চাঁদপুর, বুধবার ১২ জুন ২০১৯, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ৮ শাওয়াল ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, কিংবদন্তীতুল্য সমাজসেবক আলহাজ্ব ডাঃ এম এ গফুর আর বেঁচে নেই। আজ ভোর ৪টায় ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন।ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন।বাদ জুমা পৌর ঈদগাহে জানাজা শেষে বাসস্ট্যান্ড গোর-এ-গরিবা কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৪-সূরা কামার


৫৫ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


 


 


 


assets/data_files/web

যাকে মান্য করা যায় তার কাছে নত হও। -টেনিসন।


 


 


যারা ধনী কিংবা সবকালয়, তাদের ভিক্ষা করা অনুচিত।


 


 


ফটো গ্যালারি
দূরবীনে দূরের পাহাড়
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


মানুষ প্রকৃতিকে চায়ের কাপে পান করার পক্ষপাতী। আর এ কারণেই প্রকৃতির বিবিধ উপাদান তার কাপে চায়ের নির্যাস হয়ে আসে। চায়ের ঘ্রাণ যখন নাকে আসে তখন মনে হয় চোখে পাহাড় ভাসে। পাহাড়ের সাথে চায়ের একটা নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। চা যেন পাহাড়-কন্যা। পাহাড়ের চা সমতলে জন্মেছে তা শোনা যায়নি এখনো। চা খেতে খেতে পাহাড়ের প্রেম উছলে পড়লো। কেউ চা চেয়ে পেতে দেরি হলেই চায়ের পিপাসায় কাতর মানুষ বলতে বাধ্য হয়, কিহে, চা আনতে সিলেট গেলে নাকি? যারা অসুখী, যারা ভোগে পরশ্রীকাতরতায়, তাদের কাছে সব সময়ই দূরের পাহাড়গুলোই নীল মনে হয়। অর্থাৎ এই অসুখীদের জন্যে প্রাচীনকাল হতেই পাহাড়ের নীলাভ রহস্য অতৃপ্তির একটা কারণ হয়ে রয়েছে। আর তাই বেদনার পাহাড় চেপে বসে বুকে, মনের ঘরে। রূপকথার চাঁদের বুড়িকে দেখতে গিয়ে চাঁদের পাহাড়কে পড়ে চোখে। চাঁদের পাহাড় তাই সিনেমা হয়ে শেষমেষ মনোরঞ্জন করতে এলো মানুষের।



পাহাড় ও পর্বতের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। পর্বত অধিক খাড়া। পাহাড় ততটা নয়। সমুদ্র সমতল হতে অনধিক এক হাজার ফুট উঁচু ভূমিকে পাহাড় বলে। পাহাড় শ্যামল হতে পারে, পাহাড় সবুজ তরুতে মায়াভরা হতে পারে। কিন্তু পর্বত শ্যামল নয়, পাথুরে এবং তরুহীন। পাহাড়ের বুকে জমা আছে ধোঁয়া, জমা আছে কান্না। পাহাড় তাই নদীর জন্ম দেয়, জন্ম দেয় ঝরণার। পাহাড়ের উষ্ণ জলে ছুটে চলে প্রস্রবণ। পাহাড়ের নদী কর্ণফুলি, পাহাড় হতে ছুটে চলে ডাকাতিয়া, সাঙ্গু। পাহাড় তাই নদীমাতা। পাহাড়ের আছে অনেক রূপ, অনেক নাম।



রাজার পাহাড় রাণীর পাহাড় : বাংলাদেশের এক ক্ষীণতনু নদী ঢেউফা। চমকে চপলা এ নদীর বুকজুড়ে জেগে ওঠা চরের পাশেই বিশাল উঁচু টিলা যাকে বলে রাজার পাহাড়। এর কোল ঘেঁষে নানা কারুকার্যে সাজানো উপজাতিদের এলাকা বাবেলাকোণা। ছবি অাঁকা গ্রামের মতোই সৌন্দর্যম-িত এ স্থানটি শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের মেঘালয়ের পাদদেশে অবস্থিত। মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে, প্রাচীনকালে কোনো এক রাজার বাসস্থান ছিল এখানে আর সেই স্মৃতিতে এ পাহাড়ের নাম হয়েছে স্থানীয়দের কাছে রাজার পাহাড়। কিন্তু এ পাহাড়ের আগের সেই সৌন্দর্য এখন আর নেই। গারো পাহাড়ে যতগুলো পাহাড় রয়েছে তার মধ্যে এটির উচ্চতাই সবচেয়ে বেশি। এর চূড়া সবুজ আর নীলের সংমিশ্রণে যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ ছুঁয়ে। পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য মন কেড়ে নেয় চোখের পলকে। রাজার পাহাড় ঘেঁষা জনপদ বাবেলাকোণা, অসংখ্য উঁচু-নিচু টিলায় ঘেরা এক অনবদ্য গ্রাম। রাজার পাহাড়ের পাশাপাশি প্রাচীন শহর কুমিল্লার লালমাই ময়নামতিতে আছে রাণীর বাংলোর পাহাড়।



ডিসি হিল বা ডিসির পাহাড় : চট্টগ্রাম শহরের জিরো পয়েন্ট হতে এক কিলোমিটার দূরে উত্তরে নন্দনকানন বৌদ্ধ মন্দিরের উল্টোদিকে অবস্থিত পাহাড়টাই হলো ডিসি হিল।



ইংরেজ শাসনামলের গোড়ার দিকে এখানে চাকমা রাজার বাড়ি ছিলো। পরবর্তীতে এখানে চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনারের বাংলো স্থাপিত হওয়ায় কালক্রমে এই পাহাড় ডিসি হিল নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বন্ধু চট্টগ্রামের হাবীবুল্লাহ্ বাহারের নানাবাড়িতে তামাকুম-ি লেইনে থাকাকালীন এখানে প্রায়ই আসতেন অবসর কাটাতে। জাতীয় কবির এই আগমনকে স্মরণীয় করে রাখতে দশ এপ্রিল দুহাজার পাঁচ সালে ডিসি হিলের নতুন নামকরণ করা হয় নজরুল স্কয়ার। ঊনিশশো সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকেই এখানে পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণ উৎসব আয়োজিত হয়ে আসছে। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান আগে ইস্পাহানী পাহাড়ের পাদদেশে উদ্যাপন করা হলেও ঊনিশশো আটাত্তর সালে এই উৎসব ডিসি হিল পার্কে সরিয়ে নেয়া হয়।



পাহাড়ের রাণী : পাহাড়ের রাণী সাজেক। মেঘ, পাহাড় আর অরণ্য এই তিন নিসর্গ-নিবিড়ে বনকন্যা সাজেক অপরূপা। সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে সাজেকের ঘন সবুজে ঢাকা উঁচুনিচু পাহাড়ের দল সাদা মেঘে ঢাকা থাকে। কখনো মেঘের দল গা ভিজিয়ে দিয়ে যায় সবুজ অরণ্যের। দুই হাত প্রসারিত করলে বোঝা যায় মেঘ ছুঁয়ে যাচ্ছে। রোমাঞ্চকর এমন অনুভূতি বোঝানো যায় না আসলে।



চকলেট পাহাড় : দ্বীপদেশ ফিলিপাইনের বোহোল মিউনিসিপ্যালিটির পঞ্চাশ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ডোম আকৃতির এক হাজার সাতশ' ছিয়াত্তরটি পাহাড়কে একত্রে চকলেট পাহাড় বলা হয়। পাহাড়গুলোর আকৃতির পাশাপাশি গ্রীষ্মকালে চকলেট রঙ ধারণ করে। মনে হয় যেন সারি সারি খড়ের গাদা কেউ বসিয়ে দিয়েছে।



ফিলিপাইনের পর্যটন আকর্ষণের মধ্যে এটা হচ্ছে অন্যতম। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণেই এরকম চকলেট রঙের পাহাড়ের মাটির বর্ণ তৈরি হয়েছে এবং দুহাজার ছয় সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে।



জিলাপি পাহাড় : নানা নামে পাহাড়ের নাম যেমন হয়েছে তেমনি বাঙালির প্রিয় খাবার 'জিলাপি'র নামেও পাহাড়ের নামকরণ বাদ যায়নি। কেন জিলাপির নামে পাহাড়ের নাম তার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। কাগজে-কলমে এই পাহাড় আসলে বাটালি হিল, যা চট্টগ্রামের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। শহরের নিউমার্কেটস্থ জিরো পয়েন্ট হতে এক কিলোমিটার দূরে লালখান বাজার ও মতিঝর্ণার মাঝখানে রাস্তা দিয়ে উঠে যেতে হয় এই পাহাড়ে। এই পাহাড়ের উচ্চতা দুইশ আশি ফুট। জিলাপির মতো এঁকেবেঁকে উঠতে হয় বলে এই পাহাড়কে স্থানীয়রা জিলাপি পাহাড় নামে ডাকে। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার পর অনুভূতিটা হয় চমৎকার। এই চূড়া থেকে সমগ্র চট্টগ্রাম দেখে নেয়া যায় পাখির মতো এক ঝলকে। জিলাপি পাহাড়ের চূড়ায় আছে 'শতায়ু অঙ্গন' যেখানে রোজ ভোরে ব্যায়ামের মাধ্যমে শতায়ু লাভের উদ্দেশ্যে প্রাতঃভ্রমণকারীরা আরোহন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই বাটালি পাহাড়ের চূড়াতেই বিমান বিধ্বংসী কামান স্থাপন করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে পাহাড়টি দর্শনীয়।



শয়তানের পাহাড় : 'এঞ্জেল ফলস্' বা 'স্বর্গীয় দূত' নামে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাতটি দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের ভেনিজুয়েলায় অবস্থিত। এই জলপ্রপাতটির উৎপত্তিস্থল হলো 'আওয়ানতেপুই' পাহাড়। এই 'আইওয়ানতেপুই' শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো 'শয়তানের পাহাড়'। মজার বিষয় হলো, পৃথিবীর প্রায় সব জলপ্রপাতেরই উৎস নদী, হ্রদ, বরফগলা পানির স্রোত অথবা মাটির নিচে থেকে উঠে আসা পানি। তবে অ্যাঞ্জেল ফলসের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। 'অ্যাঞ্জেল ফলস্'-এর সে রকম কোনো পানির উৎস নেই। রেইন ফরেস্ট অঞ্চলে সারা বছর যে বৃষ্টিপাত হয়, তার পানিই পাহাড় থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে সৃষ্টি হয়েছে এই জলপ্রপাতের! এই বৃষ্টির পানি গিয়ে পড়ে নিচের 'কেরিপ' নদীতে। এক কিলোমিটার উঁচু থেকে পড়া 'অ্যাঞ্জেল ফলস'-এর বেশির ভাগ পানি নিচে পড়ার আগেই বাষ্প হয়ে যায়।



জ্বীনের পাহাড় : সৌদি আরবের মদিনা শহর হতে প্রায় পঁয়তালি্লশ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ওয়াদি আল বায়দা নামক স্থানে অবস্থিত পাহাড়টিকে বলা হয় জ্বীনের পাহাড়। সেই পাহাড়ের বিস্ময়কর ঘটনা হচ্ছে, অনেক কিছুই ঢালুর বিপরীতে অর্থাৎ উঁচুর দিকে গড়ায়। সাধারণ নিয়মের একেবারেই উল্টো। রহস্যঘেরা এই পাহাড়ে বন্ধ গাড়িও ঢালুর বিপরীতে চলতে শুরু করে। এই অদৃশ্য শক্তি টেনে নিয়ে যায় কয়েক টন ওজনের গাড়িকেও প্রায় একশ চলি্লশ কিলোমিটার গতিবেগে। একে কেউ বলে জ্বীনের পাহাড়, কেউ বলে জাদুর পাহাড়। কেউ একে বলে চুম্বকের পাহাড়ও।



পরীর পাহাড় : চট্টগ্রাম বিভাগ ও জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র চট্টগ্রাম শহরের কাছারি পাহাড়ের প্রাচীন নাম পরীর পাহাড়। সুদূর অতীতে এর অন্য কোনো নাম ছিল কিনা জানা যায় না। আজকের কাছারি পাহাড়ের প্রাচীন 'পরীর পাহাড়' নামের উৎপত্তির পেছনে সত্য-মিথ্যা ও কল্পনারঞ্জিত কাহিনীই জড়িয়ে আছে মনে করা হয়। ইংরেজ শাসনকালে পরীর পাহাড়কে 'ফেয়রি হিল' নামে ডাকা হয়। তখন এই পাহাড়টি জন হ্যারি নামক একজন পর্তুগীজের সম্পত্তি ছিল। জঙ্গলাকীর্ণ পরীর পাহাড়ে সে সময় একটা কুঠি ছিল। এই কুঠিতে পর্তুগীজদের ডাক্তারখানা ছিল। ইংরেজ ক্যাপ্টেন টেঙরা সাহেব পর্তুগীজ জন হ্যারি থেকে পরীর পাহাড় কিনে নেন। পরে পেরেডা সাহেব টেঙরা সাহেব থেকে পাহাড়টি খরিদ করেন। অবশেষে ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি পটিয়া থানার ছনহরা নিবাসী সরের জাহাজের মালিক ও খ্যাতনামা জমিদার অখিল চন্দ্র সেন নয় হাজার টাকা মূল্যে পেরেডা সাহেব থেকে পরীর পাহাড় খরিদ করেন।



বিপ্লবীর পাহাড় : যেদিন চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ার মাস্টারদা সূর্যসেন পাহাড়তলীতে ইউরোপীয়ান ক্লাবে কুকুর এবং ভারতীয়ের প্রবেশ নিষেধ লেখা দেখতে পেলেন সেদিনই ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের দামামা বেজে ওঠে রক্তে। তারই ধারাবাহিকতায় ইংরেজদের কাছ থেকে বিদ্রোহের মাধ্যমে ঊনিশশো তিরিশ সালের বাইশে এপ্রিল বিপ্লবীরা যখন চট্টগ্রামকে কিছুদিনের জন্যে মুক্ত করে জালালাবাদ পাহাড়ে অবস্থান করছিল সে সময় সশস্ত্র ইংরেজ সৈন্যরা তাঁদের আক্রমণ করে। দুই ঘন্টার প্রচ- যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর সত্তর থেকে একশ জন এবং বিপ্লবী বাহিনীর চৌদ্দ জন সদস্য শহীদ হন। এদের মধ্যে হরিগোপাল বল (টেগরা), প্রভাস বল, নরেশ রায়, ত্রিপুরা সেন, বিটু ভট্টাচার্য, মতি কানুনগো, অশোক দত্ত, নির্মল লালা, জিতেন দাশগুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, পুলিন ঘোষ ও অর্ধেন্দু দস্তিদারের নাম উল্লেখযোগ্য। এই জালালাবাদ পাহাড়ই বিপ্লবীদের পাহাড়।



রঙধনু পাহাড় : মহাচীনের ঝাংগিয়ে দাংজিয়া ল্যান্ডফর্ম জিওগ্রাফিক্যাল পার্ক বিশ্বের বিস্ময় বলেই আজ পরিগণিত। উত্তর-পশ্চিম চীনের এই অঞ্চল এখন জনপ্রিয় পর্যটক ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে কেবলমাত্র 'রঙধনু পাহাড়'-এর কারণেই।



এই এলাকায় পা রাখা মাত্রই চোখ ধাঁধিয়ে যায় বর্ণিল সাত রঙের তরঙ্গ বন্যায়। বেগুনি, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লালের বাহার যেন এখানে বাকরুদ্ধ করে দেয়। এতোসব মুগ্ধতা জাগানিয়া দৃশ্য আকাশে নয়, রঙিন পাহাড়ের গায়েই। শুধু একটা পাহাড় নয়, গোটা একটা পাহাড় শ্রেণি সাত রঙের বাহারে সেজে আছে। কৃত্রিমভাবে তৈরি নয়, প্রকৃতির আজব খেয়ালে রঙধনু পর্বত সত্যিই তৈরি হয়েছে চীনে।



বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ওই রঙিন পাহাড় তৈরি হতে সময় লেগেছে অন্তত চবি্বশ মিলিয়ন বছর। তবে পাহাড়ের গায়ে ওই বিচিত্র রঙের এই সমাহার বেলে পাথরের কারণেই। হিমালয় গঠনের অনেক আগে থেকেই এই পাহাড় তৈরি শুরু হয়েছিল। বালু-পাথরে জমাট বাঁধার সময়ে তাতে মিশে গিয়েছিল বিভিন্ন রঙের খনিজ, গাছপালার অবশেষ ইত্যাদি। সেই মিশ্রণগুলোই এই রঙিন দুনিয়া তৈরি করে। পাহাড়ের প্রাথমিক বর্ণ ছিলো লাল। পরবর্তীতে অন্য বর্ণগুলো একটির পর একটি তৈরি হয়।



ম্যাজিক পাহাড় : আইয়ারস রকের অপর নাম ম্যাজিক বা যাদুর পাহাড়। এর ভৌগোলিক অবস্থান অস্ট্রেলিয়ায়। বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্যের জন্যেই অনেকে একে ম্যাজিক পাহাড়ও বলে থাকে। দেখতে ডিমের মত আকৃতির এ পাহাড়টির উচ্চতা তিনশ' আটচলি্লশ মিটার, দৈর্ঘ্য সাত কিলোমিটার এবং প্রস্থ দুই কিলোমিটার। পাহাড়টির স্বাভাবিক রং লাল তবে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় ঘটে অদ্ভুত যত ঘটনা। সকালে সূর্যের আলোর বিচ্ছুরণ পাহাড়ের উপর পড়লেই মনে হয় যেন আগুন ধরেছে এর গায়ে। বেগুনি ও গাঢ় লাল রংয়ের শিখা বের হয়ে আসে পাহাড় থেকে। কেবল সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্ত নয় সারাদিন জুড়ে চলে রঙ বদলের এই মোহনীয় খেলা। প্রথমে হলুদ থেকে কমলা, পরে লাল ও মাঝে মাঝে বেগুনি কখনোবা গুমোট কালো। অসম্ভব রহস্যের আনাগোনা পাহাড়টি জুড়ে।



অ্যাডামস পিক বা আদম পাহাড় : রহস্যময় আদম চূড়ার অবস্থান শ্রীলংকার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের শ্রীপাডা নামক প্রদেশে। খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম এই চার ধর্মের অনুসারীদের কাছে অতি পবিত্র এই পাহাড়ের চূড়াটি । লাখ লাখ বছর ধরে চলে আসা যে রহস্য আজও মানুষ জানতে পারেনি তা হলো, চূড়ার যে স্থানে হযরত আদমের পায়ের চিহ্ন বলে কথিত, সেই স্থানে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সূর্যের আলো, আর মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মেঘের ঘনঘটা বা বৃষ্টি পড়ে না। এমন আরও অনেক রহস্য আছে এই চূড়াটিকে কেন্দ্র করে। অতি চমৎকার এই চূড়াটি বছরের পর বছর অবিকল রয়ে গেছে। এর সৌন্দর্য এতটুকু মস্নান হয়নি। এ কারণে চূড়াটি বিশ্বের মানুষের কাছে পবিত্র বলে পরিচিত।



পনরশ পাঁচ সালে শ্রীলঙ্কা সফরে এসেছিলেন পর্তুগীজ এক নাগরিক। তিনি এ পাহাড়কে বলেছেন পিকো ডি আদম বা আদমের শৃঙ্গ। সেই থেকে পাহাড়ের নাম আদম পাহাড়। হিন্দুরা মনে করে চূড়ায় অবস্থিত পদচিহ্নটি শিবের পায়ের, খ্রিস্টানরা মনে করে এটা যীশুর পায়ের ছাপ, বৌদ্ধরা মনে করে এটা বুদ্ধের পায়ের ছাপ। সবার ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় জায়গাটি সবার কাছেই শ্রদ্ধার। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ওই পায়ের চিহ্নটি সত্যিই রহস্যময়, আকারেও বিশাল। পাহাড়ের চূড়ায় আছে একটি সমতল ক্ষেত্র। সর্বপ্রথম আঠারোশ ষোল সালে লেফটেন্যান্ট ম্যালকম এই স্থান পরিমাপ করেন। এতে দেখা যায় এর দৈর্ঘ্য চুয়াত্তর ফুট এবং প্রস্থ মাত্র চবি্বশ ফুট এবং মোট আয়তন সতরশ ছিয়াত্তর বর্গফুট। এর চূড়ায় রয়েছে একটি বিশাল পাথরখ- যার উচ্চতা আট ফুট। ওই পাথরের ওপরেই রয়েছে ওই পদচিহ্ন, যা দৈর্ঘ্যে আটষট্টি ইঞ্চি এবং প্রস্থে একত্রিশ ইঞ্চি। পাহাড়ের চূড়ায় যেখানে পদচিহ্ন রয়েছে সেখানে পেঁৗছা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। তবে অনেক পর্যটকই ঝুঁকি নিয়ে সেখানে গিয়েছেন। তাঁরা নিজের চোখে ওই পায়ের ছাপ দেখে বিস্মিত হয়েছেন।



পাহাড়ের ধর্মীয় গুরুত্ব : ইসলামের ইতিহাসে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে নানা পাহাড় ও পাহাড়ের গুহা। পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছিল পাহাড়ে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কুরাইশদের আক্রমণ হতে বাঁচতে আশ্রয় নিয়েছিলেন পাহাড়ে। মক্কায় অবস্থিত সাফা ও মারওয়া এই পাহাড় দুটি হযরত ইব্রাহীম (আঃ), তার স্ত্রী হাজেরা (আঃ) ও শিশুপুত্র ইসমাইল (আঃ)-এর পবিত্র স্মৃতি সমৃদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিবি হাজেরা (আঃ) পুত্রের পানির পিপাসা মিটাতে পানির সন্ধানে এই দুই পাহাড়ের মাঝে সাতবার যাওয়া-আসা করেন। পবিত্র হজ্বব্রত পালন কালে পুণ্যার্থীদের সেই ঘটনার স্মরণে দুই পাহাড়ের মাঝখানে সাতবার হাল্কা দৌড়ে নিয়ম পালন করতে হয়। নারী হজ্বব্রত পালনকারীদের বিবি হাজেরার কল্যাণে এই দৌড় দিতে হয় না।



মক্কা শরিফ থেকে ছয় কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত একটি পাহাড়ের নাম জাবাল-আল-নূর। এই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত গুহাকে বলা হয় 'গারে হেরা' বা 'হেরা গুহা'। এখানে বসেই ধ্যান করতেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)। ছয়শ দশ খ্রিস্টাব্দের শবেক্বদরে মহান আল্লাহর তরফ থেকে ফেরেশতা জিবরাইল (আঃ) এই গুহায় সর্বপ্রথম মুহাম্মদ (সাঃ)-এর কাছে কোরআনের বাণী নিয়ে যান।



এখানে বসেই ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন তিনি। তাই মুসলমানদের কাছে এই পাহাড় ও গুহা অত্যন্ত পবিত্র একটি স্থান। মূল পাহাড়ের উচ্চতা ছয়শ বিয়ালি্লশ মিটার। কিন্তু হেরা গুহাটি পাহাড়ের চূড়া থেকে পঞ্চাশ মিটার নিচে। গুহায় উঠতে হয় বারোশ সিঁড়ি বেয়ে। গুহার প্রবেশপথ উত্তরমুখী।



সৌদি আরবের মক্কার পূর্ব দিকে আরাফাতে অবস্থিত আরো একটি পাহাড় জাবালে রহমত (রহমতের পাহাড়) নামে পরিচিত। ইসলাম ধর্মের সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এখানে দাঁড়িয়ে হজযাত্রীদের সামনে ছয়শ বত্রিশ খ্রিস্টাব্দে বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। এটি ছিল নবীজির শেষ ভাষণ। প্রায় সোয়া লাখ মানুষ সেদিন আরাফাত পর্বতের পাদদেশে দাঁড়িয়ে ভাষণটি সরাসরি শুনেছিলেন।



সিনাই পাহাড়ের সাথে জড়িয়ে আছে হযরত মুসা (আঃ) নবীর স্মৃতি। ধর্মীয় গুরুত্ববহ পাহাড় সিনাই। এটা মিসরের সিনাই উপদ্বীপের সেন্ট ক্যাথেরিন শহরে অবস্থিত। এটা হোরেব পর্বত, মুসা পর্বত, গাবাল মুসা তথা জাবাল মুসা (মুসার পর্বত) হিসেবেও পরিচিত। সিনাই পর্বতের ধর্মীয় তাৎপর্য নানামুখী। হযরত মুসা (আঃ) এই পর্বতের ওপর অবস্থানকালে নবুয়ত লাভ করেন। এটি আরবের বেদুইন এবং খ্রিস্টানদের কাছেও একটি ধর্মীয় গুরুত্ববাহী পাহাড়।



ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের নিকট সওর পাহাড়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি মক্কা শরিফ থেকে তিন মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। ইসলাম প্রচারের ত্রয়োদশ বছরে মদিনায় মুসলিমরা হিজরত করতে লাগলেন। কুরাইশরা মুসলিমদের হিজরত করতে বাধা দেওয়া ও প্রতিরোধ সৃষ্টি করার জন্যে ছিল বদ্ধপরিকর। কুরাইশদের ভয়ে মুসলিমরা গোপনে হিজরত করতেন। এমনি এক সময়ে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় কুরাইশরা। সে সময় রাসুল (সাঃ) আবু বকর (রাঃ)কে সঙ্গে নিয়ে হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেন। আবু বকর (রাঃ)সহ প্রায় পাঁচ মাইল অতিক্রম করে সওর পাহাড়ের একটি গুহায় তাঁরা তিনদিন লুকিয়ে ছিলেন।



জাবালে আবি কুবাইস নামে আর একটি পাহাড় মসজিদে হারামের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে অবস্থিত। পাহাড়টি সাফা পাহাড়ের খুব কাছে। হযরত নূহ (আঃ)-এর বন্যার সময় হাজরে আসওয়াদ এই পাহাড়ের ওপর রাখা ছিল। প্রসিদ্ধ তাবেয়ি 'মুজাহিদ'-এর বর্ণনা মতে, স্রষ্টা পৃথিবীতে পাহাড়ের মধ্যে সর্ব প্রথম এ পাহাড়টি সৃষ্টি করেন।



সনাতন সমপ্রদায়ের কাছে সীতাকু-ের পাহাড় অনেক আগে সতীকু- নামে পরিচিত ছিল। এই সীতাকু- পাহাড়ের তিনশ পঞ্চাশ বর্গকিলোমিটারের এক বিশাল অংশের পাহাড়ী এলাকা জুড়ে আছে এক তীর্থক্ষেত্র। পাশাপাশি এখানে দুই পাহাড়ের শীর্ষস্থানে আছে দুটি মন্দিরের অবস্থান। একটি বিরুপাক্ষ মন্দির অন্যটি চন্দ্রনাথ মন্দির। চন্দ্রনাথ মন্দিরটি সমতল ভূমি থেকে তেরশ ফুট উচ্চে পাহাড়ের শীর্ষদেশে অবস্থিত। এ মন্দির তথা পাহাড় একে অন্যে মিলেমিশে একাকার হয়ে চন্দ্রনাথ ধাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। প্রতি বছর শ্রী শ্রী শিবরাত্রি ব্রত উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধান তীর্থস্থান হিসেবে খ্যাত চন্দ্রনাথ ধামে বসে মানুষের মিলন মেলা।



আবার, মহেশখালীর মৈনাক পাহাড়ের সাথেও জড়িয়ে আছে আদিনাথ শিবের কাহিনী। লোককাহিনী অনুসারে মহেশখালীর মৈনাক পাহাড়ে শিবের আবির্ভাব ঘটে ত্রেতাযুগে। রাম-রাবণের যুদ্ধে শিবের আশীর্বাদ লাভের জন্যে রাবণ কৈলাশে যান শিবকে আনার জন্যে। দেবতাদের অনুরোধে শিব রাবণকে শর্ত দেন যে, বিরতিহীনভাবে নিয়ে যেতে পারলে তিনি লংকায় যেতে রাজি আছেন। শর্ত মেনে শিবকে মাথায় নিয়ে রাবণ যাত্রা শুরু করে। কিন্তু প্রস্রাবের জন্যে মৈনাক পাহাড়ে রাবণের যাত্রাবিরতি ঘটে। এতে শর্তভঙ্গ হওয়ায় শিব, মৈনাক পাহাড়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। মহেশখালী দ্বীপ এবং সমুদ্রের মাঝখানে আদিনাথ পাহাড়টির নাম মৈনাক পাহাড়। আদিনাথ মন্দিরটি সমুদ্রস্তর থেকে দুইশ আটাশি ফুট উঁচু মৈনাক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। নাথ সমপ্রদায়ের ইতিহাস থেকে জানা যায়, হিন্দু-মুসলমানদের সেতুবন্ধন হিসেবে মন্দিরটি ইতিহাসের সাক্ষী। উপমহাদেশের আদি তীর্থস্থান হিসেবে প্রত্যেক হিন্দু এখানে পূজা করে। তাই মন্দিরের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই মন্দির কমপ্লেঙ্ েআছে একটি মসজিদ ও একটি রাখাইন বৌদ্ধ বিহার। তাই অনেকে মন্দিরটিকে অসামপ্রদায়িক চেতনার প্রতীক মনে করেন।



 



পাহাড়ের সাথে জড়িয়ে আছে বৌদ্ধদেরও সুখস্মৃতি। ইতিহাস হতে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব পাঁচশ আশি হতে পাঁচশ আটাশ সালের এই সময়ে, তৃতীয় ধন্যাবতী যুগের প্রথম রাখাইন রাজা চান্দা সুরিয়ার শাসনামলে তাঁর আমন্ত্রণে সেবক আনন্দকে নিয়ে তথাগত গৌতম বু্দ্ধ আরাকানে এসেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। গৌতম বুদ্ধের সাথে ছিলেন আরো পাঁচশ শিষ্য। সেখানে এক ধর্ম সম্মেলনে সেবক আনন্দকে উদ্দেশ্য করে গৌতম বু্দ্ধ বলেছিলেন, 'হে আনন্দ! ভবিষ্যতে পশ্চিম সমুদ্রের পূর্ব উপকূলে পাহাড়ের উপর আমার বক্ষাস্থি স্থাপিত হবে। তখন এর নাম হবে 'রাং-উ'।' 'রাং-উ' রাখাইন শব্দ যার শাব্দিক অর্থ বক্ষাস্থি। 'রাং-উ' হতেই আজকের রামুর উৎপত্তি। সেই অনুসারে রামুর এই পাহাড়কে বলে রাংকূট পাহাড়। মৌর্য বংশের তৃতীয় সম্রাট অশোক কর্তৃক স্থাপিত চুরাশি হাজার ধাতু চৈত্যের মধ্যে রামুর রাংকূট বিহারের এ চৈত্যটি অন্যতম।



পাহাড়ের সাথে ইতিহাসে জড়িয়ে আছে খ্রিস্ট ধর্মের ইতিহাসও। ইতিহাসে বলে, পুরানো জেরুজালেম শহরের প্রাচীরের বাইরে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি স্থনের নাম গলগাথা। নিউ টেস্টামেন্ট অনুসারে, এখানেই জগতত্রাতা যীশুখ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। জায়গাটির অদূরে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। পরবর্তীতে যীশুর ক্রুশবিদ্ধ ও সমাধিস্থ করার স্থানকে ঘিরে গড়ে উঠে খ্রিস্টানদের সবচেয়ে প্রাচীন উপাসনালয় সেপলক্যার চার্চ।



ঔষধির পাহাড় : গ্রামের নাম দ্রোণগিরি। ভারতের উত্তরাখ-ের আলমোড়ার কাছে এই গ্রামে গত কয়েক হাজার বছর ধরে হনুমানজি কোনো পূজো পাননি। নেই কোনো মন্দিরও। তাঁর পূজো তো দূর অস্ত। তাঁর প্রতীক লাল রঙই সেখানে ব্রাত্য। অথচ গ্রামে বাস করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই।



গ্রামের ভুটিয়া জনজাতির বিশ্বাস, এই গ্রামেই ছিল দ্রোণগিরি বা দ্রোণ পাহাড়। যা আদতে রামায়ণে বর্ণিত গন্ধমাদন পর্বত। যেখানে ছিল বিশল্যকরণী লতা। ত্রেতা যুগে এই পাহাড়ের সন্ধানে এসেছিলেন পবনপুত্র হনুমান। কারণ বানররাজ সুগ্রীবের বৈদ্য সুষেণ বলেছিলেন, একমাত্র এই লতাই হতে পারে ইন্দ্রজিতের শরাঘাতে মৃতপ্রায় লক্ষ্মণের জন্যে মৃত সঞ্জীবনী সুধা। হিমালয়ের কোলে সেই পাহাড়ের সন্ধানে এই গ্রামে এসেছিলেন হনুমান। কিন্তু সেখানে চারদিকেই পাহাড় দেখে কোন্টা দ্রোণগিরি বুঝতে পারেননি। হনুমানকে পথ দেখিয়েছিলেন এক বয়স্কা মহিলা। তিনিই হনুমানকে গন্ধমাদন বা দ্রোণগিরি চিনিয়ে দিয়েছিলেন। দ্রোণগিরি চিনলেও হনুমান চিনতে পারেননি বিশল্যকরণী।



তাই আস্ত পর্বতকেই কাঁধে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন স্বর্ণলঙ্কায়। বিশল্যকরণীর স্পর্শে নতুন জীবন পেয়েছিলেন রামানুজ লক্ষ্মণ। কিন্তু ফেরার সময় হনুমান দ্রোণগিরিকে আর নিয়ে আসেননি এই গ্রামে। তাই তাঁর উপর খুব রাগ দ্রোণগিরি গ্রামের বাসিন্দাদের। তারা মনে করে তাঁর জন্যই হারাতে হয়েছে দুর্লভ ঔষধির আকরকে। এ কারণেই এই জনপদে পূজো হয় না হনুমানজি বজরঙ্গ বলীর। কেবল বছরে একদিন পূজো উৎসর্গ করা হয় দ্রোণগিরিকে। পূজোর দিন কোনো নারীর হাত থেকে খাবার গ্রহণ করেন না গ্রামের পুরুষরা। কারণ এক নারীই হনুমানকে পথ দেখিয়েছিলেন সেই পবিত্র পাহাড়ের।



লাল পাহাড় কালা পাহাড় : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালীঘাট ইউনিয়নের ফুলছড়া চা বাগানে লাল পাহাড়ের অবস্থান। উপজেলা শহর থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটারের পথ গেলেই লাল পাহাড় দেখা যায়। কালা পাহাড় হচ্ছে বৃহত্তর সিলেটের সর্বোচ্চ বিন্দু বা চূড়া। এমনকি এটি বাংলাদেশের উত্তর অংশেরও সর্বোচ্চ বিন্দু। আজগরাবাদ চা বাগান থেকে এটি মাত্র চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।



ইতিহাসের কালাপাহাড় : ষোল শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলার মুসলিম সুবেদার সুলতান সুলাইমান করানি ত্রিবেণীর যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সে সময়ের প্রবল ক্ষমতাশালী হিন্দু বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ রাজীবলোচন বা কালাচাঁদ রায় ভাদুড়ির সাথে সখ্যতা গড়তে ফন্দি অাঁটেন। সেই রাজনৈতিক চালের অংশ হিসেবে রাজীবলোচনকে নিজের প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানালেন সুলেইমান করানি। কথিত আছে, সেখানে সুলেইমানের মেয়েকে দেখে অত্যন্ত অভিভূত হয়ে পড়েন রাজীবলোচন।



এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন সুলেইমান। আবার সুলতান সুলেইমানের কন্যাও কৃষ্ণকায় লম্বা সুপুরুষ রাজীব লোচন রায়কে প্রতিদিন দেখতেন পূজো করতে আসতে। তাতে তার প্রতি সুলতান কন্যার প্রেম জাগ্রত হয় এবং তিনি তার পিতাকে তা ব্যক্ত করেন। এবার এক ঢিলে দুই পাখি মারবেন বলে ঠিক করলেন সুলতান সুলেইমান করানি। তিনি রাজীবলোচন রায়কে বললেন তার কন্যাকে বিয়ে করতে হবে নচেৎ প্রাসাদের জল্লাদের এক কোপে তার মস্তক ছিন্ন করা হবে। প্রাণ বাঁচাতে হোক, প্রেমের কারণে হোক রাজীবলোচন রাজি হলেন বিধর্মে বিবাহে। বিয়ের পর রাজীবলোচনের নতুন নাম হয় মোহাম্মদ ফারমুলি। তবে তিনি কুখ্যাত হয়ে ওঠেন লোকমুখে কালাপাহাড় নামেই। চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্য ছিল নামের। তাকে সেনাপতি করে দিলেন শ্বশুর সুলেইমান করানি।



কালাপাহাড়ের তখন একমাত্র লক্ষ্য ছিল হিন্দু ধর্মের দেবালয় ও বিগ্রহের বিনাশ সাধন। ওড়িশার তৎকালীন শাসক রাজা মুকুন্দদেবকে পরাজিত করে পুরী কোণার্ক সম্বলপুরূ কটকে তা-বলীলা চালান কালাপাহাড়। পনরশ আটষট্টি খ্রিস্টাব্দে তার আক্রমণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় কোণার্কের সূর্যমন্দির।



তাম্রলিপ্তের বর্গভীমা মন্দির ধ্বংস করতে এসেছিলেন কালাপাহাড়। কিন্তু মন্দির ও দেব বিগ্রহের সৌন্দর্য দেখে তিনি কোনও এক কারণে নিরস্ত হন। আক্রমণ না করে উল্টো মন্দিরের প্রশস্তি করেছিলেন।



হাজার পাহাড়ের দেশ সাত পাহাড়ের নগরী : পাহাড়ের যেমন অনেক নাম তেমনি পাহাড়ের নামেও আছে দেশ। হাজার পাহাড়ের দেশ বলা হয় রুয়ান্ডাকে। আবার নিরাপত্তার কারণে প্রাচীন রোম নগরী গড়ে উঠেছিলো সাতটি পাহাড়কে কেন্দ্র করে। এজন্যে রোমকে বলা হয় সাত পাহাড়ের নগরী। এই পাহাড়গুলো হতে শত্রুর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা যায় সহজে এবং আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধেও আক্রমণ করা যায় সহজে। সাত পাহাড়ের নগরী রোমকে তাদের ভাষায় বলা হয় 'সেত্তে কলি্ল ডি রোমা'।



এই সাত পাহাড় হলো



১. অ্যাভেন্টিন হিল



২. ক্যালিয়ান হিল



৩. ক্যাপিটোলিন হিল



৪. এসকুইলিন হিল



৫. প্যালাটাইন হিল



৬. কুইরিনাল হিল



৭. ভিমিনাল হিল



 



পাহাড় মানব



ভারতের বিহার রাজ্যের গলুর গ্রাম আর মূল শহরের মধ্যে বিশাল পাহাড়। পাহাড় এড়িয়ে ঘুর পথে শহরের দূরত্ব সত্তর কিলোমিটার। তবে পাহাড় টপকাতে পারলে দূরত্বটা কমে আসে সাত কিলোমিটারে। সবার জন্য পাহাড় টপকানো সহজ ব্যাপার নয়। সেই গলুর গ্রামে স্ত্রী ফাল্গুনি দেবীকে নিয়ে বাস করতেন দশরথ মাঝি। গ্রামবাসীকে পাহাড় ঘুরে শহরে যেতে দেখে তার খারাপ লাগত। ঊনিশশো ষাট সালে তিনি গ্রামবাসীদের নিয়ে পাহাড় কেটে পথ করতে চাইলেন। কিন্তু অসম্ভব বলে সবাই পাশ কাটিয়ে গেলো।



এক পর্যায়ে সবাই মিলে স্থানীয় সড়ক বিভাগে যোগাযোগ করলেও তারা কোনো আগ্রহ দেখালেন না। কিন্তু দশরথ থামার পাত্র নন। হাতুড়ি-কোদাল আর শাবল নিয়ে একাই লেগে গেলেন পাহাড় কাটতে।



প্রতিদিন তীব্র রোদের মধ্যে একাই পাহাড় কাটা চালিয়ে গেলেন দশরথ।



ঊনিশশো সাতষট্টি সাল। পাহাড় কেটে রাস্তা বানানোর সময় পিপাসা লাগলে স্ত্রী ফাল্গুনীকে পানি দিতে বললেন। ঘরে পানি ছিল না। পানির পাত্র নিয়ে পাহাড়ে উঠে গেলেন ফাল্গুনী। ফেরার পথে পড়ে আঘাত পেলেন । আহত স্ত্রীকে পাহাড় ঘুরে শহরের হাসপাতালে নিতে নিতে দেরি হয়ে গেল। পথেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ফাল্গুনী। এ ঘটনা দশরথের কাজের যৌক্তিকতাকে আরও বাড়িয়ে দিল। নতুন উদ্যমে পাহাড় কাটা শুরু করলেন তিনি। একটানা চৌদ্দ বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে শেষ করলেন রাস্তার কাজ।



সব মিলিয়ে বাইশ বছরে মোট একশ দশ মিটার রাস্তা তৈরি করেছেন দশরথ। নয় দশমিক এক মিটার চওড়া রাস্তাটির নামকরণ করা হয়েছে তার নামেই, 'দশরথ মাঝি সড়ক'। এখন বাচ্চারা শহরের ভালো স্কুলে লেখাপড়া করতে পারছে। পাচ্ছে ভালো চিকিৎসাসেবা। আগে পাহাড় কাটার জন্য যাকে সবাই পাগল বলে ডাকত, এখন তাকে সবাই ডাকে 'মাউন্টেন ম্যান বা পাহাড় মানব' নামে।



ঘুম পাহাড় : ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলায় অবস্থিত একটা পাহাড়ের নাম ঘুম পাহাড়। পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্র দার্জিলিঙের লাগোয়া ঘুম পাহাড় হলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জমজমাট একটা স্টেশন। যার উত্তরে দার্জিলিং, দক্ষিণে কার্সিয়াং, পূর্বে তিস্তা তথা কালিম্পং এবং পশ্চিমে সুখিয়াপোখরি। ভারতের উত্তরপূর্ব সীমান্ত রেলপথের একটা শাখা শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং রুটের মধ্যে পড়ে ঘুম রেলস্টেশন। এই ঘুম রেলস্টেশন হলো পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু রেলস্টেশন। শুধু তাই-ই নয়, এই রেল পরিবহন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত। কাছাকাছি আছে মনোরম পাহাড়ী সৌন্দর্য উপভোগ করার জায়গা 'বাতাসিয়া লুপ'। সারা পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে ঘুম রেল স্টেশন অন্যতম আকর্ষণ।



সেঙ্ পাহাড় : ইন্দোনেশিয়ার মধ্য জাভায় অবস্থিত একটি পাহাড়ের নাম সেঙ্ পাহাড়, যা দূর থেকে দেখলে আর পাঁচটার মতই সুন্দর আর শান্ত দেখায়। কিন্তু আর পাঁচটা পাহাড় থেকে যে এটা অনেকটা আলাদা সেটা বোঝা যায় এর নামের মাহাত্ম্য থেকে। এই পাহাড়ের ওপর অনেকটা পথ হেঁটে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে যায় তীর্থযাত্রীরা।



প্রতি রাতে প্রায় আট হাজার মানুষ এই পাহাড়ে উঠে আজব ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেন।



আদিমতার চর্চা এখনো এ পাহাড়কে রহস্যময় করে রেখেছে।



সাহিত্যে ও সঙ্গীতে পাহাড়ের ঘ্রাণ : সাহিত্য ও সঙ্গীতের সাথে পাহাড়ের সম্পর্ক নিবিড়। পাহাড় উঠে এসেছে কবির কবিতায়, কথাশিল্পীর উপন্যাসে, কণ্ঠশিল্পীর গানে গানে। প্রবাদে বলে, বস্নু আর দ্য হিলস দৌজ আর ফার অ্যাওয়ে। অর্থাৎ দূরের পাহাড় সর্বদাই নীল। মানে সুখময়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে বেড়িয়েছেন শিলং পাহাড়ে। এখানে তিনি হোমিওপ্যাথির চর্চায় একজনের দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা করে সফল হয়েছিলেন। এই পাহাড়কে প্রাধান্য দিয়েই তিনি তাঁর নান্দনিক উপন্যাস 'শেষের কবিতা' রচনা করেন। কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ তার 'দ্য সলিটারি রীপার' কবিতায় পাহাড়ের নিঃসঙ্গতার সুরকে তুলে এনেছেন শস্যকর্তনকারিণীর গানের মাধ্যমে। আমরা সাহিত্যের মাধ্যমে রিপ ভ্যান উইঙ্কেলের কথা জানি, যে পাহাড়ে চলি্লশ বছর একটানা ঘুমিয়ে আবার বাড়ি ফেরেন। মার্জারি কিনান রঅলিংসের 'অ্যা মাদার ইন ম্যানভিল'-এ আমরা জেরীকে পাই পাহাড়ের ওপারে কল্পিত মায়ের খোঁজে যেতে।



'পাহাড় চূড়ায়' কবিতায় কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়



একটা আস্ত পাহাড়ই কিনে নিতে চেয়েছেন নদীর বদলে। তার ভাষায় আমরা জানতে পাই,



'এখন আমি একটা পাহাড় কিনতে চাই।



সেই পাহাড়ের পায়ের



কাছে থাকবে গহন অরণ্য, আমি সেই অরণ্য পার হয়ে যাব, তারপর শুধু রুক্ষ



কঠিন পাহাড়।'



রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দও 'ঝরা পালক'-এর 'মিশর' কবিতায় নীলনদের দেশের 'কাফন-পাহাড়' পিরামিডের স্তূপের কথা উল্লেখ করেছেন।



কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য রাঁচিতে বেড়াতে গিয়ে পাহাড় আর সুবর্ণরেখা নদীর প্রেমে পড়েছেন।



গানে গানে পাহাড় এসেছে মূর্ত হয়ে অভিনব উপমায়। দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের গানে ধূম্র পাহাড় হয়ে উঠেছে অসাধারণ দেশপ্রেমের বাণী হয়ে। গীতিকার রফিকউজ্জামানের লেখা কথায় পাহাড়ের গান আজও কিংবদন্তী হয়ে কানে বাজে সদ্য প্রয়াত সুবীর নন্দীর কণ্ঠে-



'পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝরণা বলো



ওই পাহাড়টা বোবা বলেই কিছু বলে না



তোমরা কেন বোঝো না যে



কারো বুকের দুঃখ নিয়ে কাব্য চলে না।'



পাহাড়কে গানে চমৎকারভাবে এনেছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি যখন চট্টগ্রাম ভ্রমণে আসেন তখন সীতাকু-ের পাহাড় তার মন কেড়ে নেয়। কবির মন কেড়ে নেওয়া মানেই তা অমর হয়ে থাকা। সীতাকু-ের পাহাড় তাই আজও অমর হয়ে আছে তার গানে,



'আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই।



ওই পাহাড়ের ঝর্ণা আমি, ঘরে নাহি রই গো



উধাও হ'য়ে বই।'



 



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৭১৬৪৯৩
পুরোন সংখ্যা