চাঁদপুর, সোমবার ২৯ এপ্রিল ২০১৯, ১৬ বৈশাখ ১৪২৬, ২২ শাবান ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, কিংবদন্তীতুল্য সমাজসেবক আলহাজ্ব ডাঃ এম এ গফুর আর বেঁচে নেই। আজ ভোর ৪টায় ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন।ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন।বাদ জুমা পৌর ঈদগাহে জানাজা শেষে বাসস্ট্যান্ড গোর-এ-গরিবা কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪৯-সূরা হুজুরাত

১৮ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১২। হে মু’মিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হইতে দূরে থাক; কারণ অনুমান কোন কোন ক্ষেত্রে পাপ এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করিও না এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করিও না। তোমাদের মধ্যে কি কেহ তাহার মৃত ভ্রাতার গোশত খাইতে চাহিবে? বস্তুত তোমরা তো ইহাকে ঘৃণ্যই মনে কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ তাওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু।


assets/data_files/web

যাকে মান্য করা যায় তার কাছে নত হও। -টেনিসন।


 


 


যে শিক্ষা গ্রহণ করে তার মৃত্যু নেই।


ফটো গ্যালারি
রবীন্দ্রনাথের সহযোগী কালীমোহন ঘোষ
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান
২৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, শান্তিনিকেতনের শিক্ষক, সংগঠক কালীমোহন ঘোষ বাংলাদেশের অন্যতম কীর্তিমান মানুষ। তাঁর জন্ম ১৮৮৪ সালে চাঁদপুর শহরের ৬ মাইল দক্ষিণে বাজাপ্তি গ্রামে। বাবা দীননাথ ঘোষ, মা শ্যামাসুন্দরী। অল্পবয়সে কালীমোহন তাঁর পিতাকে হারান। ফলে তাঁর শৈশব কাটে আর্থিক টানাপড়েনে। মা শ্যামাসুন্দরী ফসল, ফলমূল, পুকুরের মাছ বিক্রিসহ নানাভাবে সংসার চালাতেন। অভাব-অনটনের মধ্যেও কালীমোহনের পড়াশোনা বন্ধ হয়নি। তিনি ঢাকার তৎকালীন ইমপেরিয়াল সেমিনার স্কুলের ছাত্র ছিলেন। ১৯০২ সালে এনট্রান্স পরীক্ষার পর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯০৫ সালে 'অনুশীলন সমিতি' নামে একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দেন কালীমোহন।



 



১৯০৬ সালের দিকে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্যে কোচবিহারের রাজ কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে তাঁর পড়াশোনা আর বেশিদূর এগুয়নি। স্বদেশি আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে কালীমোহন পড়াশোনা ছাড়েন। ওইসময় এ আন্দোলনের প্রচারণার অংশ হিসেবে তিনি গ্রামগঞ্জে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতেন। তাঁর মাধুর্যপূর্ণ বক্তব্য গ্রামের সাধারণ নারী-পুরুষকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করতো। এ কারণে কালীমোহন যেখানে যে-গ্রামেই যেতেন, গ্রামের নারীরা তাঁকে ঘরের ছেলের মতই সমাদর করতেন। বরেণ্য সংগ্রাহক গবেষক ক্ষিতিমোহন সেনের স্মৃতিকথায় এর কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, ''...শুনিলাম, একদল স্বদেশি প্রচারক গ্রামে আসিয়াছেন। বৈকালে গ্রামের সভামধ্যে তাঁহাদের দেখিলাম। তাঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ বক্তা, আর কেহ কেহ গান করেন। সকলের মধ্যে দেখিলাম কালীমোহন ঘোষই যেন প্রাণস্বরূপ। শরীরে কিছুই নাই, অথচ উৎসাহ-পরিপূর্ণ চিত্ত, তাহারই সাক্ষ্য দিবার উপযুক্ত দুইটি চক্ষু। গ্রামের পুরন্ধ্রীরা এই প্রিয়দর্শন যুবকটিকে স্নেহে ও বাৎসল্যে একেবারে ঘরের ছেলে করিয়া লইয়াছেন।'' অন্যদিকে তৎকালে অনেকের ধারণা ছিল কালীমোহন ঘোষ সশস্ত্র বিপ্লবী দলের সদস্য ছিলেন। সে কারণে তাঁর ওপর পুলিশের সজাগ দৃষ্টি ছিল। ১৯০৬-১৯০৯ সাল পর্যন্ত কালীমোহন ঘোষের রাজনৈতিক কর্মকা- নিয়ে দক্ষিণ বাংলা ও আসাম পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ একটি গোপন রিপোর্ট তৈরি করে। পুলিশ এ রিপোর্টে স্পষ্ট করেন : কালীমোহন সশস্ত্র বিপ্লবী দলের সাথে যুক্ত নন।



 



কালীমোহন ঘোষের জীবনের আদ্যপান্ত জুড়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। ১৯০৪ সালে কবির 'স্বদেশি সমাজ' প্রবন্ধটি পড়ে তিনি রবীন্দ্র-অনুরক্ত হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ক্ষিতিমোহন সেনের সানি্নধ্য তাঁর রবীন্দ্রকাব্যের চিন্তাকে আরো সমৃদ্ধ করে। স্বদেশি আন্দোলন নিয়ে কালীমোহনের কিছু জিজ্ঞাসা ছিল। সেসব প্রশ্নের উত্তর জানতে তিনি রবীন্দ্র-সানি্নধ্য লাভের জন্যে উন্মুখ হয়ে উঠেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে যান এবং বঙ্গভঙ্গ, স্বদেশি আন্দোলন ও এর কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে কবিকে প্রশ্ন করেন। প্রথম সাক্ষাতেই রবীন্দ্রনাথ কালীমোহনের স্বদেশ চিন্তা ও আগ্রহ দেখে মুগ্ধ হন। তিনি তাঁর পল্লীউন্নয়ন কর্মসূচির জন্যে উপযুক্ত সহযোগী খুঁজছিলেন। কালীমোহন ঘোষ কবির সেই অভাব পূরণ করলেন। কবি তাঁকে পল্লীউন্নয়ন কাজে শিলাইদহে নিয়ে যান। রবীন্দ্রনাথ স্মৃতিচারণে বলেছেন, 'আমাদের স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্র হচ্ছে কৃষিপল্লীতে তার চর্চা আজ থেকেই শুরু করা চাই, তখন কিছুক্ষণের জন্যে কলম কানে গুঁজে এ কথা আমাকে বলতে হল_ আচ্ছা, আমিই এ কাজে লাগব; এই সঙ্কল্পে সহায়তা করবার জন্যে সে দিন একটিমাত্র লোক পেয়েছিলুম, সে হচ্ছে কালীমোহন।'



 



১৯০৭ সালে কালীমোহন ঘোষ সর্বপ্রথম শান্তিনিকেতনে আসেন। শান্তিনিকেতনের পরিবেশ ও কর্মকা- দেখে তিনি অভিভূত হয়ে পড়েন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে শিশুবিভাগে শিক্ষকের দায়িত্ব দেন। রবীন্দ্রনাথের উৎসাহ ও সহযোগিতায় ১৯১২ সালে কালীমোহন ইংল্যান্ডের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। উদ্দেশ্য ইংরেজি সাহিত্য ও শিশুদের শিক্ষাপদ্ধতি অনুশীলন। একই বছরের মে মাসে রবীন্দ্রনাথ লন্ডনের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। কবি কালীমোহন ঘোষকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ডবিস্নউ বি ইয়েটস, এজরা পাউন্ড, এইচ জি ওয়েলস, আর্নেস্ট রীস, ঈভলিন আন্ডারহিল, অ্যালিস মেনীল, রটেনস্টাইনের কাছে পাঠাতেন। সে-সুবাদে এই বরেণ্য মানুষদের সাথে কালীমোহন ঘোষের বন্ধুসুলভ সম্পর্ক গড়ে উঠে। ইংল্যান্ডে এজরা পাউন্ডের সাথে সন্ত কবীরের দোহার ইংরেজি অনুবাদ করা কালীমোহন ঘোষের অন্যতম প্রাপ্তি। 'ঈবৎঃধরহ ঢ়ড়বসং ড়ভ শধনরৎ' গ্রন্থে ঞৎধহংষধঃবফ নু কধষর গড়যধহ এযড়ংব ধহফ ঊুৎধ চড়ঁহফ মুদ্রিত হয়েছিল। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ কালীমোহন ঘোষকে দেশে নিয়ে আসেন। এবার তাঁকে শান্তিনিকেতনের শিশু বিভাগের সার্বিক দায়িত্ব দেয়া হয়।



 



রবীন্দ্রনাথের সাথে কালীমোহন ঘোষ বিভিন্ন সফরে যেতেন। ১৯২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়িতে যান। সেসময় কবির সাথে তাঁর পুত্রবধূ, নাতনি, ভ্রাতুষ্পুত্রসহ কালীমোহন ঘোষও ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকার আহসান মঞ্জিল ও কুমিল্লা সফরকালে কালীমোহনও তাঁর সাথে ছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই শ্রীনিকেতন গড়ে উঠে। তিনি কবিগুরুর লেখা অনুলিখনও করতেন। বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকে কালীমোহন আমৃত্যু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে ছিলেন।



ব্যক্তিগত জীবনে কালীমোহন চাঁদপুরের প্রখ্যাত উকিল দীননাথ বসুর কন্যা মনোরমা দেবীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯০৬ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। তিনি ৬ ছেলে ১ মেয়ের জনক ছিলেন। বিখ্যাত রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য শান্তিদেব ঘোষ ও দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ তাঁরই কৃতী সন্তান।



 



রবীন্দ্রনাথের অন্যতম সহযোগী কর্মবীর কালীমোহন ঘোষ ১৯৪০ সালের ১২ মে অমৃতালোকে পাড়ি জমান। তাঁর মৃত্যুর সময় রবীন্দ্রনাথ কালিম্পঙে ছিলেন। দীর্ঘদিনের সহযোগী হারিয়ে স্বাভাবিকভাবে কবিগুরু ভীষণরকম শোকাহত হয়ে পড়েন। তিনি ১৯ মে কালীমোহন পুত্র শান্তিদেব ঘোষকে চিঠিতে লিখেছেন, 'তোমার পিতার মৃত্যুসংবাদে গুরুতর আঘাত পেয়েছি। শান্তিনিকেতনে আসবার পূর্বে থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার নিকট সম্বন্ধ ঘটেছিল। কর্মের সহযোগিতায় ও ভাবের ঐক্যে তাঁর সঙ্গে আমার আত্মীয়তা গভীরভাবে বিস্তার লাভ করেছিল। অকৃত্রিম নিষ্ঠার সঙ্গে আশ্রমের কাছে তিনি আপনার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ...তাঁর মূর্তি আমাদের আশ্রমে এবং আমার মনের মধ্যে চিরদিনের মতো প্রতিষ্ঠিত হয়ে রইল। লোকহিতব্রতে তাঁর যে জীবন ত্যাগের দ্বারা পুণ্যোজ্জ্বল ছিল, মৃত্যু তার সত্যকে খর্ব করতে পারে না। এই সান্ত্বনা তোমাদের শান্তি দান করুক।'



 



কালীমোহন ঘোষ তাঁর কর্মের মাধ্যমে এখনও ভারতবর্ষের মানুষের মনে অমস্নান হয়ে আছেন এবং আগামীতেও যে থাকবেন_এ কথা নিঃসঙ্কোচে বলা যায়।



 



সূত্র :



১। জীবনের ধ্রুবতারা/শান্তিদেব ঘোষ। আনন্দ পাবলিশার্স।



২। রবির জীবনে মৃত্যুশোক/অঞ্জন আচার্য। (পৃষ্ঠা : ৭৭-৭৮)। আত্মজা পাবলিশার্স।



৩। আমি তো স্টেজের মালিক : স্মৃতিচারণে সাগরময় ঘোষ। আনন্দবাজার ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে প্রকাশিত।



৪। রবীন্দ্রনাথের একটি অগ্রন্থিত রচনা : পূর্বলেখ : ভূঁইয়া ইকবাল। কালি ও কলম।



 



 



ভাষা ও একটি দৃষ্টি আকর্ষণ



আরশাদ খান



একটি জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় মেলে সাধারণত তার কৃষ্টি কালচার, বাসস্থান, শিক্ষা-দীক্ষা, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় থেকে। ভাষার প্রভাব যেমনি রয়েছে একটি পূর্ণ মানস গঠনে তেমনি জাতি হিসেবে জাতির-সংস্কৃতির মানদ-ের অন্যতম নিয়ামক হলো মাতৃভাষা। জাতীয় চরিত্রের আখ্যান যেমনি ভাষানির্ভর ঠিক তেমনি তার অস্তিত্ব এবং বিকাশও কিন্তু ভাষাকেন্দ্রিক। এইযে বৈশ্বিক অগ্রগতি তা তো মাতৃভাষায় বিষয়বস্তু বোঝা ও জাতিতে জাতিতে ভাবের সঠিক বিশ্বায়ন বৈকি। উন্নত, উন্নয়নশীল কিংবা সবেমাত্র জাতিরাষ্ট্র যে পরিচয়ই হোক না কেন ভাষার একটি অন্যরকম আবেদন সমগ্র সমাজব্যবস্থায় সর্বদা ক্রিয়াশীল।



জাতি হিসেবে আমরা বাঙালি, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা আর আমাদের সংস্কৃতি তা তো নিজস্ব ভিতের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত ও ক্রমবিকাশমান। কোনো ভাষার বিকাশ কিন্তু তার যথার্থ ব্যবহার, অনুচর্যা, পরিচর্যা এবং গুণমাত্রিক পরিপালনের ওপর নির্ভরশীল। ভাষা, উপভাষা, পরিভাষা কিংবা গোষ্ঠী বিশেষের স্বল্প পরিম-লীয় ভঙুর ভাষারও একটি অলেপনীয়, অমোচনীয় ও অনস্বীকার্য আবেদন রয়েছে। ভাষা জ্ঞান যে জাতির যত বেশি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সে জাতির তত বেশি।



আমাদের বাংলা ভাষার একটি আলাদা মাত্রা আছে। ভাষার অধিকার অর্জনে অবিস্মরণীয় জীবন উৎসর্গের পরীক্ষায় আমাদের অবতীর্ণ হতে হয়। প্রবল মাতৃপ্রেম ও মাতৃভক্তির আদর্শের কাছে নতজানু হতে হয় বাংলা-বিদ্বেষী, অর্থলোভী ঘাতকদের। রক্তস্নাত ১৯৫২ সেই আদর্শকে তার গর্ভে ধারণ করে ক্ষতবিক্ষত হদয় নিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে সময়ের বুক চিরে চলছে মলিনতায় মোড়ানো ক্ষয়িষ্ণু আবেগের বোঝা নিয়ে। হারিয়ে ফেলছে তার মায়াময়ী আবেদন। ১৯৫২ সালের পরপর অবশ্য শেকল ছেঁড়া ভাষার গাঁথুনি শক্ত হতে থাকে যার স্বরূপের উপস্থিতি বিভিন্ন কালজয়ী সাহিত্য, রচনা, কবিতা, প্রবন্ধ, ছোট গল্প, উপন্যাস ইত্যাদিতে পরিলক্ষিত হয়। বিকশিত হতে থাকে সাহিত্যের দর্শন। পরবর্তীতে আপন রঙ ও ঢঙে কালক্রমে ফিকে হতে বসে ভাষার স্বকীয়তা। আগ্রাসন- অন্যভাবে বললে অন্য সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতির বিস্তার পেয়ে বসে রকেটগতি।



বাংলাভাষা বাণিজ্যিক ও বৈশ্বিক ভাষার আগুনে পুড়তে থাকে যা আজ অঙ্গারে পরিণত হতে চলেছে। মাননীয় হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট নিজেরাই যখন দু'নীতি চর্চা করে (বাংলায় রায় লেখার কথা থাকলেও তা ইংরেজিতে লেখা) তখন তো মানুষের মুখে বহুনীতি ও ভুলনীতিই চর্চিত হবে। সরকারি গেজেটে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে সংক্ষেপে বি.বাড়িয়া বলা ও লেখা যাবে না মর্মে জারিকৃত নির্দেশ আমরা কি মেনে চলি?



বাংলিশ (বাংলা ও ইংরেজি ভাষার মিশ্রণ) ভাষার ব্যবহারে বিস্তৃতি ও ব্যাপকতা আসাই তো তখন খুবই স্বাভাবিক। এর থেকে বড় কথা হলো ভাষার প্রমিত ব্যবহার থেকে সরে আসা। আড্ডায়, স্কুল-কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাজারে, হোটেল-রেস্টুরেন্টে যে ভাষায় আজকালের স্মার্ট মোবাইল প্রজন্ম কথা বলে, তা কি শ্রুতিমধুর ? তথাকথিত এলিট শ্রেণীর ইংরেজি প্রীতি আর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে জাতীয় সংগীত না গাওয়া কিংবা মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থায় তার পাশাপাশি বাংলাকে আঁতুড়ঘরে নিক্ষেপ ইত্যাদি বাংলাকে না ভালোবাসারই নিদর্শন মাত্র। যা কোনভাবেই কাম্য নয়।



১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের এক রেজ্যুলেসনে ইউনেস্কো কর্তৃক গৃহীত মহান ২১ ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত তো বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ২০০০ সাল থেকে তা নিয়মিত পালন, এমনকি ২০০৮ কে 'আন্তর্জাতিক ভাষাবর্ষ' হিসেবে ঘোষণার স্বীকৃতি-সবই তো বাংলা ভাষাকেই ঘিরে।



এই ভাষার প্রতি আমাদের জাতীয়তাবোধ যদি কমে যায়, তবে পৃথিবীতে সপ্তম বৃহত্তম ভাষা হিসেবে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতির দাবিদার হিসেবে কি আমরা যৌক্তিক ও যথার্থ? বিভিন্ন নৃ-তাত্তি্বক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষার ব্যবহার হারিয়ে গেলেও নির্বিকার আমরা, যা বহুভাষিক ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও বিস্তারণে জাতিসংঘের নেয়া পদক্ষেপের বিপরীত। এমনকি ১৯৫২-এর মূলমন্ত্রের পরিপন্থী। বহু সাংস্কৃতিক ও বহুভাষিক মাত্রা একটি দেশের অসামপ্রদায়িক চেতনাকেই প্রতিফলিত করে।



দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অগ্রগতি কি শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষায় কথোপকথন ও পত্র চালাচালির উপর নির্ভর করে? তাহলে চীন, জাপান, কোরিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স কি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক সূচকে পিছিয়ে পড়ছে? তাদের অর্থনীতি কি থমকে দাঁড়িয়েছে? আমাদের দেশ থেকেই তো অজস্র শিক্ষানুরাগী ওসব দেশে গিয়ে অনেক সময় তাদের ভাষা শিখছে উচ্চ শিক্ষা নেয়ার জন্যে।



বাংলাদেশ যতই উন্নত হোক না কেন কোনো এক দিন কি বিদেশীরা আমাদের দেশে এসে তাদের ওঊখঞঝ এর পরিবর্তে ওইখঞঝ (ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ইধহমষধ খধহমঁধমব ঞবংঃরহম ঝুংঃবস) এ অংশগ্রহণ করার সম্ভাবনা আছে? যদি না-ই থাকে তাহলে গড্ডলিকা প্রবাহে আমরা নিঃস্বার্থভাবে গা ভাসিয়ে দিচ্ছি কেন। কেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা প্রদানের মৌলিক মাধ্যম হিসেবে বাংলাকে ব্যবহার করা হচ্ছে না। বাংলা একাডেমি কী ভূমিকা পালন করছে বাংলা ভাষার সমপ্রসারণে। কেন অন্য ভাষার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকে বাংলায় রূপান্তর করা যাচ্ছে না।



বাংলাকে নিয়ে একদিকে স্বীকৃতি আদায়, অন্যদিকে স্বকীয়তার বিদায়- এটি দ্বিচারিতার অনন্য উদাহরণ বৈকি। বিশ্বদরবারে ভাষার স্বীকৃতি তখনই পরিপূর্ণ হবে যখন নাকি প্রথমে আমাদের মুখে মুখে মাতৃভাষার পরিমিত ব্যবহার স্বতঃস্ফূর্ত হবে। এক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। নিজ ভাষার স্থলে যখন অন্য ভাষার প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায় তখন তা স্বকীয়তার সৌকর্যে দৃশ্যমান ম্রিয়মানতা ভাষা শহীদদের বুকে অসম্মানের আঘাতের পদচিহ্নই এঁকে দেয় মাত্র। কোনো জাতির কোনো নতুন প্রজন্মই তা থেকে ভাল কিছু শিক্ষা পায় না।



ভয়ের বিষয় হলো আমরা সতর্ক নই। আধুনিকতার মোড়কে ইংরেজি চর্চার লেবেল লাগানো সময়োপযোগী, কিন্তু নিজ ভাষার লেবেল খুলে নয়। ভাষার মার্জিত, রুচিশীল, পরিমিত ও পরিশীলিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাকরণ মেনে ভাষার উৎকর্ষ সাধনে প্রাগ্রসর হতে হবে। ভাষার প্রতি মমত্ববোধের তীক্ষ্ন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রচলন করতে হবে সর্বক্ষেত্রে এর ব্যবহার।



ইংরেজি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার পরেই টানতে হবে, আগে নয়।



জাতিসংঘের স্বীকৃতিকে ধারণ এবং বহন করতে হলে বিশ্বায়ন মেনেই বাংলা ভাষাকে রক্ষার জন্যে সব মহল থেকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়া অতি জরুরি। আঞ্চলিক ভাষার জায়গাটিতে অনেক কাজ করতে হবে। ভাষা লালন পালনের ভূমিকা পরিবার থেকে প্রসূত হলে তা হবে আদর্শিক ও টেকসই। মনে রাখতে হবে, মায়ের মুখের ভাষা প্রথমে সন্তানের ঠোঁটের ভাষায়, পরে মনের ভাষায় পরিণত হয়। আর মনের ভাষাই ব্যক্তি-মননে সৃষ্টিশীলতা ও সৃজনশীলতার বীজ বপন করে। যেখান থেকে সূচিত হয় সামগ্রিক মানবিক কল্যাণ।



আরশাদ খান : ব্যাংকার, সংস্কৃতিকর্মী।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১৩৩৪৯৯
পুরোন সংখ্যা