চাঁদপুর। রোববার ১১ জুন ২০১৭। ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪। ১৫ রমজান ১৪৩৮
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৮-সূরা কাসাস 


৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৫১। আমি তো উহাদের নিকট পরপর বাণী পৌঁছাইয়া দিয়াছি; যাহাতে উহারা উপদেশ গ্রহণ করে।


৫২। ইহার পূর্বে আমি যাহাদিগকে কিতাব দিয়াছিলাম, তাহারা ইহাতে বিশ্বাস করে।


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন

দুষ্ট লোকেরা নিজেরাই নিজেদের নরক তৈরি করে।                                -মিলটন।


মৃত্যুই অনন্ত পথ যাত্রার প্রারম্ভ। 


ফটো গ্যালারি
শতবর্ষে মতলব হাইস্কুল ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ওয়ালিউল্লাহ পাটোয়ারী
মোঃ মাকসুদুল হক বাবলু
১১ জুন, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ১৯১৭ সালে বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিবর্গের সহায়তায় জগন্নাথ সাহা ও বিশ্বনাথ ঘোষ প্রতিষ্ঠিত করেন মতলবগঞ্জ জে.বি. উচ্চ বিদ্যালয়। স্কুলটির গৌরবের শতবর্ষে অগণিত মেধাবী মুখ, হাজারো জ্ঞানী-গুণী, দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছে। এতে কা-ারীর অনন্য ভূমিকার পুরোধা ছিলেন, জ্ঞান সাধক, প্রবাদপ্রতিম প্রধান শিক্ষক ওয়ালিউল্লাহ পাটোয়ারী। তিনি ১৯৩১ সাল হতে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চলি্লশ বছরের প্রজ্ঞা, দর্শন, সাধনা, পরিশ্রম দ্বারা এ স্কুলটিকে সাফল্যের চরম শিখরে নিয়ে যান। অপরদিকে তিনি স্কুলে নিয়োজিত করেছিলেন একদল ত্যাগী, নির্লোভ, মেধাবী, নিবেদিত, আদর্শবাদী, পরিশ্রমী শিক্ষকবৃন্দ। যাদের উন্নত পাঠদানে স্কুলের জন্যে ব্যতিক্রমধর্মী ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। প্রতি বছর এ স্কুল ম্যাট্রিক/এসএসসি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান করে নেয়। ১৯৪২ সালে এ স্কুল থেকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় আঃ রহিম (সাবেক আইজিপি ও সচিব) চতুর্দশ স্থান এবং মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে ফুলার্স বৃত্তি অর্জন করেন। ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তান সেকেন্ডারী এডুকেশন বোর্ডে আঃ মতিন পাটোয়ারী (বুয়েটসহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য) ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ফলে মতলব হাইস্কুলের নাম ডাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্ররা স্কুলে পড়তে ছুটে আসতো। সেজন্যে স্কুলে ২০০/২৫০ ছাত্রের থাকার জন্যে হোস্টেল ছিলো। শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ওয়ালিউল্লাহ পাটোয়ারী দীর্ঘ ৪০ বছর বিশেষ কৃতিত্বের সাথে এ স্কুলের হেড মাস্টারের দায়িত্ব পালন করেন।



তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত একজন জ্ঞানসাধক। সমাজ সচেতন ও দৃঢ়চেতা এ মানুষটি ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাদানের জন্যে সবকিছু উজাড় করে দিতেন। হেডমাস্টার নিজে অ্যাসেম্বলী তদারকি করতেন। অ্যাসেম্বলীতে নানা অভিযোগের বিচার হতো। ক্লাস শুরুর পর গোপনে ক্লাস ঘুরে দেখতেন। হোস্টেলে ছুটে যেতেন, কেউ ক্লাস ফাঁকি দিচ্ছে কিনা।



স্কুল পালানো ছেলেদের খোঁজে মতলবসহ অন্যান্য স্থানে ছুটে যেতেন। একবার একজন মেধাবী ছাত্র পারিবারিক অসুবিধার কারণে লেখাপড়া ছেড়ে চাঁদপুর চলে আসে। কিন্তু তিনি তাঁকে খুঁজতে শুরু করেন। একদিন চাঁদপুর চিত্রলেখা সিনেমা হলের (বর্তমানে বিলুপ্ত) পাশের রাস্তায় ছেলেটিকে ক্যারাম খেলতে দেখে রিঙ্া থামিয়ে তারপর ছেলেটিকে উঠিয়ে মতলব নিয়ে যান। এ ছেলেটি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় চারটি লেটারসহ প্রথম বিভাগে পাস করে।



শাসন ও সোহাগের এক অপূর্ব সমন্বয় ছিলো তাঁর মধ্যে। কোনো ছাত্রকে একটু বেশি বেত্রাঘাত করলে স্বস্তিতে থাকতে পারতেন না। সন্তানের মতো তাঁকে কাছে নিয়ে যেতেন। তিনি গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থার গ-ির মধ্যে থেকেই সময়োপযোগী শিক্ষা বিতরণ দর্শন উদ্ভাবন করেন, যা একান্ত তাঁর নিজস্ব। ১৯৩১ সালে যখন তিনি মতলব হাইস্কুলের হাল ধরেন, তখন এটি ছিলো অখ্যাত। তাঁর নেতৃত্বের কারিশমায় শীঘ্রই এটি হয়ে গেল এক বিরাট ইতিহাস। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র সংগ্রহ করে আনতেন। গরিব, মেধাবী ছাত্রদের আশপাশের গ্রামে জায়গীর করে নিতেন। প্রয়োজনে বিনা খরচে হোস্টেলে রেখে লেখাপড়ার সুযোগ করে দিতেন। তাঁর শিক্ষা দর্শনের অন্যতম দিক ছিলো সারাবছরই স্কুলে ও স্কুলের বাইরে ছাত্রদের শ্রম ও সময় যেনো যথাযথভাবে জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত থাকে। এজন্যে অক্লান্তভাবে অনুসরণ করেছেন এক নিখুঁত সুদীর্ঘ কার্যপ্রণালী। বড় ছুটির সময় বিদ্যালয়ের প্রাক্তন কৃতী ছাত্রদের দিয়ে কোচিং ক্লাসের ব্যবস্থা করতেন। সে সময় শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানো নিষিদ্ধ ছিলো। তিনি নিজেও কম পড়াতেন না। পড়াতে গিয়ে কত ঘণ্টা যে পার হতো, সে খেয়ালই থাকতো না। পড়াশুনার পাশাপাশি তাঁর স্কুলের অন্যতম ভিত্তি ছিলো, লাইব্রেরি ওয়ার্ক, বাড়ির কাজ, সুন্দর হস্তাক্ষর, বিতর্ক ও অন্যান্য কারিকুলাম বহির্ভূত বিষয়ে অংশগ্রহণ। তাই মতলব হাইস্কুলে তাঁর সময়কালকে (১৯৩১-১৯৭১) শিক্ষার স্বর্ণযুগ বলা হতো। কুমিল্লা জেলা পরিষদের উদ্যোগে প্রকাশিত কুমিল্লা জেলার ইতিহাসে উল্লেখ আছে যে, মতলব স্কুল ১৯৩১ সাল হতে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এ ৪০ বছরে যতো কৃতী ছাত্র জন্ম দিয়েছে, অন্য কোনো লব্ধ প্রতিষ্ঠিত স্কুল-কলেজ তা করতে পারি নি। মরহুম অ্যাডভোকেট বি.ডি. হাবিবুল্লাহ তাঁর ÔLuminaries of Dhaka University বইতে Mr. Waliullah Patwary’  শিরোনামে লিখেছেন_Mr. Waliullah Patwary will live through all futuring with his undying fame and glory as the immortal saint of MatlabganjÕ'. তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। ১৯৯৯ সালের ২৫ আগস্ট এ রৌদ্র ছায়াময় পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন অন্য এক মহা পৃথিবীতে।



পরিশেষে বলতে হয়, তিনি ছিলেন সকল শিক্ষকের পথিকৃৎ, অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আজকের সম্মানীয় শিক্ষকগণ যদি তাঁর আদর্শ অনুসরণ করেন, তাঁর দর্শনের আলোকে নিজেদের পরিচালিত করেন, তা হলে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রকৃত মানুষ গড়ার কাজে অবশ্যই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে নির্দ্বিধায়। ঘরে ঘরে জ্বলে উঠবে শিক্ষার আলোকবর্তিকা। এদিকে তাঁর পদাঙ্ক ও আদর্শকে ভিত্তি করে শতবর্ষের আলোকে নতুন দীক্ষা নিয়ে মতলব হাইস্কুল তার গৌরব অব্যাহত রাখবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে আশা পোষণ করি।



 



লেখক : মোঃ মাকসুদুল হক বাবলু, শিশু সংগঠক/সভাপতি; মতলব সূর্যমুখী কচি-কাঁচার মেলা, মতলব দক্ষিণ, চাঁদপুর।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১০৪২২০১
পুরোন সংখ্যা