চাঁদপুর, সোমবার ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২৫ ভাদ্র ১৪২৬, ৯ মহররম ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৫-সূরা রাহ্মান


৭৮ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৬৬। উভয় উদ্যানে আছে উচ্ছলিত দুই প্রস্রবণ।


৬৭। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ অনুগ্রহ অস্বীকার করিবে?


৬৮। সেথায় রহিয়াছে ফলমূল -খর্জুর ও আনার।


 


 


 


assets/data_files/web

বাণিজ্যই হলো বিভিন্ন জাতির সাম্য সংস্থাপক। -গ্লাডস্টোন।


 


 


যখন কোনো দলের ইমামতি কর, তখন তাদের নামাজকে সহজ কর।


 


 


 


ফটো গ্যালারি
তিতাশ চৌধুরী : কর্ষিত জমির শস্য
সৌম্য সালেক
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


'সুনন্দা নিঃসীম হারিয়ে যায় সময়ের ফাঁক-ফোকরে অলৌকিক বিন্যাসে



বাঁকা চাঁদ হাতে জেগে ওঠে কেবলই লাফায় সন্ধ্যার বিলে-ঝিলে



সুনন্দা খুশির রঙিন নায়ে ভরে তোলে নীলাভ পুকুর'



তিতাশ চৌধুরী তাঁর কল্প-বালিকা সুনন্দার নিঃসীম হারিয়ে যাওয়ার মতো সমপ্রতি আমাদের কাছ থেকে শারীরিকভাবে হারিয়ে গেছেন। প্রকৃতার্থে সৃষ্টিশীল মানুষ কখনই হারিয়ে যায় না বরং দিন দিন আরো বেশি উজ্জ্বল ও বাস্তব হয়ে ওঠে তাঁদের কর্মকলা। তিতাশ চৌধুরী একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক ও সম্পাদক। সত্তরের দশকের শুরুর দিকে কবি হিসেবে তাঁর সাহিত্য জগতে প্রবেশ। এ পর্যন্ত প্রকাশিত কাব্য চারটি : দুঃস্বপ্নের রাজকুমারী (১৯৭৮), তুমি সুখেই আছো নন্দিনী (১৯৯৩), তোমাদের জন্য ভালোবাসা (২০০৪) এবং অগ্রন্থিত কবিতা (২০১২)। শিল্প-সংস্কৃতির একজন নিবিড় পাঠক ও গবেষক হিসেবে ছিল তাঁর বিশেষ খ্যাতি_এবং 'নিষিদ্ধ নজরুল ও অন্যান্য প্রসঙ্গ', 'কুমিল্লা নজরুল স্মৃতি প্রেম ও পরিণয়', 'ভিক্টোরিয়া কলেজ এ যুগের কিংবদন্তি', 'ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জনক মেজর আবদুল গনি : জীবন ও কর্ম', 'জসীমউদ্দীন : কবিতা গদ্য ও স্মৃতি', 'মোতাহের হোসেন চৌধুরী : জীবন ও সাহিত্য', 'নজরুলের নানাদিক', 'অন্য বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথ', 'কুমিল্লা জেলার লোকসাহিত্য', 'দরবেশ ও দরগার কথা' এবং 'আমাদের লোক-সংস্কৃতি' বিষয়ক পুস্তক, প্রবন্ধ নিবন্ধগুলো তাঁর মননশীল প্রতিভার অন্যতম পরিচায়ক। তিনি অনুবাদ করেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের পরিচিত ও অপরিচিত কবিদের বিপুল কবিতা, যা তাঁর 'অন্যস্বর' নামক গ্রন্থে পত্রস্থ হয়েছে। একজন প্রাজ্ঞ সম্পাদক হিসেবে পালন করেছেন ৪১ বছরের দীর্ঘ সংযম। সে হিসেবে 'অলক্ত' সাহিত্য পত্রিকাটি তাঁর আপন আলয়। পত্রিকাটির সুবাদে যেমন উপকৃত হয়েছে আমাদের সাহিত্য, তেমনি সুযোগ পেয়েছেন তিনি নিজকে ছড়িয়ে দেয়ার। অকস্মাৎ তাঁর মৃত্যুর কথা শুনলাম, স্মৃতিকথা লিখব নাকি তাঁর সাহিত্যকীর্তি সম্পর্কে লিখব ভেবে পাচ্ছি না। এলোমেলো হবে হয়তো একজন স্মৃতিধন্য, পাঠধন্য শুভাকাঙ্ক্ষীর পক্ষে যা স্বাভাবিক।



হাজার বছর ধরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়েছে এবং পরিবর্তিত হয়েছে বাংলা কবিতা। সেই পরিবর্তনের প্রভাবে যে ধারাটি বর্তমানের কাব্যভাষার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংহত তারই অন্যতম সারথি তিতাশ চৌধুরী। প্রায় ছয় দশক ধরে বাংলা কবিতার গতিকে আরো কিছু বেগ দিতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শ্রমশীল। ১৯৬৯ সালে টানা গদ্যে তিনি লিখেছেন 'এমিলি চৌধুরীর স্বপ্ন' শীর্ষক কবিতা। সেদিন একেবারেই নতুন আঙ্গিক হিসেবে কবিতাটি উপস্থাপন করেছেন। শিল্পকলার তাবৎ ধারা-ধরনের মধ্যে সবচেয়ে ঋদ্ধ ও অভিজাত শিল্পমাধ্যম কবিতা। সেই আভিজাত্যের শুচিতাকে অক্ষুণ্ন রেখে তিনি গেঁথেছেন শব্দের মালা।



'অথচ কি সুন্দর কুমারী বিস্ময়



পৃথিবীর এক অবধূত মানবীর কাছে



হৃদয় রেখে ঘুরেছি দেশে



জীবনের পুরুষ্ট আবেদনে



একদিন কবে।



মৃত ফসলের ঊমানী-গন্ধে



অথচ আমি এক ছিন্ন শতাব্দী।'



কবিতার ক্ষেত্রে গন্তব্য কিংবা সিদ্ধান্ত কোনোটিই সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করা সম্ভব নয়, কেননা আজ যারা ব্যাপক পঠিত এবং মূল্যায়িত, কাল তিনি একই সমাদর না-ও পেতে পারেন। তবে একজন কবিকে তখন সার্থক এবং সফল বলা যায় যখন দেখি তিনি উচ্চারণ করছেন বিশুদ্ধ ভালোবাসার এমন বাক্যমালা_



'পথে যেতে যেতে তুমি সীতাক- চন্দ্রনাথ পাহাড়ে



আটকে গিয়েছিলে হঠাৎ আবিষ্কার করলাম



কোন সুদূরের স্মৃতি তোমাকে এভাবে আটকে দিতে পারল?



পথে যেতে যেতে তোমাকে বিচিত্র স্বপ্নের কথা বলেছিলাম



তুমি কিছুই শুনলে না।'



কিংবা দেশমাতৃকার চরম মুহূর্তের এমন আর্ত কথামালা_



'এবং যদ্দুর জানা গেছে



মাইলাই-এর দাগী খুনিরাই কালরাত এসেছে এখানে এই বাংলায়



কী এক দুঃস্বপ্ন গ্রেনেডে মুহূর্তেই দারুণ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে ওঠে রাজকুমারীর



মুখ, চিবুক, কাছের তিল, ঠোঁট এবং সমগ্র অবয়ব।'



অনুবাদকর্মে স্বাভাবিকভাবেই দৈশিক, কালিক, স্থানিক এবং যুগচেতনার স্ফুরণ চলে আসে। হৃদয়গ্রাহী ও মর্মছোঁয়ার প্রয়োজনেই অনুবাদককে ভাবতে হয় সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষী মানুষের আবেগ-রুচি, চিন্তা ও সংস্কৃতির কথা। দুটি বিপরীত ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান একজন অনুবাদকের বিশেষ যোগ্যতা। তিতাশ চৌধুরীর অনুবাদ কবিতাগুলো পড়লে আসলেই ভ্রম হয় এটা কি বাংলা কবিতা নাকি ভিন্ন কোনো ভাষার_



'আমি আমার কামনাগুলিকে এখনো সযত্নে লালন করি



যদিও আমার হৃদয় হারিয়ে গেছে এবং



আমার মৃত্যুশয্যার এই প্রত্যাশাই



আমাকে যন্ত্রণার সুতীক্ষ্ন পেরেকে খোঁচাবে অহরহ।'



জগৎখ্যাত কবিদের সঙ্গে সঙ্গে তিনি এমন কিছু কবিকে অনুবাদ করেছেন যারা আসলেই আমাদের খুব পরিচিত নন_লিভিও ডেমিইয়ান, চু হুই কেন, সম্রাট ওয়েতাই, ফেঙ মেঙ লাং, সম্রাট ইউতাই, জুস গার্সিয়া ভিলা, মেজ হেইল্স এবং ডেরেক ওয়ালকট যাদের কয়েকজন।



বিশ্বসাহিত্যে চিঠিপত্রও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়। চেষ্টার ফিল্ড তার পুত্রকে, জওহরলাল নেহরু তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী প্রিয়দর্শিনীকে, রবীন্দ্রনাথ তার ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে, নজরুল নার্গিসকে, লোরকা তার এক শিষ্যকে, হিটলার তার প্রেয়সীকে, নেপোলিয়ন তাঁর প্রণয়িনীকে এবং রিলকে এক তরুণ কবিকে যেসব চিঠি লিখেছেন তা বিশ্বসাহিত্যের মূল্যবান সম্পদ। 'অলক্ত' সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা এবং একই সঙ্গে অলক্ত পুরস্কারের সূত্রেই বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখক-কবিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ, পত্রবিনিময় করতে হয়। তিনি সযত্নে আগলে রেখেছেন বিখ্যাত শিল্পী-সাহিত্যিকদের এসব পত্র এবং সমপ্রতি এমন শতাধিক চিঠি সংকলন করে তিনি প্রকাশ করেছেন 'লেখকের পত্রাবলি' শিরোনামের গ্রন্থ। পশ্চিমবঙ্গের লেখক অচিন্ত বিশ্বাসের চিঠি দিয়ে শুরু হওয়া গ্রন্থটিতে সংকলিত হয়েছে ড. আনিসুজ্জামান, নজরুল গবেষক আজাহার উদ্দীন খান, আনন্দ মোহন বসু, আল মাহমুদ, আবু ইসহাক, আবু জাবের, ড. মযহারুল ইসলাম, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ূন আহমেদ, আসাদ চৌধুরী, মুনতাসীর মামুনসহ অনেক প্রথিতযশা বিদ্বানের চিঠি। কথাশিল্পী শওকত ওসমানের 'পোট্রেট গ্যালারি' বইটির অসামান্যতার সঙ্গেই কেবল এই সংকলনটির তুলনা চলে।



প্রজ্ঞা ও প্রাঞ্জলতার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে তার প্রবন্ধ, নিবন্ধ এবং বিষয়ভিত্তিক রচনাগুলোয়। বিভিন্ন দিকে ডালপালা না ছড়িয়ে খুব সরল ও একরৈখিকভাবে তিনি স্বচ্ছন্দে এগিয়ে যেতেন। এতে পাঠকের কাছে লেখকের গন্তব্য ও বক্তব্য সহজেই স্পষ্ট হয়ে উঠে। তার এই গদ্যভাষা ঋজু এবং স্বতন্ত্র। 'নজরুলের কবিতা আমাদের রণসঙ্গীত ও রবীন্দ্রনাথের কবিতা আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। জসীমউদ্দীন আমাদের খেটে খাওয়া মানুষের কবি, জীবনানন্দ দাশ আমাদের বুদ্ধিজীবীদের এবং সুকান্ত আমাদের সংগ্রাম ও নির্যাতিতের কবি।' এভাবে খুব স্বল্প বাক্যব্যয়ে স্বরূপ উদ্ঘাটনে তিনি সক্ষম এবং অনাবৃত এক শব্দশিল্পী। ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির স্বরূপসন্ধানী তিতাশ চৌধুরী প্রবন্ধের অন্য এক জায়গায় উল্লেখ করেন_'আমাদের জীবনে ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির অপ্রতিহত ও অপ্রতিরোধ্য প্রভাব রয়েছে। সে প্রভাব আমাদের জীবনে কখনো সংঘাতময়তার রূপ নিয়েছে কখনো বিদ্রোহের আবার কখনো আনন্দ বা সুন্দরের'।



ভাষা-শিল্প-সংস্কৃতির এই নিবিড় ও সর্বমুখী প্রভাব যে আমাদের জীবনে বিভিন্নভাবে প্রকাশ হয় তা এভাবেই আমরা তার গদ্যে ফুটে উঠতে দেখি। 'আন্তর্জাতিক নজরুল' প্রবন্ধে নজরুলের আন্তর্জাতিক পরিম-লে গ্রহণযোগ্যতা এবং তিনি কী কী মহাগ্রন্থ, বই-পুস্তক পড়েছেন কিংবা বিশ্বসাহিত্যের কোন্ কোন্ কবি-লেখকরা ছিলেন নজরুলের পাঠ্য তালিকায়, এ বিষয়ে অত্যন্ত চমৎকার ও তথ্যবহুল তাঁর প্রবন্ধটির কোনো বিকল্প আছে কি না আমার জানা নেই।



প্রায় ছয় দশকের চিন্তা-চর্চার মাধ্যমে তিনি লিখেছেন প্রায় ৪০টি গ্রন্থ, প্রচুর প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কবিতা এবং সম্পাদনা করেছেন পত্রিকা। অলক্ত পরিবার পুরস্কৃত করেছে আহসান হাবিব, সৈয়দ শামসুল হক, আনিসুজ্জামান, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, কবির চৌধুরী, হুমায়ূন আহমেদ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, হাসান আজিজুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, সেলিনা হোসেন প্রমুখ দুই কুড়িরও বেশি কবি-লেখককে; কিন্তু তিতাশ চৌধুরীর ভাগ্যের শিকা আর ছিঁড়ল না। পুরস্কার-সম্মাননা তো আসলে শ্রম-শ্রান্তি কিংবা নিবেদনের চেয়ে বেশি কিছু নয়, তা একরকম সম্মান কিংবা স্বীকৃতি যা কবি-সাহিত্যিকদের আরো বেশি প্রাণিত-শাণিত হতে উৎসাহী করে। সর্বোপরি তার কবিতার মতোই তিনি চমকে উঠবেন মেঘে মেঘে আর সেই নিবিড় প্রতিধ্বনি পেঁৗছে যাবে সব অরণ্যে-লোকালয়ে_



'নন্দিতা, তুমি ঠিক দেখে নিও



মেঘে মেঘে ঘর্ষণেই কেবল বিদ্যুৎ চমকায়



আমার বিশ্বাসের নিবিড় প্রতিধ্বনি



তুমি দেখে নিও পৃথিবীর সকল অরণ্যে-লোকালয়ে।'



প্রতিবার মৌসুমে মৌসুমে আমরা ঘরে তুলব তাকে_তিনি আমাদের কর্ষিত জমির শস্য।



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৯২২৬৬
পুরোন সংখ্যা