চাঁদপুর, শুক্রবার ৯ আগস্ট ২০১৯, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৬, ৭ জিলহজ ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৪-সূরা কামার


৬২ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


 


 


 


assets/data_files/web

যে খেলায় কেউ জিততে পারে না সেটাই সবচেয়ে খারাপ খেলা।


-টমাস ফুলার।


 


 


কৃপন ব্যক্তি খোদা হতে দূরে লোকসমাজে ঘৃণিত, দোজখের নিকটবর্তী।


 


 


ফটো গ্যালারি
কোরবানির ফজিলত আমল ও আহকাম
মাওঃ মোঃ মোশাররফ হোসাইন
০৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


কোরবানির পরিচয় : কোরবানি আরবি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে অতিশয় নিকটবর্তী হওয়া। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় কোরবানি বলা হয় ওই নির্দিষ্ট জন্তুকে, যা একমাত্র আল্লাহপাকের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে একমাত্র আল্লাহর নামে জবেহ করা হয়।



ঐতিহাসিক পটভূমি : আল্লাহ তা'য়ালা মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ)কে অনেকবার পরীক্ষা করেছেন। সকল পরীক্ষায় তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, আল্লাহপাক তাঁকে ইঙ্গিত করেছেন প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)কে কোরবানি করতে। বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র সন্তান হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর অপেক্ষা অধিকতর প্রিয় আর কী হতে পারে। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে সিদ্ধান্তে পেঁৗছলেন যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ)কে কোরবানি করবেন। তখন তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)কে বললেন, যা পবিত্র কোরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, "হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে আমি জবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কি?" সে (হযরত ইসমাঈল (আঃ)) বললো, "হে পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। আল্লাহ চাহেতো আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।" (সূরা সফ্ফাত; আয়াত : ১০২)।



ছেলের সাহসিকতাপূর্ণ জবাব পেয়ে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) অত্যন্ত খুশি হলেন। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ছেলের গলায় ছুরি চালান। তখন হযরত জিব্রাইল (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে বেহেশত হতে একটা দুম্বা নিয়ে রওনা হলেন। তার মনে সংশয় ছিলো পৃথিবীতে পদার্পণের পূর্বেই হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যবেহ কাজ সম্পন্ন করে ফেলবেন। তাই জিবরাইল (আঃ) আকাশ হতে উচ্চস্বরে ধ্বনি দিতে থাকেন "আল্লাহু আকবার"। আওয়াজ শুনে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেন, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার"। পিতার মুখে তাওহীদের বাণী শুনতে পেয়ে হযরত ইসমাঈল (আঃ) বলে উঠলেন "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ"। আল্লাহর প্রিয় দুই নবী এবং হযরত জিবরাইল (আঃ)-এর কালামগুলো আল্লাহর দরবারে এতোই পছন্দনীয় হলো যে, কিয়ামত পর্যন্ত এ কথাগুলো ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত বিশেষ করে ঈদুল আযহার দিনে বিশ্ব মুসলিমের কণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকবে।



আল্লাহপাকের অসীম কুদরতে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর পরিবর্তে কোরবানি হয়ে গেলো একটি বেহেস্তী দুম্বা। কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কালামে ঘোষণা করেন "তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছো। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা একটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাঁর (ইসমাঈল (আঃ) পরিবর্তে দিলাম জবেহ করার জন্যে এক মহান জন্তু।" (সূরা সাফ্ফাত; আয়াত : ১০৪-১০৭)। বর্ণিত আছে যে, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) উপরোক্ত গায়েবি আওয়াজ শুনে হযরত জিবরাইল (আঃ)কে একটি বেহেস্তী দুম্বাসহ দেখতে পান। এ জান্নাতী দুম্বা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে দেয়া হলে তিনি আল্লাহর নির্দেশে পুত্রের পরিবর্তে সেটি কোরবানি করলেন। আর তখন থেকেই শুরু হলো কোরবানির মহান বিস্ময়কর ইতিহাস। যা অন্ততকাল ধরে সুন্নতে ইব্রাহীম হিসেবে বিশ্বের সকল মুসলমানের কাছে আজও স্মরণীয় হয়ে আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে।



কোরবানির গুরুত্ব : কোরবানি হলো ইসলামের একটি শি'য়ার বা মহান নিদর্শন। কোরআন মাজীদে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিয়েছেন, 'তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো ও পশু কোরবানি করো।' (সূরা আল-কাউসার : ২)। হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না সে যেনো আমাদের ঈদগাহের ধারে না আসে। যারা কোরবানি পরিত্যাগ করে তাদের প্রতি এ হাদিস একটি সতর্কবাণী। অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানি করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, "হে লোকসকল, প্রত্যেক পরিবারের উপর কোরবানি দেয়া অপরিহার্য।" উল্লেখিত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোরবানি করা ওয়াজিব। তবে অনেক ওলামায়ে কিরাম কোরবানি করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বলেছেন।



কোরবানির ইতিহাস : কোরবানি আল্লাহ তা'আলার একটি বিধান। আদম আলাইহিস সালাম হতে প্রত্যেক নবীর যুগে কোরবানি করার ব্যবস্থা ছিলো। যেহেতু প্রত্যেক নবীর যুগে এর বিধান ছিলো সেহেতু এর গুরুত্ব অত্যধিক। যেমন ইরশাদ হয়েছে : 'আমি প্রত্যেক সমপ্রদায়ের জন্যে কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি; তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণস্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন সেগুলোর উপর যেনো তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে। (সূরা আল-হাজ্জ : ৩৪)। 'আর তুমি তাদের নিকট আদমের দুই পুত্রের সংবাদ যথাযথভাবে বর্ণনা করো, যখন তারা উভয়ে কোরবানি পেশ করলো। অতঃপর একজন থেকে গ্রহণ করা হলো আর অপরজনের থেকে গ্রহণ করা হলো না। (সূরা আল-মায়িদাহ : ৩৪)। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় বন্ধু ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে বিভিন্ন পরীক্ষায় অবতীর্ণ করেছেন এবং ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আর স্মরণ করো, যখন ইবরাহীমকে তার রবের কয়েকটি বাণী দিয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর সে তা পূর্ণ করলো। তিনি বললেন, আমি তোমাকে নেতা বানাবো'। (সূরা আল-বাকারাহ-১২৪)। নিজ পুত্র জবেহ করার মতো কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম।



এ বিষয়ে সূরা আস-সাফ্ফাতের ১০০ থেকে ১০৯নং আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থ : তিনি বললেন, হে প্রভু! আমাকে নেক সন্তান দান করুন। অতঃপর আমি তাকে সুসংবাদ দিলাম এক অতীব ধৈর্য্যশীল সন্তানের। পরে যখন সে সন্তান তার সাথে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়ানোর বয়সে পেঁৗছলো তখন তিনি (ইবরাহীম আলাইহিস সালাম) একদিন বললেন, হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি আল্লাহর হুকুমে তোমাকে জবেহ করছি এখন তুমি চিন্তা-ভাবনা করে দেখো এবং তোমার অভিমত কী? তিনি (ইসমাঈল) বললেন, হে পিতা আপনি তাই করুন, যা করতে আপনি আদিষ্ট হয়েছেন। ইনশাল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্য্যশীলদের মধ্যে পাবেন। অতঃপর যখন দুজনই আল্লাহর আদেশ মানতে রাজি হলেন, তখন তিনি (ইবরাহীম আলাইহিস সালাম) পুত্রকে জবেহ করার জন্যে শুইয়ে দিলেন। আমি তাঁকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছো। আমি এভাবেই নেক বান্দাদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটি বড় পরীক্ষা। আর আমি তাঁকে বিনিময় করে দিলাম এক বড় কোরবানির দ্বারা এবং তা পরবর্তীর জন্যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলাম। শান্তি বর্ষিত হোক ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর।"



একমাত্র আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় এবং আল্লাহ প্রদত্ত কঠিনতম পরীক্ষায় সাফল্যজনকভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্যে এক মহান পিতার প্রাণাধিক পুত্রকে কোরবানি করার মধ্য দিয়ে ধৈর্য্যশীলতার উত্তম নমুনা পেশ পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। কোরআন মাজীদে উল্লেখিত আয়াতসমূহে ইব্রাহীম ও ইসমাঈল আলাইহিমুস সালামের আত্মত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি সীমাহীন আনুগত্যের সাবলীল বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। উল্লেখিত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, স্বীয় পুত্র জবেহ না হয়ে দুম্বা জবেহ হওয়ার মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কোরবানি ওয়াজিব হয়।



কোরবানির উদ্দেশ্য : কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন শুধু তাঁর ইবাদত করার জন্যে। তাই আল্লাহ তা'আলার বিধান তাঁর নির্দেশিত পথে পালন করতে হবে। তিনি বলেন, 'আমি জ্বিন ও মানুষকে এজন্যে সৃষ্টি করেছি যে, তারা শুধু আমার ইবাদত করবে।' (সূরা আয্যারিয়াত-৫৬) আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে কোরবানির বিধান আমাদের উপর আসার বেশ কিছু উদ্দেশ্যও রয়েছে :



১. শর্তহীন আনুগত্য : আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাহকে যে কোনো আদেশ দেয়ার ইখতিয়ার রাখেন এবং বান্দা তা পালন করতে বাধ্য। তাই তার আনুগত্য হবে শর্তহীন। আল্লাহর আদেশ সহজ হোক আর কঠিন হোক তা পালন করার বিষয়ে একই মন-মানসিকতা থাকতে হবে এবং আল্লাহর হুকুম মানার বিষয়ে মায়া-মমতা প্রতিবন্ধক হতে পারে না। ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের আনুগত্য ছিলো শর্তহীন। এজন্যে মহান আল্লাহ যেভাবে বিশ্ব মানবম-লীকে বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত করেছেন, ঠিক সেভাবে সর্বশেষ জাতি হিসেবে মুসলিম জাতির পিতাও মনোনয়ন দিয়েছেন। কুরআনে এসেছে : 'এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের মিল্লাত; তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম।' (সূরা আল-হাজ্জ : ৭৮)।



 



২. তাক্ওয়া অর্জন : তাক্ওয়া অর্জন ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না। একজন মুসলিমের অন্যতম চাওয়া হলো আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জন। পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কোরবানিদাতা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আল্লাহর নিকট পেঁৗছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পেঁৗছায় তোমাদের তাক্ওয়া। এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো এজন্যে যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন; সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়ণদেরকে। (সূরা আল-হাজ্জ : ৩৭)।



 



৩. আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা : প্রত্যেক ইবাদাতই আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে। তাই কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো এজন্যে যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন; সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়ণদেরকে। (সূরা আল-হাজ্জ : ৩৭)।



 



৪. ত্যাগ করার মহান পরীক্ষা : কোরবানির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ত্যাগ করার মানসিকতা তৈরি করা। আল্লাহর বিধান পালনে জান-মালের ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। কোরবানির ঈদকে গোশত খাওয়ার অনুষ্ঠানে পরিণত করা নয়, বরং নিজেদের মধ্যকার পশুসুলভ আচরণ ত্যাগ করার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। নফসের আনুগত্য ত্যাগ করে আল্লাহর একান্ত অনুগত হওয়াই কোরবানির উদ্দেশ্য। 'আমি তোমাদেরকে অবশ্যই ভয়, দারিদ্র্য, সম্পদ ও জীবনের ক্ষয়ক্ষতি করার মাধ্যমে পরীক্ষা করবো।' (সূরা আল-বাকারাহ : ১৫৫)।



 



কোরবানির ফজিলত : ১. কোরবানিদাতা কোরবানির পশুর জবাইয়ের মাধ্যমে ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ও শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের বাস্তবায়ন করতে পারে। আল-কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আর আমরা মহা কোরবানির বিনিময়ে তাকে মুক্ত করেছি।' (সূরা আস-সাফফাত : ১০৭)। এ আয়াতের তাফসীরে তাফসীর বিশারদগণ উল্লেখ করেছেন, সকল কোরবানি এ মহা কোরবানির অন্তর্ভুক্ত। এজন্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদ ইবনে আরকাম বর্ণিত হাদিসেও কোরবানিকে ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের সুন্নাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।



২. কোরবানির রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য অর্জিত হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আল্লাহর নিকট পেঁৗছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত; পেঁৗছায় তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো এজন্যে যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়ণদেরকে।" (সূরা আল-হাজ্জ : ৩৭)।



৩. কোরবানি আল্লাহ তা'আলার অন্যতম নিদর্শন। সূরা হজ্জের ৩৬নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, "কোরবানির উটসমূহকে আমরা তোমাদের জন্যে আল্লাহর নিদর্শনের অন্যতম করেছি। তোমাদের জন্যে যাতে কল্যাণ রয়েছে। সুতরাং সারিবদ্ধভাবে দ-ায়মান অবস্থা এগুলোর উপর তোমরা আল্লাহর নাম স্মরণ করো আর যখন কাত হয়ে পড়ে যায় তখন সেগুলো হতে খাও। আর আহার করাও ধৈর্য্যশীল অভাবী ও ভিক্ষাকারী অভাবগ্রস্তকে এভাবে আমি ওদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।" এ আয়াতে কোরবানির ফজিলত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং কোরবানির পশুকে আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।



৪. পশু দ্বারা কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর জিকির বা স্মরণের বাস্তবায়ন করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, 'আমি প্রত্যেক সমপ্রদায়ের জন্যে কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি; তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণস্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর উপর যেনো তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে। (সূরা আল-হাজ্জ : ৩৪)।



৫. কোরবানির প্রবাহিত রক্ত আল্লাহ তা'আলার কাছে দুটি কুচকুচে কালো ছাগলের চেয়ে প্রিয় ও পবিত্র। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোরবানির প্রবাহিত রক্ত আল্লাহ তা'আলার কাছে দুটি কুচকুচে কালো ছাগলের চেয়ে অধিক প্রিয়। (সুনান বায়হাকী )।



৬. ইসলামে হজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ইবাদত। হজের সাথে কোরবানির অনেক বিষয় জড়িত। হাজীগণ এ দিনে তাদের পশু জবেহ করে হজকে পূর্ণ করেন। এজন্যে এর নাম হলো শ্রেষ্ঠ হজের দিন। হাদীসে এসেছে, ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির দিন জিজ্ঞেস করলেন এটা কোন্ দিন? সাহাবাগণ উত্তর দিলেন এটা ইয়াওমুন্নাহর বা কোরবানির দিন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা হলো ইয়াওমুল হাজ্জিল আকবার বা শ্রেষ্ঠ হজের দিন। (সুনান আবু দাউদ)।



৭. কোরবানির মাধ্যমে সামাজিক ও পারিবারিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করার বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি হয়। সমাজে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার জন্যে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রেরণা তৈরি হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, তোমারা আল্লাহর রজ্জুকে ঐক্যবদ্ধভাবে অাঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ও না। (সূরা আলে ইমরান : ১০৩)।



৮. কোরবানিতে গরিব মানুষের অনেক উপকার হয়। যারা বছরে একবারও গোস্ত খেতে পারে না, তারাও গোস্ত খাবার সুযোগ পায়। দারিদ্র্য বিমোচনেও এর গুরুত্ব রয়েছে। কোরবানির চামড়ার টাকা গরিবের মাঝে বণ্টন করার মাধ্যমে গরিব-দুঃখী মানুষের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। অপরদিকে কোরবানির চামড়া অর্থনীতিতে একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে থাকে।



 



কোরবানির পশু জবেহ : ১. কোরবানিদাতা নিজের কোরবানির পশু নিজেই জবেহ করবেন, যদি তিনি ভালোভাবে জবেহ করতে পারেন। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে জবেহ করেছেন। আর জবেহ করা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জনের একটি মাধ্যম। তাই প্রত্যেকের নিজের কোরবানি নিজে জবেহ করার চেষ্টা করা উচিত। ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেছেন, 'আবু মুসা আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজের মেয়েদের নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেনো নিজ হাতে নিজেদের কোরবানির পশু জবেহ করেন।' (ফাতহুল বারী ১০/২১)।



২. কোরবানির পশু জবেহ করার দায়িত্ব নিজে না পারলে অন্যকে অর্পণ করা জায়েজ আছে। কেনোনা সহীহ মুসলিমের হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেষট্টিটি কোরবানির পশু নিজ হাতে জবেহ করে বাকিগুলো জবেহ করার দায়িত্ব আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে অর্পণ করেছেন। (সহীহ মুসলিম : ১২১৮)।



৩. কোরবানির পশু জবেহ করার সময় তার সাথে সুন্দর আচরণ করতে হবে, তাকে আরাম দিতে হবে। যাতে পশু কষ্ট না পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। হাদীসে এসেছে, শাদ্দাদ ইবন আউস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দুটি বিষয় আমি মুখস্থ করেছি, তিনি বলেছেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সকল বিষয়ে সকলের সাথে সুন্দর ও কল্যাণকর আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব তোমরা যখন হত্যা করবে তখন সুন্দরভাবে করবে আর যখন জবেহ করবে তখনও তা সুন্দরভাবে করবে। তোমাদের একজন যেন ছুরি ধারালো করে নেয় এবং যা জবেহ করা হবে তাকে যেনো প্রশান্তি দেয়। (সহীহ মুসলিম-১৯৫৫)।



৪. জবেহ করার সময় তাকবীর ও বিসমিল্লাহ বলা। হাদিসে এসেছে, জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, "আর তার কাছে একটি দুম্বা আনা হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে জবেহ করলেন এবং বললেন, 'বিসমিল্লাহ ওয়া আল্লাহু আকবার, হে আল্লাহ! এটা আমার পক্ষ থেকে এবং আমার উম্মতের মাঝে যারা কোরবানি করতে পারেনি তাদের পক্ষ থেকে।" (আবু দাউদ : ২৮১০)।



৫. জবেহ করার সময় যার পক্ষ থেকে কোরবানি করা হচ্ছে তার নাম উল্লেখ করে দোআ করা জায়েয আছে। এভাবে বলা, 'হে আল্লাহ তুমি অমুকের পক্ষ থেকে কবুল করে নাও।' হাদীসে এসেছে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির দুম্বা জবেহ করার সময় বললেন, 'আল্লাহর নামে, হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ ও তার পরিবার-পরিজন এবং তার উম্মতের পক্ষ থেকে কবুল করে নিন।' (মুসলিম- ১৯৬৭)।



৬. ঈদের সালাত আদায় ও খুৎবা শেষ হওয়ার পর পশু জবেহ করা। কেননা হাদীসে এসেছে, জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির দিন সালাত আদায় করলেন অতঃপর খুৎবা দিলেন তারপর পশু জবেহ করলেন।" (সহীহ আল-বুখারী : ৯৮৫)।



কোরবানির গোশত : ১. কোরবানির গোশত কোরবানিদাতা ও তার পরিবারের সদস্যরা খেতে পারবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, 'অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ, অভাবগ্রস্তকে আহার করাও।' (সূরা আল-হজ্জ : ২৮)।



২. ওলামায়ে কিরাম বলেছেন, কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে একভাগ নিজেরা খাওয়া, এক ভাগ দরিদ্রদের দান করা ও এক ভাগ উপহার হিসেবে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের দান করা মুস্তাহাব।



৩. কোরবানির গোশত যতেদিন ইচ্ছা ততোদিন সংরক্ষণ করে খাওয়া যাবে। কোরবানির গোশত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমরা নিজেরা খাও ও অন্যকে আহার করাও এবং সংরক্ষণ করো।" (সহীহ আল-বুখারী : ৫৫৬৯)।



৪. কোরবানির পশুর গোশত, চামড়া, চর্বি বা অন্য কোনো কিছু বিক্রি করা জায়েজ নেই। কসাই বা অন্য কাউকে পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির গোশত দেওয়া জায়েজ নয়। হাদিসে এসেছে, 'আর তা প্রস্তুতকরণে তা থেকে কিছু দেয়া হবে না।' (বুখারী -১৭১৬)।



 



কোরবানির সময়কাল



কোরবানির শেষ সময় হচ্ছে জিলহজ মাসের তের তারিখের সূর্যাস্তের সাথে সাথে। অতএব কোরবানির পশু জবেহ করার সময় হলো চারদিন। কোরবানি ঈদের দিন এবং ঈদের পরবর্তী তিনদিন অর্থাৎ জিলহজ মাসের দশ, এগার, বার ও তের তারিখ। এটাই ওলামায়ে কেরামের নিকট সর্বোত্তম মত হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে। কারণ, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, 'যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদের চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিযিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে। (সূরা আল-হাজ্ব : ২৮)। 'আইয়ামে তাশরীকের প্রতিদিন জবেহ করা যায়।' (মুসনাদ আহমদ- ৪/৮২)।



 



কার উপর কোরবানি আবশ্যক?



কোরবানির পশু জবেহ করতে আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর কোরবানি ওয়াজিব। সামর্থ্যবান কাকে বলা হবে এ বিষয়ে ওলামায়ে কিরামের মতপার্থক্য রয়েছে। ১. হানাফী মাযহাবের আলেমদের মতে, ব্যক্তিগত আসবাব পত্র ও ঈদের দিনগুলোর মধ্যে খাওয়া-দাওয়ার অতিরিক্ত যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের উপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। ২. একদল আলেমের মতে, ঈদের দিনগুলোতে কোরবানি পশু খরিদ করার মতো অর্থ যার কাছে রয়েছে সে কোরবানি আদায় করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস দ্বিতীয় মতটিকে শক্তিশালী করে। হাদীসে এসেছে 'যে কোরবানি করার মতো আর্থিক স্বচ্ছলতা লাভ করে সে যদি কোরবানি না করে তবে সে যেনো আমাদের ইদগাহে না আসে।'



 



কোরবানিদাতার করণীয়



১. শুধু কোরবানির গোশত খাওয়ার জন্যে কোরবানির পশু জবেহ করা নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার কোরবানি করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, "আর যে কেউ সালাতের পূর্বে নাহর করবে বা জবেহ করবে, সে তো তার পরিবারবর্গের জন্যে গোশতের ব্যবস্থা করলো, কোরবানির কিছু আদায় হলো না। (সহীহ বুখারী : ৯৬৫ )। ২. কোরবানিদাতা ঈদের চাঁদ দেখার পর স্বীয় চুল ও নখ কাটা থেকে কোরবানি করা পর্যন্ত বিরত থাকবেন। হাদীসে এসেছে, উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমাদের মাঝে যে কোরবানি করার ইচ্ছে করে সে যেনো জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।" ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ৩. কোরবানির দ্বারা পরিবেশ দূষিত হয় এমন কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সুতরাং পশুর রক্ত মাটি দ্বারা ঢেকে দেয়া, ময়লা, আবর্জনা সরিয়ে ফেলা একান্ত প্রয়োজন। আমিন।



লেখক : খতিব, কালেক্টরেট জামে মসজিদ, প্রভাষক (আরবি), মান্দারী আলিম মাদ্রাসা, চাঁদপুর।



 



 



 



 



 



 


এই পাতার আরো খবর -
    আজকের পাঠকসংখ্যা
    ৫৬৩৮৫০
    পুরোন সংখ্যা