চাঁদপুর। সোমবার ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮। ১৯ ভাদ্র ১৪২৫। ২২ জিলহজ ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুর জেলা ন্যাপের সভাপতি, চাঁদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালের পরিচালনা পরিষদের সদস্য আলহাজ্ব আবুল কালাম পাটওয়ারী ঢাকাস্থ ল্যাব এইড হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ..... রাজেউন)। মরহুমের নামাজের জানাজা বাদ জোহর পৌর ঈদগা মাঠে অনুষ্ঠিত হবে।
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪০-সূরা আল মু’মিন

৮৫ আয়াত, ৯ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৮৪। অতঃপর যখন তারা আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করলো, তখন বললো : আমরা এক আল্লাহতেই ঈমান আনলাম এবং আমরা তাঁর সাথে যাদেরকে শরীক করতাম তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করলাম।

৮৫। তারা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করলো তখন তাদের ঈমান তাদের কোনো উপকারে আসলো না। আল্লাহর এই বিধান পূর্ব হতেই তাঁর বান্দাদের মধ্যে চলে আসছে এবং সে ক্ষেত্রে কাফিররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


এমন প্রাসাদ তৈরি করো না, যা তুমি বাসযোগ্য করতে পারবে না।           


-আল-ফকরি।


নফস্কে দমন করাই সর্বপ্রথম জেহাদ।



 


বরুমতির আলাওল : অস্থিরতাই যার স্থৈর্য
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
০৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


ব্যক্তির মনন-চারিত্র নির্মাণে কিসের ভূমিকা মুখ্য? এ প্রশ্নের জবাব এক কথায় দেয়া কঠিন বৈকি! পিতা-মাতার জিন ব্যক্তির জেনোটাইপ-ফেনোটাইপ নির্ধারণ করলেও তা তার মনন-চারিত্রের নির্মাতা নয়। শিক্ষা এককভাবে ব্যক্তির মনন-চারিত্র নির্মাণ করতে পারে না। কেননা ব্যক্তির শিক্ষা আদতেই সুনির্দিষ্ট নয়। পরন্তু শিক্ষা সর্বদা একটি চলমান প্রক্রিয়া। এমনও অনেক ব্যক্তি আছে যারা বাল্যকাল হতে গণিতে পূর্ণ নাম্বার পেয়েও বাস্তব জীবনে তারা বেহিসেবি। নিজের যাপিত জীবনে তারা গণিতের যুক্তি মানেনি। তেমনি বিজ্ঞানে যার লেটার নাম্বার কব্জা হয়েছে পাবলিক পরীক্ষায়, সেও চাঁদে কোনো কোনো বিশেষ ব্যক্তির ছবি অবলোকনের মেকি কথাকে বিশ্বাস করে বসে। কিংবা ঝাড়-ফুঁক দিয়েই মৃগী রোগীকে নিরাময় করতে চায়। যে সারাজীবন রসায়ন নিয়ে দিনাতিপাত করেছে, সে বুঝে না জীবনের রসায়ন। কাজেই ব্যক্তির মনন-চারিত্র নির্মাণে শিক্ষার তেমন কোনো ভূমিকা নেই বললেই চলে। এ ক্ষেত্রে আরও একটি জোর যুক্তি খাটানো যায়, যারা জীবনে কোনও শিক্ষা গ্রহণ করেনি তাদের ক্ষেত্রে। তারা অশিক্ষিত হতে পারে, কিন্তু তাদের মনন-চারিত্র অত্যন্ত দৃঢ় কিংবা প্রগতিময়। অশিক্ষিত গ্রামীণ মা, যাঁর কাছে তাঁর ছেলে ও প্রতিবেশির ছেলের সমান আদর, তাঁর এই উদার বিশ্বজনীন মাতৃ-মননের চারিত্র কোনো শিক্ষায় তৈরি হয়নি। কিংবা শিক্ষিত হওয়া সত্বেও নগরের প্রাসাদে থাকা সুরম্য অট্টালিকার ধনবতী মায়ের কাছে তার সন্তান ও দরিদ্র প্রতিবেশির সন্তানের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান নিশ্চয়ই শিক্ষার কাজ নয়। তাহলে ব্যক্তির মনন-চারিত্র নির্মাণে কার ভূমিকা মুখ্য? এ বিষয়ে চিন্তা প্রসারিত হলে বুঝা যায়, যে ভূমিতে ব্যক্তির জন্ম ও বাস, বিকাশ ও বৃদ্ধি, সে ভূমির বৈশিষ্ট্যই মূলত ব্যক্তির মনন-চারিত্র নির্মাণ করে তোলে।



দেখা গেছে, রুক্ষ ভূমিতে জন্ম নেয়া ব্যক্তির মননও রুক্ষ এবং ঊষর হয়ে গড়ে উঠেছে। জঙ্গল-লগ্ন ব্যক্তির মননে আদিম সারল্য ও বুনো উগ্রতা প্রকটিত। তেমনি সুজলা-সুফলা নদীমাতৃক ভূমিতে ভূমিষ্ঠ ও লালিত-পালিত ব্যক্তির মননে উদারতা ও সৃজনশীলতার চর্চা দেখা যায়। সাহিত্যিক আহমদ ছফা নদীমাতৃক জনপদের ভূমিপুত্র। তাঁর মনন-চারিত্রেও তাই সৃজনশীলতা আর প্রগতির পাশাপাশি নদীর গতির মতো অস্থিরতা লক্ষণীয়।



যে জনপদে তাঁর জন্ম, সে জনপদ কীর্তিমানের সূতিকাগার। যাত্রামোহন সেন, যতীন্দ্রমোহন সেন, মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী, জাতীয় অধ্যাপক নূরুল ইসলামের মতো কিংবদন্তীদের গর্ভে ধারণ করেই চন্দনাইশ হয়ে উঠেছে সুরভিত। চন্দনের মতো সুঘ্রাণ হতে চন্দনাইশ-নামকরণের এই ইতিহাসকে আহমদ ছফার জন্ম যেন সিল-মোহর মেরে সত্যায়িত করে দেয়। অনতিদূরে পাহাড়ে পেয়ারার চাষ, সর্পিল গতিতে এঁকে-বেঁকে ছুটে চলা শঙ্খচূড় সাপের মতো সাঙ্গু বা শঙ্খ নদী এবং বরুমতির খালের প্রকৃতিই আহমদ ছফার মনন-চারিত্র নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে অধিক। তাঁর জন্ম জনপদের ফসলের মতোই উপাদেয় সৃজনশস্য উঠে এসেছে তাঁর জীবনের পাতে। নানামুখী রচনায় আহমদ ছফা হয়ে উঠেছেন চন্দনাইশের চন্দন-নন্দন প্রকৃত অর্থেই। আপন জাতিসত্তাকে সুলুক সন্ধান করে জাগ্রত করার মহান অভিপ্রায়ে আহমদ ছফা লিখে গেছেন দুহাতে। কিন্তু যে বিষয়টি তাঁকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়িয়েছে জীবনে, তা হলো অস্থিরতা। শৈশবের এঁকে-বেঁকে চলা শঙ্খনদী আর বরুমতির খালের মতোই অস্থির ছিলেন আহমদ ছফা।



বৈমাত্রেয় বড় ভাই প্রথম জীবনে তার কাছে একজন ঠকে আসা মানুষ ছিল। তিনি বাজারে ঠকতেন, পাড়ার যুবকদের কাছে ঠকতেন। আহমদ ছফার ভাষ্যে তার বড় ভাই ছিলেন বিচার-বুদ্ধিতে অপরিপক্ক ও অশক্ত মানুষ। তার চোখে আহমদ ছফা একজন শক্ত ও জয়ী মানুষ ছিলেন। আবার পরবর্তী কালে পিতার মৃত্যুর পর এই বড় ভাইকেই তিনি প্রতারক হিসেবে উল্লেখ করেছেন যিনি তার পিতার জমি-জমা সব তার নামে করে নিয়েছেন পিতাকে ঠকিয়ে। অর্থাৎ তার আপন বৈমাত্রেয় বড় ভাইকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও আহমদ ছফার একাধিক মত ও স্ববিরোধিতা এবং অস্থিরতার প্রকাশ ঘটে। একটি বিষয় আহমদ ছফা তার বড় ভাইয়ের সম্পর্কে বলে তৃপ্তি পেতেন এবং এতে তার সম্পর্কে বড় ভাইয়ের মূল্যায়ন জড়িয়ে আছে। একদিকে তিনি বড় ভাইয়ের বিচার-বুদ্ধির উপর ভরসা রাখতেন না, আবার অন্যদিকে বড় ভাই তাকে একজন 'আলাওল' আখ্যা দেয়াতে খুব তৃপ্তি বোধ করতেন। তখনকার দিনে চন্দনাইশ ও সংলগ্ন জনপদে মনে করা হতো কবি মানেই 'আলাওল'। আলাওল মানে সাধারণ কেউ নয়। তারা স্রষ্টার বিশেষ প্রেরিত পুরুষ। বড় ভাইয়ের এই বিশ্বাসকে ছফাও যে মনে-প্রাণে সত্য মানতেন সে বিষয়ে কোনো সংশয় নাই। এখানেই ছফার দ্বান্দ্বিক অস্থিরতা টের পাওয়া যায়। যাকে তিনি স্বাভাবিক বিচার-বুদ্ধিহীন বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন তার অভিধাকেই আবার সম্মতির সুরে তিনি বয়ান করেছেন। এ যেন ক্ষণে ক্ষণে বাঁক নেয়া বরুমতীর খালের অভিন্ন রূপ!



বিভূতিভূষণ নাথ নামে উঁচু শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্রের পদ্য রচনার কুশলতায় ছফার জনক ছফাকে বার বার প্ররোচিত করতে থাকেন পদ্য রচনায়। ছফাও প-িত স্যারের মায়ের কাছ থেকে শোনা 'রামায়ন'-এর প্রভাবে 'রামের পিতৃভক্তি' শিরোনামে প্রথম পদ্য রচনা করেন। ঊনিশশো ঊনপঞ্চাশ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে রচিত এই পদ্যে ছফা লিখেছেন,



'যেইজন পিতামাতার প্রতি নাহি করে ভকতি



পরকালে নরকে হবে তার বসতি। '



বড় বড় মানুষের বক্তব্য শোনাতে তার বাবা তাকে কাঁধে নিয়ে গেছেন সেই সব সভা-সমিতির আয়োজন-স্থলে। ফিরবার পথেও ছেলের পায়ে ব্যথা হবে হাঁটার কারণে তাই আবার কাঁধে চড়িয়ে নিয়ে আসতেন বাড়িতে। যার পিতা সন্তানের মানস নির্মাণের ঈশ্বর প্রদত্ত বাহন ছিলেন, সে পিতাই পরবর্তীতে ছফার কাছে হয়ে যান দূরের কেউ। আর এ কারণেই সোনার মোহর চুরি করে বাড়ি হতে পালিয়ে যান ছফা। সন্তানের মনন-বান্ধব পিতাকে না জানিয়ে ছফার পালিয়ে যাওয়ার মূলেই নিহিত আছে তার মননের অস্থিরতা। তার শিক্ষাবান্ধব, রাজনীতিবান্ধব পিতাকে ফাঁকি দিয়ে ছফার পালিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে নিত্য অস্থিরতায় ভুগতেন তিনি। তার এই অস্থিরতা নিজেকে নির্মাণের অস্থিরতা, তার এই অস্থিরতা সৃজনশীলতার অস্থিরতা।



বাড়ি পালিয়ে এসে ছফা নিজের থাকা-খাওয়া নিশ্চিত না করে আর একজন বাড়ি পালানো কিশোরের দায়িত্ব নিয়ে তাকে একটি দোকানে চাকরি জুটিয়ে দেন। সেই বালক কর্তৃক মালিকের তহবিল চুরির কারণে ছফাকেই পনর দিন চৌদ্দ শিকের আতিথেয়তা গ্রহণ করতে হয়। যে ছফার পিতৃগৃহে নিশ্চিত জীবন ছিল সে ছফাই অস্থির সময় ও অস্থির যৌবনের টানে সাড়া দিয়ে নিজের জীবনকেই করে তুলেছেন অস্থির। ছফার মননশীল অস্থিরতার অনুতপ্ত পরিণতি আমরা দেখি পিতার মৃত্যুর পর 'জনকের কবরে' কবিতায়। আজন্ম পরিচিত জনপদ ছেড়ে, পিতাকে ছেড়ে নগরে পালিয়ে আসা ছফা পিতার মৃত্যুতে অনুতাপে দগ্ধ ছিলেন বলে অনুমিত হয় তার পরবর্তী কর্মপ্রবাহে। তাইতো তাকে বলতে শুনি, 'মেকীর বাজারে আব্বাজান, কী আমি পেয়েছি?'



বাবার কবর জিয়ারতে এসেও ছফা দ্বিধান্বিত। কাকে তিনি পিতা বলছেন? তার ভাষ্যে ভাষাই তার পিতা। যিনি ভাবকে বহন করেন, লালন করেন, মুক্তি দেন তিনিই পিতা। সেই অর্থে একজন লেখকের বা বক্তার পিতা হচ্ছে ভাষা, অনেকটা এমনই মনে করতেন ছফা। তার দ্বিধা ও অস্থিরতা তাকে কি কখনও অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিয়েছিল? করে তুলেছিল অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী? হতেই পারে। সবাই যখন ধরেই নিয়েছে মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলামের পরে ছফাই মুসলিম বাঙালি সাহিত্যিক যাকে উল্লেখ করা যায়, তখন এর প্রভাব ছফাকে আরো অস্থির করে তুলতে পারে বৈকি। তার প্রচ্ছন্ন ধারণা, তার মৃত্যুর পর তার লেখাগুলি উল্লেখের বস্তু হবে এবং নেকের জন্যেই চর্চার মহাপ্রসাদ হবে। ছফার এই ধারণাতে তার অস্থিরতা আরো বুঝি ডালপালা মেলে। আমরা বুঝতে পারি, বৈমাত্রেয় অগ্রজের শৈশবের কথাই ছফা চেতনে বা অবচেতনে লালন করে চলেছিলেন। যে কারণে ছফা নিজেকে হয়তো 'আলাওল' ভেবেই বসেছিলেন। নচেৎ তিনি তার লেখায় ও কর্মকা-ে হঠাৎ হঠাৎ করে অন্যের জন্যে চরম অস্বস্তিকর হয়ে উঠবেন কেন?



শিক্ষার সোপানগুলো সুস্থিরভাবে অতিক্রম না করে ছফা পিএইচডির প্রতি মনোনিবেশ করাটা আমাদের কাছে একটু বেমানান ঠেকে বৈকি। স্থিরমতি মানুষ



 



মাত্রেই শিক্ষার সোপান সমূহের পূর্ণতার কথা ভাবে। কিন্তু এঁকেবেঁকে চলা বরুমতির খালের মতো ছফা ক্ষণে ক্ষণে বদলেছেন তার মন ও মননশীলতার দিক। বামধারার রাজনীতিতে প্রবিষ্ট হয়েও ছফা অনেকের কাছে হয়ে উঠেছেন বাঙালি মুসলমান লেখক। কেনো যে তিনি বাঙালি লেখকের তকমা পেলেন না তা বোধগম্য নয়। তাকে জাতিসত্ত্বার লেখক বলা হলেও তিনি আসলে বাঙালি জাতিসত্ত্বার সুলুক সন্ধান করেননি। তিনি সাহিত্যে বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদের খোঁজ করেছেন কেবল। মীর মোশাররফ হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলামের পরে তাঁকে পথিকৃৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে অন্তত তাই প্রমাণিত হয়। নিজে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ হয়েও তিনি কবি ফররুখ আহমদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, যিনি কি না পাকিস্থান বিভক্ত হোক তা চাননি। তিনি নজরুলকে বাঙালি মন-মানসের কবি হিসেবে না দেখে বাঙালি মুসলিম কবি হিসেবে বিচারের প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে একথাই বলতে চান, নজরুল বাংলা ভাষাকে বাঙালি মুসলিমের ভাষা হিসেবে পরিণতি দিয়েছেন সাহিত্যে। এখানেই তার অস্থিরতা প্রকাশিত হয় প্রকট হয়ে। বাংলা ভাষাকে হিন্দুয়ানি বা মুসলমানি করে দেখার সংকীর্ণতা ছফার মধ্যে থাকার কথা নয়। কারণ তিনি ছাত্রাবস্থা হতেই ন্যাপের রাজনীতির সাথে জড়িত। তার আম বাঙালিয়ানার দিকেই চোখ থাকার কথা ছিল। একদিকে প্রগতিশীল প্রবন্ধ লিখা আর অন্যদিকে লিবিয়ান রাষ্ট্রদূতের মতো সংকীর্ণ সামপ্রদায়িক ব্যক্তির অর্থায়নে সাহিত্য পাঠে অংশগ্রহণ তাকে নিঃসন্দেহ ভাবেই অস্থিরমতি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাকে অস্থিরমতি ও অস্বস্তিকর হিসেবে চিহ্নিত করা আরও সহজ হয়ে যায় যখন তার দৃষ্টিতে রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ বদলের কর্মগুলো গুরুত্বপূর্ণ না হয়ে কেবল অংশ বিশেষের জন্যে বলে তকমা পায়। তার ব্যর্থতা এই যে, তিনি কোলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু সাহিত্যিকদের ভাষার বিরোধিতা করতে গিয়ে আম বাঙালির ভাষাকে দাঁড় করাননি বরং বাঙালি মুসলিমের সাহিত্য ভাষাকেই মান ভাষা হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। তিনি নিজেই একদিকে মরুভূমি অর্থে 'বিয়াবান' এর মতো আরবি শব্দের প্রয়োগকে যথার্থ মেনেছেন, কিন্তু হিন্দু সাহিত্যিকদের সংস্কৃত শব্দের প্রীতিকে চোখের বালি হিসেবে দেখেছেন। এখানেই সাহিত্যিক হিসেবে আহমদ ছফার অস্থিরতা। তিনি মধুসূদন, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে মানতে গিয়ে জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব বসুকে প্রতীচীর দাস হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কথা এখানেই। কেউ যদি বাংলায় আরবি, ফার্সী শব্দের ব্যবহারে বীর হয়ে উঠতে পারে, তবে অন্য কেউ কেনো বাংলা কবিতায় পাশ্চাত্য সুরভি আনতে পারবে না তা বোধগম্য নয়। ছফা এ ক্ষেত্রে জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব বসুর প্রতি অতিশয় কর্কশ হয়েছেন বলেই প্রমিত হয়। বরং বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ যে ছন্দ বিদ্যুৎয়ের কথা বলেছিলেন এবং যে মাত্রাবৃত্তের মুক্তকের কথা বলেছিলেন তা নজরুলের বিদ্রোহীতেই ফুটে ওঠে। এর মাধ্যমে জীবনানন্দের গভীর ছন্দ চিন্তার স্ফূরণ ঘটে। কিন্তু আহমদ ছফা কবি জীবনানন্দ দাশকে কিঞ্চিৎ জায়গা দিতেও নারাজ। বরঞ্চ নজরুলের মূল্যায়ন তার কাছে অপূর্ণাঙ্গ মনে হয়েছে, যদিও ছফা যখন মধ্যগগনে তখন জীবনানন্দকে সবেমাত্র উৎখনন করতে শুরু করেছে কাব্যবোদ্ধারা।



একদিকে কালীর মূর্তি তার কাছে করাল মূর্তি মনে হয় আর অন্যদিকে মাইকেল মধুসূদনের হাতে বীর হয়ে ওঠা রাবণ, প্রমীলা, মেঘনাদ বাহবা পায় বুর্জোয়া চরিত্র হয়ে। আফসোস এখানেই। ছফা একদিকে ন্যাপের রাজনীতির দীক্ষায় দীক্ষিত এবং লেনিনের ভাবশিষ্য আর অন্যদিকে তিনি বুর্জোয়া চরিত্রের সাহিত্যিক সৃজনে বেশ প্রফুল্ল হয়ে উঠেছেন। কাব্য হিসেবে 'মেঘনাদবধ কাব্য' একটি উচ্চমার্গীয় শিল্প হলেও আদর্শ হিসেবে তা এখানে কিঞ্চিৎ বেমানান। কেননা মাইকেল মধুসূদন দত্ত যে সময় এই মহাকাব্যখানা রচনা করেন সে সময় তিনি আর হিন্দু নন। নামের আগে মাইকেল নামের ভার চাপিয়ে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়ে গেছেন। কাজেই একজন খ্রিস্টানের পক্ষে রাবণ ও মেঘনাদকে বীর করে দেখানো সম্ভব। যেমনটি সম্ভব আহমদ ছফার মতো কমিউনিস্ট মতাদর্শী বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক মান ভাষার সন্ধানকারীর পক্ষে কালীকে করালিনী বলা। যে কবি লিখতে পারেন 'লেনিন এখন ঘুমাবে' কিংবা যে কবি পরকীয়া প্রেমে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকেন, তার পক্ষে 'বাঙালি মুসলমানের মন' শীর্ষক প্রবন্ধ রচনা করাটা অস্থিরতা ব্যতীত আর কিছুই নয়। আবার তিনি যখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বনকারী হিসেবে পাকিস্তান প্রীতি প্রদর্শনকারী কবির সহমর্মী হন তখন বলতেই হয়, ছফা নিজেই জানতেন না তার মনন-চারিত্র আসলে কী রূপ।



ছফা লেখক হিসেবে যেমনটি অস্থির তেমনি কথক হিসেবে অস্বস্তিকর। তবে ব্যবহার এর দিক থেকে তিনি একটু বেশিই অমার্জিত। কেননা তিনি বেগম খালেদা জিয়ার নিজের হাতের রান্না খেতে চেয়ে শেখ হাসিনার হাতের রান্না খাওয়ার উদাহরণ টেনেছেন। আবার বেগম খালেদা জিয়ার পিএসকে ধমক দিয়ে বলে উঠা 'বাংলাদেশে আহমদ ছফা কয়জন আছে?'-বাক্যেও তার অমার্জিত ব্যবহারের ছাপ মেলে। এতে তার ব্যক্তিত্ব নয় বরং অহমিকাই প্রকাশ পেয়েছে। ছফার সবচেয়ে বড় অমার্জিত ব্যবহার হলো, খ্যাতিমান মানুষদের সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাত্রা ও ঘটনাবলি অবিমৃষ্যকারীর মতো বিনানুমতিতে সর্বজন সমক্ষে প্রকাশ করা। এতে একজন লেখকেরই অমার্জিত ভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।



বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আহমদ ছফার মূল্যায়ন কখনোই নিরপেক্ষ ছিলো না। প্রথমত ছফা বঙ্গবন্ধুকে একজন ব্যর্থ বাম রাজনীতিকের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছেন এবং শেষে তিনি আওয়ামী লীগের বিরোধী সরকারের আমলে একজন আওয়ামী বিরোধী হিসেবেই শেখ মুজিবকে মূল্যায়ন করেছেন। ফলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছফার বিশ্লেষণে নিরপেক্ষ হয়ে ধরা পড়েননি। বরং বঙ্গবন্ধুকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ছফা নিজেই নিজের দুটো প্রবন্ধে স্ববিরোধিতায় পঙ্কিল হয়ে উঠেছেন। 'তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান' এবং 'শেখ মুজিবুর রহমান' এই দুই স্বতন্ত্র প্রবন্ধে আগেকার আহমদ ছফাকে অনেকাংশেই বিরোধিতা করেছে পরের আহমদ ছফা। আগের আহমদ ছফার লক্ষ্য ছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে ইতিহাসের নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং পরের আহমদ ছফার অনুতাপ তার আগের বক্তব্যকে নাকচ করে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণে বিশ্লেষণের প্রয়াস পেয়েছেন। লক্ষ্মণীয় যে, 'নাম তার শেখ মুজিবুর রহমান' প্রবন্ধটি ঊনিশশো চুরাশি সালে লিখিত এবং ঊনিশশো ঊননব্বই সালে প্রকাশিত এবং পরের প্রবন্ধটি ঊনিশশো তিরানব্বই সালে লিখিত ও দুই হাজার সালে গ্রন্থভুক্ত। পরিষ্কারভাবে এখানে বুঝা যায়, আগেকার প্রবন্ধের সময় ক্ষমতাসীন দল এবং পরের প্রবন্ধের সময় ক্ষমতাসীন দলের পার্থক্যের কারণে শেখ মুজিবুর রহমানের বিষয়ে ছফার মূল্যায়নও বেশ পাল্টে গেল। ছফা অত্যন্ত অমার্জিতভাবে পূর্বোক্ত প্রবন্ধে শেখ মুজিবুর রহমানকে উল্লেখ করেছেন যা করার মতো সেই রকম ধার ও ভার ছফার আদৌ ছিলো কি না সন্দেহ। পরন্তু ছফা যে একজন মনে মনে সুবিধাবাদী ছিলেন না তা-ও নিঃসন্দেহ হওয়া যায় না। ছফা চেষ্টা করেছেন ক্ষমতার প্রতি নিজেকে নির্মোহ হিসেবে প্রচার করতে। কিন্তু তিনি যে ক্ষমতার প্রতি মোহগ্রস্ত ছিলেন তা দুই শীর্ষ নেত্রীর হাতের রান্না খাওয়ার উদগ্রীব আকাঙ্ক্ষাতেই প্রকাশিত হয়। কেননা তখন পর্যন্ত কেউ জানতও না আদৌ তারা রাঁধুনি হিসেবে যশের অধিকারী কি না।



ছফা যে কখনো দেশপ্রেমিক ছিলেন তা বুঝা যায় না। কেননা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি ছিলেন আটাশ বছরের টগবগে যুবক। কিন্তু তিনি একাত্তরের এপ্রিলে কোলকাতা পলায়ন করলেও সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। অথচ তার মতো সুঠাম দেহীর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়াই ছিল সমীচীন। ন্যাপের রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেও তিনি মুক্তিযুদ্ধে না গিয়ে বরং স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে বিচরণ করে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ককে নেতিবাচক হিসেবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। ছফারা খাঁটির ভেক ধরে ভেতরে মেকিই থেকে যান। বঙ্গবন্ধুর দেয়া কমলা রঙের কম্বল ব্যবহার করে তিনি শীত নিবারণ করলেও তার ভাষ্যে তিনি শেখ মুজিবের উপদেষ্টা হতে রাজি হননি। তিনি মনে করেছিলেন তাতে চাটুকারিতা হবে। কিন্তু তিনি যদি নিজেকে এতোই নিরপেক্ষ ভাবেন তবে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়কের উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে অবদান রাখা উচিৎ ছিলো। অথচ দেশকে দেয়ার মতো কিছু না দিয়ে জনকের কবরে নিজে কিছু না পাওয়ার বিলাপে মেতে ওঠেন।



ছফার 'গাভী বিত্তান্ত' নিয়ে অনেকেই উচ্ছ্বসিত যে, বইটিতে শিক্ষক রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি কড়া ভাষায় লিখে গেছেন। কিন্তু 'গাভী বিত্তান্ত'-র মাধ্যমে তিনি যে এদেশের কৃষককূলকে অপমানিত করেছেন তা অনেকেই এড়িয়ে গেছেন। 'গাভী বিত্তান্ত'-র মূল চরিত্র মিঞা মুহম্মদ আবু জুনায়েদ। তিনি একজন কৃষক পরিবারের সন্তান। গ্রামীণ জনপদে কিংবা নাগরিক জীবনেও কৃষককে গালি দিতে কিংবা তুচ্ছ করতে সবাই 'চাষা' শব্দটি ব্যবহার করে। মিঞা মুহম্মদ জুনায়েদকে ভিসি হওয়ার পরে বিশাল বাংলো পেয়ে গাভী পালনের খায়েশ মিটানোর কথা উল্লেখ করে কার্যত ছফা এটাই বুঝিয়েছেন, চাষা কখনো সভ্য হয় না। অথচ দেশের সরলমতি কৃষক কোনো কূটচালে না থাকলেও ছফার পরোক্ষ গালিটা তাদের উপরেই পতিত হয়। এটাও সাথে সাথে স্মরণীয় যে, ছফার পিতাও একজন গ্রামীণ কৃষক ছিলেন।



ছফার অস্থিরতা কী পরিমাণ অস্থির ছিল তা তার বিভিন্ন গ্রন্থের উৎসর্গ পত্র দেখলেই টের পাওয়া যায়। তিনি ভাষাকে পিতার স্থানে দেখছেন এবং ভাষাই মানুষের বোধ লালনকারী হিসেবে মেনেছেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও সংগ্রামীদের জন্যে বই উৎসর্গ করলেও তিনি ভাষা শহীদদের জন্যে কোনো বই উৎসর্গ করেননি। তিনি তার একমাত্র বৈমাত্রেয় ভাইয়ের নামে 'লেনিন ঘুমাবে এবার' উৎসর্গ করলেও জনকের নামে কিংবা তার প্রয়াত মাতার নামে কোনো বই উৎসর্গ করেননি। অথচ তার ভাষ্যে তার পিতা তাকে কাঁধে নিয়ে দূর-দূরান্তরে গেছেন দুটো মূল্যবান বক্তব্য শোনানোর জন্যে। বরং তার উৎসর্গ পত্রে কতিপয় খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের নাম আছে যাদের নামে তিনি বই উৎসর্গ করে তিনি নিজে লাভবান হতে চেয়েছেন বলে মনে হয়।



ছফার জীবনী ও তার সাহিত্য সমগ্র পাঠে যে কথা মনে হয়, তিনি মানুষকে



 



বিড়ম্বনায় ফেলতে ভালোবাসতেন এবং নিজেকে কপট নিরপেক্ষতার কিংখাবে মুড়িয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। বাঙালি বুদ্ধিজীবীর খোলস তিনি উন্মোচন করতে গিয়ে নিজে ধরা খেয়েছেন অবশেষে 'জনকের কবরে' এসে। কেননা বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনিও নিরপেক্ষ ছিলেন না। মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারতের অবদানকে স্বীকার না করে বরং তিনি এই বলে ভারতের বিরোধিতা করেছেন যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হেঁটে ভারতে চলে গেল। পাশাপাশি শেখ মুজিব কেনো আগে থেকে ভারত থেকে গোলা-বারূদ, অস্ত্রশস্ত্র আমদানি করে রাখেননি, সেজন্যে তিরষ্কার করেছেন তার প্রবন্ধে। সামগ্রিক বিচারে আহমদ ছফাকে তাই মনে হয়েছে মশারীর বাইরে পা টানা ব্যক্তিরূপে যে জানেনি তার সীমা ও সামর্থ কতটুকু।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
২০১৭৭০
পুরোন সংখ্যা