চাঁদপুর, সোমবার ৫ আগস্ট ২০১৯, ২১ শ্রাবণ ১৪২৬, ৩ জিলহজ ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৪-সূরা কামার


৬২ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


১৫। আমি ইহাকে রাখিয়া দিয়াছি এক নিদর্শনরূপে ; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেহ আছে কি?


১৬। কী কঠোর ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী!


১৭। কুরআন আমি সহজ করিয়া দিয়াছি উপদেশ গ্রহণের জন্য ; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেহ আছে কি?


 


 


একগুয়েমী ভালো কাজেই ভালো, মন্দ কাজে নয়। -শিবনাথ শাস্ত্রী।


 


 


প্রভু, তুমি যেমন আমার আকৃতি পরম সুন্দর করে গঠন করেছো, আমার স্বভাব ও তদ্রূপ সুন্দর করো।


 


 


 


 


ফটো গ্যালারি
এ কালের বই বিমুখতা
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
০৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


আজকের প্রজন্ম প্রযুক্তির সোনালি প্রজন্ম। বাতাস যেমন আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে আমাদের তেমনি প্রযুক্তিও প্রবল সম্মোহনী শক্তিতে জড়িয়ে আছে আজকের প্রজন্মকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই হীরক যুগে আজকের প্রজন্ম তাই প্রযুক্তির কাছে সোপর্দ করেছে নিজের মানবিকতা এবং মানসিকতা উভয়ই। প্রতিটি যুগের কিছু নিশ্চিত চিহ্ন থাকে। যেমন প্রস্তর যুগ বা তাম্র যুগের স্বতন্ত্র নিদর্শনের কারণে মানব সভ্যতার ইতিহাসে তা স্থায়ী হয়ে আছে আজও, তেমনি আজকের তথ্য প্রযুক্তির যুগেরও কিছু নিশ্চিত চিহ্ন আছে। এই চিহ্নের সনাক্তকারী যোগ্যতার কারণেই আমরা সহজে বুঝে নিতে পারি যুগের বৈশিষ্ট্য। আজকের এই প্রযুক্তির সোনালি প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য হলো অস্থিরতা এবং অগভীরতা। যুগের মন্ত্রকে বুকে ধারণ করেই আজকের প্রজন্ম এগিয়ে চলেছে জীবনের বন্ধুর পথে।



আগেকার প্রজন্ম মানবিক শক্তিতে সব করতে গিয়ে মেধা খাটিয়েছে অধিক। এতে মস্তিষ্কের ব্যায়াম যেমন হয়েছে তেমনি বুদ্ধির বিকাশও হয়েছে। আগেকার প্রজন্ম শ্রম বিনিয়োগ করে জ্ঞান অর্জনের পথে হেঁটেছে। ফলে যা জেনেছে তা গভীর। যা করেছে তা ধীরস্থির হয়ে করেছে। প্রতিযোগিতার মনোবৃত্তিতে নয় সমৃদ্ধ হওয়ার পবিত্র মানসে আগেকার প্রজন্ম নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে জ্ঞান সাধনায়। আজকের প্রজন্ম প্রযুক্তির বৈশিষ্ট্যে অতি আক্রান্ত বিধায় অতি দ্রুত ফলাফল আকাঙ্ক্ষা করতে শিখেছে। পরিণামে ফল ভালো হওয়ার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে অপরিণত ফসলে গোলা ভরে তুলছে। প্রযুক্তির স্বভাবই হলো অধীরতা বা অপেক্ষা বিমুখতা। ফলে সুইচ টেপা মাত্রই ফল পাওয়ার প্রাত্যহিকতায় অভ্যস্ত হওয়া প্রজন্ম নিজের জীবনের ক্ষেত্রেও এই তত্ত্বের সুপ্রয়োগ করতে চায়।



মনে পড়ে সেই গল্পের কথা। এক বাদশাহর কাছে পার্শ্ববর্তী রাজ্যের রাজা কুড়ি ঘড়া জ্ঞান চাইলেন। বাদশাহ পড়লেন বিপদে। জ্ঞান কি আর ঘড়ায় মেপে দেওয়া যায়? বাদশাহর বুদ্ধিমান মন্ত্রী বললেন, আলমপনা, একমাস সময় দিন। আমি কুড়িঘড়া জ্ঞান তাকে বুঝিয়ে দিবো। বাদশাহ আর রাজার দূত দুজনেই বেশ চমকিত হলেন মন্ত্রীর কথায়। মন্ত্রী পরদিন এক কুমড়ো ক্ষেতে গিয়ে কুড়িটা কুমড়ো ফুলের উপরে কুড়িটা চিকন গলার কলস উপুড় করে বসিয়ে দিলেন। অতঃপর ঐ কুমড়ো ক্ষেতে কড়া পাহারা বসালেন যাতে কোনো লোক তো দূরের কথা মাছিও না যায়। যথারীতি একমাস পরে কুমড়ো ফুল হতে পরিণত কুমড়ো হলো। মন্ত্রী কুমড়োগুলো ঘড়ার ভেতরে রেখে ক্ষেত হতে তুলে নিয়ে রাজার দূতকে দিলেন। বাদশাহ ও রাজার দূত মন্ত্রীর বুদ্ধিতে হতবাক হলেন। এই গল্পের একটা শিক্ষা হলো বুদ্ধির শক্তি হলো বড় শক্তি। আবার অন্য একটি শিক্ষা হলো ধৈর্য। ধৈর্য না ধারণ করলে কুড়ি ঘড়া জ্ঞান দেওয়া সম্ভব হতো না।



আজকের প্রজন্ম প্রযুক্তির সোনালি সন্তান বলেই এই ধৈর্য তাদের কাছে বিরল। ধৈর্য বিরল বলেই রিমোট হাতে নিয়ে কেবল চ্যানেল হতে চ্যানেলে ভ্রমণই সারা হয়। কোন অনুষ্ঠান উপভোগ আর হয়ে ওঠে না। আজকাল বিকল্প যেমন বেশি তেমনি অস্থিরতাও বেশি। পূর্ণাঙ্গ প্রয়াস না দিয়ে একটার পর একটা অপশনে চলে যাওয়া যেন আজকের যুগধর্ম। ইয়ারফোন কানে দিয়ে অদ্ভুত এক ব্যস্ততায় রাস্তা চলা, চোখ ছানাবড়া করা, অস্থিরতা নিয়ে রাস্তায় মোটর সাইকেলে গতি উঠানো এসবই আজকের প্রজন্মের নিশ্চিত দ্রষ্টব্যপূর্ণ বিষয়।



রাতভর জেগে জেগে প্রযুক্তির ভাষায় দূরের বন্ধুর সাথে ভাব বিনিময় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দেয়ালে দেয়ালে বিচরণ করতে করতে তাদের অবসরের সময়তো যায়ই, বরং পড়ার সময়টাও উবে যায় নিমেষে। এই অধীর যুগফসল দিয়ে কি আর গভীর কিছু আশা করা চলে!



আজকের প্রজন্মের আরেক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন জিপিএ। এই জিপিএ-র প্রতিযোগিতায় আজকের প্রজন্ম এতো জীবনী শক্তিহীন হয়ে যায় যে পাঠ্য পুস্তকের বাইরে তার জগৎ সীমিত এবং অন্ধকার। দ্বার থেকে দ্বারে পিঠে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আজকের প্রজন্মের শৈশব-কৈশোর হরণ করেছে পরীক্ষা ব্যবস্থা। সারাদিন কেবল নোট আর শীটে চোখ বুলাতে বুলাতে বই হতে ক্রমশঃ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে প্রজন্ম-ফসল। ফলে যা জানার তা জানে না আর যা জানলে ভবিষ্যতের কাজে আসবে তা জানানোর ব্যবস্থা নেই।



আজকের প্রজন্মের আরেক ভয়াল দানব হচ্ছে মাদক। এই মাদকের করাল গ্রাসে ঢুকে গেছে আজকের প্রজন্মের অনেকটাই। ফলে বই পড়া ব্যতিরেকে অন্ধকারে একাকী সময় ব্যয় করাটাই তার কাছে অধিক ফুরফুরে বিষয় বলে মনে হয়। ইউফোরিক অবস্থার চেয়ে জ্ঞানার্জনের খটোমটো অবস্থা তার কাছে পরিহার্য। নানাবিধ ব্যস্ততায় সময়ের অভাব, অসুস্থ প্রতিযোগিতাপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা, মাদকাসক্তি, প্রযুক্তি অতি ব্যবহার ও সহজলভ্যতা এবং তারুণ্যের চটকদার আকর্ষণ ছাড়াও আজকের প্রজন্মের কাছে আগের মতো সুলিখিত পাঠযোগ্য বইয়ের অপ্রতুলতাও বই পাঠে অনীহার একটি বড় কারণ। পরাবাস্তব ও আধুনিক কবিতার নাম দিয়ে কবিতাকে আজকাল পাঠকের নাগাল হতে দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়া আজও চলমান। কতিপয় কবি ব্যতিরেকে কবিদের কবিতা আজ আর পাঠক পড়ে না। দুর্বোধ্য আধুনিক কবিতার কারণে আজকের প্রজন্মের কাছে কবিতার বইয়ের প্রতি আগ্রহ কম। আবার বই হাতে নিয়ে কথাসাহিত্য পড়ার মতো ফুরসৎ তার অঢেল যেমন নেই তেমনি পড়বার মতো মানসম্পন্ন কথাসাহিত্যেরও আজকাল ঘাটতি লক্ষণীয়। বই পড়ার অভ্যেস কেবলমাত্র যারা লেখালেখি করেন তাদেরই বহাল আছে।



আজকাল অনলাইনে বই পড়া যায়। সেক্ষেত্রে বইকে নিয়ে শুয়ে শুয়ে পড়ার আনন্দ হতে আজকের প্রজন্ম বঞ্চিত হয়ে চলেছে। অনলাইনে পড়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করে পড়তে গিয়ে বিটুইন দ্য লাইনস পড়া যায় না। আজকের প্রজন্ম বই পড়ার চেয়ে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতে পছন্দ করে বেশি। অনলাইনে তারা বই পড়ার চেয়ে গরম ও তাজা খবর দেখতেই পছন্দ করে বেশি। অনেকটাই বার্ডস্ আই ভিউ বা পক্ষীর চোখে শহর দর্শনের মতো। তাই চিন্তার গভীরতা আজ বিরল।



অতিরিক্ত ফাস্টফুড বা জাঙ্কফুড-এর কারণে এবং জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ফুডের জন্যে আজকের প্রজন্মের মধ্যে হাইপার অ্যাক্টিভ অ্যাটেনশন ডেফিসিট সিন্ড্রোমের প্রবণতা বেড়েছে। এরই বদৌলতে একসাথে তারা অনেকগুলো কাজ করতে গিয়ে কোনোটাতেই ঠিকমত মনোযোগ নিবিষ্ট করতে পারে না। ফলে সবকটা কাজই অর্ধেক করা হয়, কোনোটাই সম্পন্ন হয় না। এই অ্যাটেনশন ডেফিসিট সিন্ড্রোমই তাদের বইপড়া হতে পিছিয়ে রেখেছে। ফলে না তারা পাঠক হতে পারছে না সত্যিকারের শিক্ষার্থী হতে পারছে। অ্যাটেনশন ডেফিসিটের কারণেই তারা মনোযোগের একাগ্রতা বাড়াতে পারছে না। তারা নিয়মিত ক্লাস করলেও রাতে সাশ্রয়মূল্যে ক্লাস নোট আদান-প্রদানে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। আগেকার প্রজন্মের চেয়ে আজকের প্রজন্মের প্রতিটা দিন ধরতে গেলে বহুলাংশে ইভেন্টফুল। ফলে প্রায় প্রতিদিনই তারা মাস্তিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। তাদের বইয়ের মতো আপাত নিরস ও নির্জীব বিষয়ের প্রতি আগ্রহ কম। যে সময়টুকু বইয়ের পেছনে ব্যয় হওয়ার কথা তাই-ই তারা ব্যয় করে মোবাইলে গেম খেলে, গ্রুপ চ্যাটিং করে কিংবা ইউটিউবে যুগসঙ্গীতে মজে।



পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে বাস বা মেট্রোজার্নিতে সবার হাতে বই থাকে এবং নিঃশব্দে সবাই জ্ঞানসুধায় সিক্ত হয়। অথচ আমাদের দেশে এইসব যানবাহনে আরামদায়ক আসন ব্যবস্থা নেই। প্রতিটা পাবলিক যানবাহনে যাত্রী গিজগিজ করে। যানবাহনে বই পড়ার চেয়ে বাঙালি পরচর্চায় নিজেদের মধ্যে নিমগ্ন থাকে বেশি। এই কারণে দেখা যাচ্ছে বাঙালির বই পড়ার হার দিন দিন কমে যাচ্ছে এবং বাঙালি ক্রমশ বই পড়া হতে বিমুখ হয়ে যাচ্ছে।



আগেকার দিনে বিবাহে মানুষ প্রীতি উপহার হিসেবে দিতো বই। আর আজকাল বিয়ের অনুষ্ঠানে ক্রোকারিজ, জন্মদিনেও তা-ই উপহার দেয়া হয়। ফলে বই এখন আর কেউ কাউকে সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে দেয় না। এমনকি স্কুল কলেজের বার্ষিক প্রতিযোগিতাগুলোতেও বই নয়, দেয়া হয় প্লেট-বাটি। ফলে শিশুদের মধ্যে বইয়ের প্রচলনটা হারিয়ে যাচ্ছে। শিশুর জন্যে উপহার নেওয়া হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয় লজেন্স নয় তো খেলনা। ফলে বইয়ের মধ্যে যে বিনোদন তার খোঁজ আজকের বাচ্চাদের কেউ পায় না। তারা স্কুল কিংবা পাঠশালায় যতদূর শিক্ষা পায় তাকেই মনে করে সঠিক শিক্ষা। বস্তুতঃ সঠিক শিক্ষার এক অনন্য নজির বইয়ের প্রতি ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহী করে তোলা। একজন পলান সরকার প্রাণান্ত চেষ্টায় বাঙালিকে বই পড়ানোর অভ্যাস নির্মাণের চেষ্টা করে গেছেন। এরকম লক্ষ পলান সরকার আমাদের দরকার। তারপরও যদি আগামী প্রজন্মের মধ্যে গড়ে ওঠে বই পড়ার অভ্যাস, তবেই মাদকাসক্তি হতে বেঁচে যাবে পরবর্তী প্রজন্ম।



আজকের প্রজন্মের অনেকেরই ভোর হয় দিনের অর্ধেক পার হওয়ার পর। যদিও তখন সূর্য আর কচি কোমলটি থাকে না। রাত নামে ভোর হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে। ফলে মাঝখানের সময়টা কাটে হৈ হৈ রৈ রৈ করে। নিরবচ্ছিন্ন সময় তার দূর অস্ত। যার কারণে বইয়ের জ্ঞানসমুদ্রে ডুব দেওয়ার মতো ধৈর্য তার থাকে না। ফেসবুকে দুই-তিন লাইনের স্ট্যাটাস দিতে দিতে আজকাল দীর্ঘ পাঠে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না আজকের অতিব্যস্ত প্রজন্ম। ফলস্বরূপ যে ফল পেকে উঠছে তা অনেকটাই রাসায়নিক দিয়ে পাকিয়ে নেওয়ার মতো হয়ে যাচ্ছে।



অতিরিক্ত পাঠ্যের চাপ বলি আর অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষের চাপ বলি, আজকের বাচ্চারা বড় না হতেই কেমন যেন পেকে যাওয়ার মড়কে ধরেছে। ফলে চিটা ধানে চাল না হয়ে বর্জ্য বাড়ছে অধিক। আজকের প্রজন্মকে বইমুখী করতে হলে স্কুল-কলেজের বিভিন্ন উৎসব-প্রতিযোগিতায়, জন্মদিন ও সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে বই উপহার দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। নিজের পঠিত পাঠ্য বইয়ের বাইরে অন্য যে কোন মননশীল-সৃজনশীল ধ্রুপদী বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতেই হবে। তাহলেই জ্ঞান চার লাইনের মহাসড়কে উঠে আলোর গতিতে চলবে।



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৫২০৫৪৯
পুরোন সংখ্যা