চাঁদপুর। শনিবার ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮। ২৪ ভাদ্র ১৪২৫। ২৭ জিলহজ ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪১-সূরা হা-মীম আস্সাজদাহ,

৫৪ আয়াত, ৬ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১৩। তারা যদি বিমুখ হয় তবে বল : আমি তো তোমাদেরকে সতর্ক করেছি এক (আযাবের) বজ্রের; আ’দ ও সামূদের বজ্রের অনুরূপ।

১৪। যখন তাদের নিকট রাসূলগণ এসেছিলেন তাদের সম্মুখ ও পশ্চাৎ হতে (এবং বলেছিলেন) তোমরা আল্লাহ ব্যতীত কারো ইবাদত করো না। তখন তারা বলেছিল : আমাদের প্রতিপালকের এইরূপ ইচ্ছা হলে তিনি অবশ্যই ফেরেশতা প্রেরণ করতেন। অতএব তোমরা যেসব সহ প্রেরিত হয়েছো, আমরা তা প্রত্যাখান করছি।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন



 


সৎ উপদেশকে টাকার মূল্যে পরিমাপ করা যায় না।                             


-ইরাসমুস।


না চাওয়া সত্ত্বেও যখন তোমাকে কিছু দেওয়া হয়, তা গ্রহণ করো এবং তার প্রতিদান দিও।

 


ফটো গ্যালারি
অশ্রু ঘামের কিস্তি
আজিজুর রহমান লিপন
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


তুমুল বৃষ্টি! বৃষ্টির প্রচন্ড তায় আব্দুলের দোচালা ঘরের টিনের চালে ঝুম-ঝুম করে শব্দ হচ্ছে। বৃষ্টির ঝাঁপটার সাথে সাথে ঠান্ডা বাতাসও বইছে। হঠাৎ হঠাৎ দু-একটা দমকা বাতাস আসে, তখন পুরো ঘরটাই যেনো হেলেধুলে ওঠে। শীতল, স্নিগ্ধ-কোমল একটা পরিবেশ। আব্দুল মাথাটা উঁচিয়ে কান পেতে বাইরে যে বৃষ্টি হচ্ছে এটা নিশ্চিত হয়। আধোছেঁড়া কাঁথাটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে, জিহ্বাটা নেড়েচেড়ে ঢোক গিলে। তারপর গুঁটি-শুটি হয়ে সুখনিদ্রায় আচ্ছন্ন হতে যাচ্ছিলো। এমন সময় হালিমার হাঁকডাক শুরু হয়।



_ও...অন্তুর বাপ আর কত ঘুম যাইবা? আইজগা যে সোমবার, গেরামিন ব্যাংক আলাগো কিস্তির দিন হেই খবর কি লাট সাবের আছেনি? কী ঘুম হেতোনের! ঘুম যাইলে আর দুইন্নাইর খবর থায় না। অই উড কইলাম তাড়াতাড়ি, উড...।



আব্দুলের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে হালিমা এগিয়ে গিয়ে স্বামীর গায়ে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে,



_অই উডো, মরার মত আর কত ঘুম যাইবা!



আব্দুল কাঁথার ভেতর থেকে হাত বের করে হালিমার হাতটা চেপে ধরে।



হালিমা স্বামীর উষ্ণ হাত থেকে ঝাঁপটা মেরে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। তারপর নিজে নিজে বক্বক করতে থাকে।



_কিস্তির চিন্তায় অাঁর রাইত নাই, দিন নাই, হাপ্তায় হাঁজগা কিস্তি দেন লাগে। ব্যাডার হেই চিন্তা নাই, হেতোনের কাছে আছে শুধু ঢং। স্ত্রীর কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বেচারা আব্দুল জড়োসড়ো হয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। অন্তর নামের চার বছরের একটি পুত্র সন্তান ছিলো হালিমাদের। আদর করে হালিমা অন্তু নামে ডাকতো। কিস্তির রাক্ষুসে গ্রাস হালিমার নাড়িছেঁড়া এ ধনটাকেও গিলে নেয়।



সেদিন ভয়াবহ জ্বর আসে অন্তুর। জ্বরের চোটে থরথর করে কাঁপতে থাকে ছেলেটা। আব্দুল সাতসকালে বেরিয়ে যায় রিঙ্া নিয়ে। সারাদিন রিঙ্া চালিয়ে কিস্তির টাকার বন্দোবস্ত করে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে। ঘরে এসে অন্তুর অবস্থা দেখে অবাক হয়ে যায় আব্দুল। হন্তদন্ত হয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে অন্তুকে নিয়ে হাজির হয় তালতলার ওসমান ডাক্তারের দোকানে। বুড়ো ওসমান ডাক্তার অন্তুকে ভালো করে দেখেশুনে বিজ্ঞতার স্বরে বলেন, আব্দুল লক্ষণ তো বালা দেখতেছিনারে। তাড়াতাড়ি হস্পিটালে লই যা। নইলে কইলাম হোলাগারে বাঁচাতি হাত্তিনো।



ডাক্তারের কথা শুনে আব্দুলের মাথা ভনভন করে ঘুরতে থাকে। কী করবে, কী বলবে কিছুই বুঝতে পারে না। কাঠশুষ্ক গলায় ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে, হাসপাতালে নিলে টিঁয়া-হইসা কেরুম লাইগবো ডাক্তার কাগা?



ডাক্তার একটু ভেবে বলেন, আব্দুল তুই হোলাগারে সদরে লই যা। হিঁয়ানে টিঁয়া-হইসা হেরুম লাইগদোনো।



_কত লাইগবো কাগা?



_এহন শ'-পাঁচেক টিঁয়া লই যা। বাঁইটা হরে ব্যবস্থা করিস্।



হালিমা আব্দুলকে জিজ্ঞেস করে__তোঁর কাছে কত টিঁয়া আছে অন?



আব্দলু জানায়, সারাদিন রিঙ্া চালিয়ে সাড়ে চারশ' টাকা রোজগার হয়েছে।



হালিমা নিরাশ কণ্ঠে বলে, কাইলগা যে গেরামিনের কিস্তির দিন! অন টিঁয়া বেগ্গুন হোলার হিছে খরচ করলে কিস্তি দিয়ুম ক্যামনে?



_তুই এতো চিন্তা করিও না, যা অইবার অইবো আগে হোলা বাঁচাই।



_না অন্তুর বাপ, কিস্তি আলাগো কাছে আর বেইজ্জুতি অইতে মনে কয় না অাঁর। হোলারে আল্লায় বাঁচাইবো, তুঁই ডাক্তার কাগুর কাছেত্তন অন কোগা জ্বরের ট্যাবলেট লই বাড়ি চল্। কাইল বেয়ানে যাই চাই, বেল্লাল মামুর কাছেত্তন কিছু হাওলাত-বরাত হাইনি।



শিয়রে বসে অন্তুর মাথায় পানি ঢালতে ঢালতে নিজের অজান্তেই হালিমা ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের ঘোরে হালিমা শুনতে পায়_



_মা...ও মা কিস্তি আলারা আইছে, তুমি কিস্তি দেও আমি যাই, যাই মা...যাই!



ফজরের আজান শুনে হালিমা জেগে ওঠে। কিন্তু অন্তুর কোনো সাড়াশব্দ নেই! জ্বরের উত্তাপে সারারাত গোঁ গোঁ করেছিলো ছেলেটা। এখন একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলো। হালিমা ছেলের গায়ে হাত দিয়ে দেখে, ইটভাটার মতো উত্তপ্ত শরীরটা হিম-শীতল হয়ে গেছে!



হালিমার মেরুদ- বেয়ে শীতল কিছু যেনো নেমে যায়। হাত-পাগুলো যেনো অবশ হয়ে আসে। পাথরের মতো বসে থাকে ছেলের লাশের কাছে।



সকালের আলো পৃথিবীকে রাঙিয়ে তোলে। কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে সবাই। অকালে ঝরে গেলো একটি মুকুল, হয়তো কুঁড়িতেই হারিয়ে গেলো আরো একজন স্টিফেন হকিং অথবা নেলসন ম্যান্ডেলা। কিন্তু তাতে কি? কারো কিছু যায়-আসে না। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। ভবের এ বাজারে কেউ নেই অন্তুদের নিয়ে একদ- ভাববার জন্যে।



হাজির হয় কিস্তিওলা, আব্দুলের অশ্রু-ঘামে ভেজা টাকা নিয়ে অন্তুর লাশের ওপর দিয়ে তারা বিদায় হয়। আব্দুল বিছানা ছেড়ে দরজায় এসে দাঁড়ায়। বৃষ্টি কিছুটা কমে এসেছে। চারিদিকে আবছা অন্ধকার। আকাশে মেঘের গুরু-গর্জন। একদল হাঁস প্যাঁক-প্যাঁক করে উঠোনের কাদাজলে এখানে-সেখানে কিছু যেন খুঁজছে। উঠোনের ওপাশে বাঁশঝাড় থেকে ঘ্যাঁগর-ঘ্যাঁগর করে ব্যাঙেরা ডেকেই যাচ্ছিলো।



এমন আকর্ষণীয় একটা পরিবেশে আব্দুলের মনটা চাইছে না রিঙ্া নিয়ে বের হতে। ইচ্ছে করে এ বাদলমুখর দিনটা বউয়ের হাতের চালভাজা ও শিমের বিচি খেয়ে কাটিয়ে দিতে। কিন্তু কিছু করার নাই গতকালও টানা বৃষ্টি ছিলো। রাস্তায় তেমন যাত্রী পায়নি বেচারা। ফলে কিস্তির টাকা পুরোটা জোগাড় হয়নি এখনো।



হালিমা থালাভর্তি পান্তা এনে রাখে স্বামীর সামনে। দু জনে সিকি-আধুলী গোনেগোনে কিস্তির টাকার হিসেব কষছিলো। এমন সময় আব্দুলের টিনের চালের ফুটো গলে টুপ টুপ করে বড় দু ফোঁটা জল এসে পড়ে পান্তার থালে।



হালিমা ছেঁছিয়ে বলে, তোরে কতদিন কইছিলাম সারাটা ঘরের চাল ছেঁদা অই রইছে। দশটিঁয়ার ফুটিং বুঝি আইনতে হারো না তুই?



_ওরে হাগলি দশটিঁয়ার ফুটিং বেচে না দোঁয়ানদাররা।



রাস্তাটা একেবারে ফাঁকা। কোনো লোকজন নেই। শুধু অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। আব্দুল খালি রিঙ্াটা নিয়ে তিন রাস্তার মোড়ে মোতালেবের দোকানে পেঁৗছায়। দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে মাথার ভেজা গামছাটা চিপতে-চিপতে বলে, ওই মোতু ভাই, দুধ-চিনি বাড়াই দি ঝাকানাকা করি ওগ্গা চা বানাও তো!



_নারে ভাই, আগের টিঁয়া ন দিলে তোরে অাঁই আর চা-টা দিতাম হাইতান্ন।



_এঁক্কান করো ক্যা। তোঁর টিঁয়া কি মারি খাইয়ুমনি? এবার তোঁর টিঁয়া বেগ্গুন এত্তরে দি দিয়ুম, অন চা দো!



কিন্তু মোতালেবের এককথা আগের টাকা না দিলে আর বাকি দেয়া হবে না।



আব্দুল নিরাশ হয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আসে। পেছন থেকে মোতালেবের ডাকে আবারও ফিরে যায় আব্দুল। গুনগুন করে কিছু বলতে বলতে আব্দুলের হাতে চা দেয় মোতালেব।



চায়ে চুমুক দিয়ে চাঙ্গা একটা মুড পায় আব্দুল। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে মোতালেবকে বলে, দোঁয়ানে মাল-টাল উডাওনা কিল্লাই মোতু ভাই? হুরা দোঁয়ানতো খালি অই রইছে।



_ক্যামনে মাল উডামু ক তুই? কিস্তির টিঁয়া লই দোঁয়ানে মাল উডাই। হেই মাল বেচি কিস্তি চালাই। দোঁয়ানের মাল শেষ অই যায় কিন্তু কিস্তি শেষ অয় না। হেই কিস্তি চালানোর লাই আবার কিস্তি লই অন্য সংস্থা তোন। এভাবে কিস্তির হরে কিস্তি। তার উপরে তোরা খাস্ বাঁই। এভাবে আর কত কইত্তাম ক?



আব্দুল সস্তা দামের সিগারেট জ্বালিয়ে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, সাথে বেরোয় ধোঁয়ার কু-লী।



মোতালেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আব্দুল খালি রিঙ্া নিয়ে ছুটে কদমতলীবাজারের দিকে। যাবার পথে ত্রিশ টাকা ভাড়ায় একটা যাত্রী পেয়ে ছোটো আশার সঞ্চার হয় তার মনে।



রিঙ্ার প্যাডেল চাপে আর ভেতরে ভেতরে অঙ্ক কষে। কিস্তির টাকার জোগাড় করতে আরো তিনশ' বিশ টাকা বাকি। এখন সকাল আটটা, বেলা দুইটার মধ্যে বাকি টাকা নিয়ে দিতে হবে কিস্তিওলাদের কাছে।



জোহরের আজান হয়ে যায়, আব্দুল সেই সকাল থেকেই রিঙ্া নিয়ে ঠাঁয় বসে আছ। একটা ভাড়াও জুটলো না, কিন্তু সেটা কিস্তিওলারা মোটেও শুনবে না, পাত্তাও দেবে না। এ ভেবে তার অস্থিরতা বেড়ে যায়। এখন কি করবে? কিস্তির বাকি টাকা কীভাবে জোগাড় করবে। কোথায় পাবে এ টাকা? সকাল থেকে আকাশভাঙ্গা বৃষ্টি।



অন্যসময়ের জনবহুল কদমতলীবাজার টানা বৃষ্টির কারণে জনশূন্য। এটা ভেবে কূল পায় না, কী করবে কার কাছে যাবে।



সহকর্মী মফিজের কাছে অনুনয় করে তিনশ' টাকা ধার চায়। মফিজ প্রথমে ময়লা দাঁতগুলো বের করে অট্টহাসি হাসে। তারপর বলে_



_আরে ব্যাডা সাতশ' টিঁয়া অইলো আইজগার কিস্তি। অনও দুইশ' টিঁয়ার ছট (শর্ট)। আর তোরে টিঁয়া হাওলাত দিলে জীবনে আর হিরৎ হায়ুম যে হেই গ্যারান্টি আছেনি?



বউটার সাথে কী জানি করছে কিস্তিওলারা এ চিন্তায় বেচারা ভীষণ অস্থির হয়ে পড়ে। কাকভেজা হয়ে ছুটে যায় বেলাল মামার কাছে। কদমতলীবাজারের অনেক বড় ব্যবসায়ী বেলাল মিয়া। হালিমার দূরসম্পর্কের মামা হয়। হালিমা মাঝে-মধ্যে টাকা পয়সা ধারকর্য নেয় বেলাল মামার কাছ থেকে। বেলাল মিয়া অবশ্য হালিমাকেই ধার দেয়, আব্দুলকে কখনো দেয়নি। আর সেই ধারের টাকাগুলোও হালিমা কখনো ফেরত দিতে পারে না।



ঠিক তাই ঘটলো, বেলাল মিয়া আব্দুলকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয়। আব্দুল এভাবে জনে-জনে ছুটাছুটি ও অনুনয়-বিনয় করতে থাকে। কিন্তু বিধিবাম! প্রতিজনেই মিলছে হতাশা।



দিন গড়িয়ে বিকেল হলো। কিস্তিওলাদের কাছে কাকুতি-মিনতি করার আর কোনো ভাষা অবশিষ্ট রইলো না হালিমার কাছে। কিস্তিওলা স্যারদের সাফ কথা হয়তো কিস্তির সম্পূর্ণ টাকা দিতে হবে, নয়তো হালিমাকে অফিসে যেতে হবে। অফিসের বড় স্যার সিদ্ধান্ত দেবে হালিমার ব্যাপারে কী করা যায়। শেষ-মেশ হালিমার সব ধরনের কাকুতি-মিনতি ব্যর্থ হয়। কিস্তিওলা স্যারেরা হালিমাকে পাকড়াও করে নিয়ে যায়।



ঠিক এমন ধরনের ঘটনাগুলোই ঘটতো পুরো অষ্টাদশ শতক ও উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে। দোর্দ- প্রতাপশালী জমিদার বা সুদখোর মহাজনেরা সরলপ্রাণ বর্গাচাষীদের নামমাত্র ঋণ দিতো। শর্ত থাকতো উৎপাদিত ফসলের সিংহভাগ যাবে মহাজনের গোলায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শর্ত রক্ষা করা সম্ভব হত না। কারণ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাঠের সব ফসল তছনছ হয়ে কৃষকের মাথায় হাত পড়তো। তখন শর্তভঙ্গের সুযোগে মহাজনেরা গরিব বর্গাচাষীদের সকল সহায়সম্বল লুটে নিতো। আর যারা ছিলো একেবারেই সহায়-সম্বলহীন তাদের ভাগ্যে ঘটতো হালিমা নাটকের মঞ্চায়ন।



সে-কালে জমিদারদের পাইক-পেয়াদারা আসতো মাথায় পাগড়ী বেঁধে, হাতে লাঠি নিয়ে। তারপর কৃষাণী বা কৃষক কন্যাদের তুলে নিয়ে করা হতো বদমাশ জমিদারের পেয়ালার সরাব। অসহায় বর্গাচাষীকে করা হতো বেদম মারধর, ক্ষেত্রবিশেষে নির্বিচারে হত্যা করতো।



সময়ের সাথে সাথে জমিদারী বা মহাজনী প্রথারও আধুনিকায়ন হয়েছে। এখনকার দিনে মহাজন বলে না, বলতে হয় এনজিও। এখন আর সুদ নয়, বলে ইন্টারেস্ট, মুনাফা বা লভ্যাংশ। এ যুগের পাইক-পেয়াদারা আসে ভদ্র বেশে শার্ট-প্যান্ট পরে, কাগজ-কলম হাতে নিয়ে।



এখনকার মহাজনেরা বা এনজিওওলারা নাম দিয়েছে 'সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ঋণ'। কিন্তু শর্তভঙ্গ হলে নিয়মটা হবে কঠিন, গলায় পড়বে ফাঁস। পরিণতি হবে আব্দুল-হালিমাদের দারিদ্র্যপীড়িত অসহায় দম্পতিগুলোর মতো।



সাঝের বেলায় আবছা অাঁধার নামলে অপরাধীর মতো নতমস্তকে বাড়ি ফেরে আব্দুল। বেচারা ভেবেছিলো হালিমা হয়তো এতক্ষণে কারো কাছ থেকে ধার-দেনা করে এনে কিস্তিওলাদের ঠিকই বিদায় করে দিয়েছে। কিন্তু একি! ঘরে তালা! তাহলে হালিমা কোথায়? ছুটে যায় প্রতিবেশী খাদিজা চাচীর কাছে। তার কাছে সবিস্তারে ঘটনা শুনতে পেয়ে আব্দুল পাগলের মতো দৌড়ে যায় গ্রামীণ ব্যাংকের অফিসে। কিন্তু অফিসের কলাপসিবল গেটে ঝুলছে তালা। চারিদিকে শুনশান নীরবতা। তাহলে হালিমা? হালিমা কই?



আব্দুল, হালিমা...হালিমা... বলে কলাপসিবল গেট ঝাঁকাতে শুরু করে। গেটের ঝনঝন শব্দ শুনে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে পালোয়ানের গোঁফওয়ালা দারোয়ান। কর্কশ কণ্ঠে বলে, এ্যাই ব্যাডা দেখোস না অফিস বন্ধ, গেট ধাক্কাস্ কিল্লাই?



আব্দুল উদ্বেগ-অস্থিরতায় কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে বলে, হালিমা, হালিমা অাঁর ইছতিরি, অাঁর ইছতিরি হালিমা কই... কই...।



_ইঁয়ানে কোনো হালিমা-টালিমা নাই, যা ভাগ।



আব্দুল তবুও গেট ঝাঁকিয়ে হালিমাকে ডাকতে থাকে। হালিমা... ও...হালিমা। হালিমা অাঁই আইছি কই তুঁই হালিমা...।



এ পর্যায়ে দারোয়ান তালা খুলে বাইরে এসে কষিয়ে আব্দুলের গালে চড় মারে। চড়ের তোড় সামলাতে না ফেরে আব্দুল ছিঁটকে পড়ে মাটিতে।



দারোয়ান ভেতরে ঢুকে তালা লাগিয়ে বলে, আর একবার যদি গেটে হাত দেস্, তাইলে ডাকাতির মামলা দি এক্কারি চোইদ্দ শিকের খাঁচার বিতরে ভরি দিয়ুম, হারোমজাদা কোনাইগার! হতভাগা আব্দুল মাটিতে গড়ায় আর হালিমা হালিমা বলে কাঁদতে থাকে।



ভোর রাতে বৃদ্ধা খাদিজা চাচী হারিকেন হাতে লাঠি ভর দিয়ে টলতে-টলতে পুকুর ঘাটে আসে ফজরের নামাজের অযু করার জন্যে। বেখেয়ালে আম গাছটার দিকে নজর যায় চাচীর। লম্বা মতন কেউ যেনো দাঁড়িয়ে আছে গাছটার নিচে। খাদিজা চাচী ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। জ্বীনটিন নয়তো? ফরহেজগার খাদিজা বেগম হারিকেনটা কপালের কাছে তুলে বড় খতমের দোয়া পড়ে আর পা টিপে টিপে এগিয়ে যায়। নিকটে গিয়ে আব্দুলকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। হাতের লাঠিটা দিয়ে গুঁতা মেরে বলে, ওই আব্দুইল্যা হারোমজাদা তুই ইঁয়ানে কিয়ারোস্, খাড়াই রইসোত কিল্লাই? কিন্তু একি! নিঃশ্চুপ আব্দুল সুতোয় বাঁধা ঝুলন্ত লাটিমের মতো এদিক-ওদিক ঝুলছে কেনো? খাদিজা বেগম অবাক হয়ে, হারিকেনের আলো দিয়ে আগায়গোড়ায় ভালো করে দেখে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে উঠে, ওরে বেগ্গুন বার অই আয়রে... ওরে আব্দুইল্যা শেষ রে...। ওরে কইরে তোরা বার অই আয়রে...।



লোকজন জড় হয়ে আবিষ্কার করে কিস্তিযুদ্ধে পরাজিত হতভাগা আব্দুলের ঝুলন্ত লাশ।



গতিপথ বদলায়, তবু থেমে যায়না নদীর প্রবাহমান স্রোতধারা। কিস্তিনামক দানব-দেবের বিষাক্ত আগ্রাসী নিঃশ্বাস ল--ভ- করে দেয় হালিমাকে। একের পর এক প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছ্বাসে হালিমা হয় নিঃস্ব, অসহায়। তবুও থেমে যায় না কিস্তির যন্ত্রণাদগ্ধ থাবা। স্বামী-সন্তানকে গ্রাস করেও তৃপ্ত হয়নি কিস্তিদানব। আজও মুক্তি দেয়নি হালিমাকে। এবারে হালিমাকেই জোগাতে হয় কিস্তিদানবের বিশাল মুখের গ্রাস। অন্যথায় জুটবে বিষাক্ত ছোঁবল।



বেলাল মামার কাছে যেতে আর মন চাইছে না হালিমার। গেলে টাকা দেয়, কখনো ফেরৎ চায় না। কিন্তু অন্য কিছু যেনো চায়, অন্য কোনো ইঙ্গিত যেনো করে। হালিমা এমনটা আশা করতে পারে না পঞ্চাশোর্ধ বেলাল মামার কাছ থেকে। কিন্তু তবুও কিস্তিদানবের ধাওয়া খেয়ে হালিমা যেতে বাধ্য হয় বেলাল মামার কাছেই।



বেলাল মিয়া হালিমাকে নিয়ে যায় আড়তের পেছনে ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরটিতে। বেলাল মিয়ার মুখের জর্দ্দা-পানের গন্ধে হালিমার দুনিয়াদারী ঘুরতে থাকে। আর কানে বাজতে থাকে স্বামীর আর্তনাদ, 'তুঁই কই? অাঁই আইছি হালিমা।'



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৬০১৮
পুরোন সংখ্যা