চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৬, ২০ জিলহজ ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৪-সূরা কামার


৫৫ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


 


 


 


assets/data_files/web

একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি সাদা কাকের মতোই দুর্লভ। -জুভেনাল।


 


 


মানুষ যে সমস্ত পাপ করে আল্লাহতায়ালা তার কতকগুলো মাপ করে থাকেন, কিন্তু যে ব্যক্তি মাতা-পিতার অবাধ্যতাপূর্ণ আচরণ করে, তার পাপ কখনো ক্ষমা করেন না।


 


 


ফটো গ্যালারি
বিশ্বকবির নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি এবং নাইটহুড উপাধি বর্জন
মোঃ কায়ছার আলী
২২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


এই পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর মোটামুটি সবই বিতর্কময়। চাঁদ সুন্দর, চাঁদ কলঙ্কময়; কন্টকাকীর্ণ শ্রেষ্ঠ পুষ্প গোলাপ ; অপার্থিব সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী ক্লিওপেট্রা, ট্রয়ের হেলেন কিংবা প্রিন্সেস ডায়না। প্রিয়তমার প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টান্ত নাকি নান্দনিক স্থাপত্যের নিদর্শন, রাজকীয় সমাধি, নাকি ইতিহাসের সাক্ষী, সৌখিন রাজা-সম্রাট শাহ্জাহানের বিলাসিতা নাকি অন্য কোনো রহস্য সপ্তাশ্চর্য আগ্রার তাজমহল? কারো নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তি চির সুন্দর তাজমহলের মত বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। বিতর্ক চিরন্তন। বিতর্কের ফলে ঐ বিষয়ের কোনো মান, মর্যাদা, সম্মান বা সৌন্দর্য কখনো কমে না বরং বাড়ে। নিষিদ্ধ বা বিতর্কিত বিষয়ের প্রতি সর্বদা মানুষের কৌতূহল সীমাহীন। আমার বন্ধু বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রত্যুৎপন্নমতি, সাবেক প্রধান শিক্ষক ময়েজ উদ্দীনকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলাম, বিশ্বকবির রচনার কোন্ দিকটি আপনার বেশি ভাল লাগে? উনি বললেন, কোন্ দিকটা বলব? কয়েক ঘন্টা পর রাতে আমাকে বললেন, 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি...' শুধু আমাদের অহংকারের জাতীয় সংগীতই নয়, বিশ্ববরেণ্য এই কবি ভারত ও শ্রীলঙ্কারও জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। তিনটি দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা বিশ্বের আর দ্বিতীয়জন নেই। ১৯১৩ সালে এশীয়দের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম নোবেল পুরস্কার পান। তিনি পৃথিবীর এক বিস্ময়কর, বহুমুখী প্রতিভাবান, বিশ্বনন্দিত, অতুলনীয়, অবিস্মরণীয়, সহিষ্ণুতা সম্পন্ন একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর মননশীলতা, সৃষ্টি শুধু বাংলা সাহিত্য ও বাংলা ভাষাভাষি মানুষকেই সমৃদ্ধ করেনি, বিশ্ব মানবতাকেও তিনি সমৃদ্ধ করেছেন। শুধু পুুরস্কার ও উপাধি এসব তাঁর স্বীকৃতি হলেও পূর্ণাঙ্গ নয়। তিনি কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে ১৮৬১ সালের ৭ই মে জন্মগ্রহণ না করলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আজকে যে ঈর্ষণীয় সাফল্যে পৌঁছেছে তা কখনোই সম্ভরপর হতো না। পৃথিবীতে যত কাল বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে, তিনিও ততদিন বেঁচে থাকবেন। সামন্ত পরিবারে জন্মালেও এর বিষবাষ্প ও কলুষতা থেকে মুক্ত হয়ে সারাজীবন মাটির কাছে নিবিড়ভাবে থেকেছেন। তিনি আধুনিক, সংস্কারমুক্ত ও প্রগতিশীল মানুষ ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের সকল শাখায় তিনি দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। কবিতা, সংগীত, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, রম্যরচনা ইত্যাদি সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর পদচারণা ছিল স্বচ্ছন্দ, উজ্জ্বল। তিনি একাধারে কবি, দার্শনিক, গীতিকার, সুরকার, শিক্ষাবিদ, চিত্রশিল্পী, নাট্য প্রযোজক ও অভিনেতা।



প্রচ- ধৈর্যশীল বিশ্বকবির দীর্ঘ আশি বছরের জীবনে এসেছে নানা রকম অপবাদ, দুঃখ, কষ্ট, অপরের লেখা চুরি করার মিথ্যা অভিযোগ। এর কোনোটাতেই তিনি ভেঙ্গে পড়েননি, হারিয়ে ফেলেন নি আপন মনোবল এবং এই সব প্রতিকূল সমালোচনা ও বিদ্বেষ বিষ আকণ্ঠ পান করে তিনি নীলকন্ঠ হয়েছেন। দুঃখ, কষ্ট, বিদ্বেষ, দুর্দৈবের অভিঘাতে নীচ প্রকৃতির মানুষ যেমন আরও নীচ হয়ে যায়, মহৎ মানুষ হয়ে উঠেন আরও মহৎ। একবার তিনি দীনেশ চন্দ্র সেনকে লিখেছিলেন, "তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বিদ্বেষমূলক মন্তব্য কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত হলে তিনি তো পড়েনই না এমনকি আত্মীয় স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবদের ঐ লেখাগুলো তাঁর চোখের সামনে আনতে বা ঐ সম্পর্কে আলোচনা করতে নিষেধ করেন।" কারণ এতে মানসিক স্থৈর্য বিচলিত হবার সম্ভাবনা থাকে। অনর্থক কাদা ঘেঁটে কী হবে? বিদ্বেষে কোনো সুখ নেই, কোনো শ্রদ্ধা নেই, এই জন্য বিদ্বেষটার প্রতিও যাতে বিদ্বেষ না আসে তার জন্যে বিশেষ ভাবে চেষ্টা করতে থাকেন। জীবন প্রদীপের তেল তো খুব বেশি নয়। সবই যদি রোষে, দ্বেষে , হুঃ হুঃ শব্দে জ্বালিয়ে ফেলে তবে ভালোবাসার কাছে এবং আরতির বেলায় কী করবে? রাষ্ট্রের একজন ব্যক্তি বড় হলে অন্যজন ছোট হয়ে যায় না। পরশ্রীকাতরতা, হীনমন্যতা ও ব্যক্তি বিশেষের অস্তিত্ব সংকটের আশঙ্কা পৃথিবীর সর্বত্রই কম-বেশি আছে। বিশ্বকবির নোবেল প্রাপ্তির সংবাদ শান্তিনিকেতনে পেঁৗছায় ১৯১৩ সালের ১৩ই নভেম্বর সন্ধ্যা ৭ টায়। পুরো জাতি আনন্দিত হয় শুধুমাত্র কিছু ব্যক্তি ছাড়া। দেশী ও বিদেশী সমালোচকরা মুখ খুলতে শুরু করেন। জগদীশচন্দ্র বসু নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিশ্বকবিকে একটি লজ্জাবতী লতা উপহার দেন। মাহাত্ম্য হচ্ছে নোবেল প্রাপ্তিতে শির উঁচু না করে লজ্জাবতী লতার মত লজ্জায় অবনতমুখী হবেন। কালী প্রসন্ন সিংহ একটি ব্যঙ্গাত্মক কবিতাও লিখেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, বিপিন পাল, হেমচন্দ্র প্রমুখ সমালোচক ছিলেন। বিদ্যাসাগরের দৌহিত্র সুরেশ চন্দ্র সমাজপতির মেধা ও যোগ্যতা কোনোটাই ছিল না। তবে তিনি মনে করতেন তিনি বাংলা সাহিত্যের হকদার বা অভিভাবক। তাই তিনিও বিরোধিতা করতেন। তবে বিশ্বকবি জানতেন জীবিত কালে গ্যাটেও নিস্তার পাননি প্রতিপক্ষের আক্রমণ থেকে। সমালোচকরা না বোঝার চেয়ে বুঝে বেশি বিরোধিতা করতেন।



ভারতবর্ষের মহান স্বাধীনতা অর্জনে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার কালে অনেক স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়েছে, প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে, অসংখ্য মানুষকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে কোনো কোনো সময় প্রতিরোধ আন্দোলন ছিল তুঙ্গে। সেই সব ক্রান্তিলগ্নে ঔপনিবেশিক শক্তির নির্যাতন যত মারাত্মক আকারে আত্মপ্রকাশ করেছে সংগ্রামী জনতার তত বেশি রক্ত ঝরেছে। ইতিহাসের এই রকম কয়েকটি রক্তক্ষয়ী মুহূর্ত হচ্ছে সিপাহী বিদ্রোহ তথা ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম, বঙ্গভঙ্গ, বুড়িবালাম, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকা- ইত্যাদি। ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল পরাধীন ভারতবর্ষে অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে ঘটেছিল এক পৈশাচিক হত্যাকা-। এই নৃশংস হত্যা যজ্ঞে মূল নায়ক ছিলেন ব্রিটিশ সেনাপতি, পাঞ্জাবের সামরিক শাসক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার। ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে তাদের পূর্বপুরুষেরা এই ভারতবর্ষে এসেছিলেন। আর এই ভারতের সবুজ, শ্যামল, কোমল মাটি ও আবহাওয়ায় জীবনের পঞ্চান্নটি বসন্ত কাটিয়েছেন। শুধুমাত্র অহংকার বা জাতীয় অহমিকার জন্যে তিনি নির্মম, নিষ্ঠুর ও নির্দয় হত্যাকা-ের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, ইংরেজদের জন্মই হয়েছে বিশ্বকে শাসন করতে। আর ইংরেজদের প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, "ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনো অস্ত যায় না।" তারাই এ উপমহাদেশে একমুখী শিক্ষার পরিবর্তে বহুমুখী শিক্ষা, শাসন ব্যবস্থাকে দ্বৈত শাসন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অবরুদ্ধ ছিটমহল, বাংলা ও পাঞ্জাবকে দুইভাগ (ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে), কাশ্মিরকে তিন ভাগ (ভারত, পাকিস্তান ও কিছু অংশ চীন) করে সারাজীবনের জন্য দ্বন্দ্ব লাগিয়ে রেখেছেন। শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারাবিশ্বকে নিয়ে তারা এভাবেই এখনো খেলছে। তারা সকাল বেলা একপক্ষকে বলে, "যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খাওয়া যায়" আবার বিকালে বেলা অন্যপক্ষেকে বলে "দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল অনেক ভাল।" তারা কুর্দিস্তানকে তিন ভাগ (ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক) ও বেলুচিস্তানকেও তিন ভাগ (ইরান, পাকিস্তান, আফগানিস্তান) করে মানচিত্রে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। কী কারণে তা এখন বিশ্ববাসী জানে। স্বাধীন আরাকান এক সময় বাংলাদেশের সাথে যুক্ত ছিল। আজ আরাকান (রোহিঙ্গারা) মায়ানমারের সাথে যুক্ত। সুতরাং এর ফলে দ্বন্দ্ব সংঘাত আজও অব্যাহত রয়েছে। হিন্দু-মুসলিম সম্মিলিতভাবে এই ইংরেজদের বা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্যে লড়াই করেছে, বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছে। জালিয়ানওয়ালাবাগে সামরিক আইন জারি হওয়ার পূর্বে বা উপেক্ষা করে হাজার হাজার জনতা সমবেত হয়েছিল। সামরিক প্রজ্ঞাপনে চারজনের অধিক লোকের একত্রে সমাবেশ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু এই প্রজ্ঞাপন যত ব্যাপকভাবে প্রচার করার কথা ছিল, তা করা হয়নি। দুর্ভাগ্য হোক বা সৌভাগ্য হোক, সেদিন জালিয়ান ওয়ালাবাগে ছিল বৈশাখী মেলা, যাকে মানুষের প্রাণের মিলনকেন্দ্র বলা হয়। তাছাড়া আবালবৃদ্ধবনিতা মেলাকে কেন্দ্র করে এবং অনেকে সমাবেশকে উদ্দেশ্য করে অধিক সংখ্যক একত্রিত হয়েছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, যারা এসেছিল তাদের অধিক সংখ্যক মানুষ গ্রামবাসী। তারা এই প্রজ্ঞাপন সম্পর্কে কিছুই অবগত ছিলেন না। আর অমৃতসরের নাগরিকদের সদ্য জারি করা সামরিক আইন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ধারণাও ছিল না। সমাবেশ শুরু হয় বিকেল ৫টার দিকে। তখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে সমাবেশকারীর মধ্য থেকে একজন বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। আর এদিকে জেনারেল ডায়ার তার আসল মতলব চরিত্রার্থ করার জন্যে সশস্ত্র সৈন্য বহর নিয়ে প্রবেশদ্বারের দুই দিকে সৈন্য মোতায়েন করে। কোনো রকম উস্কানিমূলক বক্তব্য অথবা জনতার আক্রমণ ছাড়াই পাঁচ হাজার লোকের সমাবেশে কুখ্যাত ডায়ার সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেন এবং বিরতি ছাড়াই দশ মিনিটেরও অধিক সময় ধরে গুলি চালানো হয় নিরীহ, নিরস্ত্র জনতার উপরে। গুলিবৃষ্টিতে জমায়েতের মানুষগুলো মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, রক্তে ভিজে যায় তাদের জামা ও পরিধেয় বস্ত্র, রক্তে রঞ্জিত হয় জালিয়ানওয়ালাবাগের সবুজ শ্যামল মাটি। রেরুবার মাত্র একটা সরু পথ ছিল। আর দেখা যায় সেখানেই আগলে আছে সেনাবাহিনী। জনতার পতন বা মাটিতে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে জেনারেল ডায়ার মনে মনে হাসলো আর ভাবলো, প্রাণের জন্যে যদি এতই মায়া থাকে তবে বিদ্রোহ করেছিলে কেন? সমাবেশে হাজির হলেই বা কেন? এখন পালাতে চাচ্ছই বা কেন? মর্মান্তিক বা হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখে তিনি আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন। কারণ একটা বুলেটও বাজে খরচ হয়নি। গ্রামের সাধারণ সহজ সরল মানুষ চিরকাল হৈ চৈ থেকে দূরে থেকেছেন আর গোলাগুলি বা মৃত্যুভয় সেটা তো অনেক বড় বিষয়। তাই তাদের মধ্যে কেউ কেউ উঁচু দেয়াল টপকিয়ে পালাতে চেয়েও ব্যর্থ হন। সেই হত্যাকা-ে সেনাবাহিনী ১৬৫০ রাউন্ড গুলি ছুড়েছিল। নিহত হয়েছিল প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ দেশপ্রেমিক জনতা। এত লোক হত্যাকা-ের পরেও খুনি ডায়ার কোনো অনুশোচনা বা দুঃখ প্রকাশ করেনি।



সেই হত্যাকা-ের একটা কিংবদন্তীও আছে। বাগের মধ্যে ছিল একটা কুয়ো। পূর্ব থেকে যারা জানত যে সেখানে একটি কুয়ো আছে, তারা সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে কুয়োর ভিতর লাফ দিয়ে পড়ল। প্রায় ৪০ জনের মত মৃত্যুভয়ে ভীত লোক। পানি সংগ্রহের জন্যে অথবা ভৌতিক কা- দেখার জন্যে কুয়োর কাছে ডায়ার নিজে গিয়ে অনেক লোককে একত্রে দেখে খুব খুশি হয়। এক পশলা গুলি ছোড়ার পর বড় বড় পাথর গড়িয়ে নিচে ফেলে আশ্রিত লোকগুলোকে হত্যার নির্দেশ দেয়। এ নির্দেশ শুনে শিউরে উঠল কুয়োর মধ্যে আশ্রিত হতভাগ্য লোকগুলো। কুয়োর মধ্যে লোকগুলোকে জীবন্ত প্রোথিত করা হল। মৃত্যু ভয় থেকে তারা পালিয়ে গিয়ে অবশেষে সেখানেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলো। পরবর্তীতে পাঁচ মিনিট গুলি চালিয়ে আর বেয়নেট দিয়ে গুঁতিয়ে তাঁদের মারা হলো। বাল্যকালে ডায়ার খাঁচার মধ্যে খুঁচিয়ে ঠা-া মাথায় ধরে ধরে যেভাবে ইঁদুর মারত আজ সেভাবেই জ্যান্ত মানুষগুলিকে মারলো। ইঁদুরগুলোর পালানোর পথ নেই দেখে ডায়ার মজা পেত। আর সেই ইঁদুর মারার ঘটনাটি পরদিন সহপাঠীদের বলে তাদের কাছ থেকে বাহবা নিত। ছাত্র জীবনে স্কুলে ডায়ারের পরিচয় ছিল দুরন্ত, বড় একরোখা ও গোঁয়ার হিসেবে। শিক্ষকদের সামনেই মুখে মুখে তর্ক ও তাদের অবজ্ঞা করে চলত। ছেলেমেয়েদের উত্ত্যক্ত করা এবং শিক্ষকদের মার খাওয়া ছিল তার কাজ। লজ্জা বা অনুশোচনা কোনোটাই তার ছিল না। একদিন স্কুলের গেট খোলা থাকায় একটা বাছুর ঢুকে পড়লে সে বাছুরটিকে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে আধামরা করে ছাড়ল। বেতের আঘাত কচি বাছুরটি সহ্য করতে না পেরে প্রাণ স্পন্দন থেমে গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মারা গেল। কিছুক্ষণ পর মা গাভীটা আর্তনাদ করে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে বাছুরটাকে ডাকল। বাছুরটি মায়ের ডাকে সাড়া দিল না, আর বাটেও মুখ দিল না। সদ্য সন্তান হারানোর শোকে মা গাভীটি চিৎকার করতে লাগলো। ডায়ার শুধু মানুষ নয়, বোবা পশুরও সঙ্গে নির্দয় ব্যবহার করেছে।



এই নিষ্ঠুর হত্যাকা-ে পৃথিবীব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল এবং প্রতিটি শান্তিপ্রিয় বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত, আহত ও জর্জরিত করেছিল এই হত্যাকা-। করেনি শুধু ইংরেজ সাহেবদের। পরবর্তীতে মামলার সাক্ষী লছমির বর্ণনা মতে জানা যায়, সে রাতে লছমি তার অসুস্থ-পীড়িত স্বামীকে (উদয় সিং) খুঁজতে বেরিয়েছিল। একবার ভাবল তার স্বামী বৈশাখী মেলায় গিয়েছে, হয়তো ফিরে আসবে। কিন্তু অপেক্ষা করা যে কঠিন কাজ। মাত্র মাস খানেক আগে বিয়ে হয়েছে। ধনী মানুষ হলে হানিমুনে যেত। হানিমুনে না গেলেও স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। হঠাৎ শুনতে পেল গুলির শব্দ এবং অজানা আশংকায় মনটা বার বার জেগে উঠলো। ভদ্রকুল বধূ-রমণী-ঘরণী রাতে আজ ঘরের বাইরে। হত্যাকা-ের প্রত্যক্ষ দৃশ্য নিজ চোখে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এক পেয়ালা পানির জন্যে আহতদের কাতর আবেদন, ময়লা, দুর্গন্ধ ও নর্দমার কাছে গুলিবিদ্ধ মানুষদের পড়ে থাকার দৃশ্য, মৃত্যুপথযাত্রীদের সেই মুহূর্তে সাধ্যমতো পান করাল অমৃত সুধা। ভয়াবহ দৃশ্য দেখে স্বামীর কথা ভুলে গেলো। মনে হলো শতশত উদয় সিং বাগের চারদিকে পড়ে আছে। পাঠকেরা আমার চেয়ে ভাল জানেন, এ উপমহাদেশের গৃহবধূরা কোন্ মুহূর্তে স্বামীকে ভুলে যায়? তাঁরা রাত জেগে স্বামী বাড়িতে ফিরে আসার জন্য পথ চেয়ে বসে থাকে, আর কখনো স্বামীর নাম নিজ মুখে উচ্চারণ করে না। আমাদের মায়েরা সন্তানের জ্বর হলে মাথায় জলপট্টি দেয় এবং রাত জেগে সেবার পাশাপাশি মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে সন্তানের সুস্থতার জন্য প্রার্থনা জানায়। বোনেরা অসুস্থ ভাইয়ের খবর পেয়ে শত বাধা পেরিয়ে ভাইকে দেখার জন্যে ছুটে আসে। সাধারণ গৃহবধূ লছমি সমগ্র নারী (মা, বোন ও স্ত্রী) জাতির প্রতিনিধিত্ব করে। সেই লছমির স্বামীর কথা ভুলে যাওয়ার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আনতে হবে।



এখানেই শেষ নয়, হত্যাকা-ের মামলায় ভুল বিবেচনার জন্য (প্রহসনের বিচার) দোষী সাব্যস্ত করে সভ্য ইংরেজ সরকার ডায়ারকে মৃদু তিরস্কার করেছিল মাত্র। ধিক! এই সভ্যতাকে। এই ইংরেজ সভ্যতার চরিত্র আজ সারা পৃথিবীতে উন্মোচিত। ডায়ার চাকরি থেকে অব্যাহতির পরে ইংল্যান্ডে দীর্ঘ সাত বছর বেঁচে ছিলেন অর্ধমৃত, অসহনীয়, দুরারোগ্য ব্যাধি সন্ন্যাস রোগে। মৃত্যুর পূর্বেই তার নড়াচড়া করার মত শক্তি হলো না। আর উচ্চারণ করতে পারলো না 'ফায়ার'। কালজয়ী কবি শোকে, দুঃখে বিচলিত হয়ে ইংরেজ সরকার প্রদত্ত 'নাইট' বা 'স্যার' উপাধি ১৯১৯ সালের ২রা জুন প্রত্যাখ্যান করে রাজাধিরাজ ভারতেশ্বরকে চিঠি দিয়েছিলেন। নাইটহুড প্রত্যাখ্যানে বিশ্বকবির সমালোচক বা নিন্দুকদের কী অনুভূতি হয়েছিল জানি না। খুশি হলে হতেও পারেন, নাও পারেন। কারণ মানুষের মনের একান্ত গোপন কথা জানা যায় না। সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যে বিশ্ব কবির প্রতি পৃথিবীবাসীর শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও ভালোবাসা অনেক অনেক গুণ বেড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কর্মের মধ্যে সারাজীবন বেঁচে থাকবেন (মৃত্যু ১৯৪১ সালে ৭ই আগস্ট)। আমার দৃষ্টিতে মনে হয় বাতি (সমালোচক) যদি তার ক্ষীণ আলো নিয়ে দম্ভ করে সূর্যকে (বিশ্বকবি) চ্যালেঞ্জ করে বা অপমান করে, তবে সূর্য কি তা গ্রহণ করবে?



লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।



০১৭১৭-৯৭৭৬৩৪, শধরংধৎফরহধলঢ়ঁৎ@ুধযড়ড়.পড়স



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১৬৭৭৩৬
পুরোন সংখ্যা