চাঁদপুর, শুক্রবার ১৭ জানুয়ারি ২০২০, ৩ মাঘ ১৪২৬, ২০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৬১-সূরা সাফ্ফ


১৪ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৮। উহারা আল্লাহর নূর ফুৎকরে নিভাইতে চাহে কিন্তু আল্লাহ তাঁহার নূর পূর্ণরূপে উদ্ভাসিত করিবেন, যদিও কাফিররা উহা অপছন্দ করে।


 


ব্যবসায়ীদের নিজস্ব কোনো দেশ নেই। - জেফারসন।


 


 


যদি মানুষের ধৈর্য থাকে তবে সে অবশ্য সৌভাগ্যশালী হয়।


 


 


ফটো গ্যালারি
শীতে গ্রামীণ সুস্বাদু পিঠা
নজরুল ইসলাম তোফা
১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


বাঙালির লোক ঐতিহ্যে বিভিন্ন পিঠার ইতিহাস গ্রামীণ মানুষের ঘরে ঘরে শীত ঋতুতে যেনো বারবার হাজির হয়। শীতে নানা ধরনের পিঠার গুরুত্ব ও ভূমিকা পৃথিবীর ইতিহাসে সে তো এক কালজয়ী সাক্ষী। শীত কালে গ্রামীণ মানুষদের কাছে পিঠা ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এমন পিঠার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আজ গ্রাম কেন্দ্রীক থাকেনি। তা শহরেও প্রবেশ করেছে অনেক আগে। শহরের সবখানে এখন নানা রকমের পিঠা পাওয়া যায়। এ দেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষ অন্য কোনো ঋতুর চেয়ে এই শীতঋতুতে যেন বিভিন্ন ধরনের পিঠার উৎসব করে থাকে। যুগ যুগ ধরে মানুষ সুস্বাদু উপাদেয় পিঠা খাদ্যদ্রব্যের উৎসব পালনও করে আসছে।



হেমন্ত আসতে না আসতে বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্ন। চলে পিঠা বানানোর প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে গ্রামেগঞ্জে তৈরিও হচ্ছে নানান স্বাদের পিঠা। শুধু যে গ্রামে তা নয়, শহরের আনাচে কানাচে গড়ে ওঠে বিভিন্ন পিঠার দোকান। এসব দোকানেও পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায় গ্রামের মানুষদের মতো। তবে গ্রামীণ জনপদের মানুষ যেভাবে পিঠা তৈরি করে শহরের মানুষ ততটা ভালো পারে না। গ্রাম তো পিঠা তৈরি করার শিকড় স্থান। শীতকালের আমেজে খেজুরের গুড় আর রস ছাড়া তো পিঠা তৈরির পূর্ণতা কখনো উৎকৃষ্ট হয় না। খেজুরের রস দিয়ে ভাপা পিঠা, পুলি, দুধ চিতই পায়েস যাই হোক না কেন শীতঋতু আর খেজুর গাছ ছাড়া অসম্ভব। শীতঋতুতে গ্রামে গঞ্জে খেজুর রস আর শীতের হরেক রকম পিঠা নিয়ে হয় উৎসবের আমেজ। বাড়িতে তাদের নিজ আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত করে পিঠা খাওয়ানো ও জামাই মেয়েদের বাড়িতে নিয়ে এসে নতুন কাপড় চোপড় উপহার দেওয়ার যেন হাজার বছরের রীতি। উনুনের পাশে বসে গরম গরম ধোঁয়া বা ভাপ উঠা ভাপা পিঠা খেজুর গুড় বা গাঢ় খেজুর রসে চুবিয়ে খাওয়ার ষোলকলা পূর্ণ হয় না শীতঋতু ছাড়া। শুভ সকালে সারারাত্রির বাসি, ঠা-া ভাপা পিঠা খেজুর রসে চুবিয়ে খেতে মন্দ লাগে না। মজার বেপার হলো শীত কালে এই অমৃত ভাপা পিঠা শুধু যে গ্রামের মানুষের কাছে প্রিয় তা কিন্তু নয়। শহরের অলিতে গলিতেও দেখা যায় অনেক ভাপা পিঠার দোকান। নারিকেল আর খেজুর গুড়ের সমন্বয়ে চালের আটা মিশ্রণে ভাপা পিঠা তৈরীও হয়। তবে বিভিন্ন বয়সের মানুষ হুমড়ি খেয়ে পিঠা খায়। বলতে হয় গ্রামই পিঠা তৈরির শ্রেষ্ঠ স্থান।



এলাকা ভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামকরণে চিহ্নিত পিঠা বা আলাদা গঠনে নকশাকৃতির পিঠা লক্ষ্যণীয়। গ্রামীণ জনপদের মানুষ অগ্রহায়ণ মাসে সাধারণত নতুন ধান উঠার পর পর যেন পিঠা তৈরির আয়োজন শুরু করে। আসলে শীতঋতুতে হরেক রকম পিঠার বাহারি উপস্থাপন এবং আধিক্য হয় বলে কিশোর-কিশোরীরা মামার বাড়ি যাওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ততা দেখায়। মামার বাড়ি মধুর হাড়ি এ কথাটি যে যুগে যুগে হয়তো সত্যিই রয়ে যাবে। গ্রামবাংলার বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী পিঠার অনেক নাম গ্রামের মানুষের দ্বারে এসে হানা দেয় আজও। বিভিন্ন পিঠা উৎসবের প্রস্তুতি গ্রামাঞ্চলের ধনী-গরীব নির্বিশেষে প্রতিটি ঘরে ঘরেই শুরু হতে দেখা যায়। সুতরাং গাঁ গেরামেই আত্মীয়-পরিজনের আগমন ঘটে। নানার বাড়িতে কিশোর-কিশোরীরা শীতকালীন ছুটি নিয়ে বেড়াতে যাবে বলে তাদের যেন দু'চোখে ঘুম আসে না। মেয়ে-জামাই তাদের সন্তানদের সঙ্গে শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছাটাও পোষণ করে। গ্রামে অনেক হতদরিদ্র পরিবারেও যেন বিনোদনের চরম দৃশ্যপট উদয় হয় শীতকালে। আজকাল শীতঋতুর অনেক পিঠা শহরেও মেলা উৎসবের আয়োজন করে গ্রাম গঞ্জের সংস্কৃতিকে ধরে রাখার দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। দিকনির্দেশনার পথ প্রদর্শক হিসেবে দেখা যায় সুশীল সমাজকে, প্রগতিশীল মানুষ এবং শিল্পী, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীকে। সুতরাং গ্রাম গঞ্জের ধনী পরিবার নানান জাতীয় পিঠার ঐতিহ্য ফিরে পেয়ে তাদের মেয়ে জামাইকে দাওয়াত দিয়ে খাইয়ে থাকে। শীতঋতুর হরেক রকম পিঠা তৈরির আপ্যায়নে গ্রামীণ জনপদের মানুষেরা এখন দিনে দিনে অতীতের বিলুপ্ত হওয়া পিঠাগুলো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে এবং সংস্কৃতির প্রতিও সচেতন হচ্ছে ।



আহা, কি আনন্দ ঘরে ঘরে। ভোজন প্রিয় বাঙালির ঐতিহ্যে পিঠার ইতিহাস খুব পুরনো হলেও বর্তমানে পিঠার স্বাদ আধুনিক ও রন্ধন শিল্পের নানান করণ কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। পিঠার চমৎকার গন্ধে বাড়ির উঠান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। খেজুর রসের গন্ধযুক্ত পিঠা সবার কাছে আজ সমাদৃত। হতদরিদ্র গাঁ গেরামের খেটে খাওয়া শ্রমিক মানুষের দু:খ-কষ্টের মধ্যেও পিঠা খাওয়ার তৃপ্তির মুহূর্ত যেন অনাবিল এক শান্তির পরশ বয়ে আনে। তাদের খুব পরিশ্রম ও দুঃখ-কষ্টের জীবন হলেও বিভিন্ন পিঠা উৎসবের আয়োজন করতে একটুও পিছপা হয় না। তারা অবাক করে দেবার মতো অনেক পদের পিঠা তৈরি করতে পারে। এ দেশে ১৫০ বা তারও বেশি রকমের পিঠা থাকলেও মোটামুটি প্রায় তিরিশ প্রকারের পিঠার প্রচলন বেশি লক্ষ্যনীয়। তাছাড়া আরও কতো রকমারি পিঠা অঞ্চল ভেদে রয়েছে সেগুলোর নাম বলে শেষ করা যাবে না। তবুও সে এক নিঃশ্বাসে বলা শুরু করে। যেমন: নকশি পিঠা, ভাঁপা পিঠা, ছাঁচ পিঠা, রস পিঠা, দোল পিঠা, পাকান পিঠা, চাপড়ি পিঠা, চিতই পিঠা, মুঠি পিঠা, ছিট পিঠা, পাতা পিঠা, খেজুরের পিঠা, পুলি পিঠা, পাটিসাপটা পিঠা,পানতোয়া পিঠা, ডিম চিতই পিঠা, জামদানি পিঠা, ভেজিটেবল ঝাল পিঠা, সরভাজা পিঠা, ছিটকা পিঠা, গোলাপ ফুল পিঠা, চাঁদ পাকন পিঠা, মালপোয়া পিঠা, ঝালপোয়া পিঠা, কাটা পিঠা, তেজপাতা পিঠা, তেলপোয়া পিঠা, লবঙ্গ লতিকা পিঠা, হাঁড়ি পিঠা, মালাই পিঠা, চুটকি পিঠা, গোকুল পিঠা, নারকেল পিঠা, আন্তাশা পিঠা, পুডিং পিঠা, মুঠি পিঠা, সুন্দরী পাকন পিঠা, রসফুল পিঠা, মেরা পিঠা, তেলের পিঠা, চাপড়ি পিঠা, সেমাই পিঠা, দুধরাজ পিঠা, গোকুল পিঠা, বিবিয়ানা পিঠা, ঝিনুক পিঠা, ঝুড়ি পিঠা, ফুল পিঠা, ফুল ঝুরি পিঠা, কলা পিঠা, ক্ষীর কুলি, কুশলি পিঠা, ফিরনি পিঠা, সূর্যমুখী পিঠা, নারকেলের ভাজা পুলি পিঠা, ঝাল মোয়া পিঠা, নারকেলের সেদ্ধ পুলি পিঠা, নারকেল জেলাফি পিঠা, চিড়ার মোয়া পিঠা, নারকেল নাড়ু পিঠা এবং কাউনের মোয়া পিঠা ইত্যাদি নাম অঞ্চল ভেদে পিঠা হিসেবে বিবেচ্য।



এদেশের হতদরিদ্র গাঁ গেরামের মানুষ পিঠা তৈরি করার জন্য বিভিন্ন প্রকার গুড় কিংবা চিনি ব্যবহার করে। খেজুর গাছের রস থেকে নানান পদের গুড় গ্রামাঞ্চলের মানুষের উল্লেখযোগ্য। পিঠা তৈরিতে মিষ্টি জাতীয় খাবারটা প্রধান। সেক্ষেত্রে খাঁটি গুড় ব্যবহার করা প্রয়োজন। তাতে পিঠার স্বাদ পরিপূর্ণ হয়। একটু জানা দরকার যে, খেজুর গাছের খাঁটি গুড় আপনি চিনতে পারবেন কিভাবে? একজন খেজুর গাছ চাষীর বিশ্লেষণ মতে, খেজুর গুড়ের রং অবশ্যই বিভিন্ন রকম হতে পারে। হয়তো কোনো গুড় হালকা খয়েরি, কোনোটা একটু লালচে, কোনোটা আবার কমলা রঙের। খেয়াল করা দরকার কোন রংটা বিশেষ করে খাঁটি গুড়। অবশ্য চাষীদের মতে জানা যায়, সবচেয়ে গাঢ় খয়েরি রঙের গুড়টা আসল গুড়। আর গুড়ের রং যতো হালকা হবে, বুঝতে হবে ওর মধ্যে যেন কেমিক্যাল কিছু ভেজাল পন্য মেশানো হয়েছে।আসল গুড় অবশ্যই চমৎকার এক ধরনের ঘ্রান যুক্ত হবে। খেজুর গাছের খাঁটি গুড়ের কিনারায় আঙুল দিয়ে চাপ দিয়ে ভাঙা যাবে। যদি ভাঙা না যায়, শক্ত প্রকৃতির হয়ে থাকে সে রকম গুড় গুলোতে ভেজাল আছে। খেজুর গুড় ক্রয় করার সময় গুড়ের ধারটাতে 'দুই আঙুল' দিয়ে চেপে দেখবেন। যদি তা নরম হয়, তবে বুঝবেন গুড়টি ভীষণ ভাল। তাছাড়াও গুড় ভেঙে একটু খেয়েও দেখবেন যদি সে গুড়গুলো কচকচ করে অবশ্যই তাতে চিনির মিশ্রণ আছে। জানা দরকার যে খুব খাঁটি গুড় মুখে দিলে গলে যায়, কচ কচ করবে না। যদি বাসায় নিয়েও যান- ভেজাল গুড় একটু পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে, তা হলো:- খাঁটি গুড় - দুধ একসাথে জ্বাল দিলে তা কখনো ছানা হয়ে যাবে না। খেজুর গাছের রস থেকে প্রধানত তৈরি হয় পাটালী ও ঝোলা গুড়।



সুতরাং এমন গুড় নামক মিষ্টি খাবার সামগ্রী দিয়ে ভালো পিঠা হয়। চাষীদের শ্রম দ্বারা যেনো তৈরি হয় গুড়ের বিভিন্ন পিঠা। শীত কালের আয়োজনে সত্যিই এমন ধরণের পিঠা গুলোকে ধনী কিংবা গরীবের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় না করে সাধ ও সাধ্যের মধ্যেই যেনো রসনা বিলাস করে আসছে। গ্রামীন বাঙালির পিঠা উৎসবের রসনা বিলাসী দিক হয়তো বা পৃথিবীতে আর নেই। গ্রাম বাংলায় ধানের মৌসুম অনুযায়ী নানান পিঠা তৈরি হয়।



পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন মিলে পিঠা খাওয়ার আনন্দকে কেন্দ্র করে গ্রামের দরিদ্র মজুরদের সঙ্গে নিয়ে ধান মাড়াই করে চালের আটা তৈরি করে মেতে উঠে বিভিন্ন পরিবার। পিঠা তৈরি নানান জাতের চালও শীতঋতুতে গ্রামীণ বাজারেও ক্রয় করা হয়ে থাকে। কোনো কোনো পরিবার অনেক আগে পিঠা তৈরির প্রয়োজনীয় বাৎসরিক চাহিদা ঘরে মজুদ করে রাখে। খেজুর গুড় বা নারিকেলের যোগান এখন তারা গ্রামে ফ্রিজ ব্যবহার করে পিঠা তৈরির মজা উপভোগ করছে। আয়েস করে পিঠা খাওয়ার তৃপ্তির ঢেঁকুর গ্রামাঞ্চলে কনকনে শীতের সময় খুব ছড়িয়ে পড়ে। নিশ্চয় এসব পিঠার চাল মেশিনে ভাঙানো বা পাটায় পিষানো চাউলে হয়ে থাকে।



এক সময় ঢেঁকিতে গীত গাইতে গাইতে চাল থেকে আটা তৈরি করতো গ্রামীণ মেয়েরা। ঢেঁকির শব্দ এখনো কানে বাজলেও পিঠা খাওয়ার উৎসব কমে যায়নি বলা চলে। যে সব মেয়েরা বাবার বাড়ি আসতে পারেনা তাদের শ্বশুরবাড়িতে শীত মৌসুমী পিঠা পাঠাতেও ভুল করেনা। গ্রাম বাংলার মানুষের এমন জীবন সত্যিই নান্দনিকতার বহিঃপ্রকাশ ও তাদের উৎসব পূর্ণ বিনোদনের এ জীবন আসলে ইতিহাসের কালজয়ী সাক্ষী।



 



লেখক : কলামিষ্ট।



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৪১৫২৮০
পুরোন সংখ্যা