চাঁদপুর, বুধবার ২১ অক্টোবর ২০১৫ । ৬ কার্তিক ১৪২২ । ৭ মহররম ১৪৩৭
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুরে আরো ১২ জনের করোনা শনাক্ত, মোট আক্রান্ত ১৫৯
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২১-সূরা : আম্বিয়া

১১২ আয়াত, ৭ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাাহ্র নামে শুরু করছি।



০৫। উহারা ইহাও বলে, ‘এই সমস্ত অলীক কল্পনা, হয় সে উহা উদ্ভাবন করিয়াছে, না হয় সে একজন কবি। অতএব সে আনয়ন করুক আমাদের নিকট এক নিদর্শন যেরূপ নির্দর্শনসহ প্রেরিত হইয়াছিল পূর্ববর্তীগণ।’

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন

 


শরীরের দুরন্ত অভিযানের সময় হচ্ছে যৌন, আর মনের অভিযান শুরু হয় বার্ধক্যের।

লোগন পিয়ারসাল।



 


মানবতার সেবায় যিনি নিজের জীবন নিঃশেষে বিলিয়ে দিতে পারেন, তিনিই মহামানব।

                 - হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)

 


ফটো গ্যালারি
কার্তিক মাসের কৃষি
কৃষিবিদ মোহাম্মদ হোসেন
২১ অক্টোবর, ২০১৫ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, সবাইকে হৈমন্তীয় শুভেচ্ছা। হেমন্ত বাংলা ঋতুচক্রের এক কাব্যিক উপাখ্যান। সংস্কৃতিতে ঐহিত্যে হেমন্ত যেমন সুন্দরের কাব্য শশি তেমনি কৃষি ভুবনের চৌহদ্দিত হেমন্ত কাজেকর্মে ব্যস্ততায় এক স্বপি্নল মধুমাখা আবাহনের অবতারনা করে। সোনালী ধানের সম্ভার সুঘ্রাণ ভরে থাকে বাংলার মাঠ প্রান্তর। কৃষক মেতে ওঠে ঘাম ঝরানো সোনালি ফসল কেটে মাড়াই-ঝাড়াই করে শুকিয়ে গোলা ভরতে। সে সাথে শীতকালীন ফসলের জন্যে প্রয়োজনীয় কাজগুলো শুরু করতে হবে এখনই। তাহলেই আসুন আমরা জেনে নেই কার্তিক মাসে আমাদের করণীয় কাজগুলো।

আমন ধান : এ মাসে অনেকের আমন ধান পেকে যাবে তাই রোদেলা দিন দেখে ধান কাটতে হবে। আগামী মৌসুমের জন্যে বীজ রাখতে চাইলে প্রথমেই সুস্থ সবল ভালো ফলন দেখে ফসল নির্বাচন করতে হবে। এরপর কেটে, মাড়াই-ঝাড়াই করার পর রোদে ভালোমতো শুকাতে হবে। শুকনো গরম ধান আবার ঝেড়ে পরিস্কার করতে হবে। বীজ রাখার পাত্রকে মাটি বা মেঝের ওপর না রেখে পাটাতনের ওপর রাখতে হবে। পোকার উপদ্রব থেকে রেহাই পেতে হলে ধানের সাথে নিম, নিসিন্দা, ল্যান্টানার পাতা শুকিয়ে গুঁড়া করে মিশিয়ে দিতে হবে।

গম : কার্তিক মাসের দ্বিতীয় পক্ষ থেকে গম বীজ বপনের প্রস্তুতি নিতে হয়। দো-অাঁশ মাটিতে গম ভালো হয়। অধিক ফলনের জন্যে গমের আধুনিক জাত যেমন : আনন্দ, বরকত, কাঞ্চন, সৌরভ, গৌরব, শতাব্দী, সুফী, বিজয়, বারি গম-২৭ রোপন করতে হবে। বীজ বপনের আগে অনুমোদিত ছত্রাক নাশক দিয়ে বীজ শোধন করতে হবে। সেচযুক্ত চাষের জন্যে বিঘাপ্রতি ১৬ কেজি এবং সেচবিহীন চাষের জন্যে বিঘাপ্রতি ১৩ কেজি বীজ বপন করতে হবে। ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সার জমি তৈরির শেষ চাষের সময় এবং ইউরিয়া তিন কিস্তিতে উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। বীজ বপনের ১৩-২১ দিনের মধ্যে প্রথম সেচ প্রয়োজন এবং এরপর প্রতি ৩০-৩৫ দিন পর ২ বার সেচ দিলে খুব ভালো ফলন পাওয়া যায়।

আখ : এখন আখের চারা রোপনের উপযুক্ত সময়। ভালোভাবে জমি তৈরি করে আখের চারা রোপন করা উচিত। আখ রোপনের জন্যে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৯০ সে.মি. থেকে ১২০ সে.মি. এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৬০ সে.মি. রাখতে হবে। এভাবে চারা রোপন করলে বিঘাপ্রতি ২২০০-২৫০০ চারার প্রয়োজন হয়।

ভুট্টা : ভুট্টা চাষ করতে চাইলে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে এবং জমি তৈরি করে বীজ বপন করতে হবে। ভুট্টার উন্নত জাতগুলো হলো বারি ভুট্টা-৬, বারিভুট্টা-৭, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৭, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৮, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৯, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১০, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১১ এসব।

সরিষা ও অন্যান্য তেল ফসল

কার্তিক মাস সরিষা চাষেরও উপযুক্ত সময়। সরিষার প্রচলিত জাতগুলোর মধ্যে টরি-৭, রাই-৫, কল্যানীয়া, সোনালি, সম্পদ, বারি সরিষা-৬, বারি সরিষা-৭, বারি সরিষা-৮ উল্লেখযোগ্য। জাতভেদে সামান্য তারতম্য হলেও বিঘাপ্রতি গড়ে ১ থেকে ১.৫ কেজি কেজি সরিষা বীজ প্রয়োজন হয়। বিঘাপ্রতি ৩৩-৩৭ কেজি ইউরিয়া, ২২-২৪ কেজি টিএসপি, ১১-১৩ কেজি এমওপি, ২০-২৪ কেজি জিপসাম ও ১ কেজি দস্তা সারের প্রয়োজন হয়। সরিষা ছাড়াও অন্যান্য তেল ফসল যেমন : তিল, তিসি, চিনাবাদাম, সূর্যমুখী এ সময় চাষ করা যায়।

আলু : আলুর জন্যে জমি তৈরি ও বীজ বপনের উপযুক্ত সময় এ মাসেই। হালকা প্রকৃতির মাটি অর্থাৎ বেলে দো-অাঁশ মাটি আলু চাষের জন্যে বেশ উপযোগী। ভালো ফলনের জন্যে বীজ আলু হিসেবে যে জাতগুলো উপযুক্ত তা হলো ডায়ম-, মুল্টা, কার্ডিনাল, প্যাট্রেনিজ, হীরা, মরিন, অরিগো, আইলশা, ক্লিওপেট্রা, গ্রানোলো, বিনেলা, কুফরীসুন্দরী এসব। প্রতি বিঘা জমি আবাদ করতে ২০০-২৭০০ কেজি বীজ আলুর দরকার হয়। এক বিঘা জমিতে আলু আবাদ করতে ৪৫ কেজি ইউরিয়া, ৩০ কেজি টিএসপি, ৩৩ কেজি এমওপি, ২০ কেজি জিপসাম এবং ২ কেজি দস্তা সার প্রয়োজন হয়। তবে এ সারের পরিমাণ জমির অবস্থাভেদে কম-বেশি হতে পারে। তাছাড়া বিঘাপ্রতি ১.৫ টন জৈবসার ব্যবহার করলে ফলন অনেক বেশি পাওয়া যায়। আলু উৎপাদনে আগাছা পরিষ্কার, সেচ, সারের উপরিপ্রয়োগ, মাটি আলগাকরন বা কেলিতে মাটি তুলে দেয়া, বালাইদমন, মালচিং করা আবশ্যকীয় কাজ। সময়মতো সবগুলো কাজ করতে পারলে খরচ কমে আসে, ফলন বেশি হয়।

মিষ্টি আলু : নদীর ধারে পলি মাটিযুক্ত জমি এবং বেলে দো-অাঁশ প্রকৃতি মাটিতে মিষ্টি আলু ভালো ফলন দেয়। তৃপ্তি, কমলা সুন্দরী, দৌলতপুরী আধুনিক মিষ্টি আলুর জাত। প্রতি বিঘা জমির জন্যে তিন গিটযুক্ত ৭৫০-৮০০ খ- লতা প্রয়োজন হয়। বিঘাপ্রতি ১.৫ টন গোবর/জৈবসার, ৫ কেজি ইউরিয়া, ১৫ কেজি টিএসপি, ২০ কেজি এমওপি সার দিতে হবে। আলুর মতো অন্যান্য পরিচর্যা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায়।

ডাল ফসল : ডালকে বলা হয় গরিবের আমিষ। আমিষের ঘাটতি পূরণ করতে ডাল ফসল চাষে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। মুসুর, মুগ, মাসকলাই, খেসারি, ফেলন, অড়হর, সয়াবিন, ছোলাসহ অন্যান্য ডাল এ সময় চাষ করতে পারেন। এজন্যে উপযুক্ত জাত নির্বাচন, সময়মতো বীজ বপন, সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ, পরিচর্যা, সেচ, বালাই ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করতে হবে। সরকার ডাল ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ প্রদান করছেন।

শাকসবজি : শীতকালীন শাকসবজি চাষের উপযুক্ত সময়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বীজতলায় উন্নতজাতের দেশি-বিদেশি ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, বাটিশাক, টমেটো, বেগুন এসবের চারা উৎপাদনের জন্যে বীজতলায় বীজ বপন করতে হবে। আর গত মাসে চারা উৎপাদন করে থাকলে এখন মূল জমিতে চারা রোপন করতে পারেন। রোপনের পর আগাছা পরিস্কার, সার প্রয়োগ, সেচ নিকাশসহ প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করতে হবে। তাছাড়া লাল শাক, মুলা শাক, গাজর, মটরশুঁটির বীজ এ সময় বপন করতে পারেন।

অন্যান্য ফসল : অন্যান্য ফসলের মাধ্যে এসময় পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, ধনিয়া, কুসুম, জোয়ার এসবের চাষ করা যায়। সাথী বা মিশ্র ফসল হিসেবেও এসবের চাষ করে অধিক ফলন পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে চাষাবাদ কৌশল অবলম্বন করতে হবে।

প্রাণিসম্পদ : সামনে শীতকাল আসছে। শীতকালে পোলট্রিতে রোগবালাইয়ের আক্রমণ বেড়ে যায় এবং রাণীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড, বসন্ত রোগ, কলেরা এসব রোগ দেখা দিতে পারে। এসব রোগ থেকে হাঁস-মুরগিকে বাঁচাতে হলে এ মাসেই টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। গত মাসে ফুটানো মুরগির বাচ্চার ককসিডিয়া রোগ হতে পারে। রোগ দেখা দিলে সাথে সাথে চিকিৎসা করতে হবে। গবাদিপ্রাণীর আবাসস্থল মেরামত করে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। গবাগি প্রাণিকে খড়ের সাথে তাজা ঘাস খাওয়াতে হবে। ভুট্টা, মাসকলাই, খেসারি রাস্তার ধারে বা পতিত জায়গায় বপন করে গবাদি প্রাণিকে খাওয়ালে স্বাস্থ ও দুধ দুটোই বাড়ে। রাতে অবশ্যই গবাগি প্রাণিকে বাহিরে না রেখে ঘরের ভেতরে রাখতে হবে। তা-না হলে কুয়াশায় ক্ষতি হবে। এছাড়া তড়কা, গলাফুলা রোগের বিষয়ে সচেতন থাকলে মারাত্মক সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।

মৎস্য সম্পদ : এ সময় পুকুরে আগাছা পরিষ্কার, স্মপূরক খাবার এ সার প্রয়োগ করতে হবে। তাছাড়া জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরী। রোগ প্রতিরোধের জন্যে একর প্রতি ৪৫-৬০ কেজি চুন প্রয়োগ করতে পারেন। অংশীদারিত্বের জন্যে যেখানে যৌথ মাছ চাষ সম্ভব নয় সেখানে খুব সহজে খাঁচায় বা প্যানে মাছ চাষ করতে পারেন। এছাড়া মাছ সংক্রান্ত যে কোনো পরামর্শের জন্যে উপজেলা মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। তাহলে দেখবেন আপনার জমির ফলন কতখানি বাড়ে। সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাই-বোন, শীতকাল আমাদের কৃষির জন্যে একটি নিশ্চিত মৌসুম। যতবেশি যৌক্তিক বিনিয়োগ করতে পারবেন, লাভও পাবেন তত বেশি। শুকনো মৌসুম বলে মাটিতে রস কম থাকে। তাই যদি প্রতি ফসলে চাহিদা মাফিক সেচ প্রদান নিশ্চিত করতে পারেন তাহলে দেখবেন আপনার জমির ফসল কতখানি বাড়ে। একমাত্র কৃষির মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশকে সমৃদ্ধ করতে পারি। আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আধুনিক কৃষির সব ক'টি কৌশল যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি। আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পেঁৗছতে পারবো। এছাড়া কৃষির যে কোনো সমস্যায় আপনার কাছের উপজেলা কৃষি অফিস, উপজেলা মৎস্য অফিস ও উপজেলা প্রাণিসম্পদের পরামর্শ অফিসের কাছ থেকে নিতে পারেন। আপনাদের সবার জন্য শুভ কামনা। কৃষির সমৃদ্ধিতে আমরা সবাই গর্বিত অংশীদার।

আজকের পাঠকসংখ্যা
১৪৬২৫৩
পুরোন সংখ্যা