চাঁদপুর, মঙ্গলবার ২৭ আগস্ট ২০১৯, ১২ ভাদ্র ১৪২৬, ২৫ জিলহজ ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৫-সূরা রাহ্মান


৭৮ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৯। ওজনের ন্যায্যমান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওজনে কম দিও না।


১০। তিনি পৃথিবীকে স্থাপন করিয়াছেন সৃষ্ট জীবের জন্য;


১১। ইহাতে রহিয়াছে ফলমূল এবং খর্জুর বৃক্ষ যাহার ফল আবরণযুক্ত,


১২। এবং খোসা বিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ ফুল।


 


নদীতে স্রোত আছে তাই নদী বেগবান, জীবনে দ্বন্দ্ব আছে তাই জীবন বৈচিত্রময়। -টমাস মুর।


 


 


পবিত্র হওয়াই ধর্মের অর্থ।


 


ফটো গ্যালারি
কোচিং ও ভর্তি পরীক্ষা প্রসঙ্গ
২৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


রহিমা আক্তার মৌআমার বড় সন্তান ২০১২ সালে এসএসসি ও ২০১৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষা পাস করে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে। এইচএসসি পরীক্ষার পর ওকে একটা ইংলিশ কোর্সে ভর্তি করাই, একই প্রতিষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ঘ ইউনিটে' ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য কোচিংয়ে দিই। সব মিলিয়ে দশ কী এগারো হাজার টাকা খরচ হয়। ভর্তি ফরম তুলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ঘ ইউনিট' থেকে। আর শখে পরীক্ষা দেয় ঢাকা সিটি কলেজে। আমাদের আগে থেকেই ইচ্ছা ওকে সিএ পড়াব। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ঘ ইউনিটে' পরীক্ষা দিতে বলি। যদি পছন্দের ৩-৪ বিষয়ের মাঝে ভর্তির সুযোগ পায়, ভালো কথা। নইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াব না। সে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে, কিন্তু পছন্দের বিষয় না পাওয়ায় ভর্তি করাইনি। অনেকেই বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বলে কথা, বিষয় কি এসে যায় ভর্তি করিয়ে ফেলেন। উচ্চশিক্ষার দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আমরা তা করিনি। বরং দেরি না করে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতেই তাকে সিএ ফার্মে দিই। ২০১৯ সালের ৩০ জুন ওর সিসি শেষ হয়। পাশাপাশি তাকে একটা সরকারি কলেজে বিকম ভর্তি করাই। সেটাও চলছে তার।



 



সাহিদার দুই মেয়ে এক ছেলে। দ্বিতীয় সন্তান মানে বড় মেয়ে এইচএসসি পরীক্ষার পর ওকে উচ্চশিক্ষার জন্য দুটা কোচিং এ ভর্তি করায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, গাজীপুরসহ সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তি ফরম তোলে। ফরম পূরণ করতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন মূল্য। সাইবার ক্যাপ থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ৬০০ থেকে শুরু করে ১২০০ টাকা দিয়ে ফর্ম পূরণ করতে হয়। তবে মেডিকেল আর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের হিসাব আলাদা। যদি ধরে নিই, সাহিদা ১৫টা ফরম তুলেছে তাহলে ফরম জমা দিতে ওর কত খরচ হতে পারে? গড়ে ১ হাজার করে হলেও ১৫ হাজার টাকা। বলে রাখি মেডিকেল কোচিংয়ে ভর্তি ১৫ থেকে ১৯ হাজার টাকা। দুটা কোচিং ভর্তি ৩০ হাজার তো গিয়েছেই। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, গাজীপুর যাবে মেয়ে পরীক্ষা দিতে। সঙ্গে যাবে কে? মেয়ের বাবা যাবে, বাবার সঙ্গে মেয়ে একা যাবে না। সঙ্গে মাকে যেতে হবে। মা যাবে তাহলে তার আরেক কন্যাসন্তান কোথায় থাকবে। তাকেও নিতে হবে। তার মানে দাঁড়াল একটা শিক্ষার্থীকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যেতে সঙ্গে তিনজনসহ মোট চারজনের চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, গাজীপুর যাওয়া আসা কেমন খরচ হতে পারে। শুধু যাওয়া আশা নয়, থাকা খাওযায় একটা খরচ তো আছেই। টিনএজ মেয়েদের নিয়ে তো আর যেনতেন হোটেলে ওঠা যাবে না। এর আগে কখনো চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, গাজীপুর যাওয়া হয়নি। পরীক্ষা দিতেই যখন গেল একটা দিন অন্তত ঘুরতেই পারে। প্রিয় পাঠক সব হিসাব করতে গেলে খরচ কত দাঁড়ায় তা দেখুন। তার মাঝে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, গাজীপুর বিভিন্ন জায়গার পরীক্ষার তারিখ যদি পরপর হয়, তাহলে বাসে টিকিট পাওয়া আরেক ভোগান্তি। অবশেষে সাহিদার মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইডেন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়।



 



যশোর থেকে তিন মা এসেছেন ঢাকায় তিন ছেলেকে নিয়ে। একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে তারা থাকেন। ফ্ল্যাট ভাড়া ৩০ হাজার টাকা। ছেলেদের ইঞ্জিনিয়ারিং কোচিং করাচ্ছেন। কথা হলো ওদের সঙ্গে, বললেন এখানে (ফার্মগেটে) আসল সেন্টার। যশোরে আছে কোচিংয়ের শাখা, কিন্তু সেগুলো ভালো নয়। একসঙ্গে তিন মা-ই থাকেন। ছেলেদের খাওয়ার পছন্দ আলাদা। সবার মা সবার জন্য আলাদা পছন্দের রান্না করেন। সব কাজ করেন। কোচিংয়ের সময় ঢাকা শহরের অনেক এলাকার বাসা ও হোস্টেলের ভাড়া দ্বিগুণ-তিন গুণ হয়ে যায়। শুধু কি তাই? কয়েক মাস আগেই এসে বাসা বা হোস্টেল বুকিং দিতে হয়। মালিকপক্ষ যা ধার্য করে তাই দিতে হয়, নইলে রাস্তা মাপ। এই তিন মা তাদের ঘর-সংসার স্বামী আর অন্য সন্তানদের রেখে কয়েক মাসের জন্য রাজধানীতে। তাদের পাশেই বয়স্ক একজন মহিলা, উনিও একই কাজে এই শহরে। উনি এসেছেন নাতিনের সঙ্গে। মেয়ে চাকরি করে তাই নাতিনের সঙ্গে আসতে পারেননি। মেয়েজামাই এসে বাসা ভাড়া করে দিয়ে গেছেন। এখন তিনি অন্যদের সঙ্গে এই ভাবেই থাকেন।



 



নোয়াখালী থেকে পাঁচটি মেয়ে ডাক্তারি কোচিং করতে আসে। ভাড়া নেয় একটা ফ্ল্যাট। নিয়ম করে ১৫ দিন করে যেকোনো একজন অভিভাবক (মা/খালা/নানী) থাকেন ওদের সঙ্গে। সবার জন্য বাজার করেন, রান্না করেন। অগ্রিম কিছু টাকা দিয়ে ফান্ড তৈরি আছে; সেখান থেকে খরচ করা হয় যা সবার সমান হবে। একজনে ছোট একটা ফ্রিজও নিয়ে আসে। এতে করে বাজারের অনেক সুবিধা হয়। ওদের ফ্ল্যাটে গেলাম এক দিন, ভবনটির কাজ এখনো শেষ হয়নি। ৪ থেকে ৮ তলার ফ্ল্যাটের ভেতরের কাজ শেষ করে এমন কোচিংয়ের জন্য ভাড়া দেয়। লিফট তো দূরের কথা, সিঁড়ির কাজ হয়নি কিছুই। সিঁড়িতে প্লাস্টারও করা হয়নি, রেলিং যুক্ত করা হয়নি। সিঁড়ি ঘরে কোনো লাইটিংয়ের ব্যবস্থা নেই। অনেক রড এলোমেলো ভাবে। ৪-৫-৬ তলায় মেয়েরা থাকে। ৭-৮ তলায় থাকে ছেলেরা। জানিনা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কতটুকু ছিল। প্রতিটি ফ্ল্যাট এমন কোচিংয়ের শিক্ষার্থীদের ভাড়া দেওয়া। আমি ৬ তলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে যেমন ভয় পাই; তেমনি অসুস্থও হয়ে পড়ি। চার মাস পর ওরা ফ্ল্যাট ছেড়ে দেয়। অবাক বিষয় বাড়ির মালিক চার মাসের ভাড়া আগেই একসঙ্গে অগ্রিম নিয়েছেন।



 



এমন একটি দুটি ঘটনা নয়, একটা ফ্ল্যাট দুইটা ফ্ল্যাট নয়। হাজার হাজার ঘটনা আর শত শত ফ্ল্যাট এভাবে ভাড়া দিচ্ছেন বাড়ির মালিকরা আর ভাড়া নিচ্ছেন উচ্চশিক্ষার জন্য কোচিং করতে আসা অভিভাবকরা। তাদের ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং করতে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য। অনেকের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, একটা শিক্ষার্থীকে কোচিং আর ভর্তি পরীক্ষা বাবত এক বা দেড়-দুই লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। ভর্তি পরীক্ষায় পাস করলে ভর্তিতে কত কি খরচ হয় বা লাগে তা প্রায় সবার জানা। এ হিসাব কি বলে দিচ্ছে না আমরা উচ্চশিক্ষার জন্য নিজেদেরই স্থির রাখতে পারছি না। সন্তান কোন বিভাগে পড়বে, তা তার মেধার ওপর বিবেচনা করেই দিতে হবে। এরপর তাকে উচ্চশিক্ষার জন্য কোনদিকে নেবেন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ওকালতি, শিক্ষা ক্ষেত্রে নাকি হাতে-কলম মানে টেকনিক্যাল লাইনে। আগে সন্তানের যোগ্যতা দেখুন, পরে নিজের সামর্থ্য দেখুন। এরপর ভাবুন, তারপর ওকে সেই পথে এগোতে দিন।



 



শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১২ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা জারি করে। তবে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করেনি। সাড়ে ছয় বছর পর গত ২৪ জানুয়ারি ২০১৯ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। উল্লেখ্য, কোচিংয়ে শিক্ষকদের বেপরোয়া আচরণের কারণেই ২০১১ সালে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের অভিভাবক মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু উচ্চ আদালতে রিট করেন। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোচিং বাণিজ্য বন্ধে ২০১২ সালে নীতিমালা করেই দায়িত্ব শেষ করেন। নীতিমালা জারির পর গণস্বাক্ষরতা অভিযানের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৯০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট-টিউশন নিতে হচ্ছে। আর ৪ বছরের মাথায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় সমীক্ষায় (২০১৬) বলা হয়েছে, শিক্ষার পেছনে একজন অভিভাবকের মোট আয়ের ৫ দশমিক ৪২ ভাগ ব্যয় হয়। শিক্ষার পেছনে অভিভাবকের ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত কোচিং; যা ৩০ শতাংশ।



 



এই তো হলো স্কুল কোচিংয়ের হিসাব, উচ্চশিক্ষার কোচিং ও ভর্তি পরীক্ষার খরচের হিসাব আরো মহামারি আকার ধারণ করেছে তা আমরা ওপরের কয়েকটা ঘটনা থেকেই বুঝতে পারি। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ তো করতেই হবে, কিন্তু এই মহামারি খরচ কমাতে আমাদের করণীয় বিষয় হলো : সন্তান কোন গ্রুপে পড়লে ভালো করবে তা আগেই অভিভাবকদের ঠিক করতে হবে, অবশ্যই তার মেধার ওপর নিভর্র করে। সে হিসাবে আপনি কোচিং করাবেন। অতিরিক্ত হলে ৩-৪টা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ফরম তুলবেন। যে জেলায় আছেন তার বাইরের জেলায় পড়াতে অপরাগ হলে সেসব জেলা থেকে ফরম তুলবেন না, পরীক্ষাও দিতে যাবেন না। কোচিং সেন্টারগুলোর সব শাখার লেখাপড়ার মান একই করতে হবে। পর্যায়ক্রমে ভালো শিক্ষকদের দিয়ে সব শাখায় ক্লাস বা লেকচার দেয়াতে হবে। আর বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আবেদন আপনারা একই দিনে একই বিষয়ের পরীক্ষা বিভিন্ন জেলায় দেওয়ার ব্যবস্থা করুণ। নইলে এই মহামারি থেকে যেমন বের হতে পারবে না অভিভাবকরা; তেমনি বের হতে পারবেন না শিক্ষার্থীরা। মনে রাখতে হবে, জাতির মেরুদ- সোজা করতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেরুদ- বাঁকা করার অধিকার কারোই নেই। আইন জারি নয়, বাস্তবায়ন হবে_ এটাই কাম্য।



লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৮৪২৮৭
পুরোন সংখ্যা