চাঁদপুর। শুক্রবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮। ৬ আশ্বিন ১৪২৫। ১০ মহররম ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪১-সূরা হা-মীম আস্সাজদাহ,

৫৪ আয়াত, ৬ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৪৫। আমিতো মুসা (আঃ)কে কিতাব দিয়েছিলাম, অতঃপর এতে মতভেদ ঘটেছিলো। তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে পূর্ব সিদ্ধান্ত না থাকলে তাদের মীমাংসা হয়ে যেতো। তারা অবশ্যই এর সম্বন্ধে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছে।

৪৬। যে সৎ আমল করে সে নিজের কল্যাণের জন্যেই তা করে এবং কেউ মন্দ আমল করলে ওর প্রতিফল সেই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর বান্দাদের প্রতি কোনো জুলুম করেন না।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


দুঃখের একমাত্র মৌন ভাষাই হলো অশ্রু।

 -ভল্টেয়ার।


কাউকে অভিশাপ দেয়া সত্যপরায়ণ ব্যক্তির উচিত নয়।



 


ফটো গ্যালারি
আশুরার ইতিকথা
মাওঃ মোঃ মোশাররফ হোসাইন
২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


হিজরি বছরের প্রথম মাস মহররম। পবিত্র কুরআনে এ মাসের কথা উল্লেখ রয়েছে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে সূরা তাওবার ৩৬নং আয়াতে বর্ণিত যে মাসগুলোতে যুদ্ধ-বিগ্রহ হারাম করা হয়েছে তার মধ্যে মহররম অন্যতম। বহুবিধ কারণে এ মাসটি মুসলিম উম্মাহের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। স্বয়ং আল্লাহর রাসুল (সাঃ) নিজে এ মাসকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রমজানের পরে সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর প্রিয় মহররম মাসের সাওম এবং ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম সালাত হল রাতের নামাজ। অন্যদিকে মানবতার মুক্তির দিশারী, সকল নবী-রাসুলদের নেতা এবং আমাদের পথ প্রদর্শক হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ধরাবাসীর প্রতি তার দায়িত্ব অর্থাৎ মানুষকে শান্তির ধর্ম ইসলামের পথে আহ্বানের শুরু করেছিলেন মহররম মাসে। পবিত্র কুরআনে আরবি ১২ মাসের মধ্যে মহরম, রজব, জিলক্বদ ও জিলহজ্জ মাসকে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়েছে এবং কুরআনের জীবন্ত ব্যাখ্যা গ্রন্থ অর্থ্যাৎ বিভিন্ন হাদিস শরীফে এ মাসগুলোর স্বতন্ত্র ফযিলত বর্ননা করা হয়েছে। মহররম মাসের ১০ তারিখ গোটা মুসলিম বিশ্বের কাছে পবিত্র আশুরা নামে পরিচিত। আশুরা ও মহররম শব্দদ্বয় শ্রবণের সাথে সাথে আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে এক ভয়ংকর, বীভৎস, নিষ্ঠুর, নির্মম ও ইসলামের ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নয়নের পুতুলী, কলিজার টুকরা, খাতুনে জান্নাত নবীনন্দিনী হযরত ফাতেমা (রাঃ)-এর আদরের দুলাল হযরত হোসাইনের কারবালার প্রান্তরে শাহাদাতের মর্মন্তুদ ঘটনা; যা এ পৃথিবীর এক করুণ ইতিহাস। বিশ্বের সকল মুসলিম নরনারী আজও ধর্মীয় রীতিনীতির মাধ্যমে দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ করে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর ওফাতের মাত্র পঞ্চাশ বছর পর ফোরাতের তীরে কারবালার কংকরময় প্রান্তরে মুহাম্মদ (সাঃ)-এর অন্যতম প্রিয় দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রাঃ) স্বপরিবারে তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে মোয়াবিয়া পুত্র ইয়াজিদের হাতে শাহাদাৎ বরণ করেন। এ অধ্যায়কে ইসলামের ইতিহাসে আজও বেদনার রক্তদিয়ে লেখা রয়েছে। তবে কারবালার এ করুন ট্র্যাজেডির পরেই ইসলাম নবরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে বলেই ইসলামী স্কলারদের বিশ্বাস। তাদের মতে কারবালার ত্যাগের পরেই ইসলাম জিন্দা হয়েছে। কারবালাই মুসলমানদের শিক্ষা দিয়ে গেছে, মর্সিয়া কিংবা ক্রন্দন নয় বরং ত্যাগ চাই।



মুসলামানদের কাছে আশুরার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য ব্যাপক। প্রিয় নবী (সাঃ) তাঁর অতি আদরের দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রাঃ) ফোরাতের উপকূলে ইয়াজিদ বাহিনী কর্তৃক আহলে বাইতসহ কারবালার কংকরময় প্রান্তরে শাহাদাতের ঘটনাকেই আমরা মহররম ও আশুরার একমাত্র ঐতিহাসিক ঘটনা বলে মনে করে থাকি। মূলত আশুরার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের সাথে শুধু কারবালার নিষ্ঠুরতার ঘটনাই জড়িত নয় বরং কারবালার আহলে বাইতের শাহাদাতের ঘটনা আশুরার শেষ ও চূড়ান্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা মাত্র। ইসলামের ইতিহাস অনুসারে এ দিনটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এ দিনটি একটি পবিত্র দিন কেননা এ দিনেই আসমান ও যমিন সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই দিনে পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়েছে। ১০ই মহররম আল্লাহ নবীদেরকে স্ব স্ব শত্রুর হাত থেকে আশ্রয় প্রদান করেছেন। এই দিনে নবী মুসা (আঃ)-এর শত্রু ফেরাউনকে নীল নদে ডুবিয়ে দেয়া হয়। হযরত নুহ (আঃ)-এর কিস্তি ঝড়ের কবল হতে রক্ষা পেয়েছিল এবং তিনি জুদি পর্বতশৃঙ্গে নোঙ্গর ফেলেছিলেন এই দিনেই। এই দিনে হযরত দাউদ (আঃ)-এর তওবা কবুল হয়েছিলো, নমরুদের কবল থেকে হযরত ঈব্রাহীম (আঃ) উদ্ধার পেয়েছিলেন, হযরত আইয়ুব (আঃ) দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত ও সুস্থতা লাভ করেছিলেন। এদিনে হযরত ঈসা (আঃ) কে আল্লাহ তায়ালা উর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে যে ১০ই মহররম কেয়ামত সংগঠিত হবে (আল হাদীস)।



হিজরি ৬০ সনে পিতার মৃত্যুর পর ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া নিজেকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসাবে ঘোষণা করে। অথচ ইয়াজিদ প্রকৃত মুসলমান ছিলো না বরং মোনাফেক ছিলো। সে এমনই পথভ্রষ্ট ছিল সে ইসলামে চিরতরে নিষিদ্ধ মধ্যপানকে সে বৈধ ঘোষণা করেছিল। অধিকন্তু সে একই সাথে দুই সহোদরাকে বিবাহ করাকেও বৈধ ঘোষণা করেছিলো। শাসক হিসেবে সে ছিল স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী। এ সকল কারণে হযরত হোসাইন (রাঃ) শাসক হিসেবে ইয়াজিদকে মান্য করতে অস্বীকৃতি জানান এবং কূফাবাসীর আমন্ত্রন ও ইসলামের সংস্কারের লক্ষ্যে মদীনা ছেড়ে মক্কা চলে আসেন। এখানে উল্লেখ্য যে, উমাইয়াদের শাসনামালে ইসলাম তার মূল গতিপথ হারিয়ে ফেলেছিলো। হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কারবালার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এ সময় উমর ইবনে সাদ আবি ওক্কাসের নেতৃত্বে চার হাজার সৈন্য কারাবালায় প্রবেশ করে। কয়েক ঘন্টা পর ইসলামের জঘন্য দুশমন শিমার ইবনে জিলজুশান মুরাদির নেতৃত্বে আরো বহু নতুন সৈন্য এসে আবি ওক্কাসের বাহিনীর সাথে যোগ হয়। অবশেষে বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। এ যুদ্ধ সত্য এবং মিথ্যার দ্বন্দ্বের অবসান ঘটানোর সংগ্রাম। কারবালায় দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এই অসম যুদ্ধে ইমাম হোসাইন (রাঃ) এবং তার ৭২ জন সঙ্গী শাহাদৎ বরণ করেন। শিমার ইবনে জিলজুশান মুরাদি নিজে ইমাম হোসাইনের কণ্ঠদেশে ছুড়ি চালিয়ে তাকে হত্যা করে। আর সে বেদনাহত দিনটা ছিল হিজরি ৬১ সালের ১০ই মহররম। (তথ্যসূত্র-উইকিপিডিয়া)



ইহুদীরা আশুরা উপলক্ষে মুহাররম মাসের ১০ তারিখে রোজা রাখে। শিয়া সমপ্রদায় মর্সিয়া ও মাতমের মাধ্যমে এই দিনটি উদযাপন করে। আশুরা উপলক্ষে ৯ এবং ১০ মুহররম তারিখে অথবা ১০ এবং ১১ মুহররম তারিখ রোজা রাখা সুন্নত। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এ তারিখে রোজা পালন করতেন তবে তাঁর সাহাবীদেরকে পালন করতে আদেশ দেননি। এছাড়া মুসলমানরা এদিন উত্তম আহারের চেষ্টা করে। মহররম বা আশুরা আজ গোটা মুসলিম বিশ্বে উদাযাপিত হচ্ছে কিন্তু এর মূল শিক্ষা ও তাৎপর্যকে হারিয়ে আজ আমরা এ দিবসটিকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিকৃতভাবে পালন করছি। আজকে আমাদের অবস্থা হয়েছে সমাজ বিজ্ঞানের জনক ইবনে খালদুন উচ্চারিত উক্তির মত। তিনি বলেছেন, 'বিশ্বের যে ঘটনা যত বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যে ব্যক্তি যত বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, সে ঘটনা ও ব্যক্তিত্ব তত বেশি কিংবদন্তি ও রূপকথার আবরণে আচ্ছাদিত এবং তত বেশি ভূল বুঝাবুঝিতে নিমজ্জিত (কিতাবুল হবার মুকাদ্দামায়ে ইবনে খালদুন)। জার্মান কবি গ্যাটে বলেছেন, ইতিহাসের যে ঘটনা ও ব্যক্তিত্ব যত বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা তত বেশি রুপকথার প্রলেপে আচ্ছাদিত। তেমনিভাবে আশুরা ও কারবালার ঘটনা নিয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন হয়েছে কিংবা আজও হচ্ছে। তাযিমের নামে শিয়া সমপ্রদায় ১০ই মহররমের দিন যা করে তা প্রকৃতপক্ষেই বাড়াবাড়ি। মাত্র একদিনের জন্যে শরীরের রক্ত বের করে বাকী দিনগুলোতে আশুরার মহত্ত্বকে ভূলে থাকা ইসলামের আদর্শ হতে পারে না। ইসলামের জন্যে এভাবে রক্ত দিতে হবে এটা ইসলাম কামনা তো দূরের কথা গ্রহণই করে না।



কারবালার হৃদায়বিদারক ঘটনায় মুসলমানদের জন্যে ব্যাপক শিক্ষা রয়েছে। (ক) কারবারার ঘটনা মুসলমানদেরকে মিথ্যার সাথে আপস না করা এবং সত্যের পতাকাকে সমুন্নত রাখার চেতনাকে জাগ্রত রাখার শিক্ষা প্রদান করে। মহানবী (সাঃ)-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রাঃ)-এর আহলে বাইত ফোরাত নদীর উপকূলে কারবালার প্রান্তরে শাহাদাতের ঐতিহাসিক ঘটনার প্রথম শিক্ষা হচ্ছে একজন প্রকৃত সত্যাশ্রয়ী নিষ্ঠাবান খাঁটি মুমিন ও মর্দে মুজাহিদ কখনও অন্যায়ের সাথে আপস করে না। প্রিয় নবী (সাঃ)-এর চিরন্তন বানী, আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সকল অবস্থায় সত্য কথা বলা আর সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কোন নির্যাতন ও অপবাদকারীর অপবাদ ও নির্যাতনের ভয় না করা। হযরত হোসাইন (রাঃ) কারাবালা প্রান্তরে নিজের জীবন ও স্বল্প দুধের শিশু আব্দুল্লাহ (আজগর) কে এবং কিশোর কাসেমসহ ৭২ জন আইলে বাইতের কারবালার কংকরময় প্রান্তরে তাজা খুনে রঞ্জিত করে কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহের সত্যের পতাকাকে সমুন্নত করার লক্ষ্যে আল্লাহ পরিপূর্ণ দ্বীনকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা ও রাখার উদ্দেশ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে জীবন বিলিয়ে দেওয়ার চেতনার ও প্রেরণাকে চির জাগ্রত রেখে গেছেন। (খ) কারবালার ঘটনা পরিপূর্ণ দ্বীন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত জিহাদের শিক্ষা দেয়। (গ) অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্বে সংগ্রামের চেতনা জাগ্রত করে (ঘ) কারবালার অন্যতম শিক্ষা হলো, অসৎ নেতৃত্বের পরিবর্তে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ঈমানের দাবি। হযরত হোসাইন (রাঃ) কারবালার নির্মম শাহাদাৎ মূলত অসৎ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নিছক রাজনৈতিক আন্দোলন বা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার আলোচনা নয় বরং প্রতিটি মুসলিম উম্মাহের জন্যে ঈমানের অপরিহার্য দাবি, এ সত্যের মহান শিক্ষা ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রেখে গেছেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপদে আল্লাহর পরিপূর্ণ দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও ঈমানদার, মুত্তাকী, সৎ কর্মশীল ও যোগ্যতম ব্যক্তিদেরকে নিজেদের শাসক ও নেতা হিসাবে নির্বাচিত করা মুসলিম উম্মাহের জন্যে নামায ও রোজার মতো ফরযে আইন; এ মহান চেতনা হযরত হোসাইন (রাঃ) এবং আহলে বাইত নিজেদের জীবন বিলিয়ে জাগ্রত রেখেছেন। (ঙ) কারবালার ঘটনা জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে জিহাদ, ত্যাগ ও কুরবানীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। (ঙ) কারবালার ঘটনাই প্রকৃত জয়-পরাজয়ের দৃষ্টিভঙ্গির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ৬১ হিজরির ১০ই মহররম কারবালায় ইমাম হোসাইন (রাঃ) মুসলিম উম্মাহের কাছে জয় পরাজয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও তাৎপর্য সম্বলিত উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। ইয়াজিদের সেনাবাহিনী যুদ্ধের ময়দানে জয়ী অথচ মুমিনের হৃদয় রাজ্যে হযরত হোসাইন (রাঃ) বিজয়ের মর্যাদায় ভুষিত ও অধিষ্ঠিত রয়েছেন। আজকের মুসলিম উম্মাহের মধ্যে হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ)-এর সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ইয়াজিদ এর নামের সাথে কোন মুসলামনই রাদিআল্লাহু পাঠ করে না। আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদকে কেউ রাহমাতুল্লাহ বলে না। অথচ হযরত হোসাইন (রাঃ)-এর শাহাদাতের আজ প্রায় দেড় হাজার বছর পরেও প্রতিটি মুসলিমের হৃদয় বিগলিত, প্রতিটি নয়ন থেকে অশ্রু নির্গত হয়। প্রতিটি মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু শব্দ উচ্চারিত হয়। অন্যদিকে ইয়াজিদকে ও আব্দুল্লাহকে স্মরণে প্রতিটি ব্যক্তি ধিক্কার প্রদান করে। মানুষের হৃদয় রাজ্যে যিনি জয়ের আসনে অধিষ্ঠিত হন তিনিই সত্যিকারের বিজয়ী। আল্লাহর পথে জীবন দিয়ে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করে যারা বিনা হিসাবে জান্নাত প্রাপ্তির নিশ্চয়তা লাভ করে তারাই তো সত্যিকারের বিজয়ী। তাদের বিজয়-ই-তো সবচেয়ে বড় বিজয়। প্রকৃতপক্ষে কারবালার এ হৃদয়বিদারক ঘটনা যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহের সামনে সত্যের পথে জিহাদের চেতনাকে সমুন্নত রেখেছে।



মহররমের ১০ তারিখ। দিনটিকে বলা হয় ইয়াউমুল আশুরা। এদিনে নির্মমভাবে শহীদ হন নবী (সাঃ)-এর আদরের নাতি হযরত হোসাইন (রাঃ)। এছাড়া আরও অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা দিনটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ কারণে পবিত্র আশুরার দিনটি মুসলমানদের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ। হাদিসের প্রায় সব কিতাবে মহররম মাসের ফজিলত এবং এ মাসের ১০ তারিখ আশুরার রোজা সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) থেকে বর্ণিত একাধিক হাদিস রয়েছে। পবিত্র কোরআনের সূরা তওবার ৩৬নং আয়াতে আল্লাহপাক চারটি মাসকে সম্মানিত উল্লেখ করে এ মাসগুলোতে পরস্পর অন্যায় ও অবিচার থেকে বিরত থাকতে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলামপূর্ব যুগেও এ মাসগুলোতে যুদ্ধবিগ্রহ থেকে মানুষ বিরত থাকত। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, রমজানের রোজার পর মহররম মাসের রোজা আল্লাহপাকের কাছে সবচেয়ে বেশি ফযিলতময়। (মুসলিম)



মক্কায় থাকাকালে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে আশুরার দিন রোজা রাখতেন, তবে কাউকে আদেশ করেননি। মদিনায় হিজরতের পর যখন তিনি ইহুদিদের এ মাসের ১০ তারিখে রোজা রাখতে দেখলেন তখন তিনি এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। ইহুদিরা জানাল, এ মাসের ১০ তারিখে আল্লাহপাক মূসা (আঃ)-কে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এ তারিখেই ফেরাউন ডুবে মরেছিল। হজরত মূসা নবী এ দিনটিতে রোজা রাখতেন। রাসূল (সাঃ) তখন বললেন, আমরাও মূসা নবী আলাইহিস সালামের অনুসরণ করব। তোমাদের চেয়ে আমাদের অধিকার বরং বেশি। তিনি তখন থেকে মহররমের ১০ তারিখ রোজা রাখা শুরু করলেন এবং সবাইকে নির্দেশ দিলেন। (বুখারি)



রাসূল (সাঃ) বলেছেন, আশুরার দিন রোজা রাখার কারণে আল্লাহপাক বান্দার বিগত এক বছরের গোনাহসমূহ মাফ করে দেন। (মুসলিম)। মুসলিম শরিফের বর্ণনায় জানা যায়, ইন্তেকালের আগের বছর রসুল (সাঃ) ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, যদি আমি আগামী বছর বেঁচে থাকি তবে ৯ তারিখেও রোজা রাখব। এজন্যেই আশুরার রোজার সঙ্গে সঙ্গে এর আগের দিন রোজা রাখাকে মুস্তাহাব বলেছেন উলামায়ে কেরাম। প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ হাফেজ ইবনে হাজার হজরত ইবনে আব্বাসের বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যাতে রাসূল (সাঃ) বলেছেন. তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো। তবে এতে যেন ইহুদিদের সঙ্গে সামঞ্জস্য না হয়ে যায়। এ জন্যে এর সঙ্গে মিলিয়ে আগের দিন কিংবা পরের দিনসহ রোজা পালন করো।



আশুরার দিনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে আলোচিত হাদিস ও ঘটনাবলি দ্বারা সহজেই অনুমেয়। এর গুরুত্ব ও ফজিলত কারবালার ঘটনার বহুকাল আগে থেকেই বিদ্যমান। কিন্তু রূঢ় হলেও সত্য যে, ঐতিহাসিক ঘটনাবলি না জানার কারণে অনেকে আশুরার দিনকে শুধু কারবালার বেদনাদায়ক ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে আসল ফজিলত ও মর্যাদা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। আশুরার দিনে নফল নামাজ, তেলাওয়াতে কোরআন, রোজাদারদের ইফতারি করানো এবং সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবার-পরিজনদের জন্যে প্রয়োজনের তুলনায় অধিক পরিমাণ খরচ করাও সওয়াব। এছাড়া নিজের গোনাহ ও পাপ কাজের জন্যে বিনয় সহকারে বেশি বেশি করে তওবা ইস্তিগফার করা। কারণ এ মাসে তওবা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।



 



বছরের কোন্ দিনটি আশুরার দিন



আল্লামা নববি (রহঃ) বলেন, তাসুআ, আশুরা দু'টি মদ্দযুক্ত নাম। অভিধানের গ্রন্থাবলীতে এটিই প্রসিদ্ধ। আমাদের সাথীরা বলেছেন, আশুরা হচ্ছে মহররম মাসের দশম দিন। আর তাসুআ সে মাসের নবম দিন। জমহুর ওলামারাও তা-ই বলেছেন। হাদিসের আপাতরূপ ও শব্দের প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক চাহিদাও তাই। ভাষাবিদদের নিকট এটিই প্রসিদ্ধ। (আল-মজমূ) এটি একটি ইসলামি নাম, জাহেলি যুগে পরিচিত ছিল না। (কাশ্শাফুল কান্না' ২য় খ-, সওমুল মুহররম) ইবনু কোদামাহ (রহঃ) বলেন, আশুরা মহররম মাসের দশম দিন। এটি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব ও হাসান বসরি (রহঃ)-এর মত। কারণ আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরা-মহররমের দশম দিনে রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। (বর্ণনায় তিরমিজি, তিনি বলেছেন, হাদিসটি হাসান সহিহ)



 



মাসের শুরু অস্পষ্ট হয়ে গেলে করণীয় কি?



ইমাম আহমদ (রহঃ) বলেন, মাসের শুরু নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে কিংবা সেটি অস্পষ্ট হয়ে গেলে সে মাসে আশুরার রোজা তিনদিন রাখা হবে। আর এমনটি করা হবে কেবল নয় ও দশ তারিখের রোজাকে নিশ্চিত করার জন্যে। (আল-মুগনি লি ইবনে কোদামাহ, ৩য় খ-, সিয়ামু আশুরা) সুতরাং যে ব্যক্তি মুহররম মাসের আগমণ সম্বন্ধে বুঝতে পারেনি এবং সে দশ তারিখের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতে ইচ্ছুক তাহলে সে নিয়মমত জিল হজ্জকে ত্রিশ দিন গণনা করবে। অত:পর নয় ও দশ তারিখ রোজা রাখবে। আর যে ব্যক্তি নয় তারিখের ব্যাপারেও সাবধানতা অবলম্বন করতে চাইবে সে আট, নয় ও দশ তারিখ মোট তিন দিন রোজা রাখবে। (এখন যদি জিল হজ্জ মাস নাকেস অর্থাৎ ত্রিশ দিন থেকে কম হয় তাহলে সে নিশ্চিত তাসুআ ও আশুরার রোজা রাখতে সক্ষম হবে) তবে এখানে মনে রাখা দরকার, আশুরার রোজা কিন্তু মুস্তাহাব ফরজ নয়। তাই লোকদেরকে রমজান ও শাওয়াল মাসের মত মুহররম মাসের চাঁদ তালাশ করার নির্দেশ দেয়া হবে না।



 



তাসুআর রোজা মুস্তাহাব হবার হিকমত



ইমাম নববি (রহঃ) বলেন, তাসুআ তথা মহররমের নয় তারিখ রোজা মুস্তাহাব হবার হিকমত ও উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে প্রাজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন, এক. এর উদ্দেশ্য হল, ইহুদিদের বিরোধিতা করা। কারণ তারা কেবল একটি অর্থাৎ দশ তারিখ রোজা রাখত। দুই. আশুরার দিনে কেবলমাত্র একটি রোজা পালনের অবস্থার উত্তরণ ঘটিয়ে তার সাথে অন্য একটি রোজার মাধ্যমে সংযোগ সৃষ্টি করা। যেমনিকরে এককভাবে জুমুআরা দিন রোজা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। এটি আল্লামা খাত্তাবি ও অন্যান্যদের মত। তিন. দশ তারিখের রোজার ক্ষেত্রে চন্দ্র গণনায় ত্রুটি হয়ে ভুলে পতিত হবার আশংকা থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে। হতে পারে গণনায় নয় তারিখ কিন্তু বাস্তবে তা দশ তারিখ।



এর মধ্যে সর্বাধিক শক্তিশালী তাৎপর্য হচ্ছে, আহলে কিতাবের বিরোধিতা করা। শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রহঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহু হাদিসে আহলে কিতাবদের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন। যেমন আশুরা প্রসঙ্গে নবীজী বলেছেন, আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে অবশ্যই নয় তারিখ রোজা রাখব। (আল-ফতোয়াল কোবরা, খ- : ৬)।



 



আশুরার রোজা কোন ধরনের পাপের জন্যে কাফ্ফারা?



ইমাম নববি (রহঃ) বলেন, আশুরার রোজা সকল সগিরা গুনাহের কাফ্ফারা। অর্থাৎ এ রোজার কারণে মহান আল্লাহ কবিরা নয় বরং (পূর্ববর্তী একবছরের) যাবতীয় সগিরা গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। এর পর তিনি বলেন, আরাফার রোজা দুই বছরের (গুনাহের জন্যে) কাফ্ফারা, আশুরার রোজা এক বছরের জন্যে কাফ্ফারা, যার আমীন ফেরেশতাদের আমীনের সাথে মিলে যাবে তার পূর্ববর্তী গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে হাদিসে বর্ণিত এসব গুনাহ মাফের অর্থ হচ্ছে, ব্যক্তির আমলনামায় যদি সগিরা গুনাহ থেকে থাকে তাহলে এসব আমল তার গুনাহের কাফ্ফারা হবে অর্থাৎ আল্লাহ তার সগিরা গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর যদি সগিরা-কবিরা কোনো গুনাহই না থাকে তাহলে এসব আমলের কারণে তাকে সাওয়াব দান করা হবে, তার দরজাত বুলন্দ করা হবে। আর আমলনামায় যদি শুধু কবিরা গুনাহ থাকে সগিরা নয় তাহলে আমরা আশা করতে পারি, এসব আমলের কারণে তার কবিরা গুনাহসমূহ হালকা করা হবে। (আল-মাজমূ শারহুল মুহাযযাব, ষষ্ঠ খ-, সওমু য়াওমি আরাফা)



 



রমজানের কাজা অনাদায়ি থাকা অবস্থায় আশুরার রোজার হুকুম কি?



রমজানের কাজা আদায় না করে নফল রোজা রাখা যাবে কিনা এ ব্যাপারে ওলামাদের মাঝে এখতেলাফ আছে। হানাফিদের নিকট জায়েয। কেননা রমজানের কাজা সম্পন্ন করা তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াজিব নয়। বিলম্বে সম্পন্ন করার অবকাশ আছে। শাফেয়ি ও মালেকিদের নিকটও জায়েয তবে মাকরূহ হবে। কারণ এতে ওয়াজিব আদায় বিলম্বিত হয়। আল্লামা দুসূকি (রহঃ) বলেন, মান্নত, কাজা ও কাফ্ফারা জাতীয় ওয়াজিব রোজা অনাদায়ি রেখে নফল রোজা পালন করা মাকরূহ। সে নফল রোজাটি গাইরে মুআক্কাদাহ হোক কিংবা মুআক্কাদাহ যেমন আশুরা, জিল হজ্জের নয় তারিখের রোজা ইত্যাদি। হাম্বলি ইমামগণের মতে রমজানের কাজা আদায় করার পূর্বে নফল রোজা পালন করা হারাম। এমতাবস্থায় কেউ নফল রোজা রাখলে সহিহ হবে না এমনকি পরবর্তীতে কাজা আদায় করার মত পর্যাপ্ত সময় থাকলেও। বরং আগে ফরজ আদায় করতে হবে। সুতরাং প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে, রমজানের



পরপরই বিলম্ব না করে কাজা সম্পন্ন করে নেওয়া। যাতে কোনোরূপ সমস্যা ছাড়াই আরাফা ও আশুরার রোজা পালনের সুযোগ পাওয়া যায়। কেউ যদি আরাফা ও আশুরার রোজায় কাজা আদায়ের নিয়ত করে এবং এ নিয়ত রাত্র হতেই করে-তাহলে সেটি তার জন্যে যথেষ্ট হবে। অর্থাৎ তার কাজা আদায় হয়ে যাবে। আল্লাহর করুণা অনেক বিশাল।



মহররম মাসের ১০ তারিখ আশুরার দিনটি হজরত মুসা আলাইহিস সালাম ও তার সঙ্গী-সাথীদের জন্যে বিজয়ের দিন হলেও এ দিনেই ঘটেছে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয় বিদরাক ও মর্মান্তিক কারবালা ঐতিহাসিক ঘটনা। আল্লাহর জমিনে দ্বীন তথা উত্তম প্রতিষ্ঠায় ইসলামের অগ্রসেনানী হজরত হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর এ আত্মত্যাগ এক মহাঅনুপ্রেরণা। মুসলিম উম্মাহর উচিত, আশুরার ঐতিহাসিক তাৎপর্য, গুরুত্ব ও ফজিলত অর্জনে সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করা। আল্লাহ তা'আলা মুসলিম উম্মাহকে দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আশুরার সকল ঘটনাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।



 



লেখক : খতিব,



কালেক্টরেট জামে মসজিদ ও আরবি প্রভাষক, মান্দারী আলিম মাদ্রাসা, চাঁদপুর।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৩০৭৮৫৫
পুরোন সংখ্যা