চাঁদপুর । শুক্রবার ১৩ জুলাই ২০১৮ । ২৯ আষাঢ় ১৪২৫ । ২৮ শাওয়াল ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৯-সূরা আয্-যুমার

৭৫ আয়াত, ৮ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৪৪। বল, ‘সকল সুপারিশ আল্লাহরই ইখতিয়ারে, আকাশম-লী ও পৃথিবীর সর্বময় কর্তৃত্ব আল্লাহরই, অতঃপর তাঁহারই নিকট তোমরা প্রত্যানীত হইবে’।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


দুষ্ট লোকেরা তাদের গড়া নরকেই বাস করে।

 টমাস ফুলার।


যারা অতি অভাবগ্রস্ত, দীন-দরিদ্র, কেবল তারা ভিক্ষা করতে পারে।



                       


ফটো গ্যালারি
যাকাত ও ইসলামী আর্থিক জীবনবোধ
মোঃ জাকির হোসেন
১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


যাকাত ও ইসলামী আর্থিক জীবনবোধ সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে অর্থনীতি সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন। অর্থনীতির বিষয়বস্তু হচ্ছে, উপায়-উপকরণের সীমাবদ্ধতা এবং সম্পদের বহুমুখী ব্যবহার থেকে উদ্ভূত অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে অধ্যায়ন করা, এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে অধ্যায়ন ও পর্যালোচনা এবং ক্ষেত্রবিশেষ মানুষের বস্তুগত জীবনের উন্নয়নের পন্থা ও উপায় নির্দেশ করা।



ইসলামী অর্থনীতি সম্পর্কে মুসলিম অর্থনীতিবিদগণের আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাশ্চাত্য অর্থনীতি থেকে স্বতন্ত্র ধারণা, পদ্ধতি, আওতা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে উদ্ভূত জ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে মানুষের মর্যাদা, ভূমিকা, তার প্রত্যাবর্তন ও গন্তব্যস্থল সম্বন্ধে কতগুলো অপরিহার্য্য ধারণা থেকে ইসলামী অর্থনীতির যাত্রা শুরু। শরীয়তের সীমালঙ্গন না করে অধিকতর সম্পদ অর্জনের চেষ্টা-সাধনা একটি মহৎ কাজ।



ইসলামী অর্থনীতির পদ্ধতি সমূহ ও প্রাশ্চাত্য অর্থনীতির পদ্ধতিসমূহ থেকে ভিন্নতর। যার মৌলিক ধারণা প্রধানত আল-কুরআন এবং হাদীস থেকে পাওয়া যায়। ইসলামী অর্থনীতি ফালাহ বা কল্যাণ সাধনের উপায় সম্পর্কে অধ্যায়ন ও প্রস্তাবনা পেশ করে। যাতে পৃথিবীতে বস্তুগত উন্নত জীবন এবং সাথে সাথে আখেরাতের সফল জীবন সম্পর্কে বলা হয়েছে। স্পষ্টতই এটা তুলানামুলকভাবে অত্যন্ত ব্যপক অধ্যায়ন ও গবেষণা ক্ষেত্র। ২১ শতকের শুরুতে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে, তাতে মুসলিম ও অমুসলিম সকল অর্থনীতিবিদগণেরই ইসলামী অর্থনীতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।



 



যাকাতের অর্থ ও গুরুত্ব :



যাকাত শব্দের আভিধানিক অর্থ বৃদ্ধি বা পবিত্রতা, যাকাত দানে, যাকাত দাতার সম্পদ কমে না, বরং বৃদ্ধি পায় এবং তার অন্তর কৃপণতার কলুষতা থেকে পবিত্রতা লাভ করে। অন্যদিকে যাকাত গ্রহীতার অন্তর হিংসা-বিদ্ধেষ থেকে মুক্ত হয়। তাই এর নামকরণ করা হয়েছে যাকাত। ইসলামের পরিভাষায় শরীয়াতের নির্দেশ ও নির্ধারণ অনুযায়ী কোন ব্যক্তির নিজ মালের একটি নির্দিষ্ট অংশের স্বত্বাধিকার কোন অভাবী লোকের প্রতি অর্পণ করাকে যাকাত বলা হয়।



উল্লেখিত দু'টি অর্থের প্রেক্ষিতে যাকাত এমন একটি ইবাদতকে বলা হয়েছে, যা প্রত্যেক সাহেবে নিসাব বা যাকাত প্রদানে সামর্থবান মুসলিমের ওপর এ উদ্দেশ্যে ফরজ করা হয়েছে যে, আল্লাহ ও বান্দার হক আদায় করে তার অর্থ সম্পদ পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করা এবং তার নিজের আত্মা ও সমাজ কৃপনতা, স্বার্থান্ধতা, হিংসা-বিদ্ধেষ প্রভৃতি অসৎ প্রবণতা থেকে মুক্ত হবে এবং তার মধ্যে প্রেম ভালবাসা, ঔদার্য, কল্যাণ কামনা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহানুভূতির গুণাবলী বৃদ্ধি পাবে।



 



ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে যাকাত হচ্ছে তৃতীয় মহান আল্লাহতা'লা মুসলিমদের জন্য যাকাত আদায় করা ফরজ বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে 'তোমরা সালাত কায়েম কর ও যাকাত আদায় কর এবং যারা রুকু করে তাদের সাথে রুকু কর' (সূরা আল বাকারাহ, ২:৪৩)।



'মুসলিম নর ও নারী একে অপরের বন্ধু তারা পরস্পরকে সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজে নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে' (সূরা আত-তাওবা ৯ : ৭১)। এছাড়া মহান আল্লাহ আরো অনেক আয়াতে যাকাত সম্পর্কে আলোচনা করেছেন (১)



সূরা (২) আল বাকারাহ, আয়াত : ৮৩, ১১০, ১৭৭, সূরা (৫) আল মায়িদাহ, আয়াত :১২, ৫৫, সূরা (৬) আল আনআম, আয়াত : ১৪১, সূরা (২২) আলহাজ্জ, আয়াত :৪১,৭৮, সূরা (৩৩) আল আহজাব, আয়াত : ৩৩, সূরা (৫৮) আল মুজাদালাহ, আয়াত :১৩, সূরা (৭৩) আল মুজাম্মিল, আয়াত :২০, সূরা (৯২) আল লায়ল, আয়াত :৫।



মহানবী (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ইসলামের ভিত্তি ৫টি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। "আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল- এই বলে স্বাক্ষ্য দেয়া, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ থাকলে হজ্ব পালন করা এবং রমজান মাসের সিয়াম পালন করা' (বোখারী ও মুসলিম)।



ইবনু আব্বাসের মুক্ত গোলাম আবূ মা'বাদ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আব্দুল্লাহ আবনু আব্বাস (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, যখন নাবী (সাল্লাল্লাহু



আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মু'আয আবনু জাবাল (রাঃ) কে ইয়ামান পাঠালেন, তখন তিনি তাঁকে বললেন, তুমি আহলে কিতাবদের একটি কাওমের কাছে যাচ্ছ। অতএব, তাদের প্রতি তোমার প্রথম আহবান হবে- তারা যেন আল্লাহর একত্ববাদকে মেনে নেয়। তারা তা মেনে নিলে তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, আল্লাহ দিনে রাতে তাদের প্রতি পাঁচ বার সালাত ফরজ করে দিয়েছেন। যখন তারা সালাত আদায় করবে, তখন তুমি তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, তাদের ধন-সম্পদে আল্লাহ তাদের প্রতি যাকাত ফরজ করেছেন। তা তাদেরই ধনশালীদের থেকে গ্রহণ করা হবে। আবার তাদের ফকিরদেরকে তা দেয়া হবে। যখন তারা স্বীকার করে নেবে, তখন তাদের থেকে গ্রহণ কর। তবে লোকজনের ধন-সম্পদের উত্তম অংশ গ্রহণ করা থেকে বেঁচে থাক। (সহীহুল বোখারী-১৩৯৫, ৭৩৭২, আ.প্র.-৬৮৫৬, ই.ফা.-৬৮৬৮)



রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেছেন, 'আমাদের আদেশ দেয়া হয়েছে সেসব লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল-এই বলে সাক্ষ্য দেয়া, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা' (বোখারী ও মুসলিম)।



অর্থাৎ যাকাত ধনীদের নিকট থেকে আদায় করে দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করা হয় বলে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় ধনী দরিদ্রের মধ্যে আয় বৈষম্য দূর করণের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসাবে গণ্য করা যায়, যা আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত অর্থাৎ যাকাত ব্যবস্থার সাথে ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা নিবিড়ভাবে জড়িত।



 



যাকাতের উদ্দেশ্য :



মহান আল্লাহ বলেন, 'হে রাসূল আপনি তাদের মালামাল থেকে সদকা/যাকাত গ্রহণ করুন। যাতে তা দিয়ে আপনি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন এবং আপনি তাদের জন্য দোয়া করবেন। নিশ্চয়ই আপনার দোয়া তাদের জন্য বিরাট প্রশান্তি বিশেষ। আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ' (সূরা আত্ তাওবা, আয়াত-৯:১০৩) ।



'ধনীদের সম্পদে যাঞ্চকারী ও বঞ্চিতদের হক (অধিকার) আছে'। (সূরা-আয যারিয়াত, আয়াত-৫১:১৯, সূরা আল মা'আরিজ, আয়াত ৭০: ২৪, ২৫)।



'যারা আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করে তাদের খরচের দৃষ্টান্ত হচ্ছে একটি শস্য বীজের মত, যে বীজ থেকে সাতটি শীষ বের হয় এবং প্রত্যেকটি শীষে ১০০টি দানা এবং আল্লাহ যার আমলকে চান এভাবেই বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহতো সীমাহীন ব্যাপকতার অধিকারী ও জ্ঞানী" (২ঃ২৬১)।



আল্লাহর বিধান মতে ধনীদের সম্পদকে পবিত্র, পরিশুদ্ধ ও বৃদ্ধি করার জন্য তাদের নিকট থেকে যাকাত আদায় করে তা দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করা হয়। যার ফলে দরিদ্রের দারিদ্রতা হ্রাস পায় এবং ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় ধনী দরিদ্রের ব্যবধানে দূর হয়। যাকাতের মাধ্যমে যে যাকাত দাতার সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় তা একটি উদাহরণের মাধ্যমে বলা যায়, প্রতিটি মুসলমানকে নগদ অর্থ ও ব্যবসায়ী সম্পদ থেকে ৪০ ভাগের ১ ভাগ (২.৫০%) যাকাত দিতে হবে। গ্রহিতা এই টাকা দিয়ে খাদ্য/পোশাক/বস্ত্র ক্রয় করলো যা বিক্রেতা ১০-২০% বা তার চেয়ে বেশি লাভে বিক্রয় করে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, যাকাত দাতার লাভ হয় ৪-৮ গুণ বা তার চেয়ে ও বেশি।



 



যাকাতের উৎস :



মহান আল্লাহ বলেন, 'আর সেই আল্লাহই নানা প্রকার বাগান এবং গুল্মলতা সৃষ্টি করেছেন যার কতক স্বীয় কন্ঠের উপর সনি্নবিষ্ট হয়, আর কতক কণ্ঠের উপর সনি্নবিষ্ট হয় না, আর খেজুর বৃক্ষ ও শষ্যক্ষেত্র যাতে বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যবস্তু উৎপন্ন হয়ে থাকে, আর তিনি যয়তুন (জলপাই) ও আনারের (ডালিমের) বৃক্ষও সৃষ্টি করেছেন যা দৃশ্যত অভিন্ন হলেও স্বাদে বিভিন্ন, এইসব ফল তোমরা আহার কর যখন ওতে ফল ধরে, আর ওতে শরীয়তের নির্ধারিত যে অংশ রয়েছে তা ফসল কাটার দিন আদায় করে দাও, অপব্যয় করে সীমালঙ্গন করো না, নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) অপব্যয়কারী ও সীমালঙ্গন কারীকে ভালবাসেন না।' (সূরা আন'আম, আয়াত, ৬:১৪১)।



যাকাত কোন ক্ষুদ্র উৎস নয়, যাকাত হলো খাদ্য, ফলমূল, শাকসবজিসহ সকল উৎপাদিত ফসলে আরোপিত ১০ ভাগের ১ ভাগ অথবা ২০ ভাগের ১ ভাগ। আল্লাহ আরো বলেন, 'এবং আমি যা ভূমি থেকে তোমাদের জন্য উৎপাদন করে দেই' (সূরা বাকারাহ্, আয়াত ২:২৬৭)।



এছাড়া রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, "বৃষ্টির মাধ্যমে উৎপন্ন দ্রব্যে ১০ ভাগের ১ ভাগ দিতে হবে। কৃত্রিম সেচের মাধ্যমে উৎপন্ন দ্রব্যের ২০ ভাগের ১ ভাগ দিতে হবে" (বোখারী -১৪৮৩, তিরমিযী-৬৪০, নাসায়ী-২৪৮৮, আবুদাউদ-১৫৯৬, ইবনুমাজাহ-১৮১৭)।



কৃষিযোগ্য জমির মত বর্তমান যুগের শিল্প কারখানা প্রভৃতি যা কিছুই নিয়মিত আয় নিশ্চিত করে এবং কিছু লোকের জন্য বিপুল পুঁজি সৃষ্টি করে এ সব কিছুকেই যাকাতযোগ্য খাত হিসেবে গণ্য করতে হবে।



সম্পদ ও নিসাবের মালিক এমন প্রতিটি মুসলিমকে নগদ অর্থ ও ব্যবসায়ী সম্পদ থেকে ৪০ ভাগের ১ ভাগ (২.৫০%) যাকাত দিতে হবে, যদি সে ঋণমুক্ত থাকে এবং তার মৌলিক চাহিদা মেটানোর পর তা অতিরিক্ত হয়। যে পশু সম্পদ উপকৃত হওয়ার এবং বংশ বিস্তারের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, যেমন- উট, গাভী ও ছাগল ইত্যাদিও যখন নিসাব পরিমাণ হয় এবং বছরের অধিকাংশ সময় মুক্ত চারণ ভূমিতে চড়ে পালিত হয় তারও প্রায় একই পরিমাণ যাকাত দিতে হবে।



 



ইসলামে যাকাতের মর্যাদা :



যাকাত হচ্ছে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। এটি ঈমানের অন্যতম উপাদান এবং কুরআন মজিদে বহুবার এ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। সালাত এবং সিয়ামের মত যাকাতও একটি ফরজ ইবাদত। যাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানানো অথবা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে যাকাত প্রদানের বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়া ঈমানকে প্রত্যাখান করার সমতুল্য।



মহান আল্লাহ বলেন, 'যারা ঈমান আনে, সৎ কাজ করে, সালাত আদায় করে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট সওয়াব নির্ধারিত আছে। তাদের ভয় নেই, তারা চিন্তিতও নয়" (২ঃ২৭৭)। এছাড়া মহান আল্লাহ আরো অনেক আয়াতে যাকাতের মর্যাদা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন (২)



হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন "আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি হালাল কামাই থেকে একটি খেজুর পরিমাণ সাদাকাহ করবে (আল্লাহ তা কবুল করবেন) এবং আল্লাহ কেবল পবিত্র মাল কবুল করেন আর আল্লাহ তাঁর ডান হাত দিয়ে তা কবুল করেন। এরপর আল্লাহ দাতার কল্যাণার্থে তা প্রতিপালন করেন যেমন তোমাদের কেউ অশ্ব শাবক প্রতিপালন করে থাকে। অবশেষে সেই সাদাকাহ পাহাড় বরাবর হয়ে যায়। (৩)



যাকাত ধনীদের থেকে সংগ্রহ করে গরিবদের মধ্যে বন্টন করা হয়। যাকাত ব্যয়ের খাত সমূহ আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন (সূরা আত তাওবা, আয়াত- ৬০)। এই অর্থ অন্য কোন কাজে ব্যয় করা যায় না। যাকাত এমন একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে যে কোন ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়। যাতে দরিদ্ররা দানের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার পরিবর্তে সমাজের উপার্জনশীল সম্পদে পরিণত হয়।



 



যাকাতের হকদার বা যাকাতের সম্পদ বিতরণে ইসলামের নীতি :



আল্লাহ সূরা আত-তাওবার ৬০নং আয়াতে যাকাত থেকে প্রাপ্ত সম্পদের হকদার সম্পর্কে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। যেখানে ৮ শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন। খাতগুলো হলো :



* ফকির অর্থাৎ এরুপ গরিব যার সম্পত্তির পরিমাণ নিসাব অপেক্ষা কম।



* মিসকীন অর্থাৎ এরূপ গরিব যার রোজগার তার নিজের ও নির্ভরশীলদের অপরিহার্য প্রয়োজন সমূহ মিটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।



* যাকাত আদায়কারী অর্থাৎ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের।



* ইসলাম ধর্মে আকৃষ্ট করার জন্য অমুসলিমদের সাহায্য প্রদান করা, যে ইসলাম গ্রহণ করতে চায়।



* দাসমুক্ত করার কাজে।



* ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধের জন্য।



* মুসাফিরের সহায়তায় যাকাতের টাকা ব্যবহার করা যাবে।



* যারা জিহাদে আল্লাহর রাস্তায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছে।



 



যাকাতের মালের খরচের এই আটটি ক্ষেত্রে বর্ণনা করার পর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন এ হুকুম আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত। আল্লাহ তা'আলা যাহের ও বাতেনের পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। তিনি বান্দাদের সহযোগিতার সম্পর্কে অবহিত রয়েছেন।



সূরা (৪) আন নিসা, আয়াত :১৬২, সূরা (৯) আত্ তাওবা, আয়াত : ৫, ১১, ১৮, সূরা (২৩) আল মু'মিনুন, আয়াত : ১-৫, সূরা (২৭) আন নামল, আয়াত :২-৩, সূরা (৩১) লোকমান, আয়াত : ৩-৫, সূরা (৪১) হা-মীম সেজদাহ, আয়াত : ৭-৮.



বোখারী-১৪১০, ৭৪৩০ (ই.ফ.-১৩২৪), মুসলিম-১০১৪, তিরমিযী-৬২১, নাসায়ী-২৫২৫, ইবনুমাজাহ-১৮৪২, আহম্মদ-৭৫৭৮, ৮১৮১, মুয়াত্তা মালিক-১৮৭৮.



 



যাকাত আদায় না করার পরিণতি :



যেহেতু যাকাতের বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত তাই যাকাত অবশ্যই



পালনীয় ফরজের মধ্যে একটি। যাকাত যে শুধু শেষ নবীর উম্মতদের জন্য ফরজ তা নয় বরং সকল নবী রাসূলদের উম্মতের জন্য যাকাত ফরজ করা হয়েছে। (৪)



 



তাইতো যারা যাকাত আদায় করবেনা তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর হুমকি-আল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে যা তাদেরকে দিয়েছেন তাতে যারা কৃপনতা করে, তারা যেন মনে না করে যে, তাদের জন্য কল্যাণকর, তারা যাতে কৃপনতা করেছে, সত্বর কিয়ামতের দিন তারই বেড়ি তাদের গলায় পরিয়ে দেয়া হবে। আসমান ও জমীনের স্বত্বাধিকার কেবল আল্লাহই, তোমরা যা কিছুই করছ আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবহিত (সূরা আল ইমরান, ৩:১৮০)। এছাড়া মহান আল্লাহ আরো অনেক আয়াতে এ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন (৫)



আবু হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যাকে আল্লাহ তা'আলা ধন-সম্পদ দেন তারপর সে তার যাকাত আদায় করে না কিয়ামতের দিন তার ধন সম্পদকে তার জন্য লোমহীন কালো-চিহ্নযু্ক্ত সর্পে রূপ দেয়া হবে এবং তার গলায় পরিয়ে দেয়া হবে। মুখের দুই দিক দিয়ে সে তাকে দংশন করতে থাকবে এবং বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চয়। (৬)



নিসাব পরিমাণ সম্পদ যদি কারো অধিগ্রহণে থাকে তবে তাকে অবশ্যই যাকাত আদায় করতে হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, আমাদের সমাজে যাকাতের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে কোরবানীকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয় এবং অনেক বাড়াবাড়ি করা হয়। অথচ কোরবানী না করলে কিয়ামতের দিন একটা পিপড়া কামড় দিবে এই মর্মে ও কোন হাদীস পাওয়া যায় না, অতএব ঈমান, সালাত যেমন ফরজ তেমনি যাকাত আদায় করাও ফরজ বলে অবশ্যই অবশ্যই তা আল্লাহ ও রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বিধান মতে আদায় করতেই হবে।



 



যাকাত ও আধুনিক অর্থ ব্যবস্থা :



আধুনিক অর্থ ব্যবস্থা মূলত সুদনির্ভর, অথচ 'আল্লাহ সুদেকে হারাম করেছেন আর ব্যবসাকে হালাল করেছেন' (সূরা আল বাকারাহ, আয়াত : ২৭৫)। এছাড়া মহান আল্লাহ আরো অনেক আয়াতে সুদ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন (৭)। অতএব সুদ ভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থাকে যদি যাকাত ভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থায় পরিবর্তন করা যায় তাহলে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তে বাস্তববাদী সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।



ইসলাম দারিদ্র্যের বিরূদ্ধে যুদ্ব ঘোষণা করেছে। ইসলাম, সমাজে বসবাসকারী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য মৌলিক চাহিদাগূলো মেটাবার নিশ্চয়তা প্রদান করে ক্ষুধা, বাস্তহীন হওয়া, বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার উপায় বের করে। আর এর প্রধান উপায় হলো সঠিক যাকার ব্যবস্থা। তাছাড়া শ্রমকেও প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন "তিনিই তো তেমাদের জন্য ভূমিকে সুগম করে দিয়েছেন। অতএব, তোমরা এর দিগদিগন্তে বিচরণ করো এবং তার দেয়া জীবনোপকরণ থেকে আহার্য গ্রহণ করো। (সূরা (৬৭) মুলক, আয়াত : ১৫)।



সূরা (১৯) মারইয়াম, আয়াত : ৩১, ৫৫, সূরা (২১) আল আম্বিয়া, আয়াত :৭৩, সূরা (৯৮) আল বাইয়্যিনাহ, আয়াত : ৫.



সূরা (৪) আন নিসা, আয়াত : ৩৭, সূরা (৯) আত-তাওবা আয়াত : ৩৪, ৩৫, ৭৭, সূরা (৯২) আল লায়ল, আয়াত : ৮.



বোখারী-১৪০৩, ৪৫৬৫, মুসলিম-৯৮৭, নাসায়ী-২৪৪৮, ২৪৮২, আবু দাউদ-১৬৫৮, ইবনু মাজাহ-১৭৮৬, আহম্মদ-৭৫০৯, ৭৬৬৩, মুয়াত্তা-৫৯৬।



সূরা (২) আল বাকারাহ, আয়াত :২৭৬, ২৭৮, ২৭৯, সূরা (৫) আল ইমরান আয়াত : ১৩০, সূরা (৩০) আর রুম, আয়াত : ৩৯।



অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন "সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে। (সূরা (১০) জুমআহ, আয়াত : ৬২)।



আধুনিক (মুক্ত বাজার) অর্থ ব্যবস্থায় মোট আয় হবে মোট ভোগ, সঞ্চয়/বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় এবং নীট বাণিজ্যের যোগফলের সমান, অর্থাৎ ......ণ=ঈ+ও(ও=ঝ)+এ+ঘঢ যেখানে সুদ জড়িত থাকার কারণে চযরষরঢ়ং গড়ফবষ অনুযায়ী মুদ্রাস্প্রীতি এবং বেকারত্বের মধ্যে একটা বিপরীত সম্পর্ক বিদ্বমান। কিন্তু এই মডেলে যদি ঈড়ৎঢ়ড়ৎধঃব ঝড়পরধষ জবংঢ়ড়হংরনরষরঃু(ঈঝজ) এবং যাকাতকে বিবেচনা করি তাহলে মুদ্রাস্প্রীতি এবং বেকারত্ব সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে।



সমাজ শোষণের যতগুলো উপায় এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত হয়েছে, ধনীকে আরো ধনী এবং গরিবকে আরো গরিব করার যত কৌশল প্রয়োগ হয়েছে, সুদ সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাই সুদভিত্তিক অর্থনীতির বিরূদ্বে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং যাকাত ভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থা চালু করে ব্যক্তি তথা সমাজ তথা রাষ্টে বসবাসরত শ্রমকে কাজে লাগিয়ে দারিদ্র মুক্ত করতে হবে।



যদিও যাকাত ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার একটি বিশাল বিষয়, যেখানে দারিদ্র্য বিমোচন তথা ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান হ্রাস করার প্রথম ও প্রধান সরকারি উৎস হলো যাকাত। তথাপিও আরো অনেক গুলো নিয়ামক রয়েছে। প্রথম ও প্রধান নিয়ামক হিসাবে এখানে যাকাতের বিষয় টি অতি সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামের এই পরিচর্যা দায়সারা গোছের অথবা সাময়িক নয় বরং এটি তার মূল ভিত্তি ও মৌলিক নীতির অন্তর্ভূক্ত। এই যাকাত ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। যার মাধ্যমে আল্লাহ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠ-পোষকতায় দরিদ্র ও মিসকীনসহ আট শ্রেণীর মানুষের অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। এটি ইসলামের চারটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের একটি।



পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ সর্বদা সালাতকে যাকাতের সাথে যুক্ত করে বর্ণনা করেছে। যাতে বুঝা যায় যে, এ দুটির মাঝে দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। সলাত ইসলামের স্তম্ভ। যে ব্যক্তি সালাম কায়েম করলো সে দ্বীনকে কায়েম করলো, আর যে তা ধ্বংস করলো সে দ্বীনকে ধ্বংস করলো। যাকাত ইসলামের সেতু যে ব্যক্তি তা অতিক্রম করতে পারলো সে মুক্তি পেলো, আর যে পারলো না সে ধ্বংস হলো। যাকাত অস্বীকার কারীদের বিরুদ্ধে ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর প্রসিদ্ধ উক্তিটি হলোথ আল্লাহর কসম আমি তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই যুদ্ধ করবো যারা সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে। কারণ যাকাত মালের হক। আল্লাহর কসম, তারা যদি একটি রশি দিতেও অস্বীকার করে যা তারা আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে দিতো তাহলে আমি তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবো। (বুখারী ও মুসলিম)।



অবশেষে বলা যায়, যাকাত হচ্ছে ধনীদের নিকট গরিব লোকদের পাওনা বা বরাদ্দ ঋণ এর হার ও পরিমাণ নির্দিষ্ট, যদি তাই হয়ে থাকে তবে যাকাত অবশ্যই আদায় করতে হবে। যা দ্বারা সকল শ্রেণীর মানুষের জীবনযাত্রায় উপযুক্ত মান বজায় রাখা যায়। আল্লাহ ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বিধান মতে যাকাত আদায় ও বন্টিত হলে এক সময় সমাজের তথা ইসলামী রাষ্ট্রে কোন দারিদ্রতা থাকবে না, ইনশাআল্লাহ।



 



লেখক : বিএসসি (সম্মান), এমএসসি (অর্থনীতি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, এমএসএস (স্বাস্থ্য অর্থনীতি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মোবাইল : ০১১৯৯০৮৩৬৮৬।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৬৬১৪৭৮
পুরোন সংখ্যা