চাঁদপুর, শনিবার ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৬ জিলকদ ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুরে আলোচিত জয়ন্তী চক্রবর্তীরর খুনি আটক, ১৮ আগস্ট বিকেল ৩টায় চাঁদপুর পিবিআই কার্যালয়ে এ বিষয়ে প্রেস ব্রিফিং
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৩-সূরা নাজম


৬২ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৩২। উহারাই বিরত থাকে গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কার্য হইতে, ছোটখাট অপরাধ করিলেও। তোমার প্রতিপালকের ক্ষমা অপরিসীম ; আল্লাহ তোমাদের সম্পর্কে সম্যক অবগত, যখন তিনি তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছিলেন মৃত্তিকা হইতে এবং যখন তোমরা মাতৃগর্ভে ভ্রূণরূপে ছিলে। অতএব তোমরা আত্ম-প্রশংসা করিও না, তিনিই সম্যক জানেন মুত্তাকী কে।


 


assets/data_files/web

একজন অল্প বয়স্ক মেয়ে স্ত্রী হিসেবে অথবা মা হিসেবে কোনোটাতেই ভালো নয়। -নজ এডামস।


 


 


ন্যায়পরায়ণ বিজ্ঞ নরপতি আল্লাহর শ্রেষ্ঠ দান এবং অসৎ মূর্খ নরপতি তার নিকৃষ্ট দান।


 


ফটো গ্যালারি
ঠিকানাহীন বেদে সমপ্রদায়
রিয়াজ শাওন
২০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


'আমি পথে পথে ঘুরি,



নাই যে আমার ঠিকানা



ও আমি পথে পথে ঘুরি।'



এমনই একটি সমপ্রদায় বাংলাদেশে বসবাস করে যাদের নেই ঠিকানা। নেই কোনো নিদিষ্ট স্থান, সেখানে তারা স্থায়ীভাবে বসবাস কতে পারে। অথচ তাদের আছে নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক এমনই একটি সমপ্রদায় হল বেদে সমপ্রদায়। এই বেদে সমপ্রদায় সম্পর্কে তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন তার ছোটগল্প 'বেদেনী'তে :



''বিচিত্র জাত বেদেরা। জাতি জিজ্ঞাসা করিলে বলে, বেদে। তবে ধর্মে ইসলাম। আচারে পুরা হিন্দু; মনসাপূজা করে, মঙ্গলচ-ী, ষষ্ঠীর ব্রত করে, কালী-দুর্গাকে ভূমিষ্ট হইয়া প্রণাম করে। হিন্দু পুরাণ-কথা ইহাদের কণ্ঠস্থ। বিবাহ আদান প্রদান সমগ্রভাবে ইসলাম-ধর্ম সমপ্রদায়ের সঙ্গে হয় না, নিজেদের এই বিশিষ্ট সমপ্রদায়ের মধ্যেই আবদ্ধ। বিবাহ হয় মোল্লার নিকট ইসলামীয় পদ্ধতিতে, মরিলে পোড়ায় না কবর দেয়।'



অনেকে মনে করেন, 'বেদে' কথাটি 'বৈদ্য'-এর বিবর্তিত রূপ : বৈদ্য>বাইদিয়া>বাইদ্যা>বেদে ফোকলোর বিশেষজ্ঞ ওয়াকিল আহমেদ বলেন, বেদে শব্দটি 'বাদিয়া' থেকে এসেছে। জেমস ওয়াইজের মতে, সংস্কৃত 'ব্যাধ' থেকে বেদে শব্দটি এসেছে। আবার ভিন্ন মতও আছে। বলা হয়ে থাকে, 'বেদুইন' থেকে 'বেদে' শব্দের উদ্ভব।



কথিত আছে এই সমপ্রদায়টি বাংলাদেশ ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে শরণার্থী আরাকানরাজ বল্লাল রাজার সাথে এরা ঢাকায় আসে। জনশ্রুতি আছে, এদের আদি নিবাস মিশরে। বেদুইন হিসেবে 'মিশর' থেকেই তাদের প্রথম পথচলা শুরু। খ্রিস্টীয় সাত শতকের শেষ দিকে তাদের পূর্বপুরুষরা আরব উপদ্বীপের আলবাদিয়া বন্দরে বসবাস করতো।



অন্য এক তথ্যানুযায়ী, তারা পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার পা-ুয়াতে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। তারা মাদ্রাজের অধিবাসী বলে একটি মতও রয়েছে। আবার কারো মতে, বেদেরা বাংলাদেশে এসেছে আরাকানের 'মনতং- মান্তা' নৃগোত্র থেকে। ১৬০০ থেকে ১৬৫০ খিস্টাব্দের মাঝামাঝি কোনো এক সময় তারা বল্লাল রাজের সঙ্গে ঢাকার বিক্রমপুরে আসে। কেউ কেউ এও বলেন, তারা পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুরা জেলার বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের উত্তরসূরি। বিষ্ণুপুরে সাপকে কেন্দ্র করে আজো 'ঝাঁপান উৎসব পালন করা হয়ে থাকে। এ উৎসবে শরীরে সাপ পেছিয়ে নৃত্য করা হয়। প্রকৃত বাস্তবতা হলো এই যে, তাদের আদি শিকড় কোথায় প্রোথিত, তা আজো অনুদঘাটিত।'



 



বাংলাদেশের যশোহরের কালিয়াগঞ্জ, ঢাকার সাভার, বিক্রমপুর, খড়িয়া, গোয়ালিমান্দ্রা, কানসার গ্রাম, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া, ধামরাই, সুনামগঞ্জের ছাতক, সোনাপুর, মুন্সীগঞ্জের মুন্সির হাট, লৌহজংয়ের গোয়ালীমান্দা, মৌলভীবাজারের মনু নদীর পাড়, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর, চাঁদপুরের মতলব (দঃ),হাজিগঞ্জ, শাহাতলী, বরগুনার বামনা, জামালপুরের কাচারিপাড়া, নাটোরের সিংড়াবাজার, শেরপুরের ঝিনাইগাতীর দুধনাইবাজার, মাদারীপুরের মাদারীপুর বাজার, গাজীপুরের জয়দেবপুর, কুমিল্লার হাজিগঞ্জ বাজার, চৌদ্দগ্রাম-চান্দিনা, ফেনীর সোনাগাজী, চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ফতেহাবাদ, মিরসরাই, রাউজানের মুন্সীরঘাটা এলাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৭ লাখ বেদে স্থলে ও নৌকার মাধ্যমে জলে বসবাস করে। তবে ঢাকার সাভারে একসঙ্গে অনেক বেদে বসবাস করে। সাভারের কাঞ্চনপুর, বক্তারপুর, খঞ্জনকাঠি, সচীনগর, পোড়াবাড়ি, ওমরপুর, ছোট ওমরপুরে একসঙ্গে প্রায় ২২ হাজার বেদে বসবাস করে।



বাংলাদেশের বেদেরা মোট নয়টি শাখায় বিভক্ত। এগুলি হলো লাউয়ো বা বাবাজিয়া, চাপাইল্যা, বাজিকর, বেজ বা মিচ্ছিগিরি, গাইন, মেল্লছ, বান্দাইরা, মাল এবং সাপুড়িয়া।



 



এরা মূলত চিকিৎসা করিয়ে যাদু দেখিয়ে জীবন ধারণ করে। এরা জড়ি বুটি দিয়ে শিশু চিকিৎসা, বাত ও দাঁতের ব্যথা, মালিশ প্রভৃতিতে অভিজ্ঞ বলে বিশ্বাস প্রচলিত আছে। এরা নানাধরনের খেলা দেখায়, উল্কি পরায় ও দৈহিক কসরত প্রদর্শন করে। এরা কোন বৈজ্ঞানিক ও লিখিত চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করে না। চিকিৎসার কাজে মন্ত্র, গাছের শিকড়বাকড়, পশুপাখির হাড়, ধনেশ পাখির তেল, গরু বা মহিষের শিং, কাঁচ ভাঙ্গা, কাকিলা মাছের ধারালো দাঁত ইত্যাদি প্রকারের লোকজ ওষুধ ও জীবের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ব্যবহার করে। এরা মূলত টোটকা চিকিৎসার কাজ করে থাকে। বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় খেলা দেখিয়ে এরা লোকজন জড়ো করে ঔষধের ওপর মানুষের বিশ্বাস বৃদ্ধি করে ওষুধ বিক্রয় করে।



 



বেদেদের বিভিন্ন শাখার চিকিৎসা পদ্ধতি ও ওষুধপত্রের ব্যবস্থা পদ্ধিতি ভিন্ন রকমের। লাউয়ো বেদে বা বাবাজিয়ারা বড়শি দিয়ে মাছ ধরে, মাছ ও মাছের হাড়ের মালা বিক্রয় করে। এদের নিবাস মূলত বিক্রমপুরের বিয়ানিয়া, নারায়ণগঞ্জের চারার ঘোপ, কুমিল্লার আমিরাবাদ, মাইছাখালী, হুরাইল, নারগাঁও, নারায়ণপুর, হাজীগঞ্জ, লাকসাম ও মেহের কালীবাড়ি। গাইন বেদেরা সুগন্ধি মশলা বিক্রয় করে, এদের নিবাস নেত্রকোনায়।



বেজ বেদেরা (মিচ্ছিগিরি) বরিশাল, পিরোজপুর ও চাপাইনবাবগঞ্জে থাকে। এদের পেশা চোখের চিকিৎসা করা। এরা ভাঙ্গা কাচ দিয়ে চোখে অস্ত্রোপচার করে। চাপাইল্যা বেদেদের (সাজদার) পেশা হচ্ছে বিষ-ব্যথা নিরাময়কারী মাছের কাঁটা, বাঘের থাবা ও পাখির হাড়ের মালা বিক্রয়। এছাড়া এরা আফিম, মুক্তার অলঙ্কার, চুড়ি, শাখা, হাঁসুলি ও ঝিনুক বিক্রয় করে। এরা তাঁতী ও জোলাদের জন্য খুব সস্তায় সুন্দর সুন্দর সানা (বুনানি শলা) তৈরিতে পারদর্শী। এরা দক্ষ ডুবুরিও। এদের নিবাস ঢাকার টঙ্গী, ডেমরা ও বাড্ডা, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া, মির্জাপুরের চা বাগান এবং কুমিল্লার আমিরাবাদ।



বাজিকর বেদেরা (মেল্লছ) শিয়ালের হাড় ও ধনেশ পাখির তেল বিক্রয় করে। শিয়াইল্যা বেদেরা সর্বভুক বলে অন্য বেদেদের সাথে তাদের লেনদেন হয় না। এরা গরু, শুকর, সাপ খায় এবং হিন্দু দেবদেবীর উপাসনা করে। এরা থাকে লালমনিরহাট ও ভারতের সীমান্ত এলাকায়। বান্দাইরা বেদে ওষুধ বিক্রয় করে ও বানরের খেলা দেখায়, বিভিন্ন ভোজবাজি ও শারীরিক কসরত উপস্থাপন করে। এরা রাম-লক্ষ্মণের বন্দনা-গীত গায় এবং রাম-রাবণের শৌর্যবীর্য ও হনুমানের কীর্তির বর্ণনা করে। লালমনিরহাট ও ভারতের কলকাতায় এদের বসবাস।



মাল বেদেদের (মাল বৈদ্য) পেশা সাপের বিষ ঝাড়া, দাঁতের পোকা ফেলা, রসবাতের তেল বেচা এবং শিঙা ফুঁকা। এরা সাপ ধরে বিক্রয় করে কিন্তু সাপের খেলা দেখায় না। এদের নিবাস মাদারীপুর, বিক্রমপুর, ঢাকা, রাজশাহী, কুমিল্লা, নোয়াখালী এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম।



সাপুড়িয়া বেদেরা (সাপুড়ে) সাপের তাবিজ কবজ ও ওষুধ বিক্রয় করে ও সাপ ধরে। এরা সাপের খেলা দেখায় কিন্তু সাপ বিক্রয় করে না। এরা মনসা দেবীকে এখনও খুব শ্রদ্ধা করে। বিক্রমপুর, ঢাকা, সুনামগঞ্জ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে এদের বসবাস।



বছরের অধিকাংশ সময় বিশেষ করে ফসল তোলার মৌসুমে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে এরা বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে পরিভ্রমণ করে। এই পরিভ্রমণকে বেদেদের ভাষায় গাওয়াল বলে। মহিলারাই বেশি গাওয়ালে যায়। তাদের সাথে থাকে সাপের ঝাঁপি বা ঔষধের ঝুলি। এরা সপরিবারে গাওয়ালে যায় শীতের শুরুতে অগ্রহায়ণ মাসের শেষের দিকে ও আষাঢ় মাসের দ্বিতীয়ার্ধে।



প্রথম দফায় চৈত্র মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ও দ্বিতীয় দফায় আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এরা গাওয়াল করে। গাওয়ালের সময় এরা স্থানীয়ভাবে মূলত নৌকা, তাঁবু বা কোন স্কুল ঘরের বারান্দায় সপরিবারে থাকে। গাওয়াল শেষে দলবদ্ধভাবে আবার স্থায়ী ঠিকানায় ফিরে আসে। গাওয়ালে এরা হেঁটে যায় কিংবা নৌকা ব্যবহার করে।



গাওয়াল শেষ করে স্থায়ী আবাসে ফিরে বেদেরা সাধারণত বিভিন্ন আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করে। এসব উৎসবেই বর-কনে পরস্পরকে পছন্দ ও অভিভাবকের সম্মতিতে বিয়ে করে। বিয়ের ব্যাপারে যুবক-যুবতীর পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে। বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীর ঘরে যায় এবং স্ত্রীকে স্বামী ও সন্তানের লালন-পালনের জন্য ওয়াদা করতে হয়। বেদেদের নাচ-গানের আসরে বহিরাগত কেউ উপস্থিত থাকলে তাকে প্রলুব্ধ করে বেদে তরুণীকে বিয়ে করার জন্য উৎসাহিত করা হয়। বিয়ে হয়ে গেলে তাকে নিজেদের গোত্রে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বহিরাগত কোন যুবক বেদে যুবতীকে ফুঁসলিয়ে বিয়ে করলে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। এদের সমাজে বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ ও যৌথপরিবার প্রথা নেই। বিধবা বিবাহে কোন বাধা নেই। মুসলমান হলেও বেদে মেয়েরা পর্দা করে না। মহিলারা অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ছাড়াছাড়ি হলে সম্পত্তি এমনকি পুত্র-কন্যারও বিভাজন হয়, যার বেশির ভাগ পায় স্ত্রী।



প্রতিটি পরিবারে নিজস্ব নৌকা থাকে। কয়েকটি পরিবার ও নৌকা নিয়ে হয় দল আর কয়েকটি দল নিয়ে হয় বহর। কয়েকটি বহর নিয়ে গঠিত হয় উপগোত্র। বহরের দলপতি সর্দার নামে পরিচিত। প্রতি বহরের জন্য আছেন একজন করে দলপতি যিনি সর্দার নামে পরিচিত। সর্দার তার বহরকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে প্রতিটি দলে একজন করে পরিচালকের মাধ্যমে তার কাজ পরিচালনা করেন। সর্দার প্রতিটি দলের বাণিজ্যপথ ও এলাকা নির্ধারণ করেন যাতে দলের অন্যান্য সদস্য প্রয়োজনের সময় তার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। বহরের প্রশাসনিক ও নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষার সকল দায়িত্ব সর্দারের। সর্দার নিয়মভঙ্গকারীকে শাস্তি দেন ও বিভিন্ন বিরোধের সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে রায় দেন। বিচার কার্যের শুরুতেই বাদি-বিবাদি উভয় পক্ষকেই জামানত হিসেবে সর্দারের কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত রাখতে হয়। বিচারে যে হেরে যায় তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এই বাজেয়াপ্ত অর্থ খরচ করে বহরের লোকদের খাওয়ানো হয়। পূর্বনির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন দল গাওয়াল থেকে স্থায়ী ঠিকানায় ফিরে আসতে ব্যর্থ হলে সর্দার কৈফিয়ৎ তলব করে শাস্তি দিতে পারেন। সর্দারের ভরণপোষণের দায়িত্ব বহরের। বিয়ের সময় সর্দারকে বিশেষ ফিস দিতে হয়। বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান উপলক্ষেও সর্দার উপহার পেয়ে থাকেন।



বহরের জন্য যেমন সর্দার আছেন ঠিক তেমনি আছেন উপগোত্রীয় ও গোত্রীয় সর্দার। বছরে একটি নির্দিষ্ট সময়ে পূর্বনির্ধারিত স্থানে বহরের সর্দাররা মিলিত হয়ে উপগোত্রীয় ও গোত্রীয় সর্দার নির্বাচন করেন। পূর্বে মুন্সিগঞ্জের নিকট গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গমস্থলে কার্তিক বারুণীর স্নান উপলক্ষে যখন এক মাস স্থায়ী মেলা বসত তখন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সব বহরের সর্দাররা এখানে এসে মিলিত হতেন এবং পূর্বনির্ধারিত স্থানে বহরের সর্দাররা মিলিত হয়ে উপগোত্রীয় ও গোত্রীয় সর্দার নির্বাচন করেন। পূর্বে মুন্সিগঞ্জের নিকট গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গমস্থলে কার্তিক বারুণীর স্নান উপলক্ষে যখন একমাস স্থায়ী মেলা বসত তখন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সব বহরের সর্দাররা এখানে এসে মিলিত হতেন এবং উপগোত্রীয় ও গোত্রীয় সর্দার নির্বাচিত করতেন। বর্তমানে বেদেরা প্রতিবছর কার্তিকের ৫ তারিখ থেকে অগ্রহায়ণ মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে একত্রিত হয় মুন্সিগঞ্জ ও চট্টগ্রামে। তখন নির্বাচন হয় ও সারা বছরের জমে থাকা সমস্ত বিবাদ-বিসম্বাদ মিটিয়ে ফেলা হয়।



সহজ-সরল জীবনযাপনকারী বেদেরা খুবই সৎ প্রকৃতির। অপরাধ করে গুরুতর শাস্তির ভয় থাকলেও সর্দারের কাছে তারা অপরাধ স্বীকার করতে কুণ্ঠিত হয় না। সর্দার নিয়মভঙ্গকারীকে শাস্তি দেন ও বিভিন্ন বিরোধের সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে রায় দেন। বিচার কার্যের শুরুতেই বাদি-বিবাদি উভয় পক্ষকেই জামানত হিসেবে সর্দারের কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত রাখতে হয়। বিচারে যে হেরে যায় তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এই বাজেয়াপ্ত অর্থ খরচ করে বহরের লোকদের খাওয়ানো হয়। বেদেরা নিজেদের 'মাঙতা' বা 'মানতা' নামে ডাকে। মাঙতা অর্থ মেগে বা ভিক্ষা করে খাওয়া। সাহসী এই নৃগোষ্ঠী এক সময় রাজা-বাদশাহ বা জমিদারদের পেশাদার গুপ্তচর হিসেবেও কাজ করতেন। গুপ্তচরবৃত্তি করতে গিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে এক ধরনের সাংকেতিক ভাষা আদান-প্রদান করতেন। পরবর্তীকালে এই ভাষাই 'মাঙতা', 'ঠেট', 'ঠের' ভাষা হিসেবে নিজেদের ভাষার স্থান দখল করে, যা তাদের পেশাগত কাজের ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। আজো বাংলাদেশসহ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের 'বেদে' বা 'মনতা' নৃগোষ্ঠী এই ভাষাতেই নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করেন, কথা বলেন। এদের জীবন ধারণের মান অত্যন্ত নিম্ন ও অপরিচ্ছন্ন। এদের খাদ্য তালিকায় বাছবিচার নেই। বিভিন্ন ধরনের মাদকেও এরা আসক্ত।



বেদে পুরুষরা লুঙ্গি পরে। মহিলারা দশহাত কাপড় দুই টুকরা করে এক টুকরা কোমরের নিচে দুপ্যাঁচ দিয়ে পরে, অন্য টুকরা গলায় ওড়নার মতো ঝুলিয়ে রাখে এবং গায়ে দেয় ফতুয়া অর্থাৎ আঙ্গি। বর্তমানে অনেক মনতং নারী ও পুরুষ বাঙালি নারী-পুরুষের মতো পোশাক পরতে শুরু করেছে।



জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে বাংলাদেশে বেদেরা ইসলাম ও হিন্দু ধর্ম উভয়কেই মেনে চলেন। তবে তারা নিজেদের মুসলমান দাবি করেন। তাদের বিয়ে হয় নিজেদের সমাজের মধ্যে এবং বিয়ে পড়ানো হয় মৌলানার মাধ্যমে মুসলিম রীতিতে। মুসলমানদের মতো তারা ওয়াক্তিয়া নামাজ ও জুমার নামাজ আদায় করে। এমনকি তারা ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, শবেবরাত ইত্যাদি পালন করে।



বাঙালি মুসলমানদের সাথে এদের সামাজিক সম্পর্ক খুব কম। মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তারা হিন্দু দেবদেবীর প্রশস্তি রচনা করে, বিশেষত রাম-লক্ষ্মণ-বিক্রমাদিত্যের গুণকীর্তন করে। এরা মনসা দেবীকে এখনও খুব শ্রদ্ধা করে। এদের মধ্যে পীরের প্রভাব লক্ষণীয়। দরগায় ওরশের সময় উপস্থিত থেকে নানা মানত করে। তাদের সর্দার মারা গেলে তারা অতীতে তার কবরের ওপর মাজার নির্মাণ করতো। এখন অবশ্য তারা তা করে না। মৃত্যুর পর ইসলামী রীতি অনুযায়ী তাদের দাফন করা হয়। তারা কুলখানি ও চলি্লশা পালন করে। তবে রোজা রাখার ব্যাপারে তাদের মধ্যে শিথিলতা দেখা যায়। নিজেদের তারা মুসলমান দাবি করলেও তাদের অনুকরণবাদী চরিত্রের কারণে তারা শিব, ব্রহ্মা ও মনসায় বিশ্বাস করে। আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে তারা বেশির ভাগ সময়ে হিন্দুয়ানী রীতি অনুসরণ করে। সর্পদেবী মনসাকে মান্য করে তারা বিয়ের প্রথম রাতে বাসর এড়িয়ে চলে। কারণ এ রাতেই বেহুলার বাসরে সাপ ঢুকে লখিন্দরের প্রাণ নিয়েছিল। এ রাতকে তারা কালরাত বলে। বিয়ের পরদিন সূর্য ওঠার আগে বর-কনের সিঁথিতে হিন্দু রীতির অনুরূপ 'সেন্দেল' (সোনালি রঙের জাফরান) পরিয়ে দেয়া হয়। বিয়ের সময় ঘট ও কলাগাছ স্থাপন, কুলাতে আম পাতা, জলভরা, বিয়ের স্নান যাত্রা, নববধূকে পিত্রালয়ে বরণ, সাজ বিয়ে, বাসি বিয়ে, কনে বিদায়, ছদনা তলা ইত্যাদি অনুষ্ঠানাদি হিন্দুদের মতো পালন করে। তারা সর্প দংশন থেকে বাঁচতে মা মনসার পূজা করে। তাদের বিশ্বাস, মনসার পূজা করলে বা নাম শুনলে সাপে কাটলেও বিষ হবে না।



বেদেরা সাপের বিষ নামানোর সময় বা সাপ তাড়ানোর সময় বিভিন্ন মন্ত্র পড়ে থাকে। তেমনই একটি মন্ত্র : 'আমার মরণ কিসে গো,/ আমার সোয়ামির মরণ সাপের বিষে।/আমার মরণ কিসে গো।/মদন পোড়া চিতের ছাইয়ে/ কে দেবে হায় দিশে গো,/আমার মরণ কিসে গো।'



বেদেদের নিয়ে নানা সিনেমাও হয়েছে। ১৯৩৯ সালে দেবকী বসুর 'সাপুরে' নামের বাংলা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সাপ ও সাপুড়ে কেন্দ্রিক বেদেদের জীবন কাহিনী নিয়ে সিনেমার যাত্রা শুরু। তারপর বেশ কিছু সিনেমা তৈরি হয়েছে যেমন : নাগিনী কন্যা,সাপুড়ে কন্য,নাচে নাগিন সহ অনেক। তবে তোজাম্মেল হক বাবলুর 'বেদনার মেয়ে জোছনা' সিনেমাটি বাংলা ইতিহাসের সেরা ব্যবসা সফল ছবি।



এই বেদে সমপ্রদায় আসলেই একটা রহস্যময় এটা সমপ্রদায়। এদের সকল কিছু কেমন অন্ধকার বৃত্তে ঘেরা। জীবনযাপন, খাদ্যাভাস, চলাচলসহ একে বারেই সকল কিছু। এত রহস্য নিয়েই তারা বেঁচে আছে প্রবাহামান নদীর মাঝে। নদীর সকল রূপই তাদের চেনা। সকাল সন্ধ্যা ভাসছে নদীর বুকে একটি ছোট নৌকায় একটি পরিবার। সূত্র : উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, ইন্টারনেট।



 



রিয়াজ শাওন; শাহতলী, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১৬৭৩২১
পুরোন সংখ্যা