয়ী, আদভানী, যোশি প্রমুখ সাফাই গেয়ে নিজেদের দায়িত্ব এড়াতে চাইলেও উমা ভারতী বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার নৈতিক দায়িত্ব স্বীকার করে বলেছেন, বলতে দ্বিধা নেই যে, বাবরী মসজিদ ভাঙ্গায় আমার বড় ভূমিকা ছিল। আদভানী বাবরী মসজিদ ধ্বংসের দিনকে তার জীবনের অন্যতম দুঃখজনক ঘটনা বলে নিজের দায় এড়াতে চেষ্টা করেছেন। অথচ তিনি ১৯৯০ সালে বাবরী মসজিদের স্থানে রামমন্দির নির্মাণে হিন্দু জনতাকে উদ্বুদ্ধ করতে ভারতব্যাপী প্রপাগান্ডা চালিয়েছিলেন। ১৯৯২ সালের ৫ ডিসেম্বর লক্ষ্নৌতে বলেছিলেন, বাবরী মসজিদ গুঁড়িয়ে দিয়ে ইয়াঙ্গ অর্থাৎ ধর্মীয় উৎসব পালন করা হবে। উল্লেখ্য, বাবরী মসজিদ ভাঙ্গায় ভারতে দাঙ্গায় প্রায় দুই হাজার মানুষ মারা যায় এবং শত কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতি হয়।



মোঘল সাম্রাজ্যের শাসনকাল পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, কোনো সম্রাট অন্য কোনো ধর্ম বিশ্বাসীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেননি। পুত্র হুমায়ুনকে লেখা বাবরের অসিয়তনামা এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন, বৎস! ভারত রাজ্য বিভিন্ন ধর্মে পরিপূর্ণ। মহান আল্লাহর প্রশংসা করি, যিনি তোমাকে এখানকার রাজত্ব দান করেছেন। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের প্রতি সমদর্শিতা ও ন্যায় বিচার পালন করে চলাই তোমার কর্তব্য হবে। ভারতীয় লেখক প-িত সুন্দর লাল 'ভারতে ইংরেজ রাজ' নামক গ্রন্থে বলেছেন, সকল মোঘল সম্রাটের লক্ষ্য ছিল সবসময়ই হিন্দু মুসলিম সমমর্যাদা সম্পন্ন রাখা। উভয় ধর্মকে সম্মান করা হতো। ধর্ম বিষয়ে কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব করা হতো না। প্রত্যেক বাদশার পক্ষ হতে অসংখ্য হিন্দু মন্দিরকে জায়গীর এবং দেবোত্তর সম্পত্তি দান করা হয়েছিল। এখনো হিন্দু পূজারীদের কাছে বাদশা আওরঙ্গজেবের স্বহস্তে লিখিত ফরমান পাওয়া যায়। যাতে জায়গীর এবং দেবোত্তর সংক্রান্ত আলোচনা বিদ্যমান। এলাহাবাদে মেহেশ্বর নাথ মন্দিরের পূজারী বেনারস জেলা জগজীবনের পুত্র গিরিধরকে মহেশ্বর গ্রামের যদুমিত্র এবং প-িত বিশ্বধর মিত্রকে জায়গীর দানের প্রমাণ পাওয়া যায়। অথচ ইংরেজ শাসকরা প্রজানুরাগী মোঘল সম্রাটদের নিষ্ঠুর শাসক ধর্মীয় গোঁড়ামিতে আচ্ছন্ন বলে ভারতবাসীর কাছে প্রচার করে তাদের বিভ্রান্ত করেছে এবং ভারতের স্বাধীনতার পরে সে বিভ্রান্তির সুবাদে মসজিদের নিচে রামের মূর্তি বিদ্যমান এমন যুক্তিতে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।



সুপ্রিম কোর্টের ৯ নভেম্বরের রায় অনুযায়ী অযোধ্যায় মসজিদ নির্মাণের জন্য ৫ একর জমি পাওয়া যাবে। সে জমিতে মসজিদ নির্মাণ হবে। মুসলমানরা নামাজ আদায় করতে পারবে। তবে প্রস্তাবিত সেই মসজিদ কোন ক্রমেই বাবরী মসজিদ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মনে হয় না। এই অবস্থায় রিভিউ পিটিশন করা হবে। ভারতের মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট ভারতীয় ইতিহাসের সাথে জড়িত এই বাবরী মসজিদ স্বস্থানে পুনঃ নির্মাণ করার বিষয়টি সহানুভূতির সাথে দেখবে এই প্রত্যাশায় শেষ করছি।



লেখক : সংগঠক ও সমাজকর্মী।



 



 



 


এই পাতার আরো খবর -
    আজকের পাঠকসংখ্যা
    ৭০১৭৪১
    পুরোন সংখ্যা