চাঁদপুর, সোমবার ১১ মে ২০২০, ২৮ বৈশাখ ১৪২৭, ১৭ রমজান ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুর সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কসহ আরো ৯ জনের করোনা শনাক্ত, মোট আক্রান্ত ২১৯
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৬৮-সূরা কালাম


৫২ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৪৪। ছাড়িয়া দাও আমাকে এবং যাহারা এই বাণীকে প্রত্যাখ্যান করে তাহাদিগকে, আমি উহাদিগকে ক্রমে ক্রমে ধরিব এমনভাবে যে, উহারা জানিতে পারিবে না।


 


 


 


 


 


 


হাজারো সমালোচকের মধ্যে যে সুষ্ঠুভাবে কাজ করে যায়, সেই যথার্থ কর্মী।


-এ. ডাবিস্নউ হ্যারি।


 


 


বিদ্যালাভ করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য অবশ্য কর্তব্য।


 


 


 


 


ফটো গ্যালারি
কোমল রবীন্দ্রনাথ কঠিন রবীন্দ্রনাথ
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
১১ মে, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


এক রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনেক সত্তা। আশি বছরের বয়োবৃদ্ধ তরুণের জীবন-বৃক্ষ ফলভারে আনত। তাঁর অনেক শাখা, অনেক শেকড়। প্রতিটা শাখায় স্বতন্ত্র তাঁর বিকাশ ও বিচরণ। প্রতিটি শাখায় স্বতন্ত্র ফল, বিচিত্র ফসল। এক রবীন্দ্রনাথকে ধারণে সার্ধশত বছরও যথেষ্ট হলো না। যত সময় গড়াবে কালের কল্পরথে রবীন্দ্রনাথ ততই তাঁর বিশালতা নিয়ে আবিষ্কৃত হবেন, আবির্ভূত হবেন।



আমরা ছোটদের রবীন্দ্রনাথকে পাই যার বাবা বা বাবার মতো হতে শখ। যে মাকে শুধায় কোথা থেকে মা তাকে পেলো। রবীন্দ্রনাথ কখনো তরুণদের ডাক পাঠালেন এ বলে যে, 'ওরে নবীন ওরে আমার কাঁচা, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।' তরুণরা এখানে রবীন্দ্রনাথের বন্ধু। কিন্তু এই রবীন্দ্রনাথই যখন বলেন, 'আয়না দেখেই চমকে বলে মুখ যে দেখি ফ্যাকাশে', তখন তিনি বুড়োদের হয়ে চিন্তা করতে থাকেন বার্ধক্যের অনিবার্য পরিণতি নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ভেবেছেন মায়েদের কথা যাঁরা গোরাদের মতো শিশুকে কোলে পেয়ে ভুলে যান জাতপাতের ব্যবধান কিংবা ধর্মের কড়া নিয়মের শৃঙ্খল। আবার যোগমায়াদের মতো মায়েদের কথাও রবীন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন সমান মমতায়। তাইতো লাবণ্যের মতো মেয়ে নিয়ে তিনিও সুপাত্রস্থ করার তাগিদে অমিতকে হাতছাড়া করতে চাননি। বেচারা কবিকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার অন্ত নেই। রাজার কাছে পুরস্কার চাইতে গিয়ে বউয়ের কথামাফিক টাকাপয়সা কবি চাইতে পারেননি। কবির মান ঊর্ধে তিলে ধরে তিনি বরমাল্য নিয়েই ফিরে এসেছিলেন। সেই যে গৃহভৃত্য উপেন, যে শোষিত শ্রেণির প্রতিনিধি, জমিদার সামন্তবাদীরা যাদের শোষণ করে সর্বস্বান্ত করে দেয়, তারাও রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টির বাইরে নয়। তাদের জন্যেও কবির প্রতিবাদ ছিলো সরব, সচল। কেরাণী হরিপদ, যার জীবনাবাস সকরুণ, তার বাসায় থাকা টিকটিকিটাও রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি এড়ায়নি। রবীন্দ্রনাথ এমনই সর্বগামী, এমনই সর্বশ্রেণির।



যে রবীন্দ্রনাথ এতোভাবে আমাদের জড়িয়ে রেখেছেন, আগলে রেখেছেন, তিনিও কোমলে-কঠিনে গড়া এক মানবিক সত্তা। তাঁরও ভালোবাসা আছে, মায়া আছে, প্রতিবাদ আছে, রাগ আছে। আমরা কঠিন রবীন্দ্রনাথকে পাই শৈশবে যে তার সিঁড়ির রেলিংরূপী ছাত্রদের সপাং সপাং করে বেত্রাঘাত করতেও দ্বিধা করতো না। রবীন্দ্রনাথের এই কঠিন স্বভাব কিছুটা গৃহভৃত্যদের প্রধান ব্রজেশ্বরের কাছ থেকেই শেখা। রবীন্দ্রনাথের কঠিন রূপের দেখা মেলে মা সারদা দেবীর মৃত্যুর সময়। দুই তলায় মা যখন মৃত্যুবরণ করেন,তখন তাঁর ঘরে ডাক পড়ে নিচের বাসিন্দাদের। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথও ছিলেন। কিন্তু তখনও তিনি মৃত্যুর স্বরূপ অনুধাবন করতে পারেননি। না অশ্রু বিসর্জন না ক্রন্দন। এতে কঠিন এক রবীন্দ্রনাথের দেখা মেলে। চৌদ্দ বছরের রবীন্দ্রনাথ বিলেত যেতে কায়দা-কানুন শিখতে গেলেন আন্না তড়খড়ের কাছে। আন্না তড়খড় অনুরাগাক্রান্ত হয়ে পড়লেও রবি ছিলেন কঠিন। একটুও গলেনি রবির মন। বরং তাকে নিয়ে উদ্ভট এক নাম দিয়েছিলেন মনে মনে। যত বড় হয়েছেন রবি তত যথাক্ষেত্রে তাঁর কাঠিন্য বেড়েছে। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে রবি ছিলেন খুব কঠিন। তিনি ইংরেজদের দেয়া নাইট উপাধি বর্জন করে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজে কঠিন সংকল্প করে ছেলে রথীন্দ্রনাথকে জার্মান পাঠিয়ে কৃষিবিদ্যা শিক্ষা করিয়ে আনলেন যাতে গ্রামবাংলায় উন্নত পদ্ধতিতে কৃষি বিপ্লব ঘটানো যায়। রবীন্দ্রনাথ 'ধূমকেতু' লিখে কঠিন দৃঢ়তায় নজরুলকে মনোবল যুগিয়েছিলেন। নজরুল সেই সুকঠিন সংকল্পের মন্ত্রকে পত্রিকার প্রতি সংখ্যায় ধারণ করে প্রকাশ করেছিলেন তাঁর পত্রিকা। রবীন্দ্রনাথের কাঠিন্য পেয়েছেন গোরা তার রাজনীতির সংকল্পে-সংকটে। তাঁর কাঠিন্য এমনই যে তিনি কেউ তাঁর ডাক না শুনলেও একলা চলার নীতির কথা বলেছেন। তিনি বিপদে পরিত্রাণ পেতে স্রষ্টার কৃপা নয় বরং ভয় না করার শক্তি অর্জনের কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ সমালোচক হিসেবে কতটুকুন কঠিন তা জানে কাজী নজরুল ও জীবনানন্দ। নজরুলের রক্তের প্রতিশব্দ 'খুন' প্রীতি দেখে তিনি কড়া সমালোচনা করেছিলেন। যে কারণে নজরুল তা সহ্য করতে না পেরে লিখেছেন, 'বড়'র পীড়িতি বালির বাঁধ। জীবনানন্দের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ঝরাপালক'-এর এমন কঠিন সমালোচনা তিনি করেছিলেন যে, সেই চিঠি আজ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। সেই চিঠির কার্যকারণে জীবনানন্দ ঝরাপালক হতে পথ পাল্টে লিখতে পেরেছিলেন ধূসর পা-ুলিপি। কঠিন রবীন্দ্রনাথ সহ্য করেছেন অনেক মৃত্যুশোক। মা-বাবা-নতুন বৌদি কাদম্বিনী, ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ, রেণুকা, মাধুরীদের মৃত্যু দেখতে দেখতে তিনি হয়ে গেছেন কঠিন পাথর। তিনি মরণের মাঝে তাঁর শ্যামকে দেখতে পান।



কোমল রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'কড়ি ও কোমল'-এর মাঝেই যেন প্রকাশিত। ডাকঘরের অমল কিংবা পোস্ট মাস্টারের রতনের মধ্য দিয়ে পাওয়া কেমল রবিকে প্রশ্রয় দিয়ে বাড়িয়ে তুলেছেন মা সারদা দেবী। রবি পড়তে না চাইলে মাকে বললেই তা মঞ্জুর হয়ে যেত। রবির কোমল মনই রবিকে পাঠ হতে দূরে রাখতো। কোমল রবি শৈশবে ডনকুস্তি করতে চাইতো না কখনোই। ধীরে ধীরে কোমল ও সংবেদী মন নিয়ে বড় হতে থাকা রবির সাথে নতুন বৌঠানের সখ্য হলো। রবির একটা কথা বলার মানুষ হলো। রবির গল্পগুচ্ছে পোস্টমাস্টারের স্নেহশীলতা সকলকে কাঁদিয়ে ছাড়ে। আবার 'ছুটি' গল্পের ফটিকের অন্তিম ছুটিতে কেঁদে ওঠে পাঠক। এই কোমল মনে তৈরি হয় অন্তরতর নাথের সাথে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক। বৃটিশরাজকে কাঁপিয়ে নজরুল 'আনন্দময়ীর আগমনে' লিখার অপরাধে ঢোকেন কারাগারে। কারার ভেতর বন্দীদের ডিভিশন প্রাপ্তির জন্যে নজরুল অনশন করেন যা তার মা এসেও ভাঙাতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথ এই অনশন ভাঙানোর জন্যে জরুরি টেলিগ্রাম করেন, 'গিভ আপ হাঙ্গার স্ট্রাইক আওয়ার লিটারেচার ডিমান্ডস ইউ।' কোমল রবি জীবনানন্দের 'ধূসর পালক' কাব্যগ্রন্থের কবিতাকে প্রশংসা করে বলেছিলেন, এ কবিতা চিত্ররূপময়। বলধা গার্ডেনের ছোট একটা গাছ অযত্নে বাড়তে দেখে তাঁর কোমল মনে তা রেখাপাত করে। তিনি লেখেন,' প্রাচীরের ছিদ্রে এক নামগোত্রহীন/ ফুটিয়াছে ছোট ফুল অতিশয় দীন/ধিক্ ধিক্ করে তারে কাননে সবাই/সূর্য উঠে বলে তারে ভালো আছো ভাই?' জমিদার রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অতিশয় কোমল। প্রজাদের জমির খাজনা তিনি অনেকের মওকুফ করে দিয়েছেন।



পদ্মাবোটে নদীবক্ষে ভ্রমণকালে পিতাপুত্র আবিষ্কার করেন আত্মহত্যা করতে ডুব দেয়া কৃষককে। তিনি তাকে উদ্ধার করে ঋণ মওকুফ করে দিয়েছেন। কৃষকদের জন্যে তিনি সমবায় কৃষিব্যাংক স্থাপন করেছেন নোবেলের অর্থ পুরস্কারে। রবীন্দ্রনাথের কোমলতা সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে তাঁর অন্তরতর নাথের সাথে আধ্যাত্মিক সংযোগের মধ্য দিয়েই। রবীন্দ্রমননে বুদ্ধের মৈত্রীবাণীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে গভীরভাবে। তিনি তাঁর একাধিক কবিতায়,ভাষণে তা উল্লেখ করেছেন। বুদ্ধ তাঁকে এতই আন্দোলিত করেছে যে তিনি 'চ-ালিকা' নৃত্যনাট্যে তা তুলে ধরেন আনন্দ'র চরিত্রের মধ্য দিয়ে। 'রাজর্ষি' উপন্যাসে দেবতার পূজায় পশু বলিদানে তিনি নিরস্ত করেন রাজাকে। কোমল রবি এভাবেই প্রকাশিত হতে থাকে একের পর এক ঘটনাপ্রবাহে।



বিদেশ ভ্রমণে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাথে সংযোগ তাকে এতো বেশি কেমলতায় আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো যে, তিনি লিখ ফেলেন আধুনিক কাব্যধর্মী উপন্যাস 'শেষের কবিতা'। কোমল কবি তাঁর নৈবেদ্য দিয়ে যেন শেষ কথাটুকু বলে যান,



'তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান



গ্রহণ করেছো যত ঋণী তত করেছো আমায়



হে বন্ধু বিদায়, বিদায়।'



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৫১৯৪৩৭
পুরোন সংখ্যা