চাঁদপুর, বুধবার ১৫ মে ২০১৯, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ৯ রমজান ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • মতলবের জিয়াউর রহমান সাউথ আফ্রিকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত।
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫০-সূরা কাফ্


৪৫ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


১৯। মৃত্যু যন্ত্রণা সত্যই আসিবে; ইহা হইতেই তোমরা অব্যাহতি চাহিয়া আসিয়াছ।


২০। আর শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হইবে, উহাই শাস্তির দিন।


 


 


assets/data_files/web

ভালোবাসা দিয়েই একমাত্র ভালোবাসার মূল্য পরিশোধ করা যায়। -আলেকজান্ডার ব্রাকলে।


 


 


নামাজে তোমাদের কাতার সোজা কর, নচেৎ আল্লাহ তোমাদের অন্তরে মতভেদ ঢালিয়া দিবেন।


 


ফটো গ্যালারি
নানা গুণের অধিকারী মোস্তফার আজ কদর নেই
প্রবীর চক্রবর্তী
১৫ মে, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


উপমহাদেশের বরেণ্য গায়ক মান্না দের বিখ্যাত গান 'সোহেলী গো বল, কী নামে তোমায় ডাকি?' ভালবাসার মানুষটিকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গানের কথাটি উঠে এসেছে। আজ আপনাদের সামনে যার কথা বলবো, তিনি তার নিজের গুণের কারণে নানা ভাবে নানা নামে পরিচিত। তার বাবা মায়ের দেয়া নাম হলো মোস্তফা পাটওয়ারী। কিন্তু লোকজন মোস্তফা নামটি দিয়ে চিনলেও তার সাথে বাম পাশের বিশেষণটিই তাকে বেশি পরিচিতি দিয়েছে। তার কর্মের কারণেই। কেউ তাকে আর্টিস্ট মোস্তফা বলে চিনে, কেউ তাকে রেফারি মোস্তফা নামে চিনে, কেউ তাকে পিটি করানো মোস্তফা নামে চিনে, আবার গায়ের রঙ কালো হওয়ার কারণে কেউ তাকে কালা মোস্তফা নামেও চিনে। আবার তিনি অভিনয়ও করেছেন স্থানীয়ভাবে মঞ্চস্থ নাটকগুলোতে। কিন্তু সব নামের পিছনে যেই নামটি ঢাকা পড়ে গেছে বস্তুত তিনি একজন শিল্পী। ৬৮ বছর বয়সেও তিনি সুযোগ পেলে এখনো তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার চেষ্টা করেন তার ছাত্রদের মাধ্যমে।



তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। যদিও হাজারো মুক্তিযোদ্ধার ভিড়ে যুদ্ধকালীন সময়ে ট্রেইনার হিসেবে কাজ করলেও মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটটি হারিয়ে ফেলায় মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম লেখাতে পারেন নি। নচেৎ অর্থাভাবে জীবন কাটানো এই ব্যক্তিটি শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে সরকার প্রদত্ত ভাতা দিয়েই কোনো রকমে দিনাতিপাত করতে পারতেন।



এই মোস্তফা হচ্ছেন ফরিদগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের চরমথুরা গ্রামের অধিবাসী মোস্তফা পাটওয়ারী। এক দশক পূর্বে যখন গ্রামে ডিজিটাল সাইনবোর্ড, ব্যানার ফেস্টুন বা আসবাবপত্রে স্টিকার লাগানোর জন্য প্রযুক্তি এসে পেঁৗছে নি, তখন অনেক কদর ছিল আর্টিস্ট মোস্তফা নামে খ্যাত মোস্তফা পাটওয়ারীর।



১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি মোঃ মজিদ পাটওয়ারী ও তফুরা খাতুনের একমাত্র সন্তান হিসেবে পৃথিবীর মুখ দেখেন মোস্তফা পাটওয়ারী। ছেলেবেলা থেকেই ডানপিটে হিসেবে পরিচিতি ছিল তার। সব কিছুতেই পারদর্শিতা তাকে সকলের কাছে আইকন হিসেবে চিহ্নিত করে। চাঁদপুরের বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তার প্রতিভার উন্মেষ ঘটতে থাকে। ১৯৭০ সালে এই বিদ্যালয় থেকে মানবিক শাখায় মেট্রিক পাস করেন। পরে চাঁদপুর সরকারি কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হলেও তাঁর পরীক্ষা দেয়া হয়নি।



বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি শারীরিক কসরৎ করতে ভুল করায় শিক্ষক তাকে মার দেন। পরে তিনি শপথ নেন, এই বিষয়ে ভাল করে শিখবেন ও অপরকে শেখাবেন। শুরু হয় তার প্রশিক্ষণ। তিনি শারীরিক কসরৎ শেখার এক পর্যায়ে স্কাউটিং শেখেন এবং আনসার ট্রেনিং নেন। ট্রেনিংয়ে ভাল করায় তিনি পরবর্তীতে আনসার কমান্ডার ও প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পান। এছাড়া স্কাউট লিডার হিসেবে তিনিসহ ৫জন ওয়ার্ল্ড জাম্বুরী শেষে ১৯৭১ সালের প্রথম দিকে পাকিস্তান ট্যুরের জন্যে নির্বাচিত হলেও নানা কারণে তার যাওয়া হয়নি। না হলে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তিনি পাকিস্তানে আটক পড়ে যেতেন।



তিনি জানান, স্কুলে পড়ার সময় আনসার কমান্ডার ও প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পর তার উপর মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংয়ের দায়িত্ব পড়ে। চির্কাচাঁদপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ মাঠে তিনি সাবেক ডিসি মাহবুবুর রহমান, মোস্তফা বিএসসি, মফিক সরকার, মোস্তফা জমাদার, শান্তি বাবুসহ অনেককেই যুদ্ধের জন্যে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভারতে গিয়ে ভাল ভাবে ট্রেনিং নেয়ার ইচ্ছে ছিল। ওই সময়ে চাঁদপুরের কৃতী সন্তান সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী, জীবন কানাই চক্রবর্তী, সহিদুল্লা মাস্টার নয়াহাটে আসলে চির্কা চাঁদপুর স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং চলছে বলে জানতে পারেন। কে দিচ্ছেন জানতে পেরে তাদের সামনে মোস্তফাকে নিয়ে যাবার ডাক পড়ে। এ প্রসঙ্গে মোস্তফা পাটওয়ারী বলেন, স্থানীয় মালেক মাস্টার আমাকে তাদের সামনে নিয়ে আসেন। ইতিপূর্বে মোস্তফা নামে ট্রেইনারের নাম শুনলেও সামনে আসার পর আমাকে চিনতে পেরে সহিদুল্লা মাস্টার আমাকে বলেন, তুমি এখানে কী কর, তোমার বাড়ি না বাবুরহাটে। তুমি সেই স্কুলের ছাত্র না। তখন আমি বলেছি, ওই স্কুলে পড়েছি ঠিক আছে, আমার বাড়ি এখানে। আমার আনসার কমান্ডার ও ট্রেইনার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকায় তারা সকলে আমাকে ভারতে না গিয়ে চির্কা চাঁদপুর স্কুলেই ট্রেনিং ক্যাম্প চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তাদের নির্দেশ অনুসারে আমি তিন মাস প্রাথমিক ট্রেনিং দিয়েছি মুক্তিযোদ্ধাদের।



নিজের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা বলতে গিয়ে মোস্তফা পাটওয়ারী জানান, যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে তিনি চট্টগ্রামে থাকার সময় কুমিরা টিবি হাসপাতাল এলাকায় তিনদিনের একটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পরে সেখান থেকে ফিরে এলাকায় ট্রেনিংয়ের দায়িত্ব নেন। থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়েই তিনি এই ট্রেনিং ক্যাম্প পরিচালনা করেন। তবে এর পরেও এলাকায় কয়েকটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। কষ্টের কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের স্বীকৃতি স্বরূপ সার্টিফিকেট পেলেও জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকার সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্যাতনের ঘটনা শুরু হলে আমার মা আমাকে বাঁচাতে (আওয়ামী লীগ করার কারণে) আমার মুক্তিযুদ্ধের সকল কাগজপত্র ভয়ে পুড়িয়ে ফেলেন। ফলে আজ পর্যন্ত গেজেটে নিজের নামটি লিপিবদ্ধ করতে পারিনি। যদিও টাকা দিয়ে অনেক অমুক্তিযোদ্ধা আজ মুক্তিযোদ্ধা সেজে ভাতা ভোগ করছে।



চিত্রকর বা আর্টিস্ট মোস্তফার উঠে আসার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, বাবুরহাট স্কুলে পড়ার সময় তার জেঠাতো বোনের বিয়ের আসরের জন্যে 'ওয়েলকাম' লিখতে স্থানীয় চিত্রকর মোখলেছকে দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু সে যথাসময়ে দিতে পারবে না বলে জানালে অনেকটা জিদ করেই মাত্র এক রাতে এক দিস্তা কাগজ নষ্ট করে 'ওয়েলকাম' লেখাটি লিখে ফেলেন। সেই থেকে আর্টিস্টরূপে মোস্তফার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়, যা এখনো চলমান। তিনি জানান, এক সময়ে তার খুব কদর ছিল। উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যানার, সাইনবোর্ড, দেয়ালে লেখা, স্কুলের নাম খোদাই করে লেখে দেয়ার ডাক পড়তো। তার হতের কাজগুলো মানসম্পন্ন হওয়ার কারণে লোকজন তাকে ডেকে নিতো। তবে এজন্যে কোনো চাহিদা ছিল না। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তি চলে আসার কারণে গত ৫/৬ বছর তার এই রোজগারে ধস নেমেছে। এখন মাঝে মধ্যে দুই একটা অর্ডার আসে, তাও তাদের কাছে গিয়ে কাজ করে দিয়ে আসতে হচ্ছে। কিন্তু তাতে সংসার চলে না। অর্থাভাবে চলছেন কোনো রকম ভাবে। ৫ মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেয়ার পর স্ত্রী হালিমা খাতুনকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসারটি নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থায় রয়েছে। মাঝে মধ্যে কুলাতে না পারলে মেয়েদের কাছ থেকে অর্থ চেয়ে নেন।



রেফারি হিসেবে নিজের বিষয়ে বলতে গিয়ে মোস্তফা জানান, স্কুলে পড়ার সময় ভাল ফুটবল ও ভলিবল খেলোয়াড় হিসেবে তার সুনাম ছিল। সেখান থেকেই তিনি রেফারি হিসেবে কাজ শুরু করেন। যদিও সরকারিভাবে তিনি কোনো ট্রেনিং নেয়ার সুযোগ পান নি। তারপরেও ফরিদগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন টুর্নামেন্টে এবং চাঁদপুর জেলা সদর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও রাজবাড়ি জেলায় রেফারি হিসেবে কাজ করেছেন। যদিও এখন কেউ আর ডাকে না।



পিটি বা শারীরিক কসরৎ-এর শিক্ষক হিসেবে মোস্তফার পাটওয়ারীর সুনাম এখনও রয়েছে। উপজেলা সদরে জাতীয় দিবসগুলোতে এখন মৌলিক শারীরিক কসরৎ যদি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রদর্শন করে, তবে সেখানেই পিছনের ব্যক্তি হিসেবে পিটি মোস্তফাকে দেখা যাবে। কেরোয়া আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়, ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া আলিয়া মাদ্রাসা, ফরিদগঞ্জ বালিকা দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাজী আঃ আহাদ বিদ্যালয়সহ অনেক প্রতিষ্ঠানই জাতীয় দিবস বা বার্ষিক ক্রীড়ানুষ্ঠানের পূর্বে মাঝে মধ্যে ডেকে নিয়ে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন মোস্তফাকে। যদিও এখন নৃত্যের মাধ্যমে শারীরিক কসরতের যুগের কারণে অনেকটা ভাটা পড়ে গেছে পিটি মোস্তফার দর্শনীয় শারীরিক কসরৎগুলো।



তিনি বলেন, তিনি যেখানেই শারীরিক কসরতের প্রশিক্ষণের জন্য দায়িত্ব পেতেন সেখানেই তিনি লুৎফুর রহমানের চরিত্রবান প্রবন্ধের আলোকে গল্পচ্ছলে শিক্ষার্থীদের সৎ ও চরিত্রবান হওয়ার জন্য উপদেশ দেয়ার চেষ্টা করেন।



অভিনয় শিল্পী হিসেবে নিজের কথা বলতে গিয়ে মোস্তফা বলেন, ফরিদগঞ্জ উপজেলার এক সময় মঞ্চ নাটকের জন্য সুনাম ছিল। প্রায়শই জমজমাট নাটক হতো। বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করার পর তিনি নাটক নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন।



তিনি জানান, ফরিদগঞ্জ উপজেলায় প্রকৃত রঞ্জন চাকমা ইউএনও থাকার সময়ে স্কাউটিং-এর পুনর্জাগরণ শুরু করেছিলেন। ফরিদগঞ্জ এ আর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭দিনের স্কাউটিং ক্যাম্প শুরুর মাধ্যমে এই যাত্রা শুরু হয়। যদিও আজ কেউ তার নাম নেয় না। ইউএনও গোলাম মাওলা থাকার সময়ে জাতীয় দিবসগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলন মঞ্চ তৈরির কাজটি তিনি শুরু করেছিলেন ।



সমাজকে এগিয়ে নেয়ার জন্যে একজন মোস্তফা তার জীবনের অনেক সময় দান করেছেন। কিন্তু আজ জীবন সায়াহ্নে এসে এর প্রতিদান পাচ্ছেন না। যদিও নিভৃতচারী এই মানুষটি মুখ ফুটে কাউকে কিছু কোনো দিন বলেন নি। নামমাত্র একখ- জমি আর একটি ঘরের মধ্যেই চরমথুরা গ্রামে স্ত্রী হালিমা খাতুনের সঙ্গে অভাব অনটন নিয়ে দিন কাটান নানা প্রতিভার অধিকারী এই মোস্তফা পাটওয়ারী। একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি বঞ্চিত ভাতা পাওয়া থেকে। অভিনয় শিল্পী হওয়ার কারণে সমাজে আজ ভাল থাকার অভিনয় করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। ফরিদগঞ্জে এসে অপেক্ষায় থাকেন কখন কে ডাকবে স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে পিটি করানোর জন্য, কে ডাকবে ডিজিটাল ব্যানার ও সাইনবোর্ড নয় আগের মতো হাতে লেখা কিছু কাজের জন্য। এখনো উপজেলা সদরে কোনো ফুটবল খেলা হলে নিজের মনের টানেই ছুটে যান মাঠে। জাতীয় দিবসগুলোতে কেউ না ডাকলেও দূর থেকে দেখতে মাঠে হাজির থাকেন প্রায়ই।



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৭২৫০
পুরোন সংখ্যা