চাঁদপুর, শুক্রবার ৮ নভেম্বর ২০১৯, ২৩ কার্তিক ১৪২৬, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৮-সূরা মুজাদালা


২২ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


 


 


 


 


assets/data_files/web

আনন্দ এমন একটা ফল যা অনুন্নত দেশে দুষ্প্রাপ্য। -জন কেনড্রিক।


 


 


 


 


প্রত্যেক কওমের জন্য একটি পরীক্ষা আছে আর আমার উম্মতদের পরীক্ষা তাদের ধন-দৌলত।


 


 


ফটো গ্যালারি
আল্লামা রুহুল্লাহ : নবী প্রেমের এক দেদীপ্যমান নক্ষত্র
০৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ্ হিকমত প্রদান করেন যাকে চান এবং যে ব্যক্তি হিকমত প্রদত্ত হয়েছেন তিনি প্রভূত কল্যাণপ্রাপ্ত হয়েছেন, আর উপদেশ মানে না কিন্তু বোধশক্তি সম্পন্ন লোকেরা। (সুরা আল-বাক্বারাহ-২৬৯)



শীতের রুক্ষ আচরণে প্রকৃতি যখন মৃতপ্রায় তখনি ঠিক আগমন ঘটে বসন্তের। প্রকৃতি হয়ে উঠে সজীব-সতেজ। নবরুপে সাজে প্রকৃতি। অনরূপভাবে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের চাঁদপুর জেলায় ঈমান বিধ্বংসী মতবাদ যখন কুফরির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলো, বিশেষ করে ইসলামের লেবাছে কিছু কুচক্রী যখন সরলপ্রাণ মুসলমানদের দ্বিধাবিভক্ত করে হীন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল, ঠিক এমনি এক নাজুক পরিস্থিতিতে ইসলামের মহান ত্রাণকর্তার ভূমিকায় ধুমকেতুর ন্যায় আবির্ভূত হন ক্ষণজন্মা এক মহাপুরুষ, যাঁর ক্ষুরধার বক্তব্য ও তাত্তি্বক যুক্তির সামনে অসাড় প্রমাণিত হয় সব ভ্রান্ত মতবাদ; সুপ্রতিষ্ঠিত হয় সত্য। তিনি আর কেউ নন, হিজরি পঞ্চদশ শতাব্দির শায়খুল ইসলাম, ওয়াইস ক্বুরুনে যামান, শাহসুফি আল্লামা হযরত মাওলানা মুহাম্মদ রুহুল্লাহ আল-আবেদী নক্সবন্দীয়া মুজাদ্দেদিয়া (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)।



অসময়ের রোষানলে যখন সবকিছু প্রশ্নের মুখে,



তখন বঙ্গ-জমিনে এক মুজাদ্দিদের আগমন ঘটে।



এ যেন কোনো রূপ শরীয়তের ছাঁচে।



বিকশিত হয় ইসলাম,



প্রতিষ্ঠিত হয় সত্য।



রাতের কালো দূর করে সকাল পেল চিরযৌবন,



আলোকের বিচ্ছুরিত পরিবেশ,



বারবার স্মরণ করায় সে মহান আউলিয়ার।



যিনি হলেন রুহুল্লাহ মোজাদ্দেদী।



জন্ম : আল্লামা রুহুল্লাহ সাহেব (রহঃ) ১৯২৭ ঈসায়ী সাল মোতাবেক ১৩৪৬ হিজরিতে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত রাজারগাঁও গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হলেন শাহসুফী আল্লামা মুহাম্মদ কালীমুল্লাহ (রহঃ) এবং মাতা হলেন আবেদা জয়গুনা খাতুন। পিতা-মাতা উভয়েই খোদাভীরু এবং আশিক্বে রাসুল ছিলেন। তাঁর পিতা সে সময়ে সুন্নীয়তের একজন প্রসিদ্ধ আলেম এবং বড় বুজুর্গ ছিলেন। সেই তা'লিমের ধারায় তাঁর যোগ্য সন্তান হিসেবে আল্লামা রুহুল্লাহ (রঃ)ও পরহেজগার এবং আশিক্বে রাসুল হিসেবে গড়ে ওঠেন।



প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : প্রাথমিক শিক্ষা তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকেই লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি হাজীগঞ্জ উপজেলাধীন সাদ্রা হামিদিয়া ফাযিল মাদ্রাসা হতে দাখিল (এসএসসি) ও আলিম (এইচএসসি) এবং ফাজিল (ডিগ্রি) শ্রেণীতে সাফল্যের সাথে কৃতকার্য হন। পরে ঢাকা মাদ্রাসা-ই-আলিয়া হতে কামিল (হাদিস) শেষ করেন এবং সাফল্যের সাথে কৃতকার্য লাভ করেন।



বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ : রাসুলে খোদা হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাত অনুযায়ী হাজিগঞ্জ উপজেলার রামপুর ইউনিয়নস্থ কামরাঙ্গা গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মরহুম মৌলভী আব্দুল মজিদ (রঃ) সাহেবের কন্যা মোহতারামা ফজিলাতুন্নেসার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।



তাঁর প্রসিদ্ধ শিক্ষকবৃন্দ : অধিকন্তু তিনি উস্তাযুল উলামা শায়খুল ইসলাম আল্লামা হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ আমিমুল এহ্ছান আল-বারাকাতী হানাফী (রহঃ)-এর সুযোগ্য ছাত্র ছিলেন এবং সাদ্রা দরবারের পীর সাহেব মুফতিয়ে আহলে সুন্নাহ আল্লামা মুহাম্মদ ইসহাক্ব (রহঃ)-এর প্রিয়ভাজন ছাত্র ছিলেন।



দ্বীনি প্রাতিষ্ঠানিক খেদমত : তিনি ছাত্রাবস্থায়ই স্বীয় ওস্তাদ সাদ্রা দরবারের পীর সাহেবের কাছে বায়াত গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে পীর সাহেবের আদেশক্রমে সাদ্রা হামিদিয়া ফাযিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। এখান থেকে পরে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা শেষ করে গোপালগঞ্জ জেলার একটি ফাযিল মাদ্রাসায় অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। পরে তিনি গোপালগঞ্জ থেকে ফিরে আসেন নিজ জন্মস্থান চাঁদপুরে। তিনি হাজীগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত সাতবাড়িয়া ফাযিল মাদ্রাসায় আরবি বিষয়ের অধ্যাপক ছিলেন। কামরাঙ্গা ফাযিল মাদ্রাসায় আরবি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন বেশ ক'বছর। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে চাঁদপুর নতুনবাজার ফাযিল মাদ্রাসা ও রাজারগাঁও মাদ্রাসায় অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তিনি চাঁদপুর শহরস্থ পুরাণবাজার ওসমানিয়া ফাযিল মাদ্রাসার আরবি বিভাগের অধ্যাপনার দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর ওফাতের পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ মাদ্রাসার অধ্যাপনার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি মসজিদের খেদমতের দায়িত্বেও ছিলেন। চাঁদপুর শহরের নতুনবাজারস্থ ঐতিহাসিক বেগম জামে মসজিদে তিনি দীর্ঘ ২৬ বছর (১৯৬৪-৯০) খতিবের দায়িত্বে ছিলেন। এই মহান আল্লাহর অলি মেঘনার পূর্বপাড়ে তথা পুরো চাঁদপুর জেলায় বেগম মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসেবে সমধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি চাঁদপুর জেলার আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন এবং গাউছিয়া কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন।



তিনি প্রথম জীবনে সাদ্রা দরবারের পীর সাহেব আল্লামা হযরত মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক (রহঃ)'এর কাছে বায়াত গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি পঞ্চদশ শতাব্দীর মোজাদ্দেদ, ইমামে রাব্বানী, মুফতিয়ে আজম, আওলাদে রাসুল, আল্লামা শাহসুফী আবু নছর সৈয়দ মুহাম্মদ আবেদ শাহ্ মোজাদ্দেদী আল-মাদানী (রাঃ)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করে বায়াতে রাসুলের নেয়ামত লাভে ধন্য হন এবং ওফাতের পূর্ব পর্যন্ত এই বায়াতের উপরেই অটল-অবিচল ছিলেন।



সুন্নীয়তের ময়দানে তাঁর অবদান : আল্লামা রুহুল্লাহ (রঃ) বেগম মসজিদের ইমাম ও খতিব যতোদিন ছিলেন, ততদিন এই বেগম মসজিদকেন্দ্রিক ছিলো চাঁদপুর জেলায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সকল কার্যক্রম। ইমান ও আকিদার ক্ষেত্রে তিনি আমৃত্যু আপসহীন ছিলেন। ওহাবী, মওদুদী, খারেজী, তাবলিগী ও লামাজহাবীসহ সকল ভ্রান্ত দল তাঁকে যমদূতের ন্যায় ভয় করতো। তাঁর এলেম এবং আমলের গুণে বাতিলপন্থী বড় বড় আলেমও তাঁর সামনে আকায়েদী এবং আমলী কোনো মাসয়ালা নিয়ে দাঁড়াতে সাহস করতো না। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, আহলে বাইত ও আউলিয়ায়ে কেরামগণের শান ও আজমত নিয়ে কোনো বাতিলপন্থী তাঁর সামনে কটাক্ষ করে রেহাই পেতো না। তাৎক্ষণিক তিনি ব্যাঘ্রের ন্যায় হুঙ্কার দিয়ে কোরআন-হাদিসের দলিল দিয়ে তাদের ধরাশায়ী করতেন।



 



তাঁর সাথী যুগশ্রেষ্ঠ আলেমগণ : ইমামে রাব্বানী আওলাদে রাসুল আল্লামা আবেদ শাহ মোজাদ্দেদী (রাঃ)-এর কাছে তিনি বায়াত গ্রহণ ছাড়াও বাংলাদেশের তৎকালীন সময়কার যুগশ্রেষ্ঠ আলেম ও বুজুর্গগণের সাথে তাঁর ছিলো হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। ওইসব আলেমগণের অনেকেই বেগম মসজিদে এবং চাঁদপুর শহরে তাঁর নেতৃত্বে উদ্যাপিত তাফসির মাহফিল ও সুন্নী সম্মেলনে নিয়মিত আমন্ত্রিত মেহমান হিসেবে আসতেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন_শায়খুল হাদিস আল্লামা ফজলুল করিম নক্শবন্দী (রঃ), আল্লামা হাফেজ এমএ জলিল (রঃ), শাহপুর দরবার শরীফের পীর সাহেব ড. আহমদ পেয়ারা বাগদাদী (রঃ), মুফতিয়ে আহলে সুন্নাত গাজী আকবর আলী রেজভী (রঃ), উয়ারুকের আল্লামা নূরুল হক (রঃ), আল্লামা আলী হোসাইন (রঃ), আল্লামা শেখ আবদুল করিম সিরাজনগরী, আল্লামা আবদুল বারী জেহাদী, আল্লামা নোমান ওছমানী (রঃ), মুফতি আবদুর রব আল-কাদেরী, মুফতি রুহুল আমিন মানছুরী, চট্টগ্রামের আল্লামা আইয়ুব আলী আজমী (রঃ), আবদুর রহমান আল-কাদেরী (রঃ), আমিরুল ইসলাম জালালী (রঃ)সহ আরো বহু প্রসিদ্ধ ওলামায়ে কেরাম। এসব বিজ্ঞ আলেমগণ সকলেই আল্লামা রুহুল্লাহ (রঃ)-এর আতিথেয়তা গ্রহণ করার সৌভাগ্য হয়েছে।



ওফাত : প্রখ্যাত এই আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা মুহাম্মদ রুহুল্লাহ (রঃ) ১৯৯৭ সালের ৮ নভেম্বর মোতাবেক ১৪১৮ হিজরির ৬ রজব রাত ১১টা ৪৫ মিনিটের সময় মাওলার ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর সানি্নধ্যে চলে যান। ইন্তিকালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি চাঁদপুর ওসমানিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আরবি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।



তাঁর জানাজায় অসংখ্য আলেম-উলামা এবং সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। তাঁকে তাঁর গ্রামের বাড়ি হাজিগঞ্জ থানাধীন রাজারগাঁও গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর পিতা-মাতার পাশে দাফন করা হয়।



 



লেখক : সিরাজুম মুনীর তানভীর, অনার্স (২য় বর্ষ), হাদিস বিভাগ, জামেয়া আহমাদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা, ষোলশহর, চট্টগ্রাম।



 



 



 


এই পাতার আরো খবর -
    আজকের পাঠকসংখ্যা
    ১১১০৩৩৬
    পুরোন সংখ্যা