চাঁদপুর, সোমবার ৪ নভেম্বর ২০১৯, ১৯ কার্তিক ১৪২৬, ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৭-সূরা হাদীদ


২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


১৯। যাহারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ঈমান আনে, তাহারাই তাহাদের প্রতিপালকের নিকট সিদ্দীক ও শহীদ। তাহাদের জন্য রহিয়াছে তাহাদের প্রাপ্য পুরস্কার ও জ্যোতি এবং যাহারা কুফরী করিয়াছে ও আমার নিদর্শন অস্বীকার করিয়াছে, উহারাই জাহান্নামের অধিবাসী।


 


 


সভ্যতাই সভ্যলোক তৈরি করে।


-গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড।


 


 


বিদ্যা শিক্ষার্থীগণ বেহেশতের ফেরেশতাগণ কর্তৃক অভিনন্দিত হবেন।


 


ফটো গ্যালারি
শেকড় সন্ধানী সুলতান
আব্দুর রাজ্জাক
০৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


একজন চিত্রকর জীবনের মূর্ত ও বিমূর্ত অনুভূতিকে সাদা ফ্রেমে রঙের ছাপে মূর্তরূপে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। শিল্পীদের মধ্যেও যাঁরা নিজেদের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন তাঁদের মধ্যে এস এম সুলতান অন্যতম। তিনি জীবন ও জগৎকে বিভিন্ন সমারোহে সাজিয়ে তুলেছেন তাঁর ক্যানভাসে। তিনি চিত্রকলার আধুনিকতার একটি নিজস্ব সংজ্ঞা গ্রহণ করেছিলেন। তাই তাঁর চিত্রকর্ম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লাভ করেছিল। সুলতানের চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু গ্রামীণ জীবন, কৃষি ও কৃষক, নারী, সাধারণ মানুষের জীবনবোধ এবং মৃত্তিকা সংলগ্ন মানুষ। এসব অনুষঙ্গে ভর করে সুলতান এঁকে গেছেন আজীবন।



মধ্যপঞ্চাশে ঢাকায় আধুনিক চিত্রকলা নিয়ে প্রচুর উৎসাহ ও আগ্রহ নিয়ে শিল্পীরা যখন শৈলী, ফর্ম, মিডিয়া নিয়ে নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন ঠিক তখনই সকলের দৃষ্টির অন্তরালে রয়ে গেলেন এস এম সুলতান। শেকড়ের সন্ধানে তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ সাধক। তাঁর জীবনের মূল সুরটি বাঁধা ছিলো গ্রামীণ জীবন, কৃষিজ কাজের ছন্দের সঙ্গে। শিল্পে তিনি উজ্জ্বল করেন বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বাঙালির জীবনের প্রধান উৎস কেন্দ্রটি। বাঙালির দ্রোহ ও প্রতিবাদ, বিপ্লব ও সংগ্রাম এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কিভাবে টিকে থাকা যায় সেই বিষয় তাঁর চিত্রকর্মে অন্যতম বিষয়-আশয় হয়ে উঠেছে। গ্রামের কৃষকদের জীর্ণ-শীর্ণ শারীরিক অবস্থা, শোষণ এবং সাধারণ মানুষের স্বঅবস্থান থেকে উত্তরণ চেষ্টা তাঁর শিল্পকর্মে প্রাণপ্রাচুর্য এনেছে। তাঁর সকল সৃষ্টিকর্মে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সমাবেশ ঘটেছে। তাই তিনি কৃষক পুরুষের শরীরকে করেছেন পেশীবহুল এবং বলশীল। কৃষক রমণীর শরীরকে করেছেন সুডৌল ও সুঠাম গড়নের। নারীর প্রতিকৃতিতে দিয়েছেন যুগপৎ লাবণ্য ও শক্তি। সুলতান প্রত্যক্ষ করেছেন ম্রিয়মান কৃষকদের জীবন। তিনি তাদের শেকড়ের সন্ধান করেছেন। তাঁর চিত্রকর্মে শ্রেণী দ্বন্দ্ব, গ্রামীণ অর্থনীতির সামগ্রিক বাস্তবতা বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তাই তাঁকে চিত্রকলায় নিম্নবর্গীয় মানুষের প্রতিনিধি এবং তাদের নন্দনচিন্তার একজন রূপকার হিসেবেও উপস্থাপন করা যায়। এ বিষয়ে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, 'এস এম সুলতানের শিল্প সাধনায় অবয়বধর্মিতাই প্রধান। তিনি আধুনিক, বিমূর্ত শিল্পের চর্চা করার চেষ্টা করেননি। তাঁর আধুনিকতার মানে ছিলো জীবনের শাশ্বত বোধ ও শেকড়ের শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ফর্মের নিরীক্ষাকে গুরুত্ব দেননি, মানুষের ভিতরের শক্তির উত্থানই তাঁর কাজে প্রাধান্য পেয়েছে। উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই এবং উপনিবেশিকোত্তর সংগ্রামের নানান প্রকাশে তিনি সময়ের দাবির প্রেক্ষিতে তার শিল্পকর্মের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। এটাই ছিলো তার নিজস্ব আধুনিকতা অর্থাৎ তিনি ইউরোকেন্দ্রিক, নগরনির্ভর, যান্ত্রিকতা আবদ্ধ, আধুনিকতার পরিবর্তে অন্বেষণ করেছেন অনেকটা ইউরোপের রেনেসাঁর শিল্পীদের মতন মানবের কর্মবিশ্বকে।'



এসএম সুলতানের মতো কেউ আধুনিকতার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেননি। তাঁর নিজস্ব স্টাইলের ক্ষেত্রে তিনি অননুকরণীয়, তাঁর কোনো অনুসারী অথবা স্কুল ছিলো না। তাঁর মতো মৃত্তিকাসমর্পিত জীবন তাঁর সমসাময়িককালে কেউ যাপন করেনি। সুলতান তেলরঙ ও জলরঙের ছবি এঁকেছেন। ছবি অাঁকতে ব্যবহার করেছেন সাধারণ কাগজ, সাধারণ রঙ এবং চটের ক্যানভাস। এ সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে তিনি তাঁর একাগ্র সাধনায় ব্যতিক্রম প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। প্রখ্যাত এ চিত্রকর চেতনায় ছিলেন স্বাধীন এবং প্রকৃতগতভাবে ভবঘুরে ও ছন্নছাড়া, যা তাঁর শিল্পকর্মকে প্রভাবিত করে। তিনি রোমান্টিক কবির আবেগ দিয়ে ভালোবেসেছেন। তাঁর শিল্পকর্মের পরতে পরতে দেশপ্রেম, সাধারণ মানুষকে নিয়ে তাঁর অহংকার, ভালোবাসা, মমত্ববোধ প্রকাশ পেয়েছে। সমাজের নানা অসঙ্গতি অন্যায়ের প্রতি প্রচ- প্রতিবাদ, ক্ষোভ এবং মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন তাঁর তুলির পরশে বিশাল ক্যানভাসে রূপায়িত হয়ে উঠেছে। মাঠে জমি কর্ষণরত চাষী, রাখালের বাঁশির সুরে মগ্ন, মাছ ধরায় ব্যস্ত জেলে_ এসব ধরা পড়েছে তাঁর তুলির মহিমায়। গৃহস্থালির কাজে মনোযোগী পল্লীবালা, মাছ কোটা, ধান বোনায় ব্যস্ত সুখী পরিবার এসব বিষয় হয়ে উঠেছে চিত্রকর্মে। দুপুর বেলায় দূরে কোথাও মেঠো পথে ধুলো উড়িয়ে পল্লীবধূর বাবার বাড়ি যাওয়ার দৃশ্য তাঁর শৈল্পিক চোখ এড়ায়নি। তেমনি এড়ায়নি সারি সারি তাল, নারিকেল গাছ, বনজঙ্গল, নদীতে পালতোলা নৌকা, মাঝি-মাল্লার ভাটিয়ালির সুর, জাল দিয়ে মাছ ধরা, গুণ টানায় ব্যস্ত মাল্লা, কলসিতে জল আনতে যাওয়া গ্রাম্যবধূর চাহনীর গভীরতা।



 



এস এম সুলতান কৃষকদের জীবন ব্যবস্থার উপর ছবি এঁকেছেন। তাই তাঁর কল্পনা ও মননে ছিলো সেই রুগ্ন খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের উন্নতি, কৃষকদের নিয়ে তাঁর অাঁকা ছবিগুলোতে কৃষদের দৈহিকভাবে বলিষ্ঠ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এ প্রসঙ্গে শিল্পীর অভিমত, 'আমাদের দেশের মানুষতো অনেক রুগ্ন, কৃষ্ণকায়, একেবারেই কৃষক সেও রোগা, তার গরু দুটো রোগা, বলদ দুটো সেটাও রোগা। তাদের বলিষ্ঠ হওয়াটা আমার মনের ব্যাপার। মন থেকে ওদের যেমন ভাবে ভালোবাসি, সেই ভাবেই তাদের তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমাদের দেশের এই কৃষক সমপ্রদায় একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়েছিলো, দেশের অর্থ বিত্ত তারাই জোগায়, আমার অতিকায় ছবিগুলো কৃষকের অতিকায় দেহটা এই প্রশ্ন জাগায় যে, ওরা রুগ্ন কেন? কৃষ্ণ কেন? যারা আমাদের অন্ন জোগায়, ফসল জোগায় ওদের বলিষ্ঠ হওয়া উচিত।'



এস.এম. সুলতান এদেশের কৃষি ও কৃষকদের জীবনবোধের মধ্যে তাঁর জীবনের মূল সুর ও ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন। আবহমান বাংলার খেটে খাওয়া কৃষিজীবী, মেহনতি মানুষের ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ, প্রতিবাদ এবং প্রতিকূলতায় টিকে থাকার ইতিহাস তাঁর শিল্পকর্মকে দিয়েছে শ্রেষ্ঠত্ব। গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণিদ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সংগ্রামী রূপ ফুটে উঠেছে আপন মহিমা ও স্বকীয়তায়। তাঁর চিত্রকর্মে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের মহিমা সুচারুরূপে চিত্রায়িত হয়েছে। যার প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে আমাদের গ্রাম বাংলার কৃষক, কৃষি আর গ্রামীণ জীবন। কৃষি এবং গ্রামীণ জীবন তাঁকে এতোটাই প্রভাবিত করেছিলো যে, শেষ জীবনে এসে তাঁর জীবনের পরিপূর্ণতা নিয়ে এভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'আমি সুখী, আমার কোনো অভাব নেই। সকল দিক দিয়েই আমি প্রশান্তির মধ্যে দিন কাটাই। আমার সব অভাবেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছে।'



সুলতান নারী সুঠাম দেহের গড়ন উপস্থাপন করেছেন। তিনি নারীর চিরাচরিত রূপ-লাবণ্যের শক্তির সম্মিলিত প্রকাশ ঘটিয়ে নারীকে সমাজের মূল স্রোতধারার উপলক্ষ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর যে সকল চিত্রকর্ম দেশে-বিদেশে বিখ্যাত হয়েছে সেগুলো হলো : জমি কর্ষণ-১, জমি কর্ষণ-২, হত্যাযজ্ঞ, মাছ কাটা, জমিকর্ষণের যাত্রা-১ এবং ২, যাত্রা, ধান মাড়াই, গাঁতায় কৃষক, প্রথম বৃক্ষরোপণ, চরদখল, পৃথিবীর মানচিত্র ইত্যাদি। তিনি দেশ-বিদেশে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৮২ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার সুলতানকে ম্যান অব এচিভমেন্ট সম্মাননা প্রদান করে। গুণী এই চিত্রকর পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ শিল্প একাডেমি তাঁকে আর্টিস ইন রেসিডেন্স ঘোষণা করে। এই বিখ্যাত শিল্পীর জীবন ও কর্ম নিয়ে ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ৭ বছর ধরে নির্মাণ করা হয় আদম সুরত প্রামাণ্যচিত্র।



১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর সুলতান এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। রেখে যান এক ইতিহাস, এক আদর্শ যে আদর্শ যুগ যুগ ধরে অনাগত শিল্পীদের শেখাবে কিভাবে নিঃস্বার্থভাবে শিল্পীদের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতে হয়, কিভাবে জীবনকে অনেক কাছ থেকে দেখতে হয়। তাঁকে নিয়ে যথার্থই লিখেছেন আহমদ ছফা, 'কোনো মানুষ জন্মায়, জন্মের সীমানা যাদের ধরে রাখতে পারে না। অথচ যাদের সবাইকে ক্ষনজন্মও বলা যাবে না। এরকম অদ্ভুত প্রকৃতির শিশু অনেক জন্মগ্রহণ করে জগতে, জন্মের বন্ধন ছিন্ন করার জন্য যাদের রয়েছে এক স্বাভাবিক আকুতি। শেখ মুহাম্মদ সুলতান সেই সৌভাগ্যের বরে ভাগ্যবান, আবার সে দুর্ভাগ্যের বরে অভিশপ্তও।'



মহান এ শিল্পীর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর জীবন ও কর্মের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
২৮০৭৪২
পুরোন সংখ্যা