চাঁদপুর। শনিবার ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮। ২৪ ভাদ্র ১৪২৫। ২৭ জিলহজ ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪১-সূরা হা-মীম আস্সাজদাহ,

৫৪ আয়াত, ৬ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১৩। তারা যদি বিমুখ হয় তবে বল : আমি তো তোমাদেরকে সতর্ক করেছি এক (আযাবের) বজ্রের; আ’দ ও সামূদের বজ্রের অনুরূপ।

১৪। যখন তাদের নিকট রাসূলগণ এসেছিলেন তাদের সম্মুখ ও পশ্চাৎ হতে (এবং বলেছিলেন) তোমরা আল্লাহ ব্যতীত কারো ইবাদত করো না। তখন তারা বলেছিল : আমাদের প্রতিপালকের এইরূপ ইচ্ছা হলে তিনি অবশ্যই ফেরেশতা প্রেরণ করতেন। অতএব তোমরা যেসব সহ প্রেরিত হয়েছো, আমরা তা প্রত্যাখান করছি।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন



 


সৎ উপদেশকে টাকার মূল্যে পরিমাপ করা যায় না।                             


-ইরাসমুস।


না চাওয়া সত্ত্বেও যখন তোমাকে কিছু দেওয়া হয়, তা গ্রহণ করো এবং তার প্রতিদান দিও।

 


ফটো গ্যালারি
পিতার আর্তনাদ
কবির কাঞ্চন
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


আরজু আহমেদ। জন্ম নোয়াখালী জেলার হাতিয়া থানায়। ছোটবেলা থেকে খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করেছেন। তার স্বপ্ন ছিলো পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হবেন। কিন্তু পারিবারিক ও পারিপাশ্বর্িক নানান প্রতিকূলতার কারণে তার বুকের লালিত স্বপ্ন শতভাগ পূরণ হয়নি। শেষমেশ একটি বেসরকারি ব্যাংকেই তার চাকুরি হলো।



চাকুরির এক বছর যেতে না যেতেই বাবা-মায়ের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করে সংসারী হতে হলো তাকে। একটুও ঠকলেন না আরজু সাহেব। সুন্দর ভালো মনের একজন সাংসারিক বৌ পেলেন। দু বছরের মাথায় তাদের সুখের সংসারে আলো ছড়িয়ে প্রথম পুত্র সন্তানের আগমন ঘটলো। একমাত্র ছেলে হিমেলকে পেয়ে আরজু আহমেদ, হিমেলের দাদা-দাদী খুব খুশি হলেন। ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন আরজু সাহেব। একদিন হিমেল অনেক বড় হবে। বিসিএস ক্যাডার হয়ে তার মনের অপূর্ণতা দূর করবে।



হিমেল সে পথেই বড় হচ্ছে। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তারপর নিজের কর্মস্থলের পাশে, শহরের একটি নামকরা কলেজে হিমেলকে ভর্তি করানো হয়। বাবা-ছেলে এক কক্ষবিশিষ্ট ছোট্ট একটি ব্যাচেলরকক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করলো।



আরজু আহমেদ ছেলের সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করেন। ছেলের কাছে তার চাওয়ার কথা বলেন। হিমেলও বাবার কাছে সববিষয় শেয়ার করে। লেখাপড়াকে জীবনের একমাত্র অবলম্বন মনে করে নিয়মিত পড়াশোনা করে চলেছে। সকালে বাবার সাথে হিমেল কলেজে যাবার উদ্দেশ্য কলেজ ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বের হয়। মাঝপথে ছোট্ট কোনো খাবার হোটেলে বাবা-ছেলে একসাথে সকালের নাস্তা সেরে নেয়। তারপর হিমেল বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কলেজের দিকে চলে যায়। কলেজ শেষে বাসায় ফিরে এসে দুপুরের খাবার গ্রহণ করার পর আবার প্রাইভেট পড়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়। সন্ধ্যা নামার আগে আগে বাসায় ফিরে আসে। মাগরিবের নামাজ আদায় করে পড়ার টেবিলে বসে যায়। অফিস থেকে বাবা ফিরলে দু জনে একসাথে হালকা নাস্তা করে নেয়। এরপর হিমেল আবার পড়তে বসে। হিমেলকে এভাবে পড়াশোনায় মগ্ন থাকতে দেখে আরজু আহমেদ স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়েন।



একদিন হিমেল বাবাকে কল করে বললো, 'বাবা, আমি কলেজ থেকে বের হচ্ছি। এইমাত্র কলেজ ছুটি হয়েছে। আজ তোমার জন্যে আমার একটা চমক আছে, বাবা।'



_কিসের চমক!



_তোমার অফিসের দিকে আসছি। এসেই তোমাকে চমকে দেবো। তুমি খুব খুশি হবে, বাবা। তোমার স্বপ্ন... না থাক্। সামনাসামনি দেখিয়ে বলবো।



_ঠিক আছে, বাবা। সাবধানে আসিস্।



_জি্ব বাবা, চিন্তা করো না। তোমার ছেলে তোমার কাছে খুব শীঘ্রই ফিরছে।



আরজু আহমেদ প্রাণভরে হাসলেন। মোবাইলের কল কেটে দিয়ে আনমনে ছেলেকে নিয়ে ভাবতে লাগলেন। নিজের অজান্তে কয়েক ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ে।



হিমেল ও তার ক'জন বন্ধু কলেজ গেট পার হয়ে ধীরে ধীরে প্রধান সড়কের দিকে চলে আসে। প্রতিদিনের মতো আজও বাসস্ট্যান্ডে বাস ধরার জন্যে পায়ে হাঁটতে থাকে। একে অন্যে গল্প করতে করতে প্রায় বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি চলে আসে ওরা। হঠাৎ করে পেছন থেকে ক্ষীপ্র বেগে ছুটে আসা অনিয়ন্ত্রিত একটি বাস রাস্তা থেকে ফুটপাতে উঠে আসে। হিমেল বাসটির নিচে পড়ে যায়। স্পটেই তার মৃত্যু ঘটে। অন্যরা কোনোমতে আত্মরক্ষা করে। ক'জন গুরুতরভাবে জখম হয়। ভিড়ের মাঝে গাড়িচালক ও হেলপার পালিয়ে যায়। যাত্রীদের অনেকেই গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়। মুহূর্তে আশপাশের লোকজন হিমেল ও আহতদের নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যায়। কর্মরত চিকিৎসক হিমেলের দেহ পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদের জরুরিভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা দিতে থাকে।



দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হিমেলদের কলেজের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা ছুটে আসে। হিমেলের গাইডটিচার অনিমেষ পাল হিমেলের বাবাকে কল করে হাসপাতালের দিকে আসতে বলেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আরজু আহমেদ হাসপাতালে এসে পেঁৗছলেন।



চোখের সামনে নিজের ছেলের রক্তাক্ত লাশ দেখে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। হঠাৎ হুঁশ হারিয়ে ফেলেন। উপস্থিত সবাই তাকে ঘিরে আছে। সবার চোখে জল। কিছুক্ষণ পর হুঁশ ফিরে এলে ছেলের লাশের কাছে গিয়ে বিলাপ করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, 'এ বুঝি তোমার চমক, বাবা! তোমার এমন রক্তেরঞ্জিত দেহ দেখে তো আমি চমকিত হতে চাইনিরে মানিক...।



আমি তো তোমার চমক একবারের জন্যেও বুঝতে পারিনি। উফ! যদি পারতাম...। এখন তোমার মায়ের কাছে এ সংবাদ আমি কীভাবে দেবো!



হে আল্লাহ! একি হয়ে গেলো! আমার সারাজীবনের তিলে তিলে গড়া স্বপ্ন তুমি কেনো ছিনিয়ে নিলে? পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ তুলে দেবার আগে কেনো আমার মরণ দিলে না!'



এ বলে আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।



হিমেলের কলেজের শিক্ষকরা তার বাবাকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন। অনিমেষ স্যার আর্দ্র গলায় বললেন,



_আজ আপনাকে সান্ত্বনা দেবার মতো কোনো ভাষা আমাদের জানা নেই। তবু একথা বলবো, ধৈর্য ধারণ করুন। সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করুন। তাঁর ইচ্ছের ওপর কারো হাত থাকে না।



আরজু আহমেদ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, তাই বলে আমার ছেলেকে অকালে নিয়ে যাবে! ও কি অপরাধ করেছে? ওই তো আমার বেঁচে থাকার একমাত্র স্বপ্ন ছিলো। এখন সেই স্বপ্নকে হারিয়ে আমি কি নিয়ে বাঁচবো, স্যার?



একথা বলে তিনি স্যারের বুকে মাথা রেখে সন্তান হারানোর নিদারুণ কষ্টে বিলাপ করে কাঁদতে লাগলেন।



মুহূর্তে পুরো হাসপাতাল এলাকায় যেনো শোকের ছায়া নেমে আসে।



এমন সময় পাশ থেকে একজন পথচারী ভিড়ের মধ্য থেকে এগিয়ে এসে হিমেলের বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনার ছেলের পাশে এ ব্যাগটি পেয়েছি। এ নিন।



আরজু আহমেদ ব্যাগটা হাতে নিয়ে বুকে চেপে ধরে কাঁদো গলায় বলতে থাকেন, 'আল্লাহ গো! আমার আগে কেমন করে আমার বুকের মানিককে নিয়ে গেলা!'



উপস্থিত সবাই তাকে সান্ত্বনা দিতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর পরম কৌতূহলী হয়ে ব্যাগের চেইনটা খুলতেই তার চোখে পড়ে হিমেলের ফার্স্ট ইয়ার ফাইলান পরীক্ষার রিপোর্টকার্ড। কার্ডটি হাতে নিয়ে ঝটপট পড়তে লাগলেন। হিমেল ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে। এরপর কার্ডটি দুই হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে অঝরে কাঁদতে লাগলেন। ততোক্ষণে হাসপাতালের বাইরে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। আন্দোলনকারীদের কণ্ঠে উচ্চস্বরে ধ্বনিত হতে থাকে, 'হিমেল হত্যার বিচার চাই। নিরাপদ সড়ক চাই।'



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১২২৮৩৭২
পুরোন সংখ্যা