চাঁদপুর। সোমবার ২৮ মে ২০১৮। ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫। ১১ রমজান ১৪৩৯
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৮-সূরা ছোয়াদ

৮৮ আয়াত, ৫ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১৬। তারা বলে, হে আমাদের পরওয়ারদেগার, আমাদের প্রাপ্য অংশ হিসাব দিবসের আগেই দিয়ে দাও।

১৭। তারা যা বলে তাতে আপনি সবর করুন এবং আমার শক্তিশালী বান্দা দাউদকে স্মরণ করুন। সে ছিল আমার প্রতি প্রত্যাবর্তনশীল।

১৮। আমি পর্বতমালাকে তার অনুগামী করে দিয়েছিলাম, তারা সকাল-সন্ধ্যায় তার সাথে পবিত্রতা ঘোষণা করত;   

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


ঈশ্বরের পরবর্তী স্থানই হল পিতামাতার   

 -উইলিয়াম পেন।


নারী পুরুষের যমজ অর্ধাঙ্গিনী 


ফটো গ্যালারি
ম্যাক্সিম গোর্কির জগৎ
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
২৮ মে, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


সাহিত্যচর্চা করেন অথচ ম্যাক্সিম গোর্কির নাম জানেন না, এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। এছাড়া ম্যাক্সিম গোর্কিকে চেনেন অথচ 'মা' উপন্যাসের নাম জানেন না, এমন লোকও পাওয়া দুষ্কর। শুধু মা উপন্যাসই নয়; সাহিত্যের অলিতে-গলিতে তাঁর নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে কেবল লেখনী শক্তির কারণেই। উনিশ শতকে বিশ্বসাহিত্যে যে কয়েকজন হাতেগোনা সাহিত্যিক ঝড় তুলেছেন ম্যাক্সিম গোর্কি তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান। তিনি সাহিত্য আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র। শুধু গল্প-উপন্যাসেই নয়; ব্যক্তি গোর্কির সংগ্রামী জীবনও অনুপ্রেরণা জোগায়। আশা জাগায় তীব্র হতাশার মাঝে বেঁচে থাকার। তাই তো ব্যক্তি ম্যাক্সিম গোর্কি এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম অবশ্যপাঠ্য হয়ে ওঠে।



 



তাঁর প্রকৃত নাম আলেক্সেই ম্যাকসিমোভিচ পেশকভ। এই গুণী মানুষটির জন্ম মধ্য রাশিয়ার ভলগা নদী তীরবর্তী নিঞ্জি নভগোরদ শহরে ১৮৬৮ সালের ২৮ মার্চ। 'গোর্কি' রুশ শব্দ। যার অর্থ তেতো বা তিক্ত। ব্যক্তিজীবন তিক্ততায় ভরা ছিল বলেই হয়তো লিখতে শুরু করেছেন এই নামে। গোর্কির বাবার ডাকনাম ছিল ম্যাক্সিম। তিনি একজন সাধারণ শ্রমিক ছিলেন। তার ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণে কিছু মতান্তর দেখতে পাওয়া যায়। বছরের হিসাব বাদ দিয়ে সহজেই বলা যায়, গোর্কি শিশু-কিশোর বয়সে বাবা-মাকে হারান। আশ্রয় নেন নানা-নানি কিংবা দাদা-দাদির কাছে। যে পরিবারকে একসময় বেছে নিতে হয় ভিক্ষাবৃত্তির মতো নিন্দনীয় মাধ্যম। ফলে মুচির দোকানে, রুটির দোকানে, বিস্কুট কারখানায়, বাগানের মালি, স্টিমারের হেঁসেলে বয়-বেয়ারাগিরি, মাছের আড়তে চাকরি, রেলস্টেশনের দারোয়ানি_সবই করেছেন তিনি। কারণ উদ্ভুত পরিস্থিতির চাপেই গোর্কিকে শ্রমিকের কাজে নামতে হয়। হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে ১৮৮০ সালে ঘর ছাড়েন। জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে দুইবার আত্মহত্যারও চেষ্টা করেন। সে অপরাধে তাকে অবশ্য শাস্তিও পেতে হয়েছিল।



 



অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে লেখাপড়ার সুযোগও তেমন জীবনে আসেনি। বারো-চৌদ্দ বছর বয়সে লেখাপড়া শুরু করেন। পড়ার উদ্দেশ্যে তিনি কাজান শহরে যান। কিন্তু অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। জীবিকার সন্ধানে তাঁকে পথে পথে ঘুরতে হয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর পায়ে হেঁটে পুরো রাশিয়া ভ্রমণ করেন। পড়াশোনার জন্য কাজান শহরে এলেও অর্থাভাবে রুটির কারখানায় শ্রমিকের কাজ নিতে হয়। এর আগে তাঁকে জন্মশহরে বালক অবস্থাতেই জুতার দোকানে কাজ করতে হয়েছিল। তবে কাজানে এসে তাঁর পরিচয় ঘটে একদল বিপ্লবীর সঙ্গে। তখন রাশিয়াতে পরিবর্তনের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছিল। এসময়ে ক্ষমতায় ছিল স্বৈরতান্ত্রিক, রাজতান্ত্রিক জার সরকার। তখন সরকার কুলাক ও পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করে চলতো। দেশের শ্রমিক কৃষক জনগণের ওপর চালাতো নির্মম শোষণ নিপীড়ন। ফলে বাধ্য হয়েই চূড়ান্ত মুক্তির আশায় প্রকৃত বিপ্লবী ধারার রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা ছিল সময়ের দাবি। সে যাত্রায় গোর্কি শ্রেণীগত অবস্থানের কারণেই প্রথমত মার্কসবাদী বিপ্লবী সংঘে যুক্ত হন। এ সময়ে তিনি মার্কস-এঙ্গেলসের লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হন। অবশ্য তারও আগে উনিশ শতকের রুশ সাহিত্যের সঙ্গে গোর্কির পরিচয় ঘটে। এছাড়া রুশ কথাসাহিত্যে তখন সৃষ্টির উন্মাদনা। পুশকিন, গোগল, দস্তয়েভস্কি, ইভান তুর্গেনেভ, তলস্তয়দের হাতে পৃথিবীর সেরা সাহিত্য রচিত হয়। তবে তৎকালীন অধিকাংশ রুশ কবি-সাহিত্যিকের মতো গোর্কির পারিবারিক অভিজাত্য বা ঐতিহ্য ছিল না।



 



পারিবারিক আভিজাত্যহীন গোর্কি ব্যক্তিজীবনে শ্রমিক হলেও দুনিয়া জোড়া খ্যাতির কারণ তার সৃষ্ট বিপ্লবী সাহিত্যকর্ম। লেখক হিসেবে তাঁর আবির্ভাব উনিশ শতকে। তিনি রুশ সাহিত্যের মহান ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতার অংশ। গল্প দিয়ে তাঁর সাহিত্য জগতে প্রবেশ। তবে এর পেছনে সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি পাওয়ার কোন লালসা বা আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছিল না। তাই তো প্রথম গল্প 'মাকার চুদ্রা' তিনি একটি পত্রিকায় বেনামে পাঠিয়েছিলেন। তিনি যা লিখেছিলেন তা শিল্পীর কল্পনাপ্রসূত নয়, নিজের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা। তাই গোর্কির সাহিত্য জীবনের প্রথম পর্বে পাই গল্প। এরপর উপন্যাস ও নাটক লিখেছেন। সাহিত্যবিষয়ক আলোচনা, সংবাদধর্মী অনেক লেখাও রয়েছে। তবে তাঁর 'মা' উপন্যাসই তাকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি দিয়েছে।



 



রুশ কথাসাহিত্যের অন্যতম উত্তরাধিকার ম্যাক্সিম গোর্কি। গণমানুষের লেখক হিসেবে তাঁর খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। খেটে খাওয়া মানুষের জীবনই তাঁর সাহিত্যের অন্যতম উপকরণ। উনবিংশ শতকের শেষ দিকে এবং বিংশ শতকের শুরুর দিকে রাশিয়ার রাজনৈতিক বাতাবরণে ম্যাক্সিম গোর্কির গল্প-উপন্যাস মুক্তিকামী মানুষের কাছে প্রেরণা হিসেবে হাজির হয়েছে। বিশ্বের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, ঘৃণা-ভালোবাসা, স্বপ্ন-বাস্তবতা, যন্ত্রণা, সংগ্রাম সর্বোপরি জীবনের শাশ্বত গল্প পাওয়া যায় তাঁর লেখায়। বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছেও তাঁর নাম এতটাই পরিচিত যে, তাকে রুশ ভাষার লেখক বলে মনে হয় না। তাঁর 'মা' উপন্যাসের জন্যই তিনি বাংলার সাধারণ পাঠকের কাছেও বিশেষ পরিচিত। তবুও তাঁর উপন্যাস ও ছোটগল্প বিশ্বজুড়ে পাঠকের কাছে আজও সমাদৃত। অসংখ্য ভাষায় তাঁর সাহিত্যকর্ম অনুবাদ করা হয়েছে। তাঁর সাহিত্য এখনো আগের মতোই জনপ্রিয়।



 



ম্যাক্সিম গোর্কির সাহিত্যকর্ম সর্বহারা শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে। তাঁর সাহিত্যকর্ম প্রচলিত শ্রেণীবিভক্ত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তাতে শ্রেণীবিভক্ত সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর অবস্থান তাদের মধ্যকার কঠিন সংগ্রামের চিত্র ফুটে উঠেছে। শ্রেণীবিভক্ত বর্তমান সমাজে শ্রমিক শ্রেণী শুধু নিপীড়িত নয়, তারা শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত শ্রেণীও বটে। বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শ্রমিক শ্রেণীই নেতা। অন্য শ্রেণীকে মুক্ত না করে শ্রমিক শ্রেণী তার মুক্তির লড়াইয়ে বিজয় অর্জন করতে পারে না। তাই তিনি দেখিয়েছেন, বুর্জোয়া শ্রেণীর ভূমিকা প্রতিক্রিয়াশীল, পরজীবী শ্রেণী হিসেবে তারা শ্রমিক কৃষককে শোষণ করেই টিকে থাকে। এর থেকে মুক্তি পেতে শ্রমিক-কৃষককে নিজস্ব সংগঠনে সংগঠিত হতে হবে। তীব্র শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়াশীলদের উচ্ছেদ করে শ্রমিক-কৃষকের নিজস্ব রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই মুক্তি সম্ভব।



 



যে কারণে ম্যাক্সিম গোর্কির 'মা' বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক পঠিত ও আলোচিত। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে 'মা' অবশ্যপাঠ্য হয়ে উঠেছে। প্রায় শতাব্দীকালজুড়ে কোনো উপন্যাসের এতটা প্রভাবের আর কোনো উদাহরণ আছে বলে জানা নেই। ১৯০৫ সালের বিপ্লবী পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ১ মে'র মিছিলের ঘটনাকে উপজীব্য করে এ উপন্যাসে বাস্তব অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। গোর্কি যে ভবিষ্যৎ সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, সোভিয়েত সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে তার রূপ সূর্যোদয়ের আভার মতো দেখা দিয়েছিল। যুগদ্রষ্টা গোর্কি ঘোষণা করেছিলেন_'আমি জানি, সময় আসবে যখন প্রতিটি মানুষ আর সবার কাছে তারার মতো হয়ে উঠবে। তাদের রূপে নিজেরাই মুগ্ধ হবে। পৃথিবীর বুকে থাকবে শুধু মুক্ত মানুষ। মুক্তি তাদের মহিমা দিয়েছে। প্রত্যেকটি হৃদয়ের দুয়ার খুলে যাবে। কারো মনে হিংসা থাকবে না। জীবন রূপ পাবে মানুষের সেবায়, মানুষের মূর্তি পাবে স্বর্গের দেউল। কিছুই মানুষের আয়ত্তের বাইরে নয়। মানুষ সেদিন সুন্দর হবে। সত্য আর সুন্দরের মুক্তিতে পাবে সে তার বীজমন্ত্র। আর যে মানুষ সারা পৃথিবীকে কোল দিতে পারবে, তাকে সবচেয়ে ভালোবাসবে। সর্ববন্ধনমুক্ত সে মানুষ হয়ে উঠবে নরোত্তম, কারণ সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ওই মুক্তিতে। এ নবজীবনের মানুষই রচনা করবে মহাজাতি।'



 



আজ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে যখন সংশোধনবাদীরা ক্ষমতায় বসে প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রকে সরিয়ে পুঁজিবাদ কায়েম করেছে, গোটা দুনিয়ায় শ্রমিক আন্দোলন আদর্শগত ও সংগঠনগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, যার পরিণতিতে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ তীব্রতর হচ্ছে, তখন 'মা' উপন্যাস সাহস দেবে, প্রেরণা দেবে। কেননা একবার গোর্কিকে বলা হয়েছিল, 'কেন লেখেন?' জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে প্রবল করে তোলার জন্য।' তিনি কঠোর বাস্তবতা ও তার সব ধরনের অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষকে বিদ্রোহী করে তোলার সংগ্রামে নিজেকে প্রত্যক্ষভাবে লিপ্ত করার জন্য হাতে কলম তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর ম্যাক্সিম গোর্কি হয়ে ওঠার পেছনে প্রধান কারণ হলো, বাল্যকাল থেকেই তাকে অন্যায় অত্যাচারের বীভৎসতা এবং ব্যাভিচারের আগুনে দাউ দাউ করে দগ্ধ হতে হয়েছে। দগ্ধ হতে হতেই তিনি অর্জন করেছেন শিল্পী হওয়ার মৌলিক অধিকার ও যোগ্যতা।



 



তাঁর এই সংগ্রাম একদিনের নয়। সংগ্রামী শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে কঠোর সাধনা এবং নিরীক্ষা। লেখালেখির শুরুর দিকে ১৮৯২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তিফ্লিস শহর থেকে প্রকাশিত 'কাফকাজ' নামের একটি দৈনিক সংবাদপত্রে একটি গল্প ছাপা হয়। লেখকের নাম 'ম্যাক্সিম গোর্কি'। আসল নাম আড়াল করে তিনি আবির্ভূত হলেন ম্যাক্সিম গোর্কি নামে। এ সময় এক নারীর প্রেমে পড়েন তিনি। ১৮৯৬ সালে তারা বিয়ে করেন। আট বছরের দাম্পত্য জীবন তাদের। আইনগতভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ না হলেও তারা আর একত্রে বসবাস করেননি। অপরদিকে নতুন প্রেমে জড়িয়ে পড়েন গোর্কি। তিনি বহুভাষাবিদ, মস্কো আর্ট থিয়েটারের অভিনেত্রী, বলশেভিক পার্টির সদস্য মারিয়া ফিওদরনা আন্দ্রেইয়েভা। পরে অবশ্য তার সঙ্গেও বিচ্ছেদ ঘটে। মজার ব্যাপার হচ্ছে-বিচ্ছেদ হলেও স্ত্রী একাতেরিনা এবং মারিয়া প্রাক্তন স্বামী গোর্কির খোঁজ নিতেন।



 



সাংসারিক জীবনের টানাপোড়েনকে পাশ কাটিয়েও ১৮৯৮ সালে পিটাসবুর্গ থেকে তাঁর প্রথম বই 'ওচের্কি ই রাস্কাজি' (নকশা ও গল্পাবলি) দুই খ-ে প্রকাশিত হয়। তার আগেই তো পত্র-পত্রিকায় অনেক গল্প প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে 'পেসনিয়া আ সোকলে (বাজপাখির গান)' ও 'পেসনিয়া আ বুরেভিয়েনিকে (ঝড়ো পাখির গান)' নামে দু'টি কবিতা তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে পেঁৗছে দিয়েছিল। ১৮৯৫ সালে তাঁর বিখ্যাত 'চেলকাশ' গল্পটি একটি দৈনিকে প্রকাশের পর আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সেই সুবাদে সামারার একটি বড় পত্রিকায় চাকরিও পেয়ে যান। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন, চাকরির পাশাপাশি লেখা চালিয়ে যাবেন। অবশ্য পরবর্তীতে ১৯১৫ সালে 'লিয়েতপিস' (কড়চা) নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেন। এর ছয় বছর পর ১৯২১ সাল থেকে তাঁর সম্পাদনায় সোভিয়েত সাহিত্য পত্রিকা 'ক্রাস্নায়া নোফ' (রক্তিম জমি) প্রকাশিত হতে থাকে।



লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে সাথে গোর্কি রাজনীতির সঙ্গেও যোগাযোগ রেখেছেন। ফলে জার শাসিত রাশিয়ায় তাঁকে নিগৃহিত হতে হয়েছে। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব পরবর্তী সোভিয়েত যুগেও লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছে। কারণ তিনি ১৯০৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন বলশেভিক পার্টির সঙ্গে। আর সে বছরই জারের বিরুদ্ধে প্রথম বিপ্লব সংঘটিত হয়, যা 'রক্তাক্ত রবিবার' হিসেবে পরিচিত। এর পরের বছরই তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়। ফলে প্রায় সাত বছর তিনি বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে থাকেন। এ সময়ে তিনি বেশি অবস্থান করেছেন ইতালির কাপ্রি দ্বীপে। দেশে ফেরেন ১৯১৩ সালে। চার বছর পর ১৯১৭ সালে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কারণে পতন হয় জারতন্ত্রের, প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রমিক-কৃষকের শাসন। বিপ্লব পরবর্তী সোভিয়েত রাশিয়ায় তিনি দেশ গড়ার কাজে নিযুক্ত হন। কিন্তু নতুন দেশে নতুনভাবে আর পার্টির সদস্য পদ নেননি। কারণ এসময় তিনি পুরোপুরি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন।



 



জীবদ্দশায় সোভিয়েত রাশিয়ায় সাহিত্যের মুকুটহীন সম্রাট ছিলেন তিনি। আজও বিশ্বসাহিত্যে ম্যাক্সিম গোর্কি আলোচিত নাম। সৃষ্টিকর্ম দিয়েই নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছেন। তিনি উপন্যাসের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেলেও গল্পগ্রন্থগুলো সত্যিকারের গোর্কি হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। কারণ তাঁর গল্পের গাঁথুনি বেশ মজবুত। প্রথম দিকের গল্পগুলোতে নিটোল রোমান্টিকতা থাকলেও পরবর্তীতে বিষবস্তু এবং উপস্থাপন শৈলী ভিন্ন রূপ নিতে থাকে। সমকালীন বাস্তবতা, সমাজের নিচুতলার মানুষই তাঁর গল্পের উপজীব্য। মূলত প্রথম দিকে তিনি লিখতেন প্রথাগত নিয়মে। পরবর্তীতে তাঁর পরিচয় হয় বিখ্যাত তরুণ লেখক ভস্নাদিমির করোলেঙ্কার সঙ্গে। করোলেঙ্কার কথায় চেতনা ফিরে পেয়ে প্রথাগত চেনা ধারাকে বাদ দিয়ে নতুন পথে যাত্রা শুরু করেন।



 



১৮৯৮ সালে তাঁর প্রবন্ধ ও গল্প নিয়ে একটি ছোট সংকলন প্রকাশিত হয়। নাম দেওয়া হয় 'রেখাচিত্র ও কাহিনি'। এটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে গোর্কির নাম। শুরু হয় নতুন জীবন। বৈচিত্র্যে ভরপুর হয়ে ওঠে জীবন ও সাহিত্যকর্ম। নানা ঘাত-প্রতিঘাতে এক পেশা থেকে আরেক পেশায় ঘুরতে ঘুরতে বড় হয়ে উঠতে থাকেন। সবকিছুর মধ্যেও তাঁর বই পড়ার নেশা বাড়তে থাকে। সর্বভূকের মতো যা পান, তা-ই পড়েন। এভাবেই একদিন হাতে আসে রুশ কবি পুশকিনের কবিতার বই। পড়তে পড়তে বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন। তাই তো বাস্তবমুখর জীবনের অভিজ্ঞতার কাহিনি অবলম্বনে পরবর্তীকালে লিখেছিলেন বিখ্যাত গল্প 'ছাবি্বশজন লোক আর একটি রুটি'। এছাড়াও তাঁর অন্যান্য গল্পগন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো_ মানুষের জন্ম (১৮৯২), বুড়ি ইজরেগিল (১৮৯৪), চেলকাশ (১৮৯৪), কনভালভ (১৮৯৫), বোলেসস্নভ (১৮৯৬) এবং ঝড়ো পাখির গান (১৯০১) প্রভৃতি।



 



জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সংগ্রামী এ মানুষটি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন। ১৯২১ সালে শরীরে যক্ষ্মা ধরা পড়লে উন্নত চিকিৎসার জন্য লেনিন তাঁকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় জার্মানিতে পাঠান। দুই বছর চিকিৎসার পর সেখান থেকে ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় ইতালির কাপ্রি শহরে। সেখানে আরও চার বছর অবস্থান করে সাহিত্য সাধনায় নিজেকে প্রবলভাবে নিমগ্ন রাখেন। এরপর ১৯২৮ সালে নিজ দেশ রাশিয়ায় ফিরে যান। তবে রোগ সমূলে সেরে উঠলো কিনা তা জানার প্রয়োজন বোধ করেননি। ফলে চিকিৎসারত অবস্থায় ১৯৩৬ সালের ১৮ জুন ৬৮ বছর বয়সে আকস্মিকভাবে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।



 



তাঁর আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে রহস্য ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। সে রহস্য আজও অনুদ্ঘাটিতই রয়ে গেছে। তবে অনেকেই ধারণা করছেন, আকস্মিক মৃত্যুর জঘন্যতম কাজটি আসলে তৎকালীন শাসক জোসেফ স্তালিনেরই ছিল। বলা হয়, তারই নির্দেশে চিকিৎসকগণ এমন গর্হিত কাজটি করতে পেরে ছিলেন। কারণ ক্ষমতায় যাওয়ার পর থেকে গোর্কির সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতির কথাও শোনা যায়। যদিও পরবর্তীতে চিকিৎসকদের সাজাও দিয়েছিলেন এই শাসক। ঘটনার পরিকল্পনাকারী বা হোতা যিনিই হোন না কেন, গোর্কির মৃত্যু যে স্বাভাবিক ছিল না, এ বিষয়ে সবাই সংশয়হীন। যদিও শেষকৃত্যানুষ্ঠানের শবযাত্রায় জোসেফ স্তালিন অংশ নিয়েছিলেন কফিন বাহকদের একজন হিসেবে। এমনকি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দাফনও করা হয়েছে। রহস্যাবৃত মানুষটি মৃত্যুর সময়ও যেন রহস্যই রেখে গেলেন। ভাবিয়ে গেলেন, কাঁদিয়ে গেলেন সংগ্রামী মেহনতি মানুষদের। তবে ঠাঁই করে নিয়েছেন আপামর বিশ্বের জনগণের মনে। জ্বলজ্বলে তারকা হয়ে রইলেন বিশ্বসাহিত্যের আকাশে। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক; দীর্ঘজীবী হোক ম্যাক্সিম গোর্কির বিপ্লবী সাহিত্যকর্ম।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১১৭৯৬৫
পুরোন সংখ্যা