চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার ৩ অক্টোবর ২০১৯, ১৮ আশ্বনি ১৪২৬, ৩ সফর ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৬ সূরা-ওয়াকি 'আঃ


৯৬ আয়াত, ৩ রুকু', মক্কী


 


 


 


 


মহৎ কারণে যার মৃত্যু ঘটে সে অপরাজেয়। -বার্জিল।


 


 


সদর দরজা দিয়ে যে বেহেশ্তে যেতে চায়, সে তার পিতামাতাকে সন্তুষ্ট করুক।


 


 


ফটো গ্যালারি
নাগরিকের অধিকার আছে সব তথ্য জানার
রহিমা আক্তার মৌ
০৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনগণকে নিজ নিজ দেশের সব ধরনের তথ্য জানার অধিকারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস পালিত হয়। ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এটি একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিবস।

কিছু তথ্য থাকে পারিবারিক কিছু সামাজিক আর কিছু রাষ্টীয় তথ্য। রাষ্টীয় তথ্য জনগণকে জানানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারটি মেনে নিয়েই রাষ্ট্রকে সাধারণ মানুষকে তার প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করতে হয়। তথ্য অধিকার চাহিদা বৃদ্ধি করা। এ ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে সচেতন মানুষ একত্র হয়ে একটি কর্মশালার মধ্য দিয়ে দিনটিকে আন্তর্জাতিকভাবে তথ্য অধিকার দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এটির বর্তমান রূপটি ২০১২ সালে শুরু করা। দিনটি তৈরির জন্যে ইউনেস্কোর রেজুলেশনটিকে আফ্রিকার নাগরিক সমাজগোষ্ঠী বৃহত্তর তথ্যের স্বচ্ছতা চেয়েছিলো।

সারাবিশ্বের সব নাগরিকের জন্যে তথ্য অধিকার নিশ্চিত করতে পালিত হয় 'তথ্য অধিকার দিবস'। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট হিসেবে বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা একটি আদর্শ ও কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্যে জরুরি। তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার বাক্স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিগণিত। তথ্য অধিকারকে জনগণের ক্ষমতায়নের একটি মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। যতো বেশি তথ্যপ্রবাহ জনগণের দোরগোড়ায় পেঁৗছবে, ততোই সচেতনতা বাড়বে, বাড়বে কাজের গতিও। বিশ্বের প্রায় ৭৫টি দেশ বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দিবসটি পালন করে আসছে। এর স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৩ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। টিআইবিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ২০০৬ সাল থেকেই তথ্য অধিকার দিবস পালন করে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছিলো না পুরনো কিছু আইনের কারণে। যেমন দাফতরিক গোপনীয়তা আইন ১৯১৩, সাক্ষ্য আইন ১৮৭২, ফৌজদারি দ-বিধি ১৯৬০, কার্যপ্রণালি বিধি ১৯৯৬, সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি ১৯৭৯ ইত্যাদির জন্যে। এতো এতো সব আইন টপকে তথ্য বের করা হয়ে পড়ে অসম্ভব।

নিরপেক্ষ স্বাধীনভাবে তথ্য জানার অধিকার আদায়ের জন্যে দরকার হয় একটি স্বতন্ত্র আইনের। বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামসহ বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যমগুলো গুরুত্বসহকারে দিবসটি উদ্যাপন করে জনসচেতনতা সৃষ্টি করছে। তখন বাংলাদেশ আর পিছিয়ে থাকতে চায়নি। ২০০৮ সালের ২০ অক্টোবর 'তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ, ২০০৮' জারি করা হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার 'তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ, ২০০৮'-কে আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নেয় এবং নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে যে কয়টি অধ্যাদেশ আইনে পরিণত হয় তার মধ্যে 'তথ্য অধিকার আইন-২০০৯' অন্যতম। ওই অধিবেশনে (২৯ মার্চ, ২০০৯) তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ পাস হয়। মহামান্য রাষ্ট্রপতি ৫ এপ্রিল, ২০০৯ তারিখে এ আইনটিতে সদয় সম্মতি জ্ঞাপন করেন এবং ৬ এপ্রিল, ২০০৯ তারিখে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হয়।

এ আইনের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির কোনো প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়ার জন্যে আইনে নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে তথ্যের জন্যে আবেদন করতে হয়। কর্তৃপক্ষ অনধিক ২০ কার্যদিবস বা অনধিক ৩০ কার্যদিবস, তবে বিশেষ ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তথ্য প্রদান করবে। কোনো ব্যক্তি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য না পেলে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারবে এবং কমিশনারের কাছে অভিযোগ করা যাবে। কমিশন ৭৫ দিনের মধ্যে অভিযোগ মীমাংসা করবে। তবে দেশের দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা এবং সচেতনতার অভাব প্রকট হওয়ায় তথ্য অধিকার আইনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জনগণ। তার মধ্যে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটি বিরাট সময় সামরিক শাসনের অধীনে কিংবা বেসামরিক পোশাকের আড়ালে সামরিক শাসকদের পোষ্যতার কারণে দেশটির সরকারি তথ্য জনগণের কাছে আসার সুযোগ হয়নি। এ কারণে পাশের দেশগুলোর তুলনায় অনেক পরে বাংলাদেশে এ আইন পাস হয়।

তথ্য জানার অধিকার বিষয়ে আমাদের সংবিধানের ৩৯(১) ধারা উপযোগী ভূমিকা পালন করে। তার পাশাপাশি ৩৯(২) ধারাতেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। কোথায় কীভাবে কোন মাধ্যমে তথ্য জানা যাবে সেই বিষয়ে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে আমাদের গণমাধ্যমগুলো। তবে দেশের নিরাপত্তা, অখ-তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হতে পারে বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার ক্ষেত্রে এ তথ্য অধিকার আইন প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত থাকলে তথ্য দিতে বাধ্য কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, আমাদের মানবাধিকার অবস্থাই নড়বড়ে। সেখানে তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন কতটা ভূমিকা রাখতে পারে সেটাই প্রশ্ন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তথ্য অধিকার আইনের অধিকতর ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে। জনগণের এ অধিকারকে সম্মান দিয়ে নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আমরা নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে 'তথ্য অধিকার আইন-২০০৯' পাস করি এবং কমিশন গঠন করি। ফলে জনগণ ও গণমাধ্যমের প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার দেশে গণমাধ্যমের বিকাশ ও অগ্রযাত্রায় সবসময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ মেয়াদে প্রথম দেশে বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চালুর অনুমোদন দেয়া হয়। তথ্যের অবাধ প্রবাহকে আরও বিস্তৃত করতে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বিটিভি ওয়ার্ল্ড এবং সংসদ টেলিভিশনের পাশাপাশি ৪৪টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং ২২টি এফএম বেতারকেন্দ্র এবং ৩২টি কমিউনিটি রেডিও সমপ্রচারের অনুমতি দেয়া হয়েছে। ফলে তথ্যপ্রকাশ ও প্রচারের ব্যবস্থা সহজতর হয়েছে। সরকারপ্রধান বলেন, আমরা বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের ও ২০৪১ সালের আগেই উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করবো।

রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেছেন, তথ্যপ্রাপ্তি ও জানা মানুষের গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানে তথ্য জানার অধিকার মানুষের অন্যতম মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে জনগণের চিন্তা ও বিবেক, বাক্ ও ভাবপ্রকাশ এবং সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। সরকার জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণে বদ্ধপরিকর। তথ্য জানার অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়েই বর্তমান সরকার 'তথ্য অধিকার আইন ২০০৯' প্রণয়ন করেছে এবং এ লক্ষ্যে তথ্য কমিশন গঠন করেছে। ফলে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আইন ও সালিস কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজার স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তথ্যের অবাধ প্রবাহ খুব জরুরি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান তথ্য অধিকার সম্পর্কে বলেন, আমাদের সংবিধানে চিন্তার স্বাধীনতা, বাক্স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে এবং এই স্বাধীনতাকে সুদৃঢ় ও কার্যকর করার লক্ষ্যেই তথ্য অধিকার আইন প্রণীত হয়েছে। কিন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি একদিকে আইনটি বাস্তবায়নের কথা বলে আর অন্যদিকে মানুষের বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তাহলে আইনটির কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। এর ফলে আইনটির সুফল থেকে মানুষ বঞ্চিত হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক।

আজকের পাঠকসংখ্যা
২৫৭৫২৫
পুরোন সংখ্যা