চাঁদপুর, শুক্রবার ৫ মার্চ ২০২১, ২০ ফাল্গুন ১৪২৭, ২০ রজব ১৪৪২
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
মি'রাজে রাসূল (সাঃ)-এর কতিপয় দর্শন
মুফতী মুহাঃ আবু বকর বিন ফারুক
০৫ মার্চ, ২০২১ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


মি'রাজের অর্থ



মি'রাজ শব্দটি আরবি। যার অর্থ হলো ঊধর্ব উঠার সিঁড়ি বা বাহন। ইসলামী পরিভাষায় ইসলামের নবী, নবীকুল সর্দার নিখিল বিশ্বের রহমত মুক্তির দূত সৃষ্টিকুলের মূল সরওয়ারে কায়েনাত হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর একই রাতে পবিত্র মক্কা নগরী হতে বায়তুল মুকাদ্দাসে উপনীত হয়ে সেখান হতে সপ্তাকাশ অতিক্রমকরত মহান আল্লাহর সাক্ষাতে হাজির হওয়ার ঐতিহাসিক অনন্য সাধারণ ঘটনাকে মি'রাজ নামে অভিহিত করা হয়। এ বিস্ময়কর ঘটনা সম্পর্কে বিশ্ববাসী ওয়াকেফহাল। যে রাতে এ ঘটনা সংঘটিত হয় ওই রাত বিশ্বের মুসলিম সমাজে "লাইলাতুল মি'রাজ" বা শবে মিরাজ নামে সুপরিচিত। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ মি'রাজ তিনি স্বশরীরে সম্পন্ন করেছেন। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, মহান সেই সত্তা যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের একাংশে মসজিদে হারাম হতে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন, যার চর্তুদিকে আমি বরকত ও কল্যাণময় করে দিয়েছি, যাতে আমি তাকে আমার অসীম কুদরতের নিদর্শনাবলি দেখিয়ে দেই। নিশ্চয় তিনি (আল্লাহ) সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (সূরা বনী ইসরাঈল-১)



 



মি'রাজের সময়



বুখারী শরীফের অন্যতম ভাষ্যকার আল্লামা আইনী (রহঃ) বলেছেন, এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মতানৈক্য দেখা যায়। কারো মতে হিজরতের এক বছর পূর্বে, কারো মতে হিজরতের ষোল মাস পূর্বে, কারো মতে সতের মাস পূর্বে, কারো মতে নবুয়্যতের ৫ম সালে হিজরত সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু জমহুর ওলামায়ে কেরামের মতে, নবুয়্যতের দ্বাদশ সালে ২৭ রজব স্বশরীরে জাগ্রত অবস্থায় রাতের একাংশে তাঁর মিরাজ সংঘটিত হয়। বিশ্বের মুসলিম সমাজের সর্বত্র এমতই সমধিক সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত।



 



মিরাজ একবার না একাধিক বার



প্রায় ত্রিশজন সাহাবী হতে মি'রাজের বর্ণনা সাব্যস্ত। তাদের সকলের সম্মিলিত মতানুযায়ী প্রিয় নবী (সাঃ)-এর মি'রাজ বা ইসরা তাঁর নবুয়তলাভের পর এবং হিজরতের পূর্বে মক্কায় সংঘটিত হয়েছে-ইহাতে সন্দেহ নেই।



শায়খ আব্দুল ওহাব শেরানী বলেন, ইসরা বা মি'রাজ মোট চৌত্রিশ বার হয়েছে। তন্মধ্যে জাগ্রত অবস্থায় দৈহিক মিরাজ সংঘটিত হয়েছে একবার, বাকিগুলো হয়েছে রূহানী তথা স্বাপি্নকভাবে।



 



মধু, দুধ ও শরাবের পেয়ালা দর্শন



হযরত রাসূল করীম (সাঃ) বললেন, আমি যখন বাইতুল মুকাদ্দাসে পেঁৗছে আম্বিয়ায়ে কেরামের সাথে দু'রাকাত নামাজ আদায় করলাম তখন আমি দারুণভাবে পিপাসার্ত হলাম। এহেন সময় আমার নিকট দুটি পেয়ালা আনা হলো যার একটিতে দুধ এবং অপরটিতে মধু ছিলো। আমি দুধের পেয়ালা হাতে নিয়ে উহা পান করলাম ঐ সময় আমার সামনে একজন বৃদ্ধলোক মিম্বরে উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে লক্ষ্য করে বললেন, আপনার সাথী ফিৎরত তথা ইসলামী স্বভার গ্রহণ করেছেন, অতঃপর আমি সেখান হতে বের হয়ে আসলাম তখন হযরত জিব্রাঈল (আঃ) আমার নিকট একটি শরাবের পেয়ালা ও একটি দুধের পেয়ালা নিয়ে আসলেন আমি উহা হতে ফিৎরত অর্থাৎ দুধের পেয়ালা গ্রহণ করলাম। হযরত জিব্রাঈল (আঃ) বললেন, আপনি ইসলামী ফিৎরত গ্রহণ করেছেন অর্থাৎ এমন এক সুদৃঢ় সৃষ্টি কৌশল যার মূল কারণ হলো ইসলাম অর্থাৎ আপনি ইসলাম স্বভাবের এ অর্থেই হাদীছ বর্ণিত হয়েছে প্রত্যেক সন্তান ফিৎরত তথা ইসলাম স্বভাব ও চরিত্র লাভের ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়ে জন্ম গ্রহণ করে থাকে দুধ গ্রহণ করা এ সত্যেরই বহিঃপ্রকাশ।



ইনসানুল উয়ূন কিতাবের লেখক বলেন, আমি বলব উল্লেখিত বর্ণনার বিষয়টি বাইতুল মুকাদ্দাসের অভ্যন্তরে এবং উহার বাইরে উভয় জায়গায় সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। এতে বুঝা যায় যে, দুধ ও শরাবের পেয়ালা। মহানবী (সাঃ)-এর খেদমতে দু'বার পেশ করা হয়েছিল। একবার বাইতুল মুকাদ্দাসের ভিতরে এবং দ্বিতীয়বার উহার বাইরে। তাই বাইতুল মুকাদ্দাস হতে বের হওয়ার পূর্বে একবার এবং বাইতুল মুকাদ্দাস হতে বের হয়ে উর্ধ্বগমনের পূর্বে দ্বিতীয়বার। উভয় প্রকার পানীয় তার খেদমতে উপস্থাপনে কোন প্রকার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকতে পারে না।



 



মি'রাজ রাতে অভিশপ্ত শয়তানের কারসাজী



আল্লামা কুরতবী (রহঃ) সূরা নহলের তাফসীর করতে গিয়ে এক পর্যায়ে বর্ণনা করেন, মি'রাজ রাতে একটি খবীস জি্বন একটি অগি্নশিখা নিয়ে হযরত রাসূল পাক (সাঃ) এর অনুস্মরণ করে। এতে তিনি একটু ভীত হলেন। তখন হযরত জিব্রাঈল (আঃ) তাকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কি আপনাকে এমনি কতগুলো কলেমা শিক্ষা দিব না যেগুলো আপনি পাঠ করলে ঐ খবীসের অগি্নশিখা নির্বাপিত হয়ে যাবে। তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, আপনি বলুন, আউজু বিওয়াজ-হিল্লাহিলকারীম ওয়া। বিকালিমাতিল্লাহিত্তাম্মাতিল্লাতী লা-ইউজাবিজুহুন্না বাররুন ওয়ালা ফাজিরুন মিন শারে মা ইয়ানযিলু মিনাছ ছামায়ে ওয়ামিন শারে মাইয়া'রুজু ফীহা। ওয়ামিন ফিতানিল্লাইলি ওয়ান্নাহারি ওয়া তাওয়ারিকিল লাইলি ওয়ান্নাহারে ইল্লা তারিকান ইয়াতরুকু বিখাইরিন ইয়া আরহামার রাহিমীন।



অর্থাৎ-আমি মহান আল্লাহ পাকের আলীশান দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং তার পবিত্র ও পরিপূর্ণ বাণীগুলোর মাধ্যমে তাঁর নিকট সাহায্য চাচ্ছি যেগুলোর অতিক্রম কোন নেককার বা কোন বদকার ব্যক্তি করতে পারে ন। আশ্রয় চাচ্ছি ঐ সব অনিষ্ট ও অশুভ বস্তু হতে যা আসমান হতে অবতীর্ণ হয় এবং যে সব অনিষ্ট ও আফত যমীন হতে আসমানের দিকে উথিত হয়। আরো আশ্রয় চাচ্ছি দিবারাতের আগমনকারীদের থেকে। তবে ঐ সব আগমনকারীর কথা স্বতন্ত্র। যারা কল্যাণ ও সুসংবাদ নিয়ে আগমন করে-ইয়া আরহামার রাহিমীন।



হুযূর (সাঃ) ঐ দোয়া পাঠ করতে লাগলেন। (তাতে ঐ খবীস শয়তানের ষড়যন্ত্র নিমিষে বিলীন হয়ে যায়।)



 



মি'রাজের পথে যানবাহনের সংখ্যা



আল্লামা আলাঈ (রহঃ) স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মি'রাজ রাতে মহানবী (সাঃ) এর যানবাহন ছিল পাঁচটি। প্রথম যানবাহন ছিল বুরাক যার উপর আরোহণ করে তিনি বাইতুল্লাহ শরীফ হতে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সফর করেন। দ্বিতীয় যানবাহন ছিল মি'রাজ যার মাধ্যমে তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস হতে প্রথম আসমান পর্যন্ত উর্ধ্বগমন করেন। তৃতীয় যানবাহন ছিল ফেরেস্তাদের পাখা যার উপর আরোহণ করে তিনি প্রথম আসমান হতে চতুর্থ আসমান পর্যন্ত সফর করেন। চতুর্থ যানবাহন ছিল হযরত জিব্রাঈল (আঃ)-এর পাখা যার মাধ্যমে তিনি তথা হতে সিদরাতুল মুন্তাহা পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। পঞ্চম যানবাহন ছিল রফরফ যার বদৌলতে তথা হতে তিনি আরশে আজীম তথা মহান আল্লাহর সানি্নধ্যে উপস্থিত হন। সম্ভবতঃ যানবাহনের মাধ্যমে তাঁর মি'রাজ সফর মূলতঃ তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্যই নির্ধারণ করা হয়েছিল। নচেৎ মহান আল্লাহর ক্ষমতা আছে যে, যে কোন সময় ইচ্ছা করলেই মুহূর্তের মধ্যে তাঁকে তাঁর পরম সানি্নধ্যে পেঁৗছায়ে দিতে পারেন।



কারো মতে, বুরাক যোগে তার সফর ছিল কেবল বায়তুল্লাহ শরীফ হতে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত আর তথা হতে আল্লাহ পাকের ইচ্ছার জায়গা পর্যন্ত ছিল মি'রাজ সফর। তাঁর এ মি'রাজ তথা উর্ধ্বগমনের সিঁড়ি তথা স্তর ছিল ১০ টি। সাতটি স্তর হলো বাইতুল মুকাদ্দাস হতে ৭ ম আসমান পর্যন্ত, ৮ ম স্তর বা পর্যায় হলো ৭ ম আসমান হতে সিদরাতুল মুন্তাহা পর্যন্ত, ৯ ম স্তর হলো সিদরাতুল মুন্তাহা হতে ঐ সমান্তরাল স্থান পর্যন্ত যেখানে পেঁৗছে তিনি কলমের শব্দ শনতে পেয়েছেন। আর ১০ ম স্তর হলো তথা হতে আরশে আজীম পর্যন্ত আল্লাহ পাকই সবচাইতে বেশি জানেন।



মোট কথা, বিভিন্ন প্রকার যানবাহনের মাধ্যমে নিখিল বিশ্বের বিভিন্ন স্তরে তার মহা পরিভ্রমণ ছিল এক মহা বিস্ময়কর ঘটনা। ধূলির ধরা মর্ত্যজগৎ হতে আরম্ভ হয়ে সপ্তাকাশ, আলমে মালাকুত, আলমে জাবারূত, আলমে লাহুত, আরশ, কুরসী, লৌহ-কলম, বেহেশত, দোযখ প্রভৃতি জগৎগুলোতে কি আছে, কি ঘটছে ইত্যাদি বিষয়গুলো তিনি স্বচক্ষে দর্শন করার সুযোগ পেয়েছেন। মুহূর্তের মধ্যে এসব জগৎ অতিক্রম করে মহান আল্লাহর সানি্নধ্যে পেঁৗছলে সে সব বিষয়ের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা লাভ হতে তিনি বঞ্চিত হতেন। তাই, বাহন যোগে তার মি'রাজ সফর তার সর্বোচ্চ মর্যাদাবান ও শ্রেষ্ঠজ্ঞানী হওয়ারই প্রকৃষ্ট প্রমাণ। এটা আল্লাহ পাকেরই মহা অনুগ্রহ যা তিনি যাকে ইচ্ছে দান করেন।



এ সম্পর্কে আল্লামা সালাবীর মন্তব্য প্রণিধান যোগ্য।



বুরাকের অবস্থা এই যে, যখনই উহা কোন সুবিশাল প্রান্তরে উপনীত হয় তখনই তার হস্তদ্বয় লম্বা হয়ে যায় এবং উভয় পা খাট হয়ে যায়। আর যখন কোন গিরিপথ বা বন্ধুর পথে উপনীত হয় তখন তার পদদ্বয় লম্বা হয়ে যায় এবং হস্তদ্বয় খাট হয়ে যায়। এটাই উহার অতিক্রমের স্বাভাবিক অবস্থা। বস্তুত মি'রাজ সফরের দূরত্ব ছিল সুদীর্ঘ।



আকায়েকুল হাকায়েক কিতাবে আছে, মক্কা শরীফ এবং ঐ জায়গা যেখানে মহান আল্লাহ তাঁর নবী (সাঃ) এর প্রতি অহী অবতীর্ণ করেন এ উভয় জায়গার মধ্যে দূরত্বের পরিমাণ হলো ত্রিশ কোটি বছরের দূরত্ব। সুবহানাল্লাহ! কারো মতে, পঞ্চাশ হাজার বছরের দূরত্ব ছিল। কেহ কেহ ভিন্ন সংখ্যার কথা উল্লেখ করেছেন।



উল্লেখ্য যে, লুময়াৎ শরহে মেশকাত কিতাবে আছে, মক্কা শরীফ হতে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত তিনি বুরাকের েিপাই সমাসীন ছিলেন, পথিমধ্যে তিনি কোথাও বুরাকের পৃষ্ঠ হতে অবতরণ করেননি। এমনকি বুরাক তাকে প্রথম আসমান পর্যন্ত পেঁৗছিয়ে দিয়েছিল। কেহ কেহ বলেন, যখন তিনি আসমানের দিকে আরোহণ করার ইচ্ছা করেন তখন সিঁড়ি আনা হয়। উক্ত সিঁড়িতে আরোহণ করে তিনি প্রথম আসমানে পেঁৗছেন।



অন্য বর্ণনায় আছে, বায়তুল মুকাদ্দাস হতে হযরত জিব্রাঈল (আঃ) তাঁকে আপন ডানায় করে প্রথম আসমানে উথিত হন। বুখারী শরীফে আছে, জিব্রাঈল (আঃ) তাকে নিয়ে প্রথম আসমানে পেঁৗছেন। এ সম্পর্কে আল্লামা আলাঈ (রহঃ) আকায়েকুল হাকায়েক কিতাবে উল্লেখ করেন। যখন তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে পেঁৗছলেন তখন তিনি মিল্লাতে ইব্রাহীমীর নিয়মানুযায়ী উপস্থিত আম্বিয়ায়ে কেরামকে নিয়ে দু'রাকয়াত নামাজ আদায় করেন। প্রথম রাকয়াতে সূরা কাফেরুন এবং দ্বিতীয় রাকয়াতে সূরা এখলাস পাঠ করে আদায় করেন। অতঃপর জিব্রাঈল (আঃ) তাঁর মুবারক হাত ধারণ করে সখরায়ে বায়তুল মুকাদ্দাসের নিকট নিয়ে এলেন এবং ইসমাঈল ফেরেশতাকে আহবান করে বললেন হে ইসমাঈল! মি'রাজ তথা সিঁড়ি লটকিয়ে দাও। তখন ইসমাঈল ফেরেশতা জান্নাতুল ফেরদাউস হতে সিঁড়ি নিয়ে আসেন।



 



আসমানে আরোহণে সিড়ির বর্ণনা



রাসূল পাক (সাঃ) বলেন, সখরা হতে আমরা আসমানের দিকে উঠতে আরম্ভ করলাম। আর এ পথেই আদম সন্তানের রূহ আকাশে উঠান হয়। আরোহণের জন্য যে সিঁড়ি, উহাতে স্বর্ণ রৌপ্যের বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। এসব প্রকারের সর্বমোট সংখ্যা ১০ টি। প্রত্যেক প্রকারের এক একটি মি'রাজ বলা হয়।



প্রথম ৭ টি মি'রাজ দিয়ে তিনি সপ্তাকাশ অতিক্রম করেন। ৮ ম মি'রাজ দিয়ে তিনি সিদরাতুল মুন্তাহায় পেঁৗছেন, ৯ ম মি'রাজ নিয়ে তিনি বিশাল সমান্ত রাল প্রান্তরে উপনীত হন এবং ১০ ম মি'রাজ যোগে তিনি আরশে আজীমে পেঁৗছেন। প্রত্যেকটি মি'রাজ তথা সিঁড়ি এতই সুন্দর যার চাইতে অধিক সুন্দর বস্তু কেহ কোন সময় দেখেনি।



বর্ণিত আছে যে, এ মি'রাজ বা সিঁড়ি জান্নাতুল ফেরদাউস হতে আনয়ন করা হয় এবং যা মুক্তা খচিত, উভয় পাশে অসংখ্য ফেরেশতা মোতায়েন হয়েছেন। এমনি এক মহা সুন্দর পরিবেশে তিনি এবং জিব্রাঈল (আঃ) উর্ধ্বজগতের দিকে আরোহণ করেন। সুবহানাল্লাহ!



নুযহাতুল মাজালিস কিতাবে আকায়েকুল হাকায়েক কিতাব হতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, হযরত জিব্রাঈল (আঃ) মহানবী (সাঃ) এর হস্ত মুবারক ধারণ করে তাঁকে সখরার প্রান্তে নিয়ে ইসমাঈল ফেরেশতাকে ডাক দিতে গিয়ে বললেন, হে ইসমাঈল! মি'রাজ (সিঁড়ি) নিয়ে এস। এতশ্রবণে ইসমাঈল ফেরেশতা জান্নাতুল ফেরদাউস হতে মি'রাজ নিয়ে আসলেন। যার একাংশ লাল ইয়াকুত পাথরের নির্মিত, আরেক অংশ সবুজ যবরজদ পাথর দ্বারা নির্মিত এবং মুক্তার দ্বারা খচিত। উহার মস্তক প্রথম আসমানের সাথে সংযুক্ত। উহার ১০০ টি ধাপ আছে। প্রত্যেকটি ধাপ স্বর্ণ, রৌপ্য, যবরজদ, ইয়াকুত, মেশক ও আম্বর দ্বারা নির্মিত।



 



বেহেশতের আওয়াজ শ্রবণ



হযরত রাসূল করীম (সাঃ) বলেন, অতঃপর আমরা একটি বাড়ীর পাশ নিয়ে অতিক্রম করতে ছিলাম। তখন আমরা শ্রুতি মধুর আওয়াজের সাথে এক প্রকার মনঃমুগ্ধকর সমীরণ অনুভব করলাম। আমি জিব্রাঈল আমীনকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দিলেন যে, এটা বেহেশতের আওয়াজ। সে একথাই বলছে, হে রব! আমার সাথে যা ওয়াদা করেছেন তা আমাকে দান করুন। যেহেতু আমার মধ্যে প্রাসাদ অট্টালিকা, রেশমী পোশাক, স্বর্ণ-রৌপ্য, মনি-মুক্তা, রেকাবী-পেয়ালা, ফল-ফলাদি, দুগ্ধ-মধু ও শরাব ও পানি অনেক বেশি হয়ে গেছে। অতএব, আপনি আমার সাথে যা ওয়াদা করেছেন পূরণ করুন। আল্লাহ পাক বললেন, তোমার জন্য রয়েছে সকল মুমিন মুসলমান নর-নারী এবং ঐ সব বান্দা যারা আমার সাথে কাওকে শরীক করেনা। নিশ্চয়ই আমি মহান আল্লাহ ব্যতীত আর কোন উপাস্য নেই। আমি অবশ্যই আমার অঙ্গীকার ভংগ করিনা। এতশ্রবণে বেহেশত বলল, ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার কথায় সন্তুষ্ট হয়েছি। (অর্থাৎ আমার মধ্যে অসংখ্য মুসলমান নর-নারী বসবাস করবে এবং অফুরন্ত নিয়ামত ভোগ করবে এতে আমি খুবই পুলকিত। আলহামদুলিল্লাহ)।



 



দোযখের দরখাস্ত শ্রবণ



অতঃপর আমরা এক ময়দানের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম শুনতে পেলাম এক অপছন্দনীয় শব্দ। আমি জিজ্ঞেস করলাম এ শব্দ কিসের? জিব্রাঈল আমীন উত্তর দিলেন, এটা দোযখের শব্দ। দোযখ বলছে, হে রব! আপনি যে ওয়াদা আমার সাথে করেছেন তা পূরণ করুন। কেননা, আমার মধ্যে লোহার শিকল ও ' বেড়ী খুব বেশি হয়ে গেছে এবং আগুনের তাপমাত্রা অত্যধিক কঠিন হয়ে গেছে। মহান আল্লাহ বললেন, তোমার জন্য রয়েছে অংশীবাদী পুরুষ ও মহিলা এবং ঐ সব বান্দা যারা পরকালের হিসাব নিকাশে বিশ্বাস স্থাপন করে না। এতদশ্রবণে দোযখ বলল, আমি আপনার কথায় সন্তুষ্ট ও রাজি হলাম।



 



দোযখ দর্শন ও দোযখের ফেরেশতা দর্শন



শরীফে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, হযরত রাসূল (সাঃ) বলেন, অতঃপর আমাকে বেহেশতে উঠান হলো। তথায় জনৈকা মহিলা আমাকে অভ্যর্থনা জানাল। আমি জিজ্ঞেস করলাম তুমি কে? সে উত্তর দিল, আমি যায়দ বিন হারেসার নিয়ন্ত্রণে। হুযূর (সাঃ) বলেন, আমি দেখলাম বেহেশতের আনার ফলগুলো বালতির ন্যায় বড় বড়।



অতঃপর আমার নিকট দোযখ পেশ করা হয়। হঠাৎ দেখতে পেলাম সেখানে রয়েছে আল্লাহ পাকের ক্রোধাগি্ন, ধমক তিরস্কার ও প্রতিশোধ শাস্তি। যদি উহার মধ্যে লোহা ও পাথর নিক্ষেপ করা হয় তাহলে দোযখ উহাদেরকে খেয়ে ফেলবে। অতঃপর আমার সামনে দোযখের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো।



হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল হুজায়ফা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, উভয়ের জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেয়া হলো। হুযূর (সাঃ) বলেন, আমি তখন বেহেশত ও দোযখ দেখতে পেলাম অন্য একটি বর্ণনায় আছে, হুযূর (সাঃ) দোযখের রক্ষী মালেক ফেরেশতাকে দেখতে পান, তাঁর চেহারা বিবর্ণ-মলিন, উহাতে ক্রোধের চিহ্ন বুঝা যাচ্ছিল। তখন নবী করীম (সাঃ) প্রথমে তাকে সালাম জানালেন। অতঃপর তাঁর সামনে দোযখের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। একথাও বর্ণিত আছে যে, তিনি জিব্রাঈল আমীনকে বললেন, আমার কি হলো যে, আমি আসমানবাসীদের মধ্যে যাদের সাথেই সাক্ষাৎ করেছি তাঁরা সকলেই আমাকে হাসি মুখে খোশ আমদেদ জানিয়েছেন, কিন্তু একজনের কথা স্বতন্ত্র (মালেক ফেরেশতা)। আমি তাকে সালাম দিয়েছি। তিনি আমার সালামের জওয়াব দিয়েছেন এবং খোশ আমদ জানিয়ে আমার জন্য দোয়া করেছেন, কিন্তু তিনি হাসলেন না। (এর কারণ আমার বোধগম্য হলো না)। এতদশ্রবণে জিব্রাঈল আমীন বললেন, তিনি হলেন দোযখের দ্বার রক্ষী মালেক ফেরেশতা। সৃষ্টি লগ্ন হতে আজ পর্যন্ত কোন সময় তিনি হাসেননি। যদি কারো সাথে তার হাস্য করার কথা থাকত তাহলে সে ব্যক্তি আপনিই হতেন। মাওয়াহেব ৩/৮২, সীরাতে হলবিয়া ২/৪৪৯ পৃঃ



 



সুদখোরের শাস্তি দর্শন



মহানবী (সাঃ)-এর মি'রাজ সফরের আরেক পর্যায়ে তাঁর সামনে সুদখোরের অবস্থা উন্মোচিত করা হলো। সুদখোরের অবস্থা বলতে তার পারলৌকিক অবর্ণনীয় শাস্তির কথা বুঝান হয়েছে। তিনি সেখানে এমন এক পুরুষকে দেখতে পান, যে রক্তের নদীতে সাঁতার কাটতেছে এবং পাথরের টুকরা গলধঃকরণ করছে। তিনি জিব্রাঈল আমীনকে জিজ্ঞেস করলেন, এ লোক কে? তিনি উত্তর নিলেন, এ লোক হলো সুদখোর।



 



গীবতকারীর শাস্তি দর্শন



হযরত রাসূল মকবুল (সাঃ)-এর সামনে পরনিন্দুকের অবস্থা উন্মোচিত করা হলো। তিনি এমন একদল লোকের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলেন, যাদের নখগুলো তামার, যেগুলো দ্বারা তাদের মুখম-ল ও বক্ষস্থল ক্ষতবিক্ষত করছে। এ দেখে তিনি জিব্রাঈল আমীনকে জিজ্ঞেস করলেন, এসব লোক কারা? তিনি উত্তর দিলেন, এরা হলো ঐ সব লোক যারা গীবত করে মানুষের গোশত ভক্ষণ করতো এবং মান ইজ্জতের হানি ঘটাত। নাউজুবিল্লাহ!



অতঃপর তিনি ধীরে সম্মুখ পানে অগ্রসর হলেন, হঠাৎ তিনি এমন একদল লোককে দেখতে পান যারা নিজেদের পার্শ্বদেশ থেকে গোশত কাটতেছে এবং তা গলধঃকরণ করছে। আর তাদেরকে বলা হচ্ছে, তোমরা এভাবে তোমাদের গোশত ভক্ষণ কর, যেমন তোমরা দুনিয়াতে পরনিন্দা করে নিজেদের ভাইদের গোশত ভক্ষণ করেছ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিব্রাঈল! এসব লোক কারা? তিনি বললেন, এরা হলো এসব লোক যারা দুনিয়াতে পরনিন্দা করে নিজেদের ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করত।



 



ব্যভিচারীর শাস্তি দর্শন



রাসূল পাক (সাঃ) বলেন, অতঃপর আমরা ভ্রমণের আরেক পর্যায়ে এমন একদল লোকের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলাম যাদের সামনে সুস্বাদু গোশত এবং দুর্গন্ধময় গোশত উভয় প্রকারের গোশত রয়েছে। তারা সুস্বাদু গোশত ত্যাগ করে দুর্গন্ধময় গোশত ভক্ষণ করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম হে জিব্রাঈল! এসব লোক কারা? তিনি বললেন, এরা হলো ব্যভিচারী। শায়খ তকিউদ্দীন হেসনী কৃত তামবীহ ' কিতাবে হযরত আবু জর গেফারী (রাঃ) হতে একটি হাদীছ বর্ণিত আছে, শিরকের পর সবচাইতে বড় যে গুনাহ নিয়ে বান্দা আল্লাহ পাকের সাথে সাক্ষাৎ করবে তাহলো হারাম জরায়ুতে তার বীর্যপাত করা তথা বেগানা মহিলার সাথে ব্যভিচার করা।



হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, বিবাহিত মহিলার সাথে ব্যভিচার করা আল্লাহপাকের নিকট ৭০টি কবীরা গুনাহের চাইতেও বড় অপরাধ। যে ব্যক্তি কোন বিবাহিতা মহিলার সাথে ব্যভিচার করলো তাঁর প্রতি কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ পাক তার ফেরেশতম-লী এবং সমস্ত মানুষের লানত নিপতিত হতে থাকবে।



হযরত রাসূল মকবুল (সাঃ) বললেন, অতঃপর আমি এমন কতিপয় পুরুষ দেখতে পেলাম যাদের সামনে সুস্বাদু উত্তম শ্রেণীর গোশত রয়েছে এবং তাদের পাশে রয়েছে খারাপ দুর্গন্ধময় গোশত। কিন্তু তারা সুস্বাদু গোশত ত্যাগ করে পার্শ্বস্থ খারাপ দুর্গন্ধযুক্ত গোশত খাচ্ছে। তিনি বললেন, এ দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিব্রাঈল! এসব লোক কারা? তিনি বললেন, এসব লোক হলো তারা যারা দুনিয়াতে আল্লাহ পাকের বৈধ ঘোষিত নারীদের তরক করে অবৈধ বেগানা মহিলাদের সাথে কামভাব চরিতার্থ করতো।



 



ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎকারীর শাস্তি দর্শন



হযরত রাসূল পাক (সাঃ) সামনে এগিয়ে এমন একদল পুরুষ দেখতে পান। যাদের ওষ্ঠগুলো উটের ওষ্ঠের ন্যায়। আর তাদের হাতে রয়েছে পাথরের টুকরার ন্যায় আগুনের টুকরা যা তারা নিজেদের মুখের মধ্যে নিক্ষেপ করছে এবং তা মুখ হতে মলদ্বার দিয়ে বের হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিব্রাঈল! এসব লোক কারা? তিনি জবাব দিলেন, এরা দুনিয়াতে ইয়াতীমের সম্পদ অবিচার করে ভক্ষণ করত।



 



বে-নামাজীর অবস্থা দর্শন



হযরত রাসূল পাক (সাঃ) বলেন, অতঃপর আমরা এমন একদল লোকের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলাম যাদের মাথা পাথর দ্বারা দীর্ণ-বিদীর্ণ করে দেয়া হচ্ছে। যখনই পাথর দ্বারা তাদের মস্তক গুড়ি গুড়ি করে দেয়া হয় পরক্ষণেই তাদের মাথা পূর্বাবস্থায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিব্রাঈল! এসব লোক কারা? তিনি উত্তর দিলেন, এসব হলো ঐ সব লোক যাদের মাথা স্বেচ্ছায় নামাজ সম্পাদনে অলসতা ও বিলম্বতা প্রদর্শন করত অর্থাৎ তাঁরা নামাজে অলস ছিল।



যাকাত অনাদায়কারীর শাস্তি দর্শন : নবী করীম (সাঃ) বলেন, অতঃপর আমরা এমন একদল লোকের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলাম যাদের নিতম্ব ও নাভীর নিম্নভাগের উপর কাপড়ের টুকরা। লটকায়ে দেয়া হয়েছে (পরিচিতির উদ্দেশ্যে)। তারা যাক্কুম বৃক্ষের ফল ভক্ষণের জন্য এমনিভাবে ধাবিত হচ্ছে যেমনিভাবে চতুষ্পদ জন্তু ক্ষুধার জ্বালায় দরী (এক প্রকার কণ্টকযুক্ত বৃক্ষের পাতা) ভক্ষণের জন্য ধাবিত হতে থাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিব্রাঈল! এসব লোক কারা? তিনি বললেন, এরা হলো ঐ সব লোক যারা যাকাত আদায় করতনা। মুজাহিদ ও কাতাদাহ বলেন, দরী হলো এক প্রকার উদ্ভিদ যা যমীনের সাথে মিলিত থাকে এবং কন্টকযুক্ত হয়।



হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, জাহান্নামে যে দরী হবে উহা ইলুওয়া বৃক্ষের চাইতে অধিক তিক্ত, মরকের চাইতে অধিক দুর্গন্ধময় এবং দোযখের আগুনের চাইতে অধিক গরম।



 



বে-আমল ওয়ায়েজ ও বক্তাগণের পরিণাম দর্শন



রাসূল পাক (সাঃ) বলেন, অতঃপর আমরা এমন একদল লোকের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলাম যাদের ওষ্ঠ ও জিহ্বা লোহার কেঁচি দ্বারা কর্তন করা হচ্ছে। যখনই কর্তন করা হয় সংগে সংগে উহা পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। আমি হযরত জিব্রাঈলকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এসব লোক হলো ওয়ায়েজীনের দল যারা ওয়াজ নছিহত করে বেড়ায়, কিন্তু নিজেরা তদনুযায়ী আমল করে না।



 



অন্যের সন্তানকে দুধপানের সুযোগ প্রদানকারী মহিলার শাস্তি দর্শন



হযরত আলী (রাঃ) বলেন, আমি হযরত রাসূল পাক (সাঃ)-এর পাক দরবারে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম তিনি কাঁদছেন। আমি তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আমি মি'রাজ রাতে আমার উম্মতের কিছু সংখ্যক মহিলাকে ভীষণ শাস্তির মধ্যে লিপ্ত দেখেছি। আরো দেখেছি একজন মহিলাকে স্তনযুগল বেঁধে লটকিয়ে রাখা হয়েছে এবং আলকাতরা তাঁর গলদেশের অভ্যন্তরে ঢেলে দেয়া হচ্ছে। এ মহিলা এমন যে তার স্বামীর অনুমতি ব্যতীত অন্যের সন্তানদের দুধপান করাত।



 



সাজ-সজ্জার দ্বারা অন্যের মন আকৃষ্টকারী মহিলাদের পরিণাম দর্শন



মহানবী (সাঃ) বলেন, মি'রাজ রাতে আমি এমন এক মহিলাকে দেখলাম যাকে স্তন বেঁধে শূন্যে লটকিয়ে রাখা হয়েছে এবং উহার নীচে প্রজ্জ্বলিত আগুনে দগ্ধ করা হচ্ছে, আর সে নিজের শরীরের গোশত ভক্ষণ করছে এ মহিলা তার স্বামী ব্যতীত অন্যের মন আকৃষ্ট করার জন্য সাজসজ্জা অবলম্বন করত।



 



ডাকাত ও লুটতরাজকারীর শাস্তি দর্শন



রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, অতঃপর আমরা রাস্তায় পড়ে থাকা একটি শুকনো কাঠের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। কাপড় চোপড় উহার উপর দিয়ে অতিক্রম করার সাথে সাথে ঐ কাঠটি উক্ত কাপড়কে দু'টুকরা করে ফেলে। এমনকি যে কোন বস্তু উহার উপর দিয়ে অতিক্রম করা মাত্রই সে উহাকে দু'ভাগ করে ফেলে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিব্রাঈল! এ কাঠটির অবস্থা কি? তিনি বললেন, এ হলো আপনার উম্মতের একদল লোক যারা ডাকাতি ও লুটতরাজের মাধ্যমে রাস্তা অতিক্রম করে থাকে (একাঠটি তাদেরই উদাহরণ)



 



পরধন আত্মসাৎকারীর শাস্তি দর্শন



রাসূল পাক (সাঃ) বলেন, অতঃপর আমরা এমন এক পুরুষের নিকট দিয়ে গমন করলাম যে কাঠের একটি বিরাট বোঝা বেঁধেছে। কিন্তু উহা বহন করার শক্তি পাচ্ছেনা। সে তার কাঁঠের সেই বোঝায় আরো কাষ্ঠ বৃদ্ধি করছে এবং উহা বহন করার ইচ্ছা করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিব্রাঈল! এ লোকের অবস্থা কি? তিনি বললেন, এ লোকটি আপনার উম্মতের একজন। তাঁর নিকট মানুষের বহু আমানত (গচ্ছিত সম্পদ) রয়েছে। সে ঐ সব আমানতের মাল আত্মসাৎ করে চলছে বিধায় সে মানুষের আমানতগুলো আদায় করতে সমর্থ হচ্ছেনা। এমতাবস্থায় সে আরো আমানতের বোঝা বৃদ্ধি করে চলছে।



 



মুজাহিদীনের সওয়াব সাতশত গুণে বৃদ্ধি পরিদর্শন



মহানবী (সাঃ) বললেন, আমি বুরাক যোগে ভ্রমণ করতে ছিলাম। এক পর্যায়ে আমি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী মুজাহিদ বাহিনীর অবস্থা অবলোকন করতে ছিলাম। তাদের একটি দল এক দিনে শস্যবীজ বপন করছেন এবং অন্য দিনে তা কর্তন করছেন। যে দিনে তাঁরা শস্য কর্তন করছেন সে দিনেই ক্ষেতে কৃষি ফসল পূর্বের ন্যায় রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। এ দেখে আমি জিব্রাঈল (আঃ) কে এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এসব মুজাহিদের সওয়াব সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেয়া হচ্ছে। এমনিভাবে তারা যে সব মাল আল্লাহ পাকের রাস্তায় ব্যয় করছেন সে সবের নেকী ও (পুরস্কার) তদ্রূপ বৃদ্ধি করে দেয়া হচ্ছে।



 



আয়াতুল কুরসী পাঠকারী ফেরেশতা দর্শন



মহানবী (সাঃ) বলেন, অতঃপর আমি এমন একজন ফেরেশতা দেখতে পেলাম যার ডান পাশে এবং বাম পাশে হাজার হাজার ফেরেশতা রয়েছেন। তাদের সকলের মাথায় রয়েছে নূরের টুপী, সকলেই আয়াতুল কুরসী পাঠ করছেন। এ দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিব্রাঈল! এসব ফেরেশতা কারা? তিনি উত্তর দিলেন, এসব ফেরেশতাদেরকে আরশের নূরের এক বিন্দু দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। এতদশ্রবণে আমি বললাম, "হে জিব্রাঈল! আমার মহান রাব্বুল আলামীনের আশ্চার্য নিদর্শনাবলির সংখ্যা কত বেশি!" তিনি। বললেন, "আপনার রবের যেসব আশ্চার্য নিদর্শনাবলি দেখলেন এতো কেবল অদ্য রাতের সামান্য সময়ে দেখলেন। (তাঁর অনুপম কুদরতের মালিকানায় আরো যে কত কিছু আছে সে সম্পর্কে কেবল তিনিই জানেন।) " সুবহানাল্লাহ!



 



আয়াতুল কুরসী পাঠের ফজীলত



রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, হযরত রাসূল পাক (সাঃ) বলেন, আমি জিব্রাঈল আমীনকে আয়াতুল কুরসীর সওয়াব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, মহান আল্লাহ যখন যমীন সৃষ্টি করলেন তখন উহা কাঁপতে লাগল। তখন মহান আল্লাহ উহার স্থিতিশীলতার জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রেরণ করেন। কিন্তু তাঁরা উহাকে স্থিতিশীল করতে পারেননি। অতঃপর আল্লাহ পাক আরো ৭০ হাজার ফেরেশতা ঐ উদ্দেশ্যে প্রেরণ করলেন। তাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেও তাঁরা অক্ষম হয়ে পড়েন। অবশেষে মহান আল্লাহ কোহে কাফ সৃষ্টি করতঃ উহাকে যমীনের পরিবেষ্টনকারী করে দিলেন। আর উহার চতুর্দিকে চারশত চলি্লশটি পাহাড় তৈরী করে দিলেন, ইহাতে যমীন স্থিতিশীল না হওয়ায় মহান আল্লাহ উহার উপর আয়াতুল কুরসী লিখে দেন। এতে করে যমীন স্থিতিশীল হয়ে যায়। সুবহানাল্লাহ!



সুতরাং যে বান্দা আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে সে ঐসব পাহাড়ের ওজন পরিমাণ এবং ঐসব ফেরেশতাদের তাসবীহ পাঠের সমান সওয়াব প্রাপ্ত হবে।



 



কলমের লেখার আওয়াজ শ্রবণ



অতঃপর জিব্রাঈল আমীন আমাকে নিয়ে উর্ধ্বপানে অগ্রসর হলেন। অবশেষে আমি এমন এক সমান্তরাল জায়গায় পেঁৗছলাম যেখানে কলমের চড়চড় শব্দ শুনতে পেলাম যা লেখার সময় সৃষ্টি হয়। এখানে ফেরেশতাদের দ্বারা মহান আল্লাহর ফায়সালাসমূহ লেখার কথা বুঝান হয়েছে। কিন্তু উহা দ্বারা অদৃষ্ট লিপির কথা বলা হয়নি। কেননা উহাতে কাদিম তথা অবিনশ্বর। আর ফেরেশতাদের লেখার ব্যাপারটি নশ্বর বা নূতন সৃষ্টি।



এ ব্যাপারে বর্ণিত হাদীছ গুলোর সুস্পষ্ট মর্মে বুঝা যায় যে, ভাগ্য লিপি লেখার কাজ হতে লওহে মাহফুজ অবসর প্রাপ্ত এবং আসমান ও যমীন সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর পূর্বে লাওহে মাহফুজে যা কিছু আছে উহা হতে কলম শুষ্ক ও মুক্ত হয়ে আছে। কিন্তু মিরাজ রজনীতে তিনি ফেরেশতাদের লেখার যে শব্দ শুনতে পেয়েছেন তা হলো মহান আল্লাহর ফায়সালা ও সিদ্ধান্তসমূহ তাদের ডাইরীভুক্ত করা যেখানে হা ও না বিদ্যমান রয়েছে।



আল্লামা ইবনুল কায়্যেম বলেন, কলমের সংখ্যা হলো বার। মর্যাদার ক্ষেত্রে সেগুলোর মধ্যে পার্থক্য আছে



(১) সেগুলোর মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ও সবোচ্র্চ মর্যাদার অধিকারী হলো ভাগ্য লিপির কলম যদ্বারা মহান আল্লাহ সৃষ্টিকুলের তাকদীর (অদৃষ্ট) লিপিবদ্ধ করেছেন যেমনটা সুনানে আবূ দাউদে হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, "আমি হযরত নবী পাক (সাঃ) কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন, আল্লাহ পাক যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তন্মধ্যে প্রথম সৃষ্টি বস্তু হলো কলম।" তিনি কলমকে লক্ষ্য করে বললেন, লিখ। কলম আরজ করল, হে আমার রব! আমি কি লিখব? তিনি বললেন, কিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্টিকুলের অদৃষ্ট সমূহ লিখ। এ কলমই হলো সৃষ্টিকুলের প্রথম সৃষ্টি এবং সর্বোৎকৃষ্ট। একাধিক মুফাসসিরীনে কেরাম বলেন, উক্ত কলম হলো ঐ কলম যদ্বারা আল্লাহ পাক পবিত্র কালামে কসম করেছেন।



(২) দ্বিতীয় কলম হলো অহী (প্রত্যাদেশ) লেখার কলম।



(৩) তৃতীয় কলম হলো আল্লাহ পাক ও তদীয় রাসূলের পক্ষ হতে দস্তখতের কলম



৮) চতুর্থ কলম হলো শরীরের কলম যদ্বারা আমাদের স্বাস্থ্য সংরক্ষণ করা হয়।



(৫) পঞ্চম কলম হলো রাজা বাদশাহ ও তাদের প্রতিনিধিদের পক্ষে দস্তখতের কলম। আর এ কলম দ্বারাই রাজত্ব ও বাদশাহীর ভিত্তি স্থাপন করা হয়।



(৬) যষ্ঠ কলম হলো হিসেব নিকেশের কলম যদ্বারা সম্পদের উৎস, ব্যায়ের খাত ও পরিমাণ বিন্যাশ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।



(৭) হুকুম তথা ফায়সালার কলম যদ্বারা বান্দার অধিকার সাব্যস্ত করা হয় এবং যদ্বারা ফায়সালা (মিমাংসা) জারী করা হয়।



৮) অষ্টম কলম হলো সাক্ষ্যের কলম যা দ্বারা বান্দার অধিকার স্থির করা হয়।



(৯) নবম কলম হলো তাবীরের কলম যা স্বাপি্নক প্রত্যাদেশ এবং উহার ব্যাখ্যা ও মর্ম লিপিবদ্ধ করে থাকে।



(১০) দশম কলম হলো বিশ্বের ইতিহাস ও ঘটনাপুঞ্জের কলম।।



(১১) একাদশ কলম হলো ভাষা ও উহার বিস্তারিত বিবরণ লেখার কলম।



(১২) দ্বাদশ কলম হলো সার্বিক ও পূর্ণাঙ্গ কলম। উহা হলো বাতিল পন্থিদের মতবাদ প্রত্যাখ্যান করার এবং দ্বীন পরিবর্তনকারীদের সন্দেহ বিদূরীত করার কলম। উক্ত বারটি কলমের মাধ্যমে বিশ্বের স্বাভাবিক নিয়ম ও কল্যাণ বজায় থাকে। মাওয়াহেবে লাদুনি্নয়া-৩ / ৮০পৃ: মূল (আকসানুল কুরআন)



 



বায়তুল মামুর দর্শন



অতঃপর হযরত জিব্রাঈল আমীন আমাকে নিয়ে সপ্তম আসমানে গমন করলেন এবং আসমানের দরজা খোলার জন্য দস্তক দিলেন। অপর দিক হতে আওয়াজ আসল, কে? জিব্রাঈল আমীন উত্তর দিলেন, আমি জিব্রাঈল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ! জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহ পাক তাকে পাঠিয়েছেন কি? তিনি বললেন, জি, হ্যাঁ! এতদশ্রবণে আমাদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়। অমনি আমাদের সাথে হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর সাক্ষাৎ হয় যিনি বেহেশতের দরজার পাশে উপবিষ্ট ছিলেন। এখানে বেহেশতের দরজা বলতে উহার দিক-প্রান্তের কথা বুঝানো হয়েছে, নচেৎ বেহেশত সপ্তম আসমানের উপরে অবস্থিত। আমরা তাঁকে বেহেশতের দিকে একখানি কুরছীর উপর বসা অবস্থায় দেখলাম, তাঁর পৃষ্ঠদেশ বাইতুল মামুরের দিকে ফেরানো।



হাদীসে বর্ণিত আছে যে, বাইতুল মামুর সপ্তম আকাশের মসজিদ যা কাবা শরীফের বরাবরে অবস্থিত এমন ভাবে যে, যদি বাইতুল মামুর ঘিরে পড়ে তাহলে ঠিক কাবা শরীফের উপর ঘিরে পড়বে। কেহ বলেন, বাইতুল মামুর চতুর্থ আসমানে অবস্থিত। কেহ বলেন, আসমানে, কেহ বলেন, প্রথম আসমানে অবস্থিত। ইতি পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে, প্রত্যেক আসমানে বাইতুল মামুর রয়েছে এবং প্রত্যেকটি বাইতুল মামুর পৃথিবীর কাবা শরীফের বরাবরে অবস্থিত। প্রত্যেক দিন বাইতুল মামুরে এক হাজার করে ফেরেশতা প্রবেশ করেন যারা পরবর্তীতে আর ফিরে আসেন। কোন কোন বুজর্গ হতে বর্ণিত আছে-প্রত্যহ বাইতুল মামুরে ৭০ হাজার ফিরেশতা প্রবেশ করেন।



অন্য এক বর্ণনায় আছে, বাইতুল মামুরে ৭০ হাজার সম্ভান্ত ফেরেশতা প্রবেশ করেন এবং তাদের প্রত্যেকের অধীনে ৭০ হাজার ফেরেশতা থাকেন। সম্ভবতঃ হুযুর (সাঃ) হযরত জিব্রাঈল আমীনের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন,অন্যথায় তাঁর বর্ণনা দ্বারা একথা স্পষ্ট নয়। তিনি সেখানে দু'রাকাত নামাজ আদায় করেন। জিব্রাঈল আমীন তাকে জানিয়ে দেন যে, প্রত্যহ ৭০ হাজার ফেরেশতা বাইতুল মামুরের এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করে অন্য দরজা দিয়ে বের হয়ে যান। যে দরজা দিয়ে তারা প্রবেশ করেন উহার নাম হলো বাবু মাতালেউল কাওয়াকেব অর্থাৎ নক্ষত্ররাজির উদয়াস্থলের দরজা আর যে দরজা দিয়ে তাঁরা বের হয়ে যান উহার নাম হলো বাবু মাগারিবিল কাওয়াকেব অর্থাৎ নক্ষরাজির অস্তাচলের দরজা। প্রকাশ্য কথা এই যে, ঐ সব ফেরেশতার প্রবেশ ঐ দরজার সাথে খাছ যা কেবল সপ্তম আসমানে রয়েছে অন্য আসমানের নয়।



আল্লামা সুহাইলী বলেন, একথা বিশুদ্ধ সূত্রে সাব্যস্ত যে, মুমিন ও কাফেরদের নাবালেগ সন্তান-সন্ততির জামানত তথা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর উপর সোপর্দ করা হয়েছে। হযরত রাসূল করীম (সাঃ) যখন ঐসব সন্তান-সন্ততিকে হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর সাথে দেখতে পান তখন তিনি জিব্রাঈল আমীনকে জিজ্ঞেস করলেন, হে জিব্রাঈল! এসব সন্তান সন্তুতি কারা? তিনি উত্তর দিলেন, এসব সন্তান-সন্তুতি মুমিনদের যারা শৈশবে মারা গিয়েছে। তিনি জিব্রাঈল আমীনকে জিজ্ঞেস করলেন, কাফেরদের নাবালেগ সন্তান-সন্ততির অবস্থা কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, কাফেরদের সন্তান সন্তুতিও তাদের মধ্যে শামিল যারা শৈশবে মারা গিয়েছে। বুখারী শরীফ কিতাবুল জানায়েয দ্রষ্টব্য।



মিরাজ রাতে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আমাদের নবী করীম (সাঃ) কে বলেন, আপনার উম্মতের উচিত বেহেশতে বৃক্ষ রোপনের সংখ্যা অধিক করা। কেননা, বেহেশতের মাটি হলো পবিত্র এবং উহার যমীন হলো প্রশস্ত।



এ শ্রবণে তিনি তাকে (হযরত ইব্রাহীম কে) জিজ্ঞেস করল, বেহেস্তে বৃক্ষরোপণ কিরূপে হয়? তিনি উত্তর নিলেন, "লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" পাঠ করা হলো উহাতে বৃক্ষরোপণ।



অন্য বর্ণনায় আছে, আপনি আমার পক্ষ হতে আপনার উম্মতকে সালাম জানাবেন এবং তাদেরকে এ মর্মে অবহিত করবেন যে, বেহেশতের মাটি হলো পবিত্র, উহার পানি মিষ্ট এবং উহাতে বৃক্ষরোপণ হলো "সুবহানাল্লাহ, ওয়াল হামদু লিল্লাহ, ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার। হযরত রাসূল মকবুল (সাঃ) হযরত জিব্রাঈল আমীনকে সিদরাতুল মুনতাহায় তাঁর আসল সুরতে দেখেছেন : মহানবী (সাঃ) সিদরাতুল মুন্তাহার নিকট জিব্রাঈল আমীনকে ঐ আকৃতিতে দেখেছেন যে আকৃতিতে মহান আল্লাহ তাঁকে সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ আসল আকৃতিতে দেখতে পেয়েছেন। তার ছয়শত পাখা বা বাহু আছে। প্রত্যেকটি পাখা আসমানের দিগন্তকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। পাখাগুলোতে এত সংখ্যক মুক্তা ও ইয়াকুত যা একমাত্র মহান আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানেনা। উক্ত বৃক্ষটিকে মেঘে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। জিব্রাঈল আমীন পিছে হটে আসলেন।



অন্য এক বর্ণনায় আছে, অতঃপর জিব্রাঈল আমীন আমাকে নিয়ে সপ্তম আসমানের শীর্ষদেশে উপনীত হন এবং সেখানকার একটি নদীর কিনারায় পেঁৗছলেন। নদীটি ইয়াকুত, মুক্তা এবং জবরযদের তাবু দ্বারা পরিবেষ্টিত। জিব্রাঈল আমীন বললেন, এটাই হলো কাওসার যা মহান আল্লাহ আপনাকে দান করেছেন। অমনি তিনি দেখতে পেলেন উহাতে রয়েছে স্বর্ণ রৌপ্যের অগণিত পাত্র। ইয়াকুত ও জমরদ পাথরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরোরাজির উপর দিয়ে হাওজে কাওসারের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। উহার পানি দুধের চাইতে সাদা। মহানবী (সাঃ) বলেন, আমি উহার একটি পাত্র লয়ে উহা হতে পানি উঠালাম এবং পান করলাম যা মধু হতে মিষ্ট এবং মেশকের চাইতে অধিক সুগন্ধময় অনুভূত হলো। সুবহানাল্লাহ!



 



মৃত নাবালেগ শিশুদের অবস্থা দর্শন



হযরত রাসূল করীম (সাঃ) বলেন, আমি যখন সিদরাতুল মুন্তাহায় পেঁৗছলাম দেখলাম সেই বৃক্ষের উপর কতগুলো সবুজ পাখী। উহাদের কতিপয়কে প্রফুলি্লত এবং কতিপয়কে চিন্তান্বিত দেখলাম। উহাদের পাশে রয়েছে একজন বৃদ্ধ পুরুষ ও একজন বৃদ্ধা মহিলা। আমি জিব্রাঈল আমীনকে জিজ্ঞেস করলাম, এ বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধা মহিলা কে? তিনি বললেন, ইনি হলেন হযরত ইব্রাহীম খলীল এবং বৃদ্ধা হলেন তার স্বনামধন্য স্ত্রী হযরত বিবি সারা (রাঃ)। আর পাখীগুলো হলো মুমিন বান্দাগণের নাবালেগ সন্তান যারা নাবালেগ অবস্থায় মারা গিয়েছিল। তাদের মধ্যে যারা অল্পদিন পূর্বে মাতা পিতা ছেড়ে এসেছে। তারা নিরানন্দ। আর যারা বহুদিন পূর্বে ছেড়ে এসেছে তারা বেশ আনন্দিত ও প্রফুল্লচিত্ত।



 



মোরগ দর্শন ও মোরগের তাসবীহ পাঠ শ্রবণ



হযরত রাসূল (সাঃ) বলেন, আমি আকাশ পরিম-লের বাইরে তথা সিদরাতুল মুন্তাহায় একটি মোরগ দেখতে পেলাম যার মাথার মুকুট সবুজ রংয়ের এবং পালকগুলো অতিশয় সাদা। উহার পা দু'টি লাল স্বর্ণের যা সপ্তম যমীনে অবস্থিত। লেজ হলো মুক্তার এবং মস্তক হলো মোতির যা আরশের নীচে অবস্থিত। উহার চক্ষু দু'টি ইয়াকুতের, মুকুট শীর্ষস্থ পালকগুলো লাল আকীক পাথরের, ডানাদ্বয় সবুজ রংয়ের। যখন উহা ডানা দ্বয়কে বিস্তার করে তখন উহা মাশরেক ও মাগরেবকে অতিক্রম করে। যখন রাতের তিনভাগের এক ভাগ চলে যায় তখন মোরগটি তার ডানাদ্বয়কে প্রসারিত করতঃ ঝাড়া দেয় এবং চিৎকার দিয়ে মহান আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতে গিয়ে বলতে থাকে " সুবহানাল মালিকিল কুদ্দু্ছ 'সুবহানাল কারীম।" তখন যমীনের মোরগগুলো উক্ত তাসবীহ ধ্বনির প্রতিধ্বনি করতে থাকে। অতঃপর যখন রাতের অধিক সময় অতিবাহিত হয় তখন মোরগটি আবার উহার ডানাদ্বয় বিস্তারকরত ঝাড় দেয় এবং সরবে আল্লাহ পাকের তাসবীহ পাঠ করতে গিয়ে বলতে থাকে, সুবহানা রাবি্বয়াল আজীম, সুবহানা রাবি্বয়াল আযীযিল কাহহার, সুবহানা রাবি্বয়াল আরশের রাফী। এ সময় পৃথিবীর মোরগগুলো আল্লাহ পাকের তাসবীহ পাঠ করতে থাকে। মহানবী (সাঃ) বলেন, আমি ঐ মোরগটি আবার দেখার জন্য সতত আগ্রহী। সুবহানাল্লাহ!



হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে, আরশে আজীমে যে মোরগ, উহার ডানার সংখ্যা আল্লাহ পাকের মাখলুকের সংখ্যার সমান। উহার দরখাস্ত হলো, হে আল্লাহ! আপনি উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে যারা ঈমানদার তাদেরকে ক্ষমা করুন। সাদা বর্ণের মোরগ সম্পর্কে হুযূর (সাঃ) হতে বর্ণিত আছে, এ ধরনের মোরগ নামাজের জন্য আজান দিয়ে থাকে, ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগরিত করে এবং উহার চিৎকারে অনিষ্টকারী জিন পলায়ন করে।



হযরত কা'ব আল আহবার (রাঃ) বলেন, বেহেশতের অধিকাংশ পাখী হলো মোরগ।



আরাঈস কিতাবে আছে, আল্লাহ পাক হযরত আদম (আঃ)-এর নিকট একটি মোরগ প্রেরণ করেন। ঐ মোরগ যখন ফেরেশতাদের তাসবীহ শ্রবণ করত তখন সে-ও তাসবীহ পাঠ করত। এ শুনে হযরত আদম (আঃ) তাসবীহ পাঠ করতেন। (নুযহাতুল মাজালিস-২ / ১৪০ পৃঃ)



 



হযরত আযরাঈল (আঃ)-এর দর্শন



হযরত রাসূল করীম (সাঃ) বলেন, অতঃপর আমি কুরসীর উপর উপবিষ্ট একজন ফেরেশতা দেখলাম যার হাটু দ্বয়ের মাঝখানে সমস্ত দুনিয়া বিদ্যমান। আর তার হাতে রয়েছে একটি তখ্ত যার মধ্যে তিনি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আছেন, ডানে ও বামে ভ্রুক্ষেপ করছেন না।



জিব্রাঈল আমীন বললেন, হে মালাকুল মওত! আপনি রহমতের নবী ও রাব্বুল আলামীনের হাবীবকে সালাম করবেন না? এ শুনে তিনি আমার দিকে ফিরে চাইলেন এবং বললেন, "আপনার প্রতি আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক, আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। কেননা, যাবতীয় কল্যাণ ও সৌভাগ্য আপনার মধ্যে এবং আপনার উম্মতের মধ্যে। অতএব আপনার নয়ন শীতল হোক এবং অন্তর প্রফুল্ল হোক। তখন হুযূর পাক (সাঃ) বললেন, আমাকে অবহিত করুন আপনি কিভাবে মুমিন বান্দার জান কবজ করেন। তিনি বললেন, যখন কোন মুমিন বান্দার পার্থিব জীবনের শেষ ঘণ্টা এবং পারলৌকিক জীবনের প্রথম ঘণ্টা বেজে উঠে তখন আমি আমার সাহায্যকারী ফেরেশতাদেরকে জান্নাতের একগুচ্ছ সুগন্ধি ফুল ও একটি ডাল সহ ঐ বান্দার নিকট পাঠিয়ে দেই। তাঁরা সেই ডাল ঐ বান্দার দু'চক্ষের মাঝখানে রেখে দেন এবং অতি নম্রতার সাথে তার রূহকে বের করতে থাকেন। অতঃপর তাঁর রূহ যখন গলদেশ পর্যন্ত এসে পেঁৗছে তখন আমি তাঁর নিকট অবতীর্ণ হই এবং তাকে সালাম প্রদান করি। অতঃপর তাঁর রূহকে কবজ করত উহা লয়ে আসমানের দিকে গমন করি। সেই ঊর্ধ্বজগতের ফেরেশতাদের যে দলেরই নিকট দিয়ে অতিক্রম করি তারাই ঐ আত্মার প্রতি অভিনন্দন ও সম্মান জ্ঞাপন করতে থাকেন। এভাবে শেষ পর্যন্ত আমরা মহান আল্লাহর আলীশান দরবারে পেঁৗছে যাই। মহান আল্লাহ তাঁকে দেখে বলেন, মারহাবা, পবিত্র আত্মার প্রতি যিনি ছিলেন পবিত্র শরীরে। ওহে ফেরেশতাগণ! তোমরা আমার সেই বান্দার জন্য ইলি্লয়্যীনদের অন্তর্ভুক্ত করে একখানা পত্র লিখ। এবং তাকে জান্নাতে পেঁৗছে দাও। তখন সেই রূহ তাঁর জন্য তৈরিকৃত জান্নাতের নিয়ামতগুলো দেখতে থাকেন অতঃপর সেই বান্দার রূহকে তার শরীরে ফেরত দেয়া হয়। তখন সে তাঁর গোসলখানা ও সুগন্ধি সাবান ইত্যাদি দেখতে থাকে। জীবিত লোকদের মধ্যে তাঁর নিকট সবচাইতে প্রিয় সব লোক যারা বলে, জলদী তাঁর কাফন ও দাফন কার্য সম্পন্ন কর আর তাদের মধ্যে সবচাইতে অপ্রিয় ও বিরাগভাজন ঐ সব লোক যারা বলে, তোমরা তাঁর জন্য আরো কিছু সময় অপেক্ষা কর অর্থাৎ কাফন দাফন কাজে বিলম্ব কর।



অন্য এক বর্ণনায় আছে, হযরত রাসূল মকবুল (সাঃ) বলেন, অতঃপর আমি একজন ফেরেশতাকে কুরসীর উপর উপবিষ্ট দেখতে পেলাম যার দু'হাটুর মাঝখানে রয়েছে দুনিয়া ও উহার যাবতীয় বস্তু। আর তার হাতে রয়েছে একখানি নূরের ফলক যার মধ্যে তিনি তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আছেন, ডানে ও বামে ঐক্ষেপ করছেন না। তার ডান পাশে আছে এক বিরাট বৃক্ষ। তিনি একবার ঐ বৃক্ষের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং আরেকবার দৃষ্টিপাত করেন সেই নূরের ফলকের প্রতি। আমি জিজ্ঞেস করলাম এ ফেরেশতা কে? জিব্রাঈল আমীন বললেন, ইনি হলেন মালাকুল মওত। এতশ্রবণে আমি তার নিকটবর্তী হলাম এবং তাকে সালাম দিলাম। তিনি তার মস্তকের ইশারায় আমার সালামের উত্তর দিলেন। তখন জিব্রাঈল আমীন ফেরেশতাকে বললেন হে মালাকুল মওত! ইনি হলেন হযরত মুহাম্মদ রহমতের নবী। একথা শুনে উক্ত ফেরেশতা আমার প্রতি অভিনন্দন ও সম্মান জ্ঞাপন করলেন এবং বললেন, হে মুহাম্মদ! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। কেননা, মংগল ও কল্যাণ আপনার ও আপনার উম্মতের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত কেন্দ্রিভূত থাকবে। তখন আমি বললাম, আলহামদুলিল্লাহ অর্থাৎ সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য যিনি আমাদেরকে তার অসংখ্য নিয়ামত দান করে আমাদের প্রতি বড়ই এহছান করেছেন। অতঃপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কিভাবে অসংখ্য সৃষ্টি জীবের আত্মা কবজ করতে সক্ষম হন? তিনি উত্তর দিলেন, আপনি কি দেখেননা যে, গোটা দুনিয়া আমার সামনে বিদ্যমান এবং সমস্ত সৃষ্টি জীব আমার দু'চক্ষের সামনে হাজির। আর এই যে বৃক্ষ ও উহার পত্রগুলো সকল সৃষ্টি জীবের সংখ্যার সমান। প্রত্যেক পত্রে উহার সাথীর নাম লিপিবদ্ধ আছে। আর এই ফলকে রয়েছে সমস্ত সৃষ্টি জীবের নাম। যখন কোন বান্দার জীবিকা শেষ হয়ে যায় তখন তার পত্রটি হলুদ রং ধারণ করে এবং শুকিয়ে যায়। তখন আমি তার নাম ঐ পত্র থেকে মুছে ফেলি। অমনি ঐ বান্দা মৃত্যুবরণ করে।



হাদীছ শরীফে আছে, মহান আল্লাহ যতগুলো রূহ সৃষ্টি করেছেন মালাকুল মওতের ততগুলো হাত আছে। তিনি তার স্থানে বসে জান কবজ করে থাকেন। আল্লামা নাসাফী কৃত যাহরুর রিয়াজ কিতাবে আছে, সৃষ্টি জীবের সংখ্যা অনুযায়ী আযরাঈলের চক্ষু রয়েছে। যখনই তিনি কারো জান কবজ করেন তখই তার একটি চক্ষে অশ্রু প্রবাহিত হয়ে যায়।



রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম মি'রাজে আরো অনেক নিদর্শন দেখতে পেয়েছেন। এখানে সংক্ষিপ্তভাবে কতগুলো বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল মাত্র। যে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে সে বিষয়গুলো ইসলামি আলোকে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আমল করার তাওফিক দান করুক। আমিন।



লেখক : ইমাম ও খতিব : বিষ্ণুপুর মদিনা বাজার বাইতুল আমিন জামে মসজিদ, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর।



 



 


হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২-সূরা বাকারা


২৮৬ আয়াত, ৪০ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


২০। বিদ্যুৎ চমক তাহাদের দৃষ্টিশক্তি প্রায় কাড়িয়া লয়। যখনই বিদ্যুতালোক তাহাদের সম্মুখে উদ্ভাসিত হয় তাহারা তখনই পথ চলিতে থাকে এবং যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয় তখন তাহারা থমকিয়া দাঁড়ায়। আল্লাহ ইচ্ছা করিলে তাহাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি হরণ করিতেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।


 


 


assets/data_files/web

নত হই ছোট নাহি হই কোনমতে।


_রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/কণিকা।


ডান হাত যা দান করে বাম হাত তা জানতে পারে না-এমন দানই সর্বোৎকৃষ্ট দান।


 


 


 


 


করোনা পরিস্থিতি
বাংলাদেশ বিশ্ব
আক্রান্ত ৬,৪৪,৪৩৯ ১৩,২১,৯৪,৪৪৭
সুস্থ ৫,৫৫,৪১৪ ১০,৬৪,২৬,৮২২
মৃত্যু ৯,৩১৮ ২৮,৬৯,৩৬৯
দেশ ২১৩
সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
আজকের পাঠকসংখ্যা
৬১৩৫৫১
পুরোন সংখ্যা