চাঁদপুর, শুক্রবার ১২ জুলাই ২০১৯, ২৮ আষাঢ় ১৪২৬, ৮ জিলকদ ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৩-সূরা নাজম


৬২ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


 


assets/data_files/web

একটা হাত পরিষ্কার করতে অন্য একটা হাতের সাহায্য দরকার।


-সিনেকা।


 


 


ন্যায়পরায়ণ বিজ্ঞ নরপতি আল্লাহর শ্রেষ্ঠ দান এবং অসৎ মূর্খ নরপতি তার নিকৃষ্ট দান।


 


যিনি বিশ্বমানবের কল্যাণসাধন করেন, তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ।


 


 


ফটো গ্যালারি
জান্নাতি পরিবার
মোঃ তাইয়্যেব হোসাইন
১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


বাবা তাঁর স্টাডি রুমে। নির্ঘাত পড়ছে কিংবা লিখছে কিছু। বাবা বড্ড ব্যস্ত থাকে আজকাল, নিজের জগতে। একটু উঁকি দিয়ে দেখে এলো সে। হ্যাঁ আসলেই পড়ছে। কী পড়ে এতো এই ভর দুপুরে? নাকি নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা! খাঁ খাঁ করছে পুরো বাসাটা। এত নিস্তব্ধতা ভালো লাগে না তানহার। কেনো চুপচাপ সব? পৃথীবিটাকে তার কাছে অর্থহীন ঠেকে। আবার সেই চরাচর বিস্মৃত বিষণ্নতা ভর করছে অসহ্য!



মামনি বাবা এসেছে বারান্দায়।



বলো বাবা।



কী হয়েছে আজ? পরীক্ষা ছিলো না?



নাহ... তুমি ভুলে গেলে বাবা। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলো কাল, এখনত ছুটি!



ওহ! এই রোদের মধ্যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছো কেন? ঘরে আসো মা। তোমার জন্যে একটা দারুণ জিনিস আছে দেখবে?



একটু পর যাবো। তুমি এখন যাও। পড়ছিলে পড়ো।



না, মনটা একটু শান্ত না হলে সে যেতে পারবে না বাবার সামনে। কিছুক্ষণ একা থাকা দরকার। বাবাটা এমনই। কষ্ট পেলে কখনো বলবে না। চুপ করে সামনে থেকে চলে যাবে।



তানহা-ই বা কী করবে? নিজেকেই কখনো কখনো অপরাধী মনে হয়। মা চলে যাবার পর বাবাটা মানসিকভাবে এত ভেঙ্গে পড়েছেন। সর্বদা হাসিমুখ যে বাবাকে দেখে এসেছে আজন্ম বড্ড অচেনা লাগে এখন। ক্লাস নেয় আর বাসার মধ্যেই নিজেকে আটকে ফেলেছেন। তুহিনটা (তুহিন তানহার ছোট ভাই) কোচিং-এ। সামনে এসএসসি পরীক্ষা তার। ওকেও সময় দেয়া দরকার। গতকাল কোচিং-এর মডেল টেস্টের রেজাল্ট দিল। ভালো করেনি তুহিন। পড়াশুনার প্রতি অবহেলাটা চরমে উঠেছে। সারাদিন বাইরে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায় ও-ই জানে। বাবা কাল বকলেন ওকে কিছুক্ষণ। এখনো ততটা অবাধ্য হয়নি। নিশ্চুপ হয়ে শুনলো। তানহার কেমন যেন কান্না পেয়েছিল তখন। মা থাকতে এটা কল্পনাও করা যেত না। জেএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া তুহিন এখন রসায়নে পাস নম্বর তুলতে পারে না। ত্যালের বোতল খালি আফা, ত্যাল কিনতে পাঠান ড্রাইভার।



হঠাৎ চমকে গেলও!



মরিয়াম আফা, তানহাদের দূর-সম্পর্কের এক আত্মীয়। মা চলে যাওয়ার পর ঘর-দোর সামলানোর জন্যে ওকে আনা হয়েছে। নিজের অজান্তে কখন বিন্দু বিন্দু অশ্রু পড়ে দু'গাল ভিজে গেছে খেয়াল করেনি। চোখ মুছে ড্রাইভারকে ফোন করতে গেল। বাবা রুমে এসে কী যেন দেখছেন মনোযোগ দিয়ে। চলে যেতে উদ্যত হয়েও না গিয়ে বলল, বাবা কী দেখাবো বলো! ও তুমি এসোছো! ড্রয়ার থেকে একটা হলুদ খাম বের করে হাসিমুখে তানহার হাতে দিয়ে বললেন, দেখো ত মামনি এর ভেতর কী আছে? একটু অবাক হয়ে খুলল সে খামটা। তিনটি ছবি পুরনো। একটাতে সদ্যজাত একটা শিশু কোলে নিয়ে মামনি আর বাবা, আরেকটাতে শুধুই শিশুটা খোলা একটা জানালার পাশে শুয়ে আছে, রোদ এসে পড়ছে তার মুখে, আরেকটাতে বাবা আর মামনির কম বয়সের একটা ছবি। বাবা হাসিমুখে চেয়ে আছেন। তানহা জানে শিশুটা কে। সেই- ত! অদ্ভুত। এই ছবিতো সে দেখেনি আগে। বাসায় তার ছোটবেলার এত ছবি আছে কিন্তু এইগুলি ছিল না।



এগুলো তোমার জয়তুন ফুপ্পি আজ দিয়ে গেছে আমাকে। তোমার জন্মের পর প্রথম তোলা ছবি মা। দেখো কী সুন্দর ছিলে তুমি।



এখন তো একদম হয়েছো তোমার মায়ের মতো।



বাবা! তানহা বাবার কোলে মুখ লুকালো।



থ্যাংক ইউ বাপ্পা।



নিজের ঘরে এসে অনেকক্ষণ দেখলো সে ছবিগুলো। মামনি। তুমি এখন নেই কেন? কেন নেই? খুব দ্রুত মনে পড়ে যাচ্ছে তানহার সবকিছু.... ছোটবেলায় মামনির ওড়নার প্রান্ত ধরে রাখত সবসময়



আম্মি আম্মি তুমি এখন একটু ছাড় আমাকে।



রান্না করছি দেখছো না?



নানা আমি একদম ছাড়বো না তোমাকে।



ইশ! এই যে দেখো ঠিকমত কাজ করতে পারছি না, ছাড় না মা।



তানহা কখনোই ছাড়ত না।



প্রথম স্কুলে যাবার দিন মামনি বাবাসহ গিয়েছিলো। বাবা-মাকে বলছে, তুমিও ওর সাথে আজকে থাকো, সাফরিন অফিস থেকে ছুটি নাও। মেয়েটা না হলে ভয় পাবে। মামনি বলল তানহা তুমি এখন বড় হয়েছো না? স্কুলে কি মা থাকে সাথে? তুমি যদি ভয় পেয়ে কান্নাকাটি শুরু করো তাহলে সবাই বলবে, মা কিছুই শেখায়নি মেয়েটাকে? সাহস আছে মামনি তোমার?



তানহা বলেছিলো, হুম, খুব সাহস আছে। তোমরা যাও মামনি। আমি একটুও ভয় পাবো না দেখে নিও। যদিও আশঙ্কা হচ্ছিলো মনে মনে। তাও তো তার মায়ের সম্মানের ব্যাপার। তানহাকে সেদিন ক্লাসে বসিয়ে মামনি চলে গিয়েছিলেন। মিমকে কী কী যেনো বলে গেলেন, তারপর মিম ক্লাসের সবার সাথে ওরে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।



মেয়েদের কত বন্ধু-বান্ধবী থাকে। তানহার 'বেস্ট ফ্রেন্ড ফর এভার' ছিলো মা। শৈশব, কৈশোর থেকে শুরু করে এই তারুণ্যের দিনগুলোর একান্ত সঙ্গী ছিলেন এই মা। দিনের সব কথা মাকে না বলতে পারলে ও হাঁসফাঁস করতো। কার সাথে কী কথা হলো, কোন্ বন্ধু আজ সবাইকে ফুচকা খাওয়ালো সে থেকে শুরু করে ক্লাসের দজ্জাল ম্যাম আজ মরিয়মকে কী শাস্তি দিলো সবই! গল্পের কোনো বই শেষ করে কাহিনিটা তার মাকে শোনানো চাই-ই চাই!



ছোট্টবেলা থেকে মামনি তাদের দুই ভাই-বোনের মনে গেঁথে দিয়েছেন, শোনো তোমাদের বড় হতে হবে, আলী (রাঃ)-এর মতো, মুয়াজের (রাঃ) মতো, আসমা (রাঃ) মতো, ফাতিমা (রাঃ)-এর মতো। এতো সুন্দুর কুরআন পড়তেন মামনি। তিনি তো শেখাতেন ফজরের পর পবিত্র ভোরগুলোতে। আর কখনো সেসব দিন ফিরে আসবে না তানহার জীবনে। কয়েকমাস আগের সকালগুলো কত অন্যরকম ছিলো।



বারান্দায় মামনি, বাবা ও তুহিন মিলে রাজ্যের যতো গল্প করতো নাস্তা খেতে খেতে। ইসলাম গল্পের বই, বিজ্ঞান, মুভি...এমন কি রাজনীতি-অর্থনীতির বড় বড় ব্যাপার তুহিনটা পর্যন্ত বিজ্ঞের মতো কথা বলতো। ওর আজব আজব কথা শুনে হেসে গড়িয়ে পড়তো তানহা।



চারটার কাছাকাছি বাজে। কলিং বেলের আওয়াজ শুনে দরজা খুলতে গেলো তানহা। তুহিন এসেছে।



আসসালামু আলাইকুম বুবু।



সালামের জবাব দিয়ে তাকিয়ে দেখলো ছেলেটা কেমন যেনো হয়ে গেছে। শুকনো মুখে ক্লান্তভাবে ঢুকলো বাসায়। তানহার বুকটা হু হু করে উঠলো। তার আদরের ভাইটার আজ এ কী অবস্থা! কী করবে সে, কত দিন জ্বালাবে আর?



নামাজ পড়েছিলি?



হুম।



সকালে কী কী খেলি?



যা যা দিয়েছো সব। এক্ষণ ক্ষুধা পেয়েছে। বুবু ভাত দাও। হাসিমুখে বললো তুহিন। কোচিং থেকে ছুটি আড়াইটায় হওয়ার কথা। এখন চারটে বাজতে চললো। ওহ! তুমি যা প্রশ্ন করো না? কোথায় আর যাবো, খেলতে গেলাম মাঠে। তুহিনের গলার আওয়াজ শুনে বাবা এলেন।



বাবা তুমি গোসল করে খেয়ে, রেস্ট নিয়ে একটু আমার ঘরে এসো। হুম, বাবা কী বলেছে শুনলে? আগে গোসল করে এসো। আমি ভাত দিচ্ছি টেবিলে। বলেই তানহা চলে গেলো।



বাবা ছেলের কী কথা হলো কে জানে। দেখলো তুহিন বইপত্র নিয়ে বাবার স্টাডি রুমে গেলো। পড়াচ্ছে বাবা। তানহা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ওর দুআ কবুল করেছেন আল্লাহ। বাবাকে একটু স্বাভাবিক দেখাচ্ছে আজ।



তানহা জানে তার ছোট্ট কাঁধে কত বড় দায়িত্ব। এই পুরো সংসার...বাবাটার পাশেও থাকা উচিৎ তার। তার নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। তুহিনকে গড়ে তুলতে হবে, মায়ের স্বপ্নের মতো করে।



ছবিগুলো হাতে করে আবার বারান্দায় এলো সে। মামনি যে বলছে, আমি কী শিখিয়েছি আম্মি তোমায়? মনে আছে তো?



তোমার সাহস আছে তো?



দেখতে দেখতে বিকেল পেরিয়ে সন্ধা হয়ে এলো একটা দুটো করে তারা জ্বলে উঠছে আকাশে। আজান দেবে এক্ষুণি। শৈশব অভ্যেস ছিলো এই! অনন্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা। আজ যেনো মেঘ ভেঙে জল ঝর ঝর করে পড়লো...।



তানহা হু হু করে কেঁদে উঠে।



কিন্তু মনে অদ্ভুত একটা প্রশান্তি, একটা প্রত্যয়! 'তুমি দেখো মামনি তোমার মেয়ে তোমার যত্নে গড়া বাগানের ফুলগুলোকে একটুও মলিন হতে দেবে না, কিছুতেই না! অপূর্ব সে উদ্যানে নিশ্চয়ই আমরা আবার একসাথে হেঁটে যাবো হাতে হাত রেখে ইনশাআল্লাহ। সেদিন আর হারিয়ে যেতে দেবো না মামনি তোমায়।'



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১০৫৩৪৯
পুরোন সংখ্যা