চাঁদপুর, বুধবার ৮ জানুয়ারি ২০২০, ২৪ পৌষ ১৪২৬, ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৬০-সূরা মুমতাহিনা


১৩ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


১১। তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যদি কেহ হাতছাড়া হইয়া কাফিরদের নিকট রহিয়া যায় এবং তোমাদের যদি সুযোগ আসে তখন যাহাদের স্ত্রীগণ হাতছাড়া হইয়া গিয়াছে তাহাদিগকে, তাহারা যাহা ব্যয় করিয়াছে তাহার সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করিবে, ভয় কর আল্লাহ্কে, যাঁহাতে তোমরা বিশ্বাসী।


 


বুদ্ধিজীবীরাই দেশের সম্পদ, তারাই দেশের সম্পদ তুলে ধরে।


-লংফেলো।


 


 


 


বিদ্যালাভ করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্যে অবশ্য কর্তব্য।


 


 


ফটো গ্যালারি
স্মৃতির মোড়কে ইতিহাস
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান
০৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

বঙ্গবন্ধুকে সরাসরি দেখা যে কোনো বাঙালির জন্যেই পরম সৌভাগ্যের বিষয়। যাঁরাই বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন তারা প্রত্যেকেই তাঁর চিন্তা ও দেশপ্রেম দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। তাই বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর আপাদমস্তক সংগ্রামী জীবনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম। বিশিষ্ট চিকিৎসক খালেদা বেগমও সেই সৌভাগ্যবান মানুষদের একজন, যিনি বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন, রেসকোর্সে উপস্থিত থেকে সামনের সারিতে বসে ৭ মার্চের ভাষণ শুনেছেন এবং সপরিবারে রাজপথে আন্দোলন করেছেন। তিনি 'স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ এবং অন্যান্য' গ্রন্থে নিজস্ব ঢংয়ে বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা সংগ্রামের কথাসহ নানা বিষয় তুলে ধরেছেন। এ গ্রন্থে ১৩টি রচনা স্থান পেয়েছে। গ্রন্থটির ভাষা সহজ-সাবলীল হওয়ায় এটি এক ধরনের হৃদ্যতা নিয়ে পাঠকের কাছে পেঁৗছেছে। ফলে রচনাগুলো ক্লান্তি না এনে পাঠকের সাথে বঙ্গবন্ধুর আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করে যেন!

'স্বাধীনতা যুদ্ধ ও আমরা' প্রবন্ধের একাংশে খালেদা বেগম বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দর্শনের স্মৃতি তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, 'ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন যখন তুঙ্গে_তখন এমনি একসময় ফেব্রুয়ারিতে আমরা রিঙ্াযোগে নিউমার্কেট যাচ্ছিলাম। রিঙ্াচালক আমাকে বলল, 'জানেন শেখ মুজিব আজই জেল থেকে মুক্তি পাচ্ছে, প্রথমে শহীদ মিনারে এবং পরে পল্টন ময়দানে বক্তৃতা করবেন।' আমি আর নিউমার্কেট যাইনি, ফিরে এলাম, শহীদ মিনারে লোকে লোকারণ্য, তিল ধরার ঠাঁই নাই। বঙ্গবন্ধু ইতিমধ্যেই পেঁৗছে গেছেন শহীদ মিনারে। জাতির জনকের মুখ দর্শনের জন্য মন আকুল। পরিশেষে একটি জিপ গাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে প্রথম দর্শন লাভ করি মহামানবের। বজ্রকণ্ঠে চারদিক মুখরিত, আন্দোলিত, অনুপ্রাণিত ও চেতনায় শাণিত।'

বইয়ের প্রথম রচনা 'ফিরে দেখা টুঙ্গিপাড়া'। এই লেখাটি মূলত স্মৃতিচারণামূলক। লেখক টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনকের সমাধিতে যাওয়ার স্মৃতিসমূহ তুলে ধরেছেন। এ রচনায় খালেদা বেগম জানান, তিনি মাকে নিয়ে সপরিবারে ৭ মার্চ রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ শুনেছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি পরিবারের কথা মনে হলেও সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ওইসময়ের পারিবারিক চিত্রপট এমনই ছিল। অনেকেই এসেছিলেন সেদিন সপরিবারে, যারা আসেননি তারা বেতারে কান পেতেছিলেন, সে সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হলে আগ্রহীরা লোকমুখে ভাষণের কথা শুনেছিলেন। ৭ মার্চের মতো আর কোনো ভাষণ সামগ্রিকভাবে জাতিকে চূড়ান্তরূপে উজ্জীবিত করতে পারেনি।

আলোচ্য গ্রন্থের 'বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরা ও বীরাঙ্গনা কথা' রচনাটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। লেখক তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণে বীরাঙ্গনাদের আত্মত্যাগ ও হানাদারদের নৃশংস নির্মমতার কথা তুলে ধরেছেন। ধর্মের নামে সব যুদ্ধনীতি ভঙ্গ করে পাকিস্তানীরা পৈচাশিক উল্লাসে মেতেছিল। তাদের হাতে ধর্ষিত ও নির্যাতিত হয়েছে দুই লাখ দুই হাজার পাঁচশ সাতাশ জন। খালেদা বেগম জানান, ধর্ষিত ও নির্যাতিতদের মধ্যে ৫৬.৫০ ভাগ মুসলমান, ৪১.৪৪ ভাগ হিন্দু ছিল। এদের মধ্যে ৭০ ভাগ নির্যাতিতার সামনে তাদের স্বজনদের হত্যা করা হয়। আলোচ্য রচনায় লেখক কেবল নির্মমতার পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেছেন। পরবর্তী রচনা 'বীরাঙ্গনা ও স্বাধীনতা-উত্তর কার্যক্রম'-এ খালেদা বেগম বীরাঙ্গনা সুরক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরেছেন। লেখকের এ লেখাটি আরো দীর্ঘ হতে পারতো। পাশাপাশি বীরাঙ্গনাদের প্রতি সামাজিক মনোভাবের বিষয়টি সম্পৃক্ত করা গেলে নিঃসন্দেহে রচনাটি আরো সমৃদ্ধ হতো। অন্যদিকে একই গ্রন্থভুক্ত 'যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ও বীরাঙ্গনার কথা' রচনাটি একই তথ্য ও বক্তব্য ধারণ করে আছে। ফলে গ্রন্থে একই রচনার পুনারাবৃত্তি ঘটেছে।

খালেদা বেগম নিজে ১৯৬৮ সাল থেকে প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পূর্ব এবং পরবর্তী উত্তাল সময়কে তিনি সচেতনভাবে দেখেছেন। লেখকের মা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে রান্না করতেন। কখনো কখনো মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের অস্ত্র লেখকের পরিবারের কাছে লুকিয়ে রাখতে দিতেন। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে লেখকের সঙ্গী ছিলো রেডিও, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ধারণ করা ক্যাসেট প্লেয়ার। পাকিস্তানীরা এ ক্যাসেট পেলে তাদেরকে হত্যা করবে নিশ্চিত জেনেও ক্যাসেটটি তারা ফেলে আসেননি। বিজয় দিবসের দিনে খালেদা বেগম ঢাকা ছিলেন। সেই দিনটির স্মৃতিচারণ : '১৬ ডিসেম্বর দেখলাম কিছু আর্মি ট্রাক শহরে ফিরছে। তখনো বুঝিনি আর্মি আত্মসমর্পণ করেছে। অবশেষে বিকেলে বড়ভাই আমাদের উদ্ধার করে নিয়ে গেলেন নতুন ঢাকায়। পথিমধ্যে এক বাঁশিবাদক জয় বাংলার গান বাজাচ্ছিল। বড় ভাই খুশিতে তাকে ৫০ টাকা দিলেন। গুলিস্থান যেন জন সমাবেশে পরিণত।'

'বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা' প্রবন্ধে লেখক দেশ ও জাতির জন্যে বঙ্গমাতার অবদান তুলে ধরেছেন। সকল আন্দোলনে ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বঙ্গবন্ধুর পাশে ছিলেন, সাথে থেকে শক্তি জুগিয়েছেন। নেতা-কর্মীদের জন্যে তাঁর দরদ ছিল প্রবাদতুল্য। খালেদা বেগম লিখেছেন, বঙ্গমাতা 'নেতা-কর্মীদের জন্য খাবার রান্না করে রাখতেন, এমনকি যেসব নেতা-কর্মী গভীর রাত্রে ৩২ নম্বরে ফেরার সম্ভাবনা ছিল_তাদের জন্য রান্না করে পাকঘরের পিছনের দরজা খোলা রাখতেন।' ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের এমন অবদান অনেকেই প্রত্যক্ষ করেননি_ লেখকের এমন ভাষ্যে কোনো অত্যুক্তি নেই : 'বাংলাদেশের দীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলনে কেউ হয়তো প্রত্যক্ষ করেননি বেগম মুজিবের উপস্থিতি। কিন্তু তার নীরব এবং সক্রিয় উপস্থিতি ছিলো বাংলাদেশের প্রতিটি মুক্তি আন্দোলনে, দেশ গড়ার সংগ্রামে।'

'স্মৃতিতে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান ও ১৯৭০ নির্বাচন' রচনায় বর্তমান ছাত্ররাজনীতি নিয়ে লেখকের পরোক্ষ উষ্মা প্রকাশ পেয়েছে। কারণ বর্তমান ছাত্র রাজনীতি নেতিবাচক দিকে বদলে গেছে। অতীতের ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে খালেদা খানম লিখেছেন, 'তখনকার ছাত্রসংগঠনগুলির দায়িত্ব ছিল ছাত্র সংসদের নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে কলেজের উন্নতিকল্পে কাজ করা এবং নিজেদের সাংস্কৃতিমনা ও প্রগতিশীলতায় সমৃদ্ধ করা। কলেজের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা তখন নেতৃত্ব দান করত সংগঠনের।' বর্তমান ছাত্ররাজনীতি যে অতীতের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

'স্মৃতি মার্চ থেকে ডিসেম্বর' প্রবন্ধে লেখক তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের মাধ্যমে সমগ্র দেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন অবস্থা তুলে ধরেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিটি দিনই ছিল অসংখ্য ইতিহাসে পূর্ণ। খালেদা বেগম সেই ইতিহাসের সাক্ষী। আলোচ্য রচনায় লেখক ১ মার্চ থেকে শুরু করে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য দিনগুলির স্মৃতিচারণ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ''আমার মায়ের বক্তব্য ছিল, মৃত্যু তো একদিন হবেই, আর্মি আসলে আমি বলব, আমি শেখ মুজিবের লোক, তিনি জাতির নেতা, তাঁর অধীনে যুদ্ধ করছি। মারলে মেরে ফেলো।'' এই অংশটুকুর উল্লেখ করলাম এ কারণে যে, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিটি মায়েরই উচ্চারণ ছিল এমনই বজ্রকঠিন ও তীব্র। মা নিজেই সন্তানের হাতে তুলে দিয়েছেন অস্ত্র এবং বলেছেন, দেশ স্বাধীন না করে ফিরবি না_এমন মায়ের উদাহরণ একজন নয়, হাজার হাজার আছে। অন্যদিকে এ গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অবদানের কথাও রচনা তুলে ধরা হয়েছে। যেমন, 'ভোর বেলা গ্রাম থেকে যে বুড়বুড়ি করে শাক-সবজি নিয়ে ঢাকায় আসে তাদেরকে ব্যবহার করা হয়। শাক-সবজির ভিতরে অস্ত্র ঢুকিয়ে এত বড় অস্ত্রের চালান ঢাকায় ভিতরে আনা হয়।' কিন্তু আলবদর রাজাকার আর জামাতে ইসলামীরা দেশের স্বাধীনতা চায়নি। তারা উল্টো ভাই হয়ে ভাইকে হত্যা করেছে, বোনের ইজ্জত নিয়েছে। খালেদা বেগম লিখেছেন, 'খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার হলো সে সময় পিডিপির চেয়ারম্যান নূরুল আমিন পাক-সরকারের কাছে আবেদন করেছিল রাজাকার ও অস্ত্রসস্ত্র বৃদ্ধি করার জন্য। এভাবেই মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে ছিল।' 'বন্ধুরাষ্ট্র ভারত ও মুক্তিযুদ্ধ' রচনায় মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অনবদ্য অবদানের উল্লেখ করা হয়েছে। এ গ্রন্থে 'আমার রক্তবিন্দুতে ১৫ আগস্ট' শিরোনামে একটি দীর্ঘ কবিতাও স্থান পেয়েছে।

আজকের পাঠকসংখ্যা
১০৭৫০৮১
পুরোন সংখ্যা