চাঁদপুর, শনিবার ১ জুন ২০১৯, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২৬ রমজান ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫০-সূরা কাফ্


৪৫ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


২২। আকাশে রহিয়াছে তোমাদের রিযক্ ও প্রতিশ্রুত সমস্ত কিছু।


২৩। আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিপালকের শপথ ! অবশ্যই তোমাদের বাক্-স্ফুর্তির মতই এই সকল সত্য।


২৪। তোমার নিকট ইব্রাহীমের সম্মানিত মেহমানদের বৃত্তান্ত আসিয়াছে কি?


 


 


 


assets/data_files/web

ভালোবাসার কোনো অর্থ নেই, কোনো পরিমাপ নেই।


-সেন্ট জিরোমি


 


 


যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ নয়।


 


 


ফটো গ্যালারি
এক জোড়া লাল জুতো
কাজী নাঈম
০১ জুন, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


‘বাপজান, এবার ঈদে আমার কিন্তু লাল জামা লাগবোই লাগবো। আমি লাল জামা ছাড়া কিন্তু এবার ঈদে যামু না।’ দৃষ্টি তার বাবা করিমুদ্দিকে ফোনে বলছিলো তার ঈদে আবদারের কথা।

গতবার আবদার করেছিলো, আকাশের মতো নীল জামা লাগবে। এবার তার লাল জামা চাই-ই চাই। করিমুদ্দি একটি বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড, এক ঈদে ছুটি তো আরেক ঈদে নেই। এবারে হয়তো রোজার ঈদে যাওয়া যাবে না। মেয়ের কথা শুনে তার কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে আসলো। নিজেকে সামলে শুধু বললো, ‘আইচ্ছা মা’।

‘বাপজান তাড়াতাড়ি কিনবা কিন্তু নাইলে আবার দোকানের সব জামা শেষ হইয়া যাইবো।’

করিমুদ্দি আবার বললো, ‘অইচ্ছা মা’। বলেই লাইন কেটে দিলো।

আজ মাসের ২৮ তারিখ, ৫ তারিখে ঈদ করিমুদ্দির বেতন হয় মাসের ৮ তারিখে। বড়সাবকে বলে-কয়ে হয়তো ব্যবস্থা করা যাবে, কিন্তু ছুটি কী দিবে এসব ভাবতে ভাবতে করিমুদ্দির গলা শুকিয়ে আসে।

৩ তারিখ। করিমুদ্দি আজ ভারি খুশি। বড় সাহেবকে অনেক বলে-কয়ে সে বেতন পেয়েছে। পেয়েই নিউমার্কেট চলে গেছে মেয়ের জন্যে জামা কিনতে। বাজার ঘুরে ঘুরে মেয়ের জন্যে লাল জামা, আলতা, চুড়ি আর লাল ফিতে কিনলো। জুতা জোড়া আর কেনা হলো না।

ঈদ ঘনিয়ে আসছে। আর মাত্র দুইদিন। করিমুদ্দির মেয়ে বারবার তাকে ফোন দিচ্ছে বাড়ি যাওয়ার জন্যে।

ঈদের দিন ভোরবেলা বাবার ডাকে ঘুম ভাঙ্গে দৃষ্টির। বাবার ছোঁয়া পেয়ে করিমুদ্দিকে জড়িয়ে ধরে সে।

‘আমার লাল জামা আনছো বাবা?’

হরে, মা আনছি।

করিমুদ্দি ঈদে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়, করিমুদ্দির স্ত্রী মেয়েকে জামা, আলতা, আর চুড়ি পরিয়ে বাবার সাথে ঈদে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত করে দেয়। করিমুদ্দির সামনে এসে দাঁড়ায় মেয়েটি। জিজ্ঞাস করে, ‘বাবা আমারে কেমন লাগে দেখতে?’ করিমুদ্দি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে।



মেয়ে আবার প্রশ্ন করে, ‘বাবা লাল রঙ দেখতে কেমন?’ করিমুদ্দি ধরা কণ্ঠে বলে, ‘তোকে আমি জড়িয়ে ধরলে তোর কাছে যেমন লাগে ঠিক তেমনরে মা।’ দৃষ্টি করিমুদ্দির জন্ম অন্ধ মেয়ে। তার কাছে লাল মানে শুধুই আঁধার, তার বাবাকে জড়িয়ে ধরার মতো সুতীব্র ভালোবাসার আধার।



২.

শায়লারা থাকে গুলিয়ার বস্তিতে। তার বাবা মারা গেছে মাস ছয়েক আগে। তার ছোট বোনের জন্মের পরপরই ট্রেনে কাটা পরে। মা রোগে শয্যাশায়ী। শায়লা ঈদের দিন সকাল থেকে তার ছ মাস বয়সী ছোট বোন ঝুনঝুনিকে নিয়ে তার জামার ভেতরে ঢুকিয়ে গলার দিক দিয়ে মাথা বের করে বসে আছে। কারণ তার ছোট বোনের কোনো ঈদের জামা নেই। শায়লা তার ইদের জামা পেয়েছে একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাছ থেকে। কিন্তু তার বোন পায়নি। হাড্ডিসার বোন দুটোকে এক জামার ভেতরে ভালোই এঁটেছে। মনে হচ্ছে একই বৃন্তের দুটি ফুল।



৩.

বিপু এবার বিপুল উৎসাহ নিয়ে অপেক্ষা করছে বাবা তার জন্যে নতুন কেডস্ জুতা আনবে। বিপু এক জোড়া কেডস্ একটা করে দুই ঈদে দুইটা পরে। যদিও পরের ঈদে উল্টো পায়ের কেডস্ পরতে তার অনেক কষ্ট হয়। তার বাবা টুকটুকে লাল জোড়া কেডস্ জোতা এনেছে।

বিপু বিপুল উৎসাহ নিয়ে এক পায়ে কেডস্ আরেক হাতে ক্রেচারে ভর করে ঠুকঠুক করে হেঁটে বেড়াচ্ছে। পাঁচ বছর বয়সে বিপু এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার একটি পা হারায়।



৪.

ঈদ স্পেশাল সার্ভিসের একটি বাস কিছুক্ষণ আগেই খাদে পরে গিয়েছে। মানুষের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিলো মিনিট ত্রিশেক আগেও। গোটা দশেক মৃত লাশ বের করে আনা হয়েছে। আর বাকি ত্রিশের মতো অর্ধমৃত দেহ বের করে আনা হয়েছে। পানিটা গাঢ় লাল হয়ে গেছে সেই লালের মাঝে ভাসছে এক জোড়া লাল বাচ্চা জুতো। যা আর পরা হবে না কোনো দিনই।



৫.

সুপনের ছোট বোন খুব করে আবদার করছিলো। বাড়ি আসার সময় যাতে তার জন্যে নতুন জামা নিয়ে আসে। আর ছোট ভাইয়ের জন্যে অনেকগুলো পকেটওয়ালা প্যান্ট।

সুপন শহরে পড়াশোনা করে। টিউশন করে কোনো রকম আধবেলা খেয়ে না খেয়ে বাড়িতে যৎসামান্য টাকা পাঠায়।

এ মাসে জ্বরের কারণে শুরুর ১০ দিন টিউশনিতে না যাওয়ায় তিনটি টিউশনির কোনোটিরই বেতন হয়নি।

কয়েকবার চেয়েও শুনতে হয়েছে অভিভাবকদের তপ্তবাক্য। সুপন ভাবছে রাত ঘুমেই যদি ঈদটা চলে যেতো।



ঈদের আগের দিন সুপনের ছোট বোন আবার কল করেছে। সুপন দুবার লাইন কেটে দিয়েছে। তিন বারের সময় কাঁপাকাঁপা হাতে কল ধরলো।

ও পাশ থেকে ছোট বোনের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে,

‘ভাইয়া, আমার তো গেলো ঈদের জামাটা এখনো একদম নতুন। আজকে আম্মা ট্রাংক থেকে বের করে ধুয়ে দিছে। আমার নতুন জামা লাগবো না ভাইয়া। তুই চলে আয়, তুই আসলেই হবে।’

ছোট ভাই ও পাশ থেকে চিল্লাচ্ছে আর বলছে, ‘ভাই অনেক পকেটওয়ালা প্যান্ট পরলে স্যারেরা মারে। আমার ওই প্যান্ট লাগবো না। তুই কিনিস না, চলে আয়। তুই ছাড়া আমি ঈদে যামু না।’

সুপন আর ঘুমোতে চায় না। শুধু একটা দৌড় দিতে চায়। খুব জোরে। যতোটা জোড়ে দৌড়ালে মূহূর্তেই তিন ভাইবোন জড়াজড়ি করে একসাথে কেঁদে সুখ পাওয়া যায় ততোটা।



প্রতিটি ঈদ একেকটি পরিবারের জন্যে একেকটি ছোট গল্প। শেষ হয়েও হয় না। ঈদ চলে যায়। নতুন ঈদ চলে আসে আবার চলে যায়। এসবের মাঝেই মহাআনন্দ নিয়ে দেশের আনাচে-কানাচেতে থাকা সকল মধ্যবিত্ত, নি¤œ মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্তদের মাঝে নেমে আসুক অনাবিল সুখের ঈদ। অপূর্ণতাগুলো পূর্ণ হোক আনন্দ এবং ভালোবাসায়।

 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১১১৭২৬৩
পুরোন সংখ্যা