চাঁদপুর, বুধবার ১০ জুলাই ২০১৯, ২৬ আষাঢ় ১৪২৬, ৬ জিলকদ ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৩-সূরা নাজম


৬২ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


০৫। তাহাকে শিক্ষা দান করে শক্তিশালী,


০৬। প্রজ্ঞাসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে স্থির হইয়াছিল,


০৭। তখন উহা ঊর্ধ্বদিগন্তে,


০৮। অতঃপর সে তাহার নিকটবর্তী হইল, অতি নিকটবর্তী,


 


 


ভয় অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। -ওয়ার্ডসওয়ার্থ।


 


 


নারী পুরুষের যমজ অর্ধাঙ্গিনী।


 


 


ফটো গ্যালারি
কন্যা সন্তানের প্রতি সচেতনতা
রহিমা আক্তার মৌ
১০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


২০১৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ৩০ মিনিট। আমি ছোট মেয়ে অভ্রকে নিয়ে স্কুলে বের হই। ওকে দিয়ে ফেরার পথে দেখি একটা মাইক্রো গাড়ি চালাচ্ছে লুঙ্গি পরা এক লোক। ড্রাইভার মনে হয়নি। লোকটার কোলে দুই থেকে আড়াই বছরের এক কন্যা সন্তান। লোকটার ১টি হাত গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে আরেকটা হাত লুঙ্গির ভিতর দিয়ে বাচ্চাটার দুই পায়ের মাঝে। দেখে কিছু বোঝার আগেই টান দেয়। গাড়ির নাম্বারটাও নিতে পারিনি ভুলে গেছি। আমি পারিনি ওই কন্যা সন্তানের জন্য কিছু করতে, আমি নিজেকে অপদার্থ বলতে একটুও বিবেকে লাগছে না। ওই শিশুর পরিবার কি জানবে আজ সকালে একটা নরপিশাচ কি করেছে শিশুটির সাথে। ওই কন্যা সন্তান কি কখনও কাউকে কিছু বলতে পারবে। তাই বলছি, আপনার কন্যা সন্তানের প্রতি আরেকটু সচেতন হোন। আমার ফেসবুকে আজ এই নিয়ে একটা লেখা দিই। অনেক বন্ধু সেখানে কমেন্ট করেছে। সম্ভব হলে লেখার শেষ অংশে তাদের মন্তব্যগুলো দিতে চেষ্টা করবো।



দেশের অর্ধেক নারী হওয়া সত্ত্বেও প্রতি মুহূর্তে নারী ও কন্যা শিশুরা এইটুকু সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। ওদের জীবনগুলো যেন অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা হয়ে যাচ্ছে। সমাজের কিছু লোক শুধু ওদের নারী ও কন্যা শিশু হিসাবে দেখছে। বিশ্ব কন্যাসন্তান দিবস উপলক্ষে কন্যা সন্তানদের জীবন ও চলার পাথর সমস্যা নিয়ে এই লেখাটির মাঝে কিছু অরুচিকর শব্দ এসে যেতে পারে। পাঠক তা ক্ষমার চোখে দেখবেন। এই লেখাটি শুধু সচেতন হওয়ার জন্য। কাউকে ছোট বা ইঙ্গিত করে কিছু বলার জন্য নয়। কোন সম্পর্ককে ছোট করে দেখার জন্য নয়।



বিংশ শতাব্দী পার করে এসেছি আমরা। সমাজ আজ অনেক এগিয়ে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নত হচ্ছে রাষ্ট্র। কিন্তু বিবেকগুলো কি সেভাবে উন্নত হচ্ছে। আমরা কি পারছি আমাদের পরের প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী জুড়ে দিতে।



যে কন্যা সন্তানটি জন্ম নিচ্ছে আমাদের ঘরে সে কন্যা সন্তানটি আমাদের পরের প্রজন্মের মা হতে যাচ্ছে তাকে কতটা নিরাপত্তা দিতে পারছি আমরা। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন জায়গায় কিভাবে কন্যা সন্তানটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পড়তে পারে বা আমাদের সমাজের কন্যা সন্তানরা কি ধরনের সমস্যায় পড়ে তার কয়েকটি ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।



বিথী ৩য় শ্রেণীতে পড়ে। দেখতে সুন্দর। অন্য বাচ্চাদের সাথে বেঞ্চে বসে সেও স্কুলে পড়ে। শিক্ষকরা পড়ানোর সময় বেঞ্চের পাশে এসে দাঁড়ায়। বেঞ্চের উপর বিথীর হাত। শিক্ষক লুঙ্গি পরা। বেঞ্চের উচ্চতা শিক্ষকের কোমরের নিচ পর্যন্ত। শিক্ষক বেঞ্চের পাশে দাঁড়ালেই বিথী বুঝতে পারে ওর হাতে কিছুর স্পর্শ লাগছে মাঝে মাঝে পেছনে পিঠেও এমন কিসের স্পর্শ লাগে। তখন বিথী কিছু বুঝেনি বড় হবার পর বুঝতে পারে। এখন তার বয়স ৪০ এর উপরে। (এমন একটি লেখা লিখব শুনে বিথী ঘটনাটি আমায় বলে) যা এর আগে সে কাউকে বলতে পারেনি।



রমা আর সমা দুই বোন কোথায় আরবি শিক্ষকের কাছে পড়ে। পড়ার সময় সবাই সবার মতো কর্মব্যস্ত থাকে। মাঝে মাঝে ওরা ফিসফিস করে কথা বলে। শরীর ব্যথা অনুভব করে। কাউকে কিছু বলে না। তবে শরীর ব্যথা বলে। মা কিছু সন্দেহ করে। ওদের জিজ্ঞাস করে ওরা কিছু বলে না। তবে দুই বোন ফিসফিস করে কি যেন বলে। মায়ের সন্দেহ আরও বাড়ে। লুকিয়ে একদিন পাহারা দেয় দেখতে পায় আরবি শিক্ষক পড়ার সময় ওদের সাথে বাজে ব্যবহার করে। শিক্ষক ওই কন্যা শিশুদের বুঝিয়েছে এটা নাকি পড়ালেখার একটি অংশ। কাউকে বলা যাবে না। তাই ওরা বলেনি।



পত্রিকার পাতার খবর ২ বছর ৯ মাসের শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। খবরটা পড়ে ঊষা চোখের পানি ফেলে। ওর বয়স ৩০/৩২। পাশে এসে আছে বড় বোন তিশা। তিশার বয়স ৩৪/৩৫ হবে। তিশা বলে কিরে চোখে পানি কেন? ঊষা বলে জানিস আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা রিন্টু মামা (ধর্মের মামা) যখন আমাদের বাসায় আসতো এই শিশুটির মতো মামা আমার সাথে খারাপ আচরণ করতো। কথাটা শুনে তিশাও চোখের পানি ফেলে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে জানিস রিন্টু মামাতো আমার সাথেও এমন আচরণ করেছে। তখন না বুঝলেও বিয়ের পর এখন সব বুঝি। ৬ বছরের জলি বেড়াতে যায় আন্টির বাসায়। আঙ্কেলসহ টিভি দেখছে। টিভি দেখার ফাঁকে ফাঁকে আঙ্কেল ওর প্যান্টের ভিতর হাত দেয়। ভয় পেয়ে জলি অন্য রুমে চলে যায়। ৩-৪ মাস পর আন্টি আঙ্কেল জলিদের বাসায় বেড়াতে আসে। জলি ভয়ে ভয়ে থাকে। আন্টির পাশে বসলেও আঙ্কেলকে দেখে বারবার চলে আসে। ১ সপ্তাহ পর জলি কাজের মেয়ে বিলকিসের সাথে কথাগুলো বলে। বিলকিস কথাগুলো জলির মাকে বলে। সব জানার পরও সন্তানের কথা ভেবে জলির মা কাউকে কিছু বলতে পারেনি, এমনকি ওই পিশাচটাকেও।



ছোট ছোট বাচ্চারা বিকেল বেলায় বাড়ির সামনে খেলছে। ওদের সাথে সাথীও। সাথী আজ খেলছে না_পাশে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছে। কালাম নামে সাথীদের এক আত্মীয় আসে। বলে সাথী চল বাসায় যাই। সাথী কালামের সাথে সিঁড়ি দিয়ে বাসায় উঠছে। মাঝে সিঁড়িতে হঠাৎ কালাম তার প্যান্ট খুলে সাথীর মুখে... সাথী মুখে গলায় ব্যথা পেয়ে চিৎকার করে উঠে। কালাম ওর মুখ চেপে ধরে। বলে কাউকে বলবি না। রাতেই সাথীর ১০৪/১০৫ ডিগ্রি জ্বর আসে। হঠাৎ কেন এই নিয়ে দুশ্চিন্তা। ও বমি বমি ভাব করছে। অনেক বলার পর সাথী ঘটনা বলে।



রিনা ও মনা দুই বান্ধবী মহিলা মাদ্রাসায় পড়ে। ওখানে শিক্ষক ও শিক্ষিকা রয়েছে। পড়া শেষ করে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় শিক্ষক জয়নাল ওদের সাথে নামে। ওদের পিঠে ও শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় হাতে দেয়। রিনা বাসায় এসে মাকে বলে, আমি আর মাদ্রাসায় যাবো না। রিনার মা মনাকেও ডেকে জিজ্ঞেস করে। ও বলে আমিও যাবো না। কেন? জিজ্ঞাস করায় দুইজনে বলে ঘটনাগুলো। ওই নরপিশাচ শিক্ষকের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারেনি রিনা মনার মায়েরা।



ঢাকা শহরের নামকরা একটি স্কুল+কলেজের কথা। স্কুলের শিক্ষক দ্বারা ১০ম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ। এমন খবর চার পাশে ছড়িয়ে যায়। মিডিয়া যায় স্কুলে। ওরা ওদের ক্ষমতা আর দাপটের চোটে মিডিয়াকে ঢুকতে দেয় না। মিডিয়া হালকা কিছু খবর প্রকাশ করে। ওই স্কুলের ওই শিক্ষকের নাম্বার থাকে আমার কাছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে কল করি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিই। প্রথম কথা বলতে চায় না। এরপর বলে, দুই শিক্ষকেরই ঘটনাটি ঘটেছে বলে স্বীকার করে। আরো বলে ওই প্রতিষ্ঠানে ৪র্থ শ্রেণির এক ছাত্রীর সাথে বাজে ব্যবহার করেছে ৪র্থ শ্রেণির এক কর্মচারী। স্কুলের ক্ষমতার কারণে ঘটনাগুলো চাপা পড়ে যায়।



১১ বছরের পিংকি ভাইয়ের হাত ধরে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির সামনের প্রার্থনা ঘরের কাছে যায়। প্রার্থনা ঘর পাহারা দেয়া লোকটি বলে পিংকি একটু ঘরটা পরিস্কার করে দিবে। দুই ভাইবোন প্রার্থনা ঘরে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ পর গুরু পিংকির ভাইয়ের হাতে ১০ টাকা দিয়ে বলে যাওতো বিস্কুট নিয়ে আসো। টাকা নিয়ে পিংকির ভাই দোকানে যায়। ওই ফাঁকে লোকটি পিংকির সাথে বাজে ব্যবহার করে। কাউকে না বলার কথা বলে হুমকি দেয়। ২/৪ মাস পর একই ঘটনা ঘটায় তরুর সাথে। তরুর চিৎকারে আশেপাশের মানুষ জমা হয়। পিংকিও আসে। কিন্তু পিংকি লজ্জায় মুখ খুলতে পারেনি।



১৪ বছরের রত্না হঠাৎ প্রচ- পেট ব্যথা অনুভব করে। তখন রাত ৯টা। রত্নার মা কোন কিছু বুঝতে পারছে না। বাসার পাশে একটা ওষুধের দোকান। ওখানে ডাঃ দিপক বসে। রত্নাকে ওখানে নিয়ে যায়। ডাক্তার বলে সিটে শুয়ে দিতে। চেয়ারে বসা রত্নার মা, ডাক্তার রত্নার পেট ধরে দেখছে ব্যথা কোথায় আস্তে আস্তে হাত নাভীর নিচে নিচ্ছে। আর বলছে, এখানে এখানে। এক পর্যায়ে স্পর্শকাতর স্থানে। রত্না ভাবছে ডাঃ ওর চিকিৎসা করাচ্ছে বা এটা দেখা প্রয়োজন। ১০ মিনিট পর রত্নাকে সিট থেকে তুলে কিছু ওষুধ দেয়। পর দিন আবার নিয়ে আসতে বলে। তাই করা হয়। আজও ডাক্তার তাই করছে। বাধ্য হয়ে রত্না মাকে বলে আমি আর এই ডাক্তারের কাছে আসব না। আমি জানি না এটা কি চিকিৎসা দিল নাকি...।



প্রিয় পাঠক এমন ঘটনা আপনার আশেপাশে হচ্ছে হয়ে আসছে। হয়ত আমরা জানি হয়ত জানি না। তবে এর কি শেষ আছে। আমরা কথায় কথায় আইনের কথা বলি। আমাদের দেশে আইন আছে অনেক, যা অন্যদেশে এতটা নেই। তবে নেই আইনে যথাযথ ব্যবহার। দুর্নীতি যেমন গ্রাস করছে আমাদের চারপাশকে। তেমনি আইনকেও কব্জা করছে। কিছু ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। তদন্তের নামে ঝুলে থাকে। আবার এই ধরনের কুৎসিত ব্যক্তিদের জন্য সুপারিশও আসে আমাদের সমাজে। ধিক্কার জানাই সেই সব অমানুষ নরপিচাশগুলোকে।



আইনের কথা যখন বলব আমরা সাথে সাথে নিজেদের সচেতনতার কথাও বলব। নারীর পদে পদে পথে পথে বিপদ। তার মাঝে শিশুদের জন্য আরো বেশি। সেই শিশুটি যদি হয় কন্যা শিশু আপনি তার প্রতি আরেকটু সচেতন হোন। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাও আমাদের মন-মানসিকতার অনেক পরিবর্তন প্রয়োজন। আগে পরিবারের বয়স্কদের কাছে বড় হতো শিশুরা। দাদি-নানিসহ যৌথ পরিবার ছিল। এখন যৌথ পরিবারগুলো ভেঙ্গে একক পরিবারে এসে দাঁড়িয়েছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে গেছে অনেক হারে। একজনের উপার্জনে চলছে না সংসার। বাধ্য হয়ে সন্তানদের ছেড়ে উপার্জনে ছুটতে হয় বাবা-মাকে। তারপরও বলবো, আপনার কথা সন্তানের ভবিষ্যৎ-এর কথা ভেবে ওর প্রতি আরেকটু সচেতন হোন। ওর বয়স যত বাড়বে ওকে সচেতন করে তুলুন। ওর সাথে বিপদ হবার মত ঘটনাগুলো শেয়ার করুন। স্কুল কলেজে যাওয়া আসার সময় কিভাবে চলতে হবে সমস্যা হলে জানাতে বলবেন। আপনি সচেতন হোন সন্তানকে সচেতন করুন।



ওদের জন্য স্বপ্নময় পৃথিবী গড়তে আপনার আমার আমাদের দায়িত্বশীল হতে হবে। আইন হাতে নেয়া অপরাধ। মনে রাখতে হবে ওদের মত নরপিচাশের সংখ্যা আমাদের সমাজে অনেক নয়। তবে কমও নয়। এই সব পরিস্থিতিগুলোর কথা সন্তানদের মানসিকতায় বেঘাত ঘটাচ্ছে। ওদেরকে স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে উঠতে দেয়ার জন্য আমাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। আসুন আমরা সচেতন হই যে যে দিক দিয়ে পারি। আমাদের কন্যা সন্তান হবে যে আগামীর জাতি গঠনের প্রতীক।



লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৫৮৫২২৪
পুরোন সংখ্যা