চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৯-সূরা হাশ্র


২৪ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৪। ইহা এইজন্য যে, উহারা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করিয়াছিল, এবং কেহ আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করিলে আল্লাহ তো শাস্তিদানে কঠোর।


 


 


assets/data_files/web

আকৃতি ভিন্ন ধরনের হলেও গৃহ গৃহই। -এন্ড্রি উল্যাং।


 


 


স্বদেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ।


 


 


ফটো গ্যালারি
নিজেই নিজের দীপ হয়ে জ্বলো
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


ধর্ম মানুষের ও জগতের কল্যাণের জন্যে স্বআলোকিত মহামানবের চেতনা ও অভিজ্ঞতালব্ধ দর্শন ও অনুশীলনের অতুলনীয় পন্থা মাত্র। ধর্ম কোন স্রস্টা নামক অদৃশ্য ও কল্পিত অস্তিত্ব দ্বারা মানুষের উপর আরোপিত কোন বিষয় নয়। যেহেতু ধর্মের সৃজন ও বিস্তারণের মূখ্য উদ্দেশ্য মানবতার কল্যাণ, ব্যক্তির নিজের ও জগতের, সেহেতু ধর্মের মূল ভিত্তি যতটা না বিশ্বাস তার চেয়ে অধিক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতা। সেই নিরিখে এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের এক ও অনন্য স্বআলোকিত বোধিসম্পন্ন পরম সত্তা মহাকরুণানিধি গৌতম বুদ্ধের আবিষ্কৃত ধর্মমত আসলে একটি বিজ্ঞানসম্মত পথ অনুশীলন ব্যতীত তথাকথিত কোন অবিদ্যাসম্ভূত ধর্মাচরণ নয়। এটি একাধারে বিজ্ঞান ও দর্শনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন যাদের উভয়েরই মূলভিত্তি যুক্তি ও জিজ্ঞাসা। এতে ভক্তি বা বিশ্বাসের চেয়ে বৈজ্ঞানিক সত্যের সার্থকতা খুজে পাওয়াই অধিকতর মৌলিক। বুদ্ধের বুদ্ধত্ব লাভের প্রক্রিয়া হতেই আমরা বিজ্ঞানকে মূখ্য ভূমিকায় দেখতে পাই যেখানে মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন না করে বুদ্ধ মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছিলেন। বুদ্ধ নিজেকে বিভাজ্যবাদী হিসেবে ব্যাখ্যা করে অতি বিলাস ও অতিবৈরাগ্য পরিহার করেছিলেন। কায়-মন-বাক্য এই তিন দ্বার দিয়ে প্রমাদ সংঘটিত হয় বিধায় বুদ্ধ অপ্রমাদে জীবন যাপনের উপদেশ দিয়েছেন এবং খুব চমৎকার করে প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতি প্রবর্তন ও ব্যাখ্যা করেন। ইহা করিলে উহা হইবে - এই অমোঘবাণী নিয়ে বুদ্ধ কর্মফলকেই জীবনের প্রবাহের ধারা হিসেবে ব্যক্ত করেছেন। এই কারণে বৌদ্ধ ধর্ম সর্বাংশে একটি অনাত্মবাদী ধর্ম। দেহের কোন অংশে যেহেতু শক্তি ও পদার্থ বিনা অন্য কিছুর অস্তিত্ব সম্ভব নয় সেহেতু কোন আত্মাই নেই- এই বৈজ্ঞানিক সত্য দিয়ে বুদ্ধ কর্মফলের প্রবহমানতা দিয়ে পুনর্জন্ম ব্যাখ্যা করেছেন।



 



এই ভারতীয় উপমহাদেশ তাঁর কারণেই প্রথম খ্যাতিমান হয় বিশ্বে। তিনিই পৃথিবীর মানুষকে প্রথম সত্যিকারের ত্যাগের সংজ্ঞা শিক্ষা দেন। এমন সে ত্যাগ, এই ত্যাগের মহিমায় তুচ্ছ হয় রাজসিংহাসন। তুচ্ছ হয় রাজকন্যা কিংবা রাজপুরবাসী সুন্দরী, নৃত্যগীত পটিয়সী রমণীরা। তুচ্ছ হয় জাগতিক পুত্রপ্রেম, পিতৃ-মাতৃ স্নেহ। বোধিসত্ত্ব-জীবনে তুচ্ছ হয় আপনার প্রাণ, তুচ্ছ হয় জগত-সংসার। কেবল ঊর্ধ্বে তুলে ধরে ত্যাগের মহিমা।



জাগতিক তৃষ্ণাকে ক্ষয় করার সঠিক শিক্ষা তিনিই প্রদান করেন মানুষকে। তাঁর মতো করে এমন মৈত্রীর কথা আর কেউ বলেনি কখনও। সে মৈত্রী এমনই, মা যেমন নিজ আয়ু দিয়ে স্বীয় একমাত্র পুত্রের জীবন রক্ষা করে ঠিক তেমনই জগৎ ও অন্য প্রাণির প্রতি অপরিমেয় মৈত্রীর শিক্ষা তিনি দিয়েছেন। তাঁর দেশিত করুণা অপার। সে করুণায় সুপথে আসে দস্যু অঙ্গুলিমাল, যে নয়শত নিরানব্বইজন মানুষকে হত্যা করে প্রত্যেকের ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মালা গেঁথে গলায় ধারণ করেছিল পরের কথায় প্ররোচিত গুরু দ্বারা আদিষ্ট হয়ে, ক্রোধান্বিত গুরুর গুরু দক্ষিণা দেওয়ার পবিত্র অভিপ্রায়ে।



 



তিনিই জগতকে শিক্ষা দেন প্রজ্ঞা কীভাবে ভেদন করে মানুষের মন। শ্রদ্ধা হতে উৎপন্ন দানের মহিমায় জগতকে কীভাবে মানবিক করে তুলতে হয় তা তাঁর কাছেই শেখা। ধ্যানযোগের যে অনন্য প্রাপ্তি, ধ্যানের মধ্যেই যে লুকিয়ে আছে বিশ্বশান্তি তা তিনিই প্রথম উপস্থাপন করেছেন জগতের কাছে।



 



জগতকে সত্যিকার গণতন্ত্র শিক্ষা দিয়ে গেছেন তিনিই প্রথম, ভিক্ষু সংঘ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। গণতন্ত্রের জন্যে সাতটি অপরিহার্য কর্তব্যের উল্লেখ করে তিনি আজও হয়ে আছেন পরম জনকল্যাণমুখী। তাঁর ধর্মেই প্রথম নারীরাও অধিকার পায় ভিক্ষুণী সংঘে। ক্ষৌরকার পুত্র উপালিকে প্রথমে প্রব্রজ্যায় দীক্ষা দিয়ে এবং অতঃপর অন্যান্য রাজপুত্রদের প্রব্রজ্যিত করে তিনি স্থাপন করেন সাম্য ও মনুষ্যত্বের এক অনুপম দূরদর্শী দৃষ্টান্ত যাতে অবহেলিত ক্ষৌরকারপুত্র উপালি গৃহী জীবনের রাজপুত্র অপেক্ষা ভিক্ষুসংঘে জ্যেষ্ঠ হয়। তিনিই প্রথম আদিম পেশায় নিয়োজিত নারীদের মানব-কল্যাণের ছায়াতলে এনে ভিক্ষুণী সংঘে প্রব্রজ্যিত হওয়ার অমূল্য সুযোগ দান করেন।



 



জীবন ও জগতের রহস্যময় দর্শন উন্মোচিত করে তিনিই উপহার দেন অভিধর্ম। তিনিই বলেছেন প্রথম, বহুজনের হিতে, বহুজনের সুখে, লোকের অনুকম্পার্থে তাঁর মার্গ-দর্শন প্রচার করতে। জগতের সকল মিথ্যাদৃষ্টিকে তিনিই প্রথম আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, ভেঙ্গে দেন মানুষের মোহাবিষ্ট চর্চা। অন্যকেউ নয়, মানুষের ত্রাতা সে স্বয়ং নিজে। মানুষ নিজেই তার দীপ। নিজের শরণই অনন্য শরণ। কোন অদেখা বা কল্পিত দেবদেবী নয়, কেবল মাত্র আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ বা পথই ভবচক্রে দুঃখ কাতর মানুষের মুক্তির সোপান। গৃহীর পঞ্চশীল কিংবা শ্রমণের দশশীল বা বৌদ্ধ ভিক্ষুর দুইশ বিশ শীল পালনীয় হয়ে উঠার মূলে আছে বিজ্ঞানসম্মত চিন্তা আর তার বাস্তবায়নে। আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোমড় ব্যথা উপশমে শক্ত বিছানায় শোয়ার ব্যবস্থা দেওয়া হচ্ছে। অথচ বুদ্ধ আজ থেকে আড়াই হাজারেরও অধিক বছর আগে উচ্চ শয্যা বা মহাশয্যায় না শোয়ার শিক্ষা প্রদান করেছিলেন। বুদ্ধের শিক্ষায় কোন পূজা নেই, কেবল শরণের কথা বলা হয়েছে। আজকাল বুদ্ধের মনোরম মূর্তি তৈরি করে মহা সমারোহে তার পূজার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অথচ বুদ্ধ বলেছেন, আত্মদীপ হয়ে বিচরণ করতে। তিনি আত্ম শরণকে অনন্য শরণ হিসেবে দেশনা করেছেন। নিজেকেই নিজের নাথ হয়ে নিজের ত্রাণে এগিয়ে আসতে বলেছেন। মানুষকে ত্রাণকারী ভিন্ন কোন সত্ত্বা নাই যতক্ষণ না মানুষ নিজেই নিজের ত্রাণে এগিয়ে না আসে।



বুদ্ধ যে দানের কথা বলেছেন তা কোন বুদ্ধমূর্তির সামনে দানের কথা বলেননি। বুদ্ধ আর্ত ও পীড়িত এবং দরিদ্র মানুষকে দানের কথা বলেছেন। দান বলতে প্রভূত অন্ন ও খাদ্যদ্রব্য, ফল-ফলাদি বুদ্ধমূতির্র সামনে দিয়ে বিনষ্ট করার কথা দেশনা করা হয়নি। এই দান হলো মানবকল্যাণে দান।



 



তিনিই প্রথম, যিনি তাঁর দর্শন-শিক্ষার্থী ও অনুসারী হতে ইচ্ছুক গৃহীকে বলেছেন, এসো, দেখো। গ্রহণযোগ্য হলে গ্রহণ করো, অন্যথায় বর্জন করো। তাঁর 'এহিপসি্সকো'- এই আহ্বান আজও ঘুরে বেড়ায় ইথারে ইথারে, মানুষের মনে মননে। মানুষের মধ্যে তিনিই প্রথম, যিনি খুঁজে পাননি কোন আত্মা। যা মনে নেই, মস্তিষ্কে নেই, যা শক্তি নয়, পদার্থ নয়, যা দেহের অভ্যন্তরে কোন স্থানই দখল করে না, সেই অতি কল্পনাকল্পিত আত্মার ধারণা তিনিই প্রথম ভেঙ্গেছেন। তিনিই বিজ্ঞানকে দর্শন আর ধর্মের সাথে বেঁধেছেন পরম সাফল্যে। আজকের অটোফেজি বা স্বভক্ষণ সেতো তাঁরই আবিষ্কার। তিনিইতো বিকালভোজন হতে বিরত রেখে ভিক্ষু সংঘের দেহকে মেদমুক্ত রাখার উপায় করে দিয়েছেন। গৃহীর জন্য অষ্টশীল পালনের মাধ্যমে অটোফেজির চর্চা তিনিই তৈরি করেছেন প্রথম। অতিভোজন ব্যক্তির মেদ বাহুল্যের কারণ এবং এই মেদ বাহুল্য ব্যক্তির চিত্ত চাঞ্চল্য ঘটায়। বুদ্ধ এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে অনুধাবন করেই বিকাল ভোজন অনুমোদন করেননি। আজ যে অটোফেজির কথা বিজ্ঞান বলছে, বুদ্ধ তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন দুই হাজার পাঁচশ ষাট বছরেরও আগে। তাই তিনি বিকালে ভোজন কে কখনোই অনুমোদন করেননি। সকালের ভোজনলব্ধ শকর্রা যাতে দেহে মেদের সৃষ্টি না করে এবং অতিরিক্ত মেদকলা যাতে অটোফেজির মাধ্যমে বিনষ্ট হয় সেই ব্যবস্থার জন্য বিকাল-ভোজনে বিরতি একটা উৎকৃষ্ট বৈজ্ঞানিক পন্থা। সপ্তাহের সাতদিন বিজ্ঞানের চোখে সমান। শনি বা মঙ্গল বারের মধ্যে যেমন কোন কু বা খারাপ নেই তেমনি বৃহস্পতিবারের মধ্যেও কোন সৌভাগ্য লুকিয়ে নেই। আবার জন্মদিন বলেই সে দিনকে উপেক্ষা করতে বিজ্ঞান বলেনি কখনো। ঠিক একথাই বুদ্ধ বলেছেন তাঁর লব্ধ প্রজ্ঞার আলোকে বোধিসত্ত্ব থাকাকালীন।



 



ধ্যান বা বিপাসনা হলো মনকে নিয়ন্ত্রণের এক বিজ্ঞানসম্মত উপায়। ধ্যান হলো মনকে কেন্দ্রীভূত করে একটা বিন্দুতে নিয়ে আসা যাতে একাগ্র মন হতে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও পথনির্দেশ পাওয়া যায়। ধ্যান মানেই অস্থিরতাকে স্থৈর্য দিয়ে জয় করা। ধ্যানে দেহের ও মনের উভয়ের ব্যায়াম হয়। বুদ্ধ মনকে অতিমাত্রায় বেগবান বলে উল্লেখ করেছেন। বাস্তবিক মনের বেগ আলোর বেগের চেয়ে অধিক এবং মন সর্বস্তরে সহজে অনুপ্রবেশশীল। বুদ্ধ কর্তৃক মনের যে সংজ্ঞা আমরা পাই তাতেই বৌদ্ধধর্মের বিজ্ঞান-অন্বিষ্টতা সহজবোধ্য হয়ে উঠে। বৌদ্ধধর্মেই জগত এর মধ্যে ইউনিভার্স এর দর্শন মিলেছে। এই পৃথিবী ছাপিয়ে যে ব্রহ্মা-, তাকে ছাপিয়ে জগত। তাই নির্বাণ হলো মর্ত্যলোক, স্বর্গলোক ও ব্রহ্মা- পেরিয়ে এক অবাঙ্মানসগোচর অবস্থা। বুদ্ধই ঋদ্ধিবলের মাধ্যমে আজকের টেলিপ্যাথিকে ব্যবহার করে গেছেন অনেক আগেই।



 



যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে বিশ্লেষণ ছাড়া কোন সত্যকে গ্রহণ না করতে তিনিই জগতকে শিখিয়েছেন। তাঁর দেশিত পথ অহিংসার। তাঁর দেশিত পথ মৈত্রীর। তাঁর দেশিত পথ করুণার। তাঁর দেশিত পথ দানের। তাঁর দেশিত পথে কোন আমি বা আমার জাতীয় নামরূপ নেই। বৌদ্ধধর্মের পরতে পরতে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানই বুদ্ধের বোধিপ্রাপ্তির মূল ভিত্তি। অন্ধ ভক্তি-বিশ্বাস কিংবা অদেখা কারু উপর সমর্পণ নয়, এসো, দেখো, গ্রহণযোগ্য হলে গ্রহণ করো, অন্যথায় বর্জন করো- এই চিরায়ত আহ্বান দিয়েই বৌদ্ধধর্ম আজ জগৎ ত্রাণে পথ চলেছে কোটি কোটি উপাসকের চর্চায় ও অনুশীলনে। তাঁর দেশিত পথে আছে জগত ও সর্ব সত্তার কল্যাণ। সেই মহাকারুণিক জগত-শাস্তা, পরম শিক্ষক মহামতি মানবপুত্র গৌতমবুদ্ধের দেশিত পথই হোক আজকের মৃত্যুমুখো পৃথিবীর পরিত্রাণের পবিত্র পথ।



 



জগতের সকল প্রাণি দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করুক।



 



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৫৩৭৭৪
পুরোন সংখ্যা