চাঁদপুর, বুধবার ২৫ নভেম্বর ২০২০, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ৯ রবিউস সানি ১৪৪২
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
একটি বছরে যা হারিয়েছি তা কখনো পূরণ হবার নয়
মোঃ মঈনুল ইসলাম কাজল
২৫ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


জীবন থেকে আরো একটি বছর হারিয়ে গেলো। একে একে অনেক বছর এই সুন্দর পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। কোনো একদিন আমারও সময় শেষ হয়ে যাবে। যেমনি করে প্রিয় মানুষগুলো তাদের গন্তব্যে চলে যাচ্ছে। জীবনের একটি বছর শেষ করে যখন আরেকটি বছরে পা রাখি ঠিক তখন কাছের মানুষগুলো বিভিন্ন ভাষায় শুভ কামনা ও নতুন দিনের শুভেচ্ছা জনিয়ে নিজেকে নতুন উদ্যমে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। তখন বেঁচে থাকার প্রত্যাশা অনেক গুণ বেড়ে যায়। তারপরও কি আমরা বেঁচে থাকতে পারি? আমার জন্ম হওয়ার পর কয়েকটি বছর আমার জন্মতারিখ জানা ছিলো না। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ১৯৮৫ সালে আমার বাবা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে যান। বাবা বিদায় নেয়ার পর বাবার ডায়েরি থেকে আমরা জানতে পারি আমাদের ভাই-বোনদের জন্ম তারিখ। সেই থেকে জন্মদিনের বিষয়ে একটু আগ্রহ সৃষ্টি হয়। যদিও আমি কখনোই আমার জন্মদিন ঘটা করে পালন করিনি। তবে জন্মদিনের বিষয়ে মনে একটি আগ্রহ থাকতো সবসময়ই। এই দিনটি আসলেই কাউকে কোনো কিছু না জানিয়ে খাইয়ে দিতাম। জন্ম তারিখ জানার পর বেশ কয়েকটি জন্মদিন এভাবেই কেটে যায়। তবে এবারের জন্ম দিনটি আমার কাছে অন্য রকম। বিগত বছর আমি যা হরিয়েছি তা আর কখনোই ফিরে পাবো না। আমার জীবনে যা ঘটে গেলো তা আমি কোনোদিনই ভুলতে পারবো না। ২০২০ সাল আমার কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।



২০১৯ সালের ৪১ দিন ভালো ভাবেই কেটেছিল। ২০ সালের শুরুটা ভালো ভাবেই যাচ্ছিল, হঠৎ সংবাদ আসে আমার বড় বোন কামরুন্নাহার অসুস্থ হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর দুদিনের মাথায় ১৯ জুন ২০২০ আপা আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে যান। আপার মৃত্যুর পর জুলাই মাসের ১০ তারিখে একটি আনন্দের সংবাদ আমাদের পরিবারে আসে। আমি একমাত্র পুত্র সন্তানের পিতা হই। আমার ছেলেকে নিয়ে যখন আনন্দে আত্মহারা ঠিক সেই সময়ই ৩১ জুলাই শুক্রবার দুপুরে ঈদুল আযহার আগের দিন আমার খুব প্রিয়জন, যাকে আমি আমার বড় ভাই হিসেবেই জানতাম, যার সুখে দুঃখে ও আমার যে কোনো সমস্যায় আমাকে ছায়ার মতো আগলে রাখতেন, কখনোই যার কাছ থেকে কোনো কিছু প্রত্যাশা করে খালি হাতে ফিরে আসতে হয়নি, আমাকে যে তার জীবনের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করতেন, শাহরাস্তি উপজেলা বিতর্ক ফাউন্ডেশনের সভাপতি শ্রদ্ধেয় শিক্ষক কবিরুল ইসলাম মজুমদার আমাকে ফোন দিয়ে বললেন, কাজল আজ কি করোনা টেস্ট করা যাবে? আমি বললাম, ভাই একটু পর জুমার নামাজ, তার ওপর শুক্রবার, এখন কাউকে পাওয়া যাবে না। কাল অথবা পরশু খবর নিতে হবে। ভাই আমাকে বল্লেন, তুমি একটু খবর নিয়ে দেখ? আমি বল্লাম, ঠিক আছে। আমি আপনাকে জানাবো। আপনার কী হয়েছে? তিনি বললেন, শরীরটা খারাপ লাগছে, দু একদিন যাবৎ জ্বর, তাই করোনা টেস্ট করতে চাইছি। ভাইয়ের সাথে কথা বলে আমি নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে মসজিদে চলে গেলাম। নামাজ শেষে বাড়িতে ফিরে দুপুরের খাবার শেষ করে বিশ্রাম নিবো, ঠিক সেই সময় ভাই আমাকে আবার ফোন দিলেন, বলে উঠলেন, কাজল তুমি কোথায়? আমি বাসায়। ভাই বল্লেন, তুমি একটু বাসায় আসো, তুমি তোমার আপার সাথে কথা বলো। এই বলে তিনি মোবাইল ফোনটি আপাকে দিয়ে দিলেন। আপা আমাকে শুধু বল্লেন, তুমি একটু জরুরি বাসায় আসো। আমি খুব তড়িঘড়ি করেই বাসায় চলে যাই। তাই খাটের উপর বসে আমাকে বল্লেন, আমার শরীর ভালো নেই, তুমি একটু চাঁদপুরে কথা বলো। আমি শ্রদ্ধেয় কাজী শাহাদাত ভাই কে ফোন দিয়ে কথা বলি। শাহাদাত ভাই আমাকে চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ ভাইয়ের সাথে কথা বলতে বলেন। আহসান উল্লাহ ভাইয়ের সহযোগিতায় চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে কবির ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য ব্যবস্থা করা হয়। আমি তাৎক্ষণিক একটি প্রাইভেট কার নিয়ে এসে কবির ভাইকে গাড়িতে উঠিয়ে দিই। ভাই আমাকে তার সাথে যেতে বলেন। কিন্ত পরের দিনই ঈদুল আজহা, তাই আমি যেতে পারিনি। বুঝতেও পারিনি এ বিদায় শেষ বিদায়।



চাঁদপুর গিয়ে পেঁৗছার পর আমি জানতে পারি, ভাইয়ের চিকিৎসা শুরু হয়েছে। করোনা কবির ভাইকে যে তিলে তিলে শেষ করে দিয়েছে তা কেউ বুঝতে পারেনি। তাকে দেখে এমনটি মনেও হয়নি। আমি যখন তাকে বিদায় দেই, তখনও আমি বুঝতে পারিনি, ভাই আর ফিরে আসবেন না। রাত প্রায় ১১টা, আমি বন্ধুদের সাথে বসে আছি। হঠাৎ কাজী শাহাদাত ভাই ফোন দিয়ে বললেন, কাজল, কবির আর নেই। শাহরাস্তিতে আমাদের আপন কেউ নেই, তুমি দায়িত্ব নিয়ে তার লাশ দাফনের ব্যবস্থা করো। আমি ভাষা হারিয়ে ফেল্লাম! কী করবো ভেবে পাচ্ছি না! ভাবতেই পারছি না কবির ভাই নেই! আমার হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল। যাকে বিকেল বেলায় বিদায় দিলাম, যার সাথে কথা বল্লাম, যার জীবনের শেষ বেলায় আমাকেই স্মরণ করলো, ঈদের আগের রাতে তার বিদায় কী করে মেনে নেই। আমি উক্ত খবরটি সাংবাদিক ছোট ভাই ফয়েজকে জানাই। এ খবর শুনে ফয়েজও ভেঙ্গে পড়লো। আমি সহযোগিতা চাওয়ার আগেই সে সকল কিছুর জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে আমাকে আশ্বস্ত করে। আমরা একত্রিত হয়ে রাত ৪টায় ভাইয়ের দাফন সম্পন্ন করে ফিরে আসি। দুই ভাই মিলে মেহার স্টেশন এলাকায় খাবার খেয়ে বাড়িতে এসে ফজরের নামাজ আদায় করি। সকালে উঠেই ঈদের নামাজ আদায় করি।



২০২০ সালের ঈদুল আযহা আমার জীবনের স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কবির ভাইয়ের মৃত্যুর দুদিন পরেই আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। মায়ের চিকিৎসার জন্য মাকে নিয়ে কুমিল্লায় ছুটে যাই। সারা রাত মাকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ছোটাছুটি। কিন্ত করোনা রিপোর্ট না থাকায় মাকে কোনো হাসপাতালেই ভর্তি করা সম্ভব হয়নি। ফজরের আজানের সময় মাকে নিয়ে আবার বাড়িতে ফিরে আসি। পরের দিন আমার মায়ের নমুনা সংগ্রহ করে চাঁদপুর পাঠানো হয়। রাতেই রিপোর্ট আসে নেগেটিভ। পরদিন আবার মাকে নিয়ে কুমিল্লায় চলে যাই, হাসপাতালে ভর্তি করে দেই। প্রথমেই ডাক্তার মাকে সিসিইউ কে ভর্তি করে দেন। কৃতজ্ঞতা জানাই ডাক্তার বেলাল হোসেন ভাইয়ের প্রতি, যিনি নিজের মায়ের মতো করেই আমার মায়ের পাশে থেকেছেন। বিভিন্ন পরমর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। প্রায় ৫ দিন হাসপাতালে থাকার পর ১৪ আগস্ট শুক্রবার জুমার নামাজের সময় মা আমাদের ছেড়ে চলে যান। মা আমাকে বলতেন, আমি তো কোনো কাজই করতে পারি না। তারপরও মা বলে তো ডাকতে পারেন। মা আমার বেঁচে থাকার প্রেরণা ছিল। আমি আমার এ বয়সেও মায়ের সাথে ঘুমাতাম। মা ছাড়া থাকতে পারতাম না। কিন্ত আজ মা নেই, আমিতো বেঁচে আছি! আর কোনোদিন মা বলে ডাকতে পারবো না। দোয়া করি, যতদিন বেঁচে থাকবো, মায়ের জন্য যাতে সর্বদা মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করে যেতে পারি।



মাকে বিদায় দেয়ার ১০ দিন পর আমার বড় কাকা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। মায়ের অসুস্থ হওয়ার সাথে সাথে ছোট কাকাও অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছুদিন না যেতেই আমার স্ত্রীর বড় ভাই অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাকে নিয়ে ঢাকায় বারডেম হাসপাতালে গিয়ে এনজিওগ্রাম করা হলে ডাক্তার জানান, জরুরি ভিত্তিতে তার ওপেন হার্ট সার্জারি করতে হবে। ঢাকায় বেশ ক'দিন থেকে তার ওপেন হার্ট সার্জারি সম্পূর্ণ করে বাড়িতে আসি। সর্বশেষ গত ১০ নভেম্বর আমার চাচাতো ভাই সহিদদুল্লাহ স্ট্রোক করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। এর মাঝে তো করোনার ঝুঁকি সব সময় মনের ভিতর উঁকি দিয়ে আছে। কুমিল্লা, ঢাকা ও চাঁদপুর ব্যস্ত সময় পার করার পরও মহান আল্লাহ আমাকে সুস্থ রেখেছেন, তার জন্যে অনেক অনেক শোকরিয়া।



বিগত একটি বছরে যা আমি হারিয়েছি তা কখনোই ফিরে পাবার নয়। জানি কোনোদিনই আমার মা, বোন, চাচা ও ভাইদের ফিরে পাবো না। যারা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন আমাদের মায়া ত্যাগ করে, আর যারা বিগত একটি বছরে আঘাত করেছেন, সকলের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছি। তিনি যেনো পরপারে ও পৃথিবীতে সবাইকেই সুখে রাখেন। সৃষ্টিকর্তা যেন করোনা থেকে সকল মানবজাতিকে নিরাপদে রাখেন। তিনি যেন আগামী বছরগুলোতে আমাদেরকে নেক হায়াত দান করেন। আমার মা-বাবাসহ পৃথিবী থেকে যারা পরপারে চলে গেছেন, মহান আল্লাহ সবাইকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুক। যারা বেঁচে আছি সবাই যাতে একটি সুন্দর, সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে পারি সেই প্রত্যাশা রইলো।



 



 



 


হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৮২-সূরা ইন্ফিতার


১৯ আয়াত, ১ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


১। আকাশ যখন বিদীর্ণ হইবে,


২। যখন নক্ষত্রম-লী বিক্ষিপ্তভাবে ঝরিয়া পড়িবে,


৩। সমুদ্র যখন উদ্বেলিত হইবে,


৪। এবং যখন কবর উন্মোচিত হইবে,


 


সাহায্য করা ভালো কিন্তু সাহায্য যেন কাউকে অলস করে না তোলে।


-ডাবিস্নউ এস গিলবার্ট।


 


 


অভ্যাগত অতিথির যথাসাধ্য সম্মান করা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য।


 


ফটো গ্যালারি
করোনা পরিস্থিতি
বাংলাদেশ বিশ্ব
আক্রান্ত ৫,১২,৪৯৬ ৮,২৪,৩৫,৪৮২
সুস্থ ৪,৫৬,০৭০ ৫,৮৪,৪৩,৫১৫
মৃত্যু ৭,৫৩১ ১৭,৯৯,২৯৪
দেশ ২১৩
সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
আজকের পাঠকসংখ্যা
২৬২৮১৭
পুরোন সংখ্যা