চাঁদপুর, বুধবার ৬ নভেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৬, ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৭-সূরা হাদীদ


২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


২১। তোমরা অগ্রণী হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও সেই জান্নাত লাভের প্রয়াসে যাহা প্রশস্ততায় আকাশ ও পৃথিবীর মত, যাহা প্রস্তুত করা হইয়াছে তাহাদের জন্য যাহারা আল্লাহ ও তাঁহার রসূলগণে ঈমান আনে। ইহা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাহাকে ইচ্ছা তিনি ইহা দান করেন; আল্লাহ মহাঅনুগ্রহশীল।


 


 


 


 


 


যারা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হতে চায় না, তারা কোনোদিন লাভবান হতে পারে না। -ডেভিড জেফারসন।


 


 


নামাজ হৃদয়ের জ্যোতি, সদকা (বদান্যতা) উহার আলো এবং সবুর উহার উজ্জ্বলতা।


 


 


 


 


ফটো গ্যালারি
শিক্ষকের প্রয়োজনীয় গুণাবলি
মজিবর রহমান মুজিব
০৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


জগতের যে কোন কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য চাই আন্তরিকতা। কাজের সাথে অন্তরকে একত্রিত করতে না পারলে সে কাজটি কখনও সুচারুরূপে করা সম্ভব নয়। আন্তরিকতাকে আমরা সহজ ভাষায় বলি মনোযোগ। অন্তর মনেরই একটা সমার্থক শব্দ। প্রত্যেকটি মানুষ মনের অধিকারী। তার কাজের সাথে যদি সেই মন ঢেলে দেয়া যায়, তবে তা সুন্দর হতে বাধ্য। কাজের সাথে মনের যোগ থাকতে হবে, অর্থাৎ মন দিয়ে কাজ করতে হবে। যে কাজে মন নেই, তা হয়ত শেষ হয়, কিন্তু সুচারুরূপে হয়না। যেমনটা চাই তেমনটা হয় না। মনের বিরুদ্ধে কাজ করে শান্তি পাওয়া যায় না। দায় ঠেকে কাজ করলে সফলতা আসে না। আমার এক গুরুজন প্রায়ই বলতেন_মনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে যেওনা, জয়ী হতে পারবে না। কথাটার তখন মানে বুঝতাম না।



 



শুনেছি পাখিদের মধ্যে কাক নাকি বাসা তৈরির বেলায় কোন মনোযোগ দেয় না । হাতের কাছে যা কিছু পায়, তাই দিয়েই কোন রকম দায় সারা গোছের বাসা তৈরি করে। এজন্য কাকের বাসা খুব অসুন্দর এবং পাখি হিসেবেও সে অসুন্দর। অথচ বাবুই কত য়ত্নের সাথে, কত মনোযোগের সাথে বাসা তৈরি করে। পৃথিবীতে সে শিল্পী পাখি হিসেবে পরিচিত।



 



এ পৃথিবীতে লক্ষ-কোটি মানুষ বসবাস করে। জীবনের তাগিদে তারা কত রকম কাজকেই না পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। সকল পেশার, সকল মানুষের সকল কাজের মধ্যেই যে আন্তরিকতা বা মনযোগ আছে তা বলা যাবে না। মনের বিরুদ্ধেও মানুষ কোন কোন কাজ করে থাকে। আর মনের বিরূদ্ধে কাজ করলেই তা সুন্দর হয় না। তাতে শান্তি থাকে না এবং তাতে বিপত্তি ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয়। আমরা উচ্চতর শিক্ষা লাভ করে যে কাজটিকে পেশা হিসেবে নিয়েছি তা হল_ শিক্ষকতা। শিক্ষকতা একজন শিক্ষকের কাজ। শিক্ষক তিনি, যিনি অপরকে শিক্ষা দেন। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীকে যিনি বা যারা শিক্ষাদান করেন তিনিই শিক্ষক। শিক্ষাদান একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটিকে ধীরে ধীরে নিজস্ব মেধা, শ্রম ও মননের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। ছড়িয়ে দিতে হয় শিক্ষার্থীর মগজে। তাকে গড়ে তুলতে হয় পরম মমতায়, নিজস্ব মেধা, নিজস্ব কৌশল ও চিন্তা-চেতনায়। একজন শিক্ষক তার ছাত্রের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাকে জাগ্রত করে তুলেন। ছাত্রের মনের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে চলার পথ বেঁধে দেন। শিক্ষকের সঠিক দিক নির্দেশনায় শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করে সফল হয়ে উঠে। শিক্ষার্থী শিক্ষকের সাহচার্যে এলেই তার ভেতরে শক্তি জাগ্রত হয়। সেই শক্তির দ্বারাই সে তার ভবিষ্যত জীবনকে সুন্দর ও সাবলীলভাবে গড়ে তোলার প্রয়াস পায়। শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলার এই যে প্রক্রিয়া তা সত্যি হয় শিক্ষকের মননশীলতার গুণে।শিক্ষাদানের মধ্যে অবশ্যই মনযোগ থাকতে হচ্ছে। নিজের আগ্রহ, বুদ্ধি, কৌশল, সৎভাব না থাকলে শিক্ষাদান ব্যর্থ হয়। কথায় আছে_ প্রাণ থাকলে প্রাণী হয় মন না থাকলে মানষি হয়না। শিক্ষকের মনের কোঠায় শিক্ষার্থীর একটি পোক্ত আমল থাকা আবশ্যক। শিক্ষার্থীর প্রতি মনের টান না থাকলে কিছুতেই তাকে সশিক্ষা দেয়া যায় না। তাকে প্রতিনিয়ত শিখিয়ে-পড়িয়ে জগত উপযোগী করে গড়ে তোলার ইচ্ছা থাকলে তবেই সে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে। এখানে শুধু আর্থিক সম্পর্কটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, আত্মিক সম্পর্কও থাকতে হবে। শিক্ষার্থী হচ্ছে শিক্ষকের মানস সন্তান। পিতা-মাতার পরের স্থানই হচ্ছে শিক্ষকের । পিতা-মাতা জন্মদানের পরে খাইয়ে-পড়িয়ে তার জীবনটাকে সচল রাখে, শিক্ষক শিক্ষাদানের মাধ্যমে নেই সচল প্রানে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বেলে দেয়। তাকে আলোকিত করে। মনোজগতের দ্বার উন্মোচন করে। পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে চলতে শেখায়। বিশ্ববরেণ্য শিক্ষক এরিস্টোটল যেমন তার ছাত্র আলেকজান্ডারকে গড়ে তুলেছিলেন। পন্ডিত পূর্ণাইয়া গড়ে তুলেছিলেন সম্রাট আকবরকে। ঠিক তেমনি প্রত্যেকটি শিক্ষক যদি তার ছাত্রের প্রতি মনোযোগ দেন, ভালবাসেন, আপন সন্তান মনে করেন তাহলে পৃথিবী ধন্য হবে। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে শিক্ষা- সৈৗন্দর্যে ভরে উঠবে। তৈরি হবে যোগ্য উত্তরসূরী , সুনাগরিক ও সুধী মানব সন্তান।



 



ইসলাম ধর্মে মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত বলা হয়েছে। যার অর্থ সৃষ্টির সেরা। সৃষ্টির সেরা হতে হলে তাকে নিশ্চয়ই জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎকর্ষতা লাভ করতে হবে। শিখতে হবে, শেখাতে হবে। রাসুলে পাক (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ, যিনি নিজে কোরআন শিখে এবং অপরকে শিক্ষা দেয়। এখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কথা এসেছে। মক্কা বিজয়ের সময় যে সমস্ত লোক মুসলমানদের হাতে বন্দি হয়েছিল তাদেরকে মুক্তিপণ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হল। যারা অসমর্থ তাদেরকে মুক্তিপণ হিসেবে দায়িত্ব নিতে হল এক একজন লোক কমপক্ষে দশ জন লোককে শিক্ষাদান করবে। মহানবী (সঃ) নিজেও ছিলেন একজন শিক্ষক, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। কোরআন শরীফের অনেক আয়াতে আছে_ তোমাকে একজন শিক্ষকরূপে প্রেরণ করা হয়েছে।



 



একজন শিক্ষকের অনেক দায়িত্ব। পরিবারের প্রতি, সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি, ধরিত্রির প্রতি। শিক্ষক মানেই সচেতন ব্যক্তি, সম্মানের পাত্র। এজন্যে তার কাজের জবাবদিহিতাও রয়েছে। এ জবাবদিহিতা প্রথমত তার নিজের বিবেকের কাছে। আমি আমার ছাত্রকে কী শেখাতে পারলাম, কতটুকু শেখাতে পারলাম। আদৌ কিছু শেখাতে পারলাম কী না। দ্বিতীয়ত জবাবদিহিতা রয়েছে অভিভাবকের কাছে। যে বিশ্বাস নিয়ে একজন অভিভাবক তার সন্তানকে মানুষ করার জন্য শিক্ষকের কাছে পাঠাচ্ছেন, শিক্ষক হিসেবে তার সেই বিশ্বাসের কতটুকু মর্যাদা দিতে পারছি। আমার কর্তব্য ঠিকমত পালন করছি কিনা। মাস শেষে শরীরের ঘাম ঝরানো বহুকষ্টে উপার্জিত পয়সা থেকে যে অংশটি একজন অভিভাবক শিক্ষকের হাতে তুলে দেন, তার বিনিময় সঠিকভাবে হচ্ছে কি না। সর্বপরি জবাবদিহিতা রয়েছে আল্লাহর কাছে। আমর সকলেই স্ব স্ব ধর্মের প্রতি অনুগত। সেখানেও কর্তব্যে ফাঁকি দেয়ার বেলায় জবাবদিহিতার প্রশ্ন রয়েছে। একটা কথা আমি প্রায়ই বলে থাকি_ শিক্ষকতা অন্য দশটা পেশার মত কোন সাধারণ পেশা নয়। শিক্ষকতা হচ্ছে একটা ব্রত, একটা সেবা। এখানে অর্থের চেয়ে মর্যাদা বড়। সম্পদের চেয়ে সম্মান বড়। প্রতিপত্তির চেয়ে প্রভাবের দাম বেশি। অন্তঃসার শূন্য হয়ে শিক্ষাদার করে শুধু পয়সা রোজগারের ধান্দা থাকলে শিক্ষকতা কেন। চাল-ডাল, ভূষি, ময়দার ব্যবসা করলেতো অল্পদিনেই ধনী হওয়া যায়। ভাঙ্গা-চূড়ার ব্যবসা করে আমার অনেক বন্ধু কোটিপতি। স্রেফ জমির দালালি করে কত বন্ধু বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়ে আরামে বসবাস করছে। আমার সাথে তাদের অন্যতম পার্থক্য হচ্ছে টাকার মালিকরা আমাকে স্যার বলে সম্বোধন করে। কোন শিক্ষকের জীবনে তার ছাত্ররা যখন উচ্চ শিখরে আরোহন করে, এগিয়ে আসে, তখন কী যে আনন্দ, কী যে আত্মতৃপ্তি, কী যে স্বর্গীয় অনুভূতি তা বলে বোঝানো যাবে না। আমার একুশ বছর শিক্ষকতার জীবনে এমন বিরল সম্মান ও অনুভূতি বহুবার হয়েছে। জগন্নাথ কলেজে পড়ার সময় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম স্যার বলেছিলেন, 'ক্লাসে পড়াতে এলে তোমরা যখন উঠে দাঁড়াও, চুপচাপ বসে আমার লেকচার শোন, তখন মনে হয় আমি সম্রাট আকবর। অথচ এই ঢাকা শহরে আমি ভাড়া বাড়িতে থাকি।' একজন শিক্ষকের মর্যাদা একজন সম্রাটের চেয়েও বেশি। কারণ, সম্রাটকেও একজন শিক্ষকের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়েছে। আমাদের দেশের অনেক বরেণ্য রাষ্ট্র নায়ক, অনেক বড় মাপের নেতা-মন্ত্রীরাও তাদের শিক্ষককে সম্মান করেছেন। শুনেছি জাতির জিতা বঙ্গবন্ধুও একজন শিক্ষককে শিক্ষা মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিলেন। ইউরোপ-আমেরিকাতে শিক্ষকের বেতনই সবচেয়ে বেশি। তারাই সমাজের সবচেয়ে মর্যাদাবান নাগরিকের স্বীকৃতি পায়।



 



আমরা শিক্ষকরা কোনক্রমেই সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের হেলা-ফেলার পাত্র নই। আমরা অকর্মণ্য অলস হলে জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুনাগরিক তৈরি হবে না, দেশ উন্নত হবে না। শিক্ষক মানেই একটা আদর্শ, একটা নীতি, একটি সচেতনতার চিত্র ফুটে উঠে। নিয়ম-নিষ্ঠার সাথে যারা শিক্ষকতা করেছেন বা করছেন তারা আজো সবার নমস্য। মানুষ তাদের সম্মান করে। যোগ্যতার আসন দেয়। চাঁদপুরের অলিউল্লাহ মাস্টার সাহেবের নাম এখনও সকলের মুখে মুখে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও ভোটে দাঁড়ালে মানুষ একজন শিক্ষককে ভোট দেয়।



 



আমাদের দেশে শিক্ষককে মানুষ স্যার বলে সম্বোধন করে। শুধু শিক্ষার্থী নয়, তাদের অভিভাবকরাও। এমনি একটা মর্যাদাশীল পেশায় যিনি নিয়োজিত তিনি কী করে নিজের কাজের প্রতি যত্নশীল ও আন্তরিক হবেন না ভাবতে অবাক লাগে। ইটালির বিখ্যাত সাহিত্যিক ন্যান্জেল বলেছেন, ভাগ্যের উপর হাত থাকলে আমি শিক্ষক হতাম। কাজেই শিক্ষকতা করা কোন দুর্ভাগ্যের কারণ নয়; বরং সেটা ভাগ্যের পরিচায়ক।



 



তবে শিক্ষক যদি হন আন্তরিক, পরিশ্রমী এবং মমতাময়ী তার দ্বারা জগতের পরিবর্তন করা সম্ভব। সমাজের সবকিছু বদলে দিতে পারেন তিনি। কলকাতা হিন্দু কলেজের শিক্ষক ডি-রোজিও গোড়াপত্তন করেছিলেন আধুনিক সাহিত্য সৃষ্টির জন্য মুক্ত মনের মানুষ তৈরির। তারই ঐকান্তিক চেষ্টায় কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মত মানুষ গড়ে উঠেছিল, যার হাত দিয়ে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধারা সূচিত হয়েছে।



 



একজন শিক্ষক শিক্ষার আলোতে আলোকিত করেছেন শিক্ষার্থীর অন্তর। তার সংস্পর্শে এসে আলোকিত মানুষ গড়ে ওঠে সমাজের ঘরে ঘরে। জ্ঞানে বিজ্ঞানে সমৃদ্ধশালী হয়ে যায় দেশ। পৃথিবীর সকল ছাত্ররা বিনয়াবনত চিত্তে শিক্ষা লাভ করে নিজেদের ধন্য করবে। এগিয়ে নিয়ে যাবে কল্যাণ ও মানবতার পথে। চির উজ্জ্বল হবে আগামীর পৃথিবী।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৩৩০৬৬৮
পুরোন সংখ্যা