চাঁদপুর, সোমবার ৫ আগস্ট ২০১৯, ২১ শ্রাবণ ১৪২৬, ৩ জিলহজ ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৪-সূরা কামার


৬২ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


১৫। আমি ইহাকে রাখিয়া দিয়াছি এক নিদর্শনরূপে ; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেহ আছে কি?


১৬। কী কঠোর ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী!


১৭। কুরআন আমি সহজ করিয়া দিয়াছি উপদেশ গ্রহণের জন্য ; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেহ আছে কি?


 


 


একগুয়েমী ভালো কাজেই ভালো, মন্দ কাজে নয়। -শিবনাথ শাস্ত্রী।


 


 


প্রভু, তুমি যেমন আমার আকৃতি পরম সুন্দর করে গঠন করেছো, আমার স্বভাব ও তদ্রূপ সুন্দর করো।


 


 


 


 


ফটো গ্যালারি
জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা : পাঠ ও নাট্য-প্রযোজনা বিষয়ে একটি ক্ষুদ্র বক্তব্য
সৌম্য সালেক
০৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


নিঃসন্দেহে 'জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা' শহীদুল জহির-এর শ্রেষ্ঠ এবং বাংলা ভাষার একটি তাৎপর্যবহ উপন্যাস। এ তাৎপর্য উপন্যাসটির ঘটনাঘন দ্রুতচাল কাব্যিক বর্ণনা, অস্তিত্ববাদী চিন্তা এবং পর্যায়হীন চেতনাবহ বাকনির্মিতির জন্য। উপন্যাসটির শুরুতে বয়ান এমন, 'ঊনিশ শ পঁচাশি সনে একদিন লক্ষ্মীবাজারের শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরী লেনের যুবক আবদুল মজিদের পায়ের স্যান্ডেল পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতি বিধানে ব্যর্থ হয়ে ফট্ করে ছিঁড়ে যায়। আসলে বস্তুর প্রাণতত্ত্ব যদি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতো, তাহলে হয়তো বলা যেত যে, তার ডান পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেলের ফিতে বস্তুর ব্যর্থতার জন্য নয়, বরং প্রাণের অন্তর্গত সেই কারণে ছিন্ন হয় যে কারণে, এর একটু পর আবদুল মজিদের অস্তিত্ব পুনর্বার ভেঙে পড়তে চায়।'



উপন্যাসটির অনেক জায়গায় আমরা এমন দুর্দান্ত বাকপ্রবাহের সাক্ষাৎ পাবো। যদিও উপন্যাসটির বিষয়ে, 'সময় অনুযায়ী ঘটনার ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়নি', এমন অভিযোগ রয়েছে। কেননা ১৯৭১-এর পর ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত আখ্যানের ঘটনার সাথে সম্পর্কিত এমন অনেক কিছু ঘটেছে যার প্রকাশ কিংবা আভাস এখানে নেই। লেখক এই আখ্যানের সময়কালকে ৭১ পরবর্তী দুই বা তিন বছরের মধ্যে সীমিত রাখলে অনেক প্রশ্ন জাগতো না। ১৯৮৫ সালের ৮ জানুয়ারী ইত্তেফাকে যে বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে তা যদি ১৯৭৪ সালে প্রকাশ হতো তাহলে এত প্রশ্নের উদয় হতো না, কেননা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরই আবদুল মজিদ ও তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আশঙ্কা জেগেছে যে, তারা আবারও বদু মাওলানা কর্তৃক নিগ্রহের শিকার হতে পারে। কেন লেখক ঘটনাটিকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত টেনে এনেছেন এর উত্তরও বিচিত্র হতে পারে। হয়ত লেখক বুঝিয়েছেন, দিনে দিনে বদু মাওলানারা দেশে আবারও শক্তিমান হয়ে উঠছে কিংবা আবদুল মজিদের সন্তান জন্ম লাভের বয়স দেখানোর জন্য কিছু সময়ের প্রয়োজন, কারণ মজিদের মনে হচ্ছিল তার কন্যাও মোমেনার মতোই বদু মওলানা বা তার দোসরদের দ্বারা আবারও লাঞ্ছিত হতে পারে; এজন্য তিনি বছরগুলোকে এগিয়ে দেখিয়েছেন, এমন আরও বিভিন্ন উত্তর ভাবা যায়। উপন্যাসে জাতির ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কে এড়িয়ে আসা হয়েছে -এমন কথাও বলেছেন কেউ কেউ।



এ বিষয়ে কিছু প্রস্তাব হচ্ছে, শিল্প-সাহিত্যের মধ্যে ইতিহাসের অবলম্বন থাকবে, ছায়া, প্রচ্ছায়া থাকবে কিন্তু ইতিহাসের পূর্ণ-প্রতিস্থাপন থাকতে হবে এমন নয়। এ উপন্যাসে মূলত রাজাকারদের অপকর্ম ও তাদের সদর্পে চলা পরবর্তী দিনকাল ও বাস্তবতা দেখানো হয়েছে। এটি দেখাতে গিয়ে অনেক বর্ণনাযোগ্য বিষয় এড়িয়ে লেখক কেবল সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একরৈখিকতা বজায় রেখে এগিয়েছেন। এতে লেখক বরং তার শিল্পের স্বাভাবিক পথেই চলেছেন এবং নানা বিষয়ের অবতারণা করে গল্পকে জটিলতর করতে চান নি। এ উপন্যাসের ভাষা প্রচলিত গদ্য ভঙ্গিতে রচিত হয় নি। কখনও দীর্ঘ বাক্যের মর্ম বোধ করার জন্য আপনাকে থেমে আবার পাঠ নিতে হতে পারে। যদিও আমাদের মুক্তি-সংগ্রামের ঘটনা এটি, কিন্তু ঘটনার ঘনঘটায় আপনি পথ হারাতে পারেন আবার ফিরতেও খুব বিলম্ব হবে না। এর গদ্যশৈলী আপনাকে মার্কেজ, বোর্হেস, কার্লোস ফুয়েন্তেস কিংবা জোসে সারামগো-এর গদ্যভঙ্গির কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। এ উপন্যাসের টেঙ্ট সম্পর্কে আরও অনেক কথা বলার রয়েছে। সেসব পরবর্তী কোনও গদ্যে রচনার জন্য অবশিষ্ট রেখে আমরা সৈয়দ জামিল আহমেদ কৃত 'জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা' উপন্যাসের নাট্যনির্মিতি সম্পর্কে কিছু সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করবো।



১। ঘটনাঘন এই আখ্যানের মাঝে অনেক জটিল, বেদনাবহ, বিদ্রূপাত্মক, রক্তাক্ত ও চরম দৃশ্য আমরা কল্পনা করতে পারি, সেসব দৃশ্যকল্পকে মঞ্চে উপস্থাপনের জন্য বারবার চাকাযুক্ত যেসব দৃশ্যপটকে নির্দেশক জামিল আহমেদ আমদানি করেছেন তা অভিনব এবং দৃশ্যকে এভাবে পটভূমে তুলে আনার চেয়ে যথার্থ কোনও বিকল্প রয়েছে বলে এই মুহূর্তে মনে আসছে না। দৃশ্য চিত্রায়নের এই সৃজনশীলতা নির্দেশকের শিল্প সম্পন্নতার এক বড় দৃষ্টান্ত।



২। উপন্যাস পাঠ শেষে মনে হয়েছে, পরোক্ষভাবে হলেও বদু মাওলানা ধিকৃত হয়েছে আখ্যানের সর্বাংশ জুড়ে, সে ঘৃণা প্রকাশের প্রত্যক্ষ পক্ষ ছিল না, যদিও কিন্তু নাটক দেখে মনে হয়েছে বদু মাওলানা বারবার কেবলি জিতে যাচ্ছে, তার আস্ফালন ও ধৃষ্টতা বারবার জান্তব হয়ে উঠেছে মঞ্চে। হয়তবা কালো অক্ষর ও অপ্রত্যক্ষ কল্পরূপের ব্যবধান উবে যাওয়াতে বিষয়টা এমন জান্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিংবা ভাববস্তু ও বাস্তবতার পার্থক্য এতটুকুই, কেননা নির্দেশকের মন্তব্য তিনি একটি সংলাপও নিজে থেকে আরোপ করেননি।



৩। হইচই, ছুটাছুটি, আলো-শব্দের খেলে নাটকের অনেক সংলাপ মার খেয়েছে এবং এতে মূল পাঠ যাদের অপঠিত তাদের জন্য নাটকে আখ্যানের বুঝাবুঝিতে বেশ মুশকিল হয়েছে বলে কিছু প্রদর্শনার্থীর অভিমত।



৪। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার ঘটমান বর্তমানের উত্তরাধুনিক শিল্প প্রয়াসে শহিদুল জহির তার উপন্যাসে কাক কিংবা উইপোকার আবর্তন দেখিয়ে গল্পটিকে প্রতীকায়িত করেছিলেন আর এসব প্রতীককে জামিল আহমেদ দারুণ সৃজন নৈপুণ্যে মঞ্চে এনেছেন প্রপ্স ও আলোকসজ্জার কারিশমায়, যা নাটকটিতে মনকাড়া এবং কিছু ক্ষেত্রে শিরশিরে অনুভূতিজাগা আবহে রূপ দিয়েছে।



৫। জামিল আহমেদ উপন্যাসের দীর্ঘ ক্যানভাসকে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে জাতীয় নাট্যশালার সব বেড়ী ও আস্তারণকে সরিয়ে দিয়েছেন। ঢাকার দর্শকরা দেখতে পেলো, একটি বিশাল মঞ্চ যা প্রেক্ষাগৃহের দর্শক সারির চেয়েও বড় দেখতে লেগেছে। তবে এই বিস্তারিত আয়তন যে সর্বদা তার কাজে এসেছে তা নয় এটি বরং তার পাত্র-পাত্রীর যাতায়াতকে স্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছে কেবল।



৬। নাটক সম্পর্কে একটি বড় সমালোচনা ছিল- ঘটনার/ বর্ণনার রিপিটেশন। আসলে এই রিপিটেশনটা কিন্তু শহিদুল জহিরের টেঙ্ট-এর। নির্দেশক টেঙ্টের বাইরে যান নি কিন্তু তিনি দু-এক ক্ষেত্রে যেতে পারতেন, যেমন মোমেনার শ্লীলতাহানি ও তাঁকে হত্যার ঘটনা। গল্পে এ বিষয়টি তিনবার এসেছে, এসেছে মূলত লেখকের অন্তঃশীল চেতনা প্রবাহের ফেরে, যা বাস্তবতার অনুপুঙ্খ নীতি নয় বরং এটি আত্ম-আলোড়নের অধিবাস্তবতা। ভেবে দেখলাম, জামিল আহমেদ মোমেনার ধর্ষণ এবং মৃত্যুকে একবার দেখলে নাটক নির্মাণে নির্দেশককে আরও ব্যাপক পরিশ্রম করতে হতো, গবেষণা করতে হতো, হয়ত সেই ঝুঁকি ও দুর্ভোগটুকু তিনি এড়াতে চেয়েছেন এবং সেজন্য গল্পের অনুপুঙ্খ রক্ষণে সচেষ্ট থেকে সহজ পথে এগিয়েছেন।



৭। নাটকে লেখকের সংলাপহীন বর্ণনার বাক্যগুলোতেও পাত্র-পাত্রীর অভিনয় জোরালো দেখেছি, এমনটি বর্ণনাত্মক ধারার নাটকের অভিনয় রীতির সাথে কতটা সংগতিশীল তার প্রশ্ন সাপেক্ষ। বেশ কিছু সংলাপের সময় দেখেছি, পাত্র-পাত্রী বিকৃত স্বরে কথা বলছে, এতে সাধারণ দর্শকের জন্য কাহিনী ও বক্তব্য কিছুটা জটিল হয়ে উঠেছে।



৮। ঘটনা সমান্তরাল হলে গল্প-উপন্যাসের বর্ণনাত্মক ধারায় নাট্যায়ন খুব জটিল কিছু নয়। কিন্তু গদ্য যদি হয় শহিদুল জহিরের মতো মারপ্যাঁচ যুক্ত ডিকশনে নির্মিত, সেটাকে মঞ্চে উপস্থাপনাটা বেশ দুরূহ এবং ঝুঁকিপূর্ণ । সৈয়দ জামিল আহমেদ এমন একটি জটিল কাজকে যে মঞ্চে এনেছেন তা অবশ্যই সাহসিতার ব্যাপার। যদিও ইতঃপূর্বে জেলা শিল্পকলা একাডেমি, ফেণী নাট্যরূপ দিয়ে ২০১৪ সালে এই উপন্যাস থেকে নাটক করেছে। কিন্তু তা ছিল খ-িত এবং এক ঘণ্টার স্বল্প আয়তনের নির্দেশনায় বন্দী। এক্ষেত্রে সৈয়দ জামিল আহমেদের প্রযোজনা বেশ প্রকল্পিত এবং শিল্পানুগ।



একটি মৌলিক সাহিত্যকর্ম কিংবা যে কোনও শিল্পবস্তু তার নিজস্ব ও প্রারম্ভিক রূপেই সর্বাধিক সার্থক ও সম্পন্ন কেবল কৌতূহল, প্রয়োজন ও উপযোগ ভাবনা থেকেই অন্য শিল্প-মাধ্যমে সেটিকে রূপান্তরের চেষ্টা চলে, সে চেষ্টা যে সর্বদা সফল বা বিফল হয় তা নয়। মানুষের গ্রহণযোগ্যতাই তাকে মাহাত্ম্য দিয়ে থাকে। এমনও দেখা গেছে যে, অনেক শিল্পকর্ম তার প্রথম অবস্থার চেয়ে দ্বিতীয় রূপান্তরে অধিক পরিচিতি পেয়েছে, বিষয়টি সম্পূর্ণই আপেক্ষিক। আমাদের উদ্দিষ্ট পাঠ 'জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা' শহিদুল জহিরের একটি সফল উপন্যাস এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। এর দ্বিতীয় নির্মাণের ক্ষেত্রে যে সৈয়দ জামিল আহমেদ ব্যাপক ভেবেছেন, খেটেছেন এবং ঘেমেছেন এ বিষয়েও আমাদের সন্দেহ নেই।



আমরা উপন্যাসটি পড়ে পেয়েছি এক ঘোরলাগা অনুভূতি, শিহরণ, উত্তেজনা, হতাশা ও হাহাকার আর এর নাট্যায়ন আমাদের সামনে এনেছে বর্ণনার বিবিধ ব্যঞ্জনা, সচল ভাষ্য, চিত্রকল্প ও নানা মুহূর্তের জান্তব বাস্তবতার নির্মমতা। পাঠ ও নির্মিত বিষয়ের মধ্যে তফাৎ থাকবে স্বাভাবিক, কিন্তু দুটোর মধ্যে নিবিড় সাযুজ্য সাধনে নির্দেশক সৈয়দ জামিল আহমেদ যে প্রাণান্ত ছিলেন সেটিকে উন্মোচনের কিঞ্চিৎ আকাঙ্ক্ষা থাকলে সহসাই আপনার কাছে তা স্পষ্ট হবে।



লেখক : সৌম্য সালেক। ০১৯১৮৭১০৭৭৩/ ০১৮৫৫৫১৮৯০৮



 



 



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৮২৬২৮২
পুরোন সংখ্যা